নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা: স্লোগানের বাইরে বাস্তবতা
-আইনুল শেখ
নারী নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের দেশে কথার অভাব নেই। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও নারী ক্ষমতায়ন, নারী স্বাধীনতা কিংবা নারী সুরক্ষার কথা শুনতে পাই। কিন্তু বাস্তবে একজন মেয়ে যখন বাড়ি থেকে স্কুল বা কলেজে যায়, তখন তার পরিবার আজও চিন্তায় থাকে—মেয়েটা ঠিকঠাক বাড়ি ফিরবে তো? কিছুদিন আগে বারুইপুরের ঘটনা আমাদের আবারও সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। একটি নাবালিকার নিথর দেহ পুকুর থেকে উদ্ধার হল। পরিবারের অভিযোগ, তাকে যৌন নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে। ঘটনাটি জানার পর স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, প্রতিবাদ হয়েছে। কিন্তু সত্যি বলতে, এই ধরনের ঘটনা ঘটলেই আমরা কয়েকদিন খুব আলোচনা করি। তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু আগের মতো হয়ে যায়। কিন্তু মেয়েদের ভয়টা কি চলে যায়? একজন ছাত্রীকে প্রতিদিন রাস্তায় কটুক্তি, বাসে অশালীন আচরণ, অনুসরণ করা কিংবা অনলাইনে হেনস্থার মতো ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়। সব ঘটনা সংবাদপত্রে আসে না। অনেক ঘটনা থানাতেও পৌঁছায় না। কারণ অভিযোগ করলে কী হবে, পরিবার কী বলবে, পরিচিত মানুষ কী ভাববে—এই ভয়গুলোও একজন মেয়েকে চুপ করিয়ে দেয়। তারপরও কোনো ঘটনা সামনে এলে আমাদের সমাজের একটা অংশ মেয়েটিকেই প্রশ্ন করতে শুরু করে। এত রাতে বাইরে ছিল কেন? কোথায় গিয়েছিল? কী পোশাক পরেছিল? আমার প্রশ্ন খুব সাধারণ—অপরাধ করেছে যে, প্রশ্নটা তাকে না করে মেয়েটিকে কেন করা হবে? নিরাপত্তার নামে মেয়েদের স্বাধীনতা কমিয়ে দেওয়াও সমাধান হতে পারে না। ‘সন্ধ্যার পরে বাইরে যেও না’, ‘একা যেও না’, ‘ওই জায়গায় যেও না’—ছোটবেলা থেকে মেয়েদের এই কথাগুলোই বেশি শেখানো হয়। অথচ ছেলেদের কতজনকে শেখানো হয়, একজন মেয়েকে অসম্মান করা যাবে না, তার ‘না’-এর অর্থ ‘না’?
শিক্ষাঙ্গনের কথাও বলতে হয়। কলেজে কোনো ছাত্রী হেনস্থার শিকার হলে সে কোথায় অভিযোগ করবে—আমাদের মধ্যে কতজন সেটা জানি? অভিযোগ করলে সত্যিই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তার পরিচয় গোপন থাকবে কি না- এই বিশ্বাসটাই যদি না থাকে, তাহলে শুধু কমিটি তৈরি করে কী লাভ? আর গ্রামের মেয়েদের সমস্যাটা আরও কঠিন। অনেককে দূর থেকে কলেজে আসতে হয়। সন্ধ্যার পরে বাস কমে যায়, অনেক রাস্তায় পর্যাপ্ত আলো নেই, কাছাকাছি নিরাপদ হোস্টেলও পাওয়া যায় না। তখন অনেক পরিবার মেয়েকে বলে, ‘এত দূরে গিয়ে পড়াশোনা করার দরকার নেই।’ এভাবেই হয়তো একজন মেয়ের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন থেমে যায়। এখানেই নারী নিরাপত্তার প্রশ্নটা শিক্ষার অধিকারের সঙ্গে মিশে যায়। বারুইপুরের ঘটনার পরে আমরা বিচার চাইছি। নিরপেক্ষ তদন্ত হোক, দোষীরা কঠোর শাস্তি পাক—এই দাবি অবশ্যই থাকবে। কিন্তু শুধু ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে প্রতিবাদ করলেই কি আমাদের দায়িত্ব শেষ? কেন এমন ব্যবস্থা তৈরি হবে না, যেখানে একটা মেয়ের নিরাপদে বাড়ি ফেরা নিয়ে তার পরিবারকে প্রতিদিন ভয় পেতে হবে না? নারী দিবসে আমরা পোস্টার লাগাই, নারী শক্তির কথা বলি। সরকারের বিজ্ঞাপনেও নারী সুরক্ষার কথা থাকে। কিন্তু বাস্তবের মেয়েটা যদি রাস্তায় নিরাপদ না থাকে, কলেজে অভিযোগ করতে ভয় পায়, কিংবা নিরাপত্তার অভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়—তাহলে সেই সমস্ত স্লোগানের মূল্য কোথায়? নারী শিক্ষার্থীরা কারও দয়া চায় না। তারা শুধু নিজের অধিকার নিয়ে পড়তে চায়, চলতে চায়, নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে চায়। বারুইপুরকে আর পাঁচটা ঘটনার মতো ভুলে গেলে চলবে না। আজ বিচার চাইতে হবে, আবার একই সঙ্গে প্রশ্নও করতে হবে—কেন বারবার এমন ঘটনা ঘটছে? আমার মনে হয়, এই প্রশ্ন তোলার দায়িত্ব ছাত্রসমাজেরও আছে। কারণ একজন ছাত্রীর নিরাপত্তার লড়াই শুধু তার একার লড়াই নয়। এই লড়াই আমাদের সবার।