বয়সে তরুণ, চেতনায় পাহাড়সম এক বিপ্লবের নাম ভগৎ সিং
দেবাদৃত আচার্য
১৯০৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর অবিভক্ত পাঞ্জাবের বাঙ্গা গ্রামে ভগৎ সিং-এর জন্ম। ছেলেবেলা থেকেই পরিবারে স্বাধীনতা আন্দোলনের আবহ। লাহোরের ন্যাশনাল কলেজে পড়ার সময় থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি বিপ্লবী ভাবধারার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি । ১৯২৬ সালে নওজোয়ান ভারত সভা গঠন করেন এবং তারপরেই হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান
অ্যাসোসিয়েশন-এর অন্যতম প্রধান নেতা হয়ে ওঠেন তিনি। তাঁর উদ্দেশ্য শুধুমাত্র ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতবর্ষ- কে মুক্ত করা ছিল না , ভগৎ সিং এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল একটি শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজ বা দেশ গঠন করা।
ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াইয়ের দুটি ঘটনা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ১৯২৮ সালে লালা লাজপত রাই এর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে লাহোরে সন্ডার্স হত্যা এবং ১৯২৯ সালে সেন্ট্রাল অ্যাসেম্বলিতে বোমা নিক্ষেপ, যেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে এমন বোমা তৈরি করা হয়েছিল যাতে প্রাণহানি না হয়, তবে উদ্দেশ্য ছিল বধির ব্রিটিশ সরকারকে জাগানো। এরপর গ্রেপ্তার এবং বিখ্যাত লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা। ১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ সন্ধ্যায় নির্ধারিত সময়ের ১১ ঘণ্টা আগেই লাহোর সেন্ট্রাল জেলে রাজগুরু ও সুখদেবের সঙ্গে তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ফাঁসির দিনের শেষ মুহূর্ত নিয়ে একটি তথ্য প্রচলিত রয়েছে, যা বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়। জেলের ওয়ার্ডারের কাছে তাঁর শেষ ইচ্ছা জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, তিনি লেনিনের জীবনী পড়ছিলেন এবং সেটি শেষ করতে চান। সেই সময় তিনি জার্মান মার্কসবাদী ক্লারা জেৎকিনের লেখা ‘Reminiscences of Lenin’ বইটি পড়ছিলেন, কোনো কোনো সূত্রে লেনিনের ‘State and Revolution’ বইটির কথাও উল্লেখ রয়েছে।
ভগৎ সিং-এর রাজনৈতিক চিন্তায় ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান ছিল না। ১৯২৮ সালে ‘ কীর্তি’ পত্রিকায় তিনি ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও তার প্রতিকার’ নামক একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি লেখেন যে ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পিছনে মূল কারণ ব্রিটিশ শাসন এবং ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা। সেই সময় ১৯২৫ সালে আরএসএস-এর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এবং হিন্দু ও মুসলমান সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলি সক্রিয় ছিল। ভগৎ সিং সেই সব ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি নিজেকে নাস্তিক বলে ঘোষণা করেন এবং জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় ‘আমি কেন নাস্তিক’ প্রবন্ধটি লেখেন। তাঁর কাছে বিপ্লবের অর্থ ছিল যুক্তিবাদ, সমতা এবং সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষতা।
ভগৎ সিং যে ভারতের স্বপ্ন দেখতেন তা রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর লেখা থেকে জানা যায়, তিনি এমন একটি ভারতের কথা ভেবেছিলেন যেখানে মানুষকে ধর্ম, জাত , বর্ণে নয়, মানুষ হিসেবে পরিচিত হবে। যেখানে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও শোষণ নামক কোনো শব্দের অস্তিত্ব থাকবে না। তাঁর কাছে স্বাধীনতার অর্থ ছিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি। এই কারণেই আজও তাঁর চিন্তাধারা ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে গণ্য করা হয়।
ভগৎ সিং-কে ফাঁসির মঞ্চে এনে ব্রিটিশ শাসক ভেবেছিল একটা অধ্যাযের সমাপ্তি ।ওরা বোঝেনি যে ওটা শেষ ছিল না। ভারতের বুকে অতীতেও ভগৎ সিং ছিল, আজও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে । যতদিন অন্যায় থাকবে, ততদিন প্রতিবাদ হয়ে থাকবে। যতদিন শোষণ থাকবে, ততদিন ইনকিলাব হয়ে ভারতবর্ষের প্রতিটি মানুষের বুকের পাঁজরের ভেতর থাকবে – এক বিপ্লব , ভগৎ সিং

