অক্ষর থেকে অধিকার — আন্তর্জাতিক স্বাক্ষরতা দিবস প্রসঙ্গে
সাগ্নিক গোস্বামী
স্বাক্ষরতা একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন। প্রতিটি মানুষের হাতে একটি বই পৌঁছে দেওয়া নিছক একটি শিক্ষামূলক কর্মসূচি নয়। অক্ষর চেনার অধিকার মানে শুধু নিজের নাম লিখতে পারা নয় — রাষ্ট্রের নীতি পড়া, শ্রমচুক্তি বোঝা, ইতিহাসকে প্রশ্ন করা, ধর্মীয় নির্দেশকে যাচাই করার এবং ক্ষমতার ভাষার বিরুদ্ধে নিজের ভাষা প্রয়োগের অধিকার।
১৯৬৫ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর, ইরানের রাজধানী তেহরানে UNESCO এর উদ্যোগে World Congress of Ministers of Education on the Eradication of Illiteracy-এর উদ্বোধন হয়। সেই সম্মেলনই ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে পালনের সুপারিশ করে ও পরবর্তীতে UNESCO ১৯৬৬ সালে ঘোষণা করে। ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস তার ৬০তম বর্ষে পৌঁছেছে। কিন্তু ছয় দশক পরেও পৃথিবীর সামনে প্রশ্নটি একই রয়ে গেছে — সবাই কি সত্যিই শিক্ষার অধিকার পেয়েছে?
শিক্ষায় অসাম্য — ইতিহাস লেখার অধিকার : মানবসভ্যতার ইতিহাসে জ্ঞান কখনও সমভাবে বণ্টিত হয়নি। সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই লেখা, পড়া এবং জ্ঞানচর্চা ছিল সমাজের বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত অংশের হাতে কেন্দ্রীভূত। রাজপরিবার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বা অভিজাত শ্রেণি— জ্ঞান ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের একটি অস্ত্র। ইতিহাস লেখার অধিকার তাদেরই, যারা স্বাক্ষর — ফলে, ইতিহাসে কাদের ঠাঁই হবে বা কাদের আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হবে — সবটার ভাগ্যনিয়ন্তা শিক্ষিত শ্রেণীই।
আধুনিক যুগে গণশিক্ষার ধারণা বিকশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা ক্রমশ একটি গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন হয়ে ওঠে। শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, নারীমুক্তি আন্দোলন এবং উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম — সব ক্ষেত্রেই শিক্ষার দাবি ছিল মুক্তির দাবির সঙ্গে যুক্ত। ১৯৪৮ সালের Universal Declaration of Human Rights-এর Article 26 স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে — প্রত্যেক মানুষের শিক্ষার অধিকার রয়েছে; অন্তত বুনিয়াদি স্তরের শিক্ষা বিনামূল্যে হওয়া উচিত এবং প্রাথমিক শিক্ষা হওয়া উচিত বাধ্যতামূলক।
স্বাক্ষরতার অর্থ : একসময়ের ধারণা ছিল নিজের নাম লিখতে পারার মতো সাধারণ অক্ষরজ্ঞান অর্জন করলেই স্বাক্ষরতা লাভ হয়। কিন্তু, বর্তমান পৃথিবীতে স্বাক্ষরতার অর্থ বিস্তৃত। তথ্য বুঝতে পারা, বিজ্ঞানমনস্কভাবে স্বাধীন চিন্তা করা, প্রযুক্তির নতুন পৃথিবীতে Fake News শনাক্ত করতে পারা এবং রাষ্ট্র-সমাজকে প্রশ্ন করতে পারা — এই সবটাই স্বাক্ষরতার সঙ্গে যুক্ত।
শিক্ষা নিয়ে ব্রাজিলীয় শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরের চিন্তা আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর মতে, শিক্ষা এমন কোনও ব্যবস্থা হতে পারে না, যেখানে শিক্ষক শুধু জ্ঞান জমা করেন আর ছাত্র সেই জ্ঞানের নিষ্ক্রিয় ভাণ্ডার। শিক্ষাকে হতে হবে প্রশ্নের, চিন্তাভাবনা আদানপ্রদানের ও বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত (প্রাকটিক্যাল)। রবীন্দ্রনাথের তোতাকাহিনীর মতোই, শিক্ষাকে কুঠুরীবদ্ধ করার চেষ্টা তথাকথিত শিক্ষিত পন্ডিতরা করছেন — ফলে, পাঠ্যবই ও পাঠ্যক্রমের চাপে মুক্তমনা ছাত্রছাত্রীরা সার্বিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কিন্তু, শিক্ষা মানে শুধু তথ্য নয়— চেতনা।
Education for All – বাস্তবতা : বিশ্বে সাক্ষরতার হার অবশ্যই বেড়েছে। গত কয়েক দশকে বহু দেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। কিন্তু বৈষম্য এখনও ভয়াবহ। বিশ্বে প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতার হার ২০১৪ সালের প্রায় ৮৫ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে প্রায় ৮৮ শতাংশে পৌঁছেছে। কিন্তু, একই সঙ্গে, ২০২৪ এর পরিসংখ্যান অনুযায়ীও, বিশ্বে প্রায় ৭৩৯ মিলিয়ন যুব ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মৌলিক সাক্ষরতা দক্ষতা ছিল না। জাতিসংঘের Sustainable Development Goals 4 (SDG4) সংক্রান্ত সাম্প্রতিক হিসেব অনুযায়ী প্রায় ৭৫৪ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এখনও নিরক্ষর, এবং তাঁদের প্রায় ৬৩ শতাংশ নারী। অর্থাৎ নিরক্ষরতার প্রশ্নটি শুধুমাত্র শিক্ষার প্রশ্ন নয় — একই সঙ্গে শ্রেণি, লিঙ্গ, অঞ্চল এবং সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্ন।
শিক্ষা সকলের — না ধর্মের, না বাজারের : শিক্ষা মানুষের অধিকার — কোনও কর্পোরেট বাজারের পণ্য নয়। বর্তমানে সব রাষ্ট্রযন্ত্রই ‘Education For All’ উদযাপন করলেও শিক্ষা ক্রমশ একটি commodity অর্থাৎ পণ্যে পরিণত হচ্ছে। নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতির অন্যতম বিপজ্জনক প্রবণতা — শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহণ — যে ক্ষেত্রগুলি একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত, সেগুলিকে বাজারের হাতে তুলে দেয়া। এর ফল কী? — বেসরকারি শিক্ষা, ঝাঁ-চকচকে ক্যাম্পাস, শিক্ষা ঋণের পাহাড়, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার সংকট — পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাব, গবেষণায় অর্থ বরাদ্দ হ্রাস এবং সর্বোপরি শিক্ষাকে বিনিয়োগের বাজার হিসেবে গড়ে তোলা।
শিক্ষার অন্য মৌলিক চ্যালেঞ্জ আসে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও অন্ধ বিশ্বাসের রাজনীতি। শিক্ষার কাজ প্রশ্ন করতে শেখানো। গোঁড়ামির কাজ প্রশ্ন বন্ধ করা। ধর্মীয় মৌলবাদ চায় নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্নকে নিষিদ্ধ করে দিতে। কিন্তু, একটি গণতান্ত্রিক ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা কখনও কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় মতবাদকে unquestionable truth হিসেবে শিক্ষার্থীর উপর চাপিয়ে দিতে পারে না। চার্বাক থেকে গ্যালিলিও, কোপার্নিকাস থেকে ডারউইন, বিদ্যাসাগর থেকে জগদীশচন্দ্র—মানবসভ্যতার অগ্রগতি ঘটেছে প্রশ্ন করার মধ্য দিয়েই। তাই ভারতের ছাত্র ফেডারেশন মনে করে — শিক্ষা হোক সকলের, না ধর্মের না বাজারের।
ডিজিটাল যুগে নয়া-নিরক্ষরতা : একবিংশ শতাব্দীতে সাক্ষরতার প্রশ্ন আরও জটিল হয়েছে। ডিজিটাল পৃথিবীতে একজন মানুষকে জানতে হবে — কোন খবর সত্য, কোনটি প্রোপাগান্ডা, কোনটি algorithm – এর তৈরি বিভ্রম। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে অশিক্ষা শুধু অক্ষর না জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আজ একজন তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত মানুষও তথ্যের সমালোচনামূলক মূল্যায়ন করতে না পারলে তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক manipulation-এর শিকার হতে পারেন। রাজনৈতিক স্বার্থের, প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে ইতিহাস বিকৃতি, হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটি তে প্রস্তুতকৃত তথ্য প্রচার — এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গণমুখী ডিজিটাল শিক্ষা, বিনামূল্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকার এর কথা বলতে হবে।
১৯১৭ সালে নভেম্বর বিপ্লবের পর নবগঠিত সোভিয়েত রাষ্ট্রের সামনে এক নির্মম বাস্তবতা ছিল — বিপুল জনগোষ্ঠী নিরক্ষর। কিন্তু, সোভিয়েত সমাজতন্ত্র প্রণীত “Likbez” বা ‘likvidatsiya bezgramotnosti’ — নিরক্ষরতা নির্মূলের অভিযান সমাজে শিক্ষা আন্দোলনকে এক গণআন্দোলনের চরিত্র দিয়েছিল। গণশিক্ষা আন্দোলনের দীর্ঘ ঐতিহ্য, নিরক্ষরতার বিরুদ্ধে সম্মিলিত সংগ্রাম এবং সমতার স্বপ্ন আজও আমাদের পথ দেখায়। ছাত্র আন্দোলন সেই উত্তরাধিকারেরই নতুন প্রজন্মের কণ্ঠ — শিক্ষাকে পণ্য নয়, অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার লড়াই চলবে…
তথ্যসূত্র:
1. https://www.unesco.org/en/days/literacy