সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে মনে রেখে…

কল্লোল, কৃত্তিবাস,হাংরি জেনারেশন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অবানিজ্যিক তিনটি পৃথক ধারা।এর মধ্যে কৃত্তিবাস ছাড়া অন্য দুটি সঠিক অর্থে কিছুটা উন্নাসিক। গোষ্ঠীর বাইরে যেতে তাদের দ্বিধা দ্বন্দ ছিল।ফলে নতুন লেখকদের কাছে খুব আপন হয়েও উঠতে পারেনি।চাতক পাখির মতো কমবয়েসীদের নজর কাড়তো কৃত্তিবাসের পাতা।একই ভাবে কৃত্তিবাসের নজর থাকতো নতুন লেখকদের প্রতি। যুবক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রথম থেকেই কৃত্তিবাসের সামনের সারিতে ছিলেন। খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেও তিনি নতুনদের অভিভাবকত্ব অস্বীকার করার সামান্য ইচ্ছে প্রকাশ করতে চাননি বা করেন নি। বোলপুর- শান্তিনিকেতন থেকে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিন “১৪০০ সাহিত্য” সম্পাদনার সুবাদে তাঁর কাছে খুব সহজেই যাবার সুযোগ পেয়েছি। শান্তিনিকেতন লাগোয়া ফুলডাঙায় তাঁর বাড়িতে যেতাম মাঝে মধ্যেই। বাড়ির নাম ” একা এবং কয়েকজন”। পরামর্শ দিয়েছেন কীভাবে লিটলম্যাগ আন্দোলনের শরিক হতে হয়। “সম্পাদক যখন লেখা নির্বাচন করবে লেখকদের নামটা চাপা দিয়ে শুধু লেখাটি পড়বে”-তাঁর কাছেই শেখা।
এটি মুক্তচিন্তার একটি সহজ পাঠ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যা নিজের জন্য ও উত্তরসুরীদের জন্য বিশ্বাস করে গেছেন। তাঁর প্রতিটি বিশ্বাসের পেছনে ছিল অনন্ত জিজ্ঞাসা ও অকপট সাহসী উচ্চারণ। কথায় কথায় বলতেন তরুণদের প্রতি তাঁর দুর্বলতার কারণ। ভাঙবার, গড়বার সাহস এবং স্পর্ধাকে তিনি উৎসাহিত করতে পছন্দ করে গেছেন আজীবন – জীবন ও সৃষ্টির যথার্থ মেলবন্ধনে।ফুলডাঙার বাড়িতে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম অনেক লেখকের লেখা তাঁর জীবনচর্চার সঙ্গে মেলেনা।কবি কি কবিতার সতীন? হেসেছিলেন। বলেছিলেন “, ভালোটা নিও , খারাপটা শিখো না।”
তাঁর ” মনের মানুষ” চিনতে শিখিয়েছে লালনকে আরো কাছ থেকে। লালন আর রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখার মাধ্যমে আমাদের কাছে আরো সহজ করে এসেছেন।
“পূর্ব পশ্চিম” কিংবা “প্রথম আলো” বা “সেই সময়” ইতিহাসকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে শিখিয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা এক একপেশে স্তাবকতা চমকে উঠে হোঁচট খেয়েছে। ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে তিনি দেখিয়েছেন মহামানবদের কিছু কিছু কার্যকলাপ। উচ্চারণে অকপট স্বীকারোক্তি মহামানবেরাও আদতে মানুষ। এই মুক্তচিন্তা অবতার তত্ত্বের বিরোধী। স্বাভাবিকভাবেই মৌলবাদীদের না- পসন্দ।
“কি লিখবেন কেন লিখবেন” গোষ্ঠীতে কাজ করেও তিনি নিজস্ব সক্রিয়তায় মুক্তচিন্তার ধারক ও পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছেন।
পূর্ববঙ্গে জন্ম তাঁর। এই বঙ্গে সফল জীবন। জন্মভূমি কর্মভূমি উভয়ই জুড়ে আছে তাঁর সৃজনভূমি। বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর ছিল এক প্রশ্নহীন ভালোবাসা,দরদ। আসলে তিনি বিশ্বাস করতেন ভাষার মাধ্যমেই অখণ্ড মানুষের দেখা পাওয়া যায়। ধর্ম তার কাছে এক অপ্রয়োজনীয় ধারণা।
জাতপাত মানুষের সৃষ্টি করা এক অবাঞ্ছিত সংক্রমণ।
ফুলডাঙ্গার বারান্দায় বসে উদাত্ত কণ্ঠে তাঁর গাওয়া রবীন্দ্র সংগীত যেভাবে ভেসে যেত খোলা হাওয়ায় , আজ সেই আকাশ দখল করতে চাইছে স্বার্থপর দৈত্য। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় থাকলে দুলতে দিত না ,”সাঁকো” টা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *