RSS আর হিন্দু মহাসভা দেশের সবচেয়ে বড় গদ্দার- নেতাজি

ভূমিকা:

স্বাধীনতার ৮০ তম বর্ষে দাঁড়িয়ে আমাদের শুনতে হচ্ছে, জাতির বিবেককে ‘গুন্ডা’ আখ্যা দেওয়া। ফরোয়ার্ড ব্লকের কর্মীদের উদ্দেশ্যে ছোঁড়া এই বিশেষণ বাস্তবে জাতির অপমান। যাঁর নামে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কেঁপেছিল , যার নাম শুনলে এখনো অবধি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের বুকের পাঁজরা কেঁপে ওঠে । যিনি বাঙালির কাছে কোনো দেবতা নন, তিনি প্রেরণা।
আজ যখন সম্পূর্ণ দেশ এক ভয়ঙ্কর সম্প্রদায়িক অসুখে আক্রান্ত তখন প্রশ্নটা খুব সোজা। আমরা পতাকার তলায় কাকে স্মরণ করবো? প্রশাসনিক ফাইলের নেতাকে, নাকি রক্তস্নাত সংগ্রামের নায়ককে?

ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা -বাঙালির চেতনায় নেতাজির অবস্থান:

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বাঙালির কাছে কোনো আমদানি করা আইকন নন। তিনি রক্তের উত্তরাধিকার।
বার্মায় “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব” এই বক্তব্য শুনে লাখ লাখ ভারতীয় যুবক যুবতী সংগ্রামের পথ বেছে নিয়েছিলেন। ঝাঁসির রানী রেজিমেন্ট, নেহেরু ব্রিগেড, গান্ধী ব্রিগেড। বিশ্ব ইতিহাসে এই প্রথম কোনো জাতীয় মুক্তি বাহিনীতে নারীদের সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ দেখাগিয়েছিল

বাঙালির প্রতিটি ঘরের দেওয়াল, স্কুলের প্রার্থনা, পাড়ার মোড়ের মূর্তি। সর্বত্র নেতাজি। এই উপস্থিতি মুছে ফেলার মতো ধৃষ্টতা এখনও কারোর হয়নি।

ওরা ভারতের সরকারি নথিতে শ্যামাপ্রসাদের নাম প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। কিন্তু এই বাঙালির সমষ্টিগত চেতনায় নেতাজির নাম বহু আগেই রক্তাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে রয়েছে। সেই লিপি মোছার অসাধ্য সাধন এখনো কেউ করে উঠতে পারেনি।

আদর্শিক সংঘাতে নেতাজির ,RSS সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গির বিশ্লেষণ:

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক দর্শন ছিল সর্বাত্মক জাতীয়তাবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের কখনই কোনো স্থান ছিল না। তাঁর কাছে স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র ভারতবাসীর সম্মিলিত অভ্যুত্থান। এই কারণেই তিনি কখনোই সংকীর্ণ সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদকে স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল স্রোত হিসেবে স্বীকার করেননি। RSS যে হিন্দু সাংস্কৃতিক ঐক্যের তত্ত্ব প্রচার করত, নেতাজির সর্বধর্ম সমন্বয়ের আদর্শ তার থেকে মৌলিকভাবে পৃথক ছিল। আজাদ হিন্দ ফৌজে মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান সৈনিকদের একত্রে ব্রতী করার মধ্য দিয়ে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ সেনাবাহিনীর আদর্শ স্থাপন করেন। তাঁর কাছে দেশপ্রেমের মাপকাঠি ছিল আত্মত্যাগ ও রাষ্ট্রচিন্তা, কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক সংগঠনের প্রতি আনুগত্য নয়। তাই ১৯৪০ সালের মে মাসে একটি জনসভায় তিনি হিন্দু মহাসভার সাম্প্রদায়িক রাজনীতির তীব্র বিরোধিতা করেন এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চোখে চোখ রেখে তিনি সম্পূর্ণ ভারতবর্ষের সামনে এই বক্তব্য রাখেন “সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীদের হিন্দু মহাসভা ত্রিশূল হাতে ভোটভিক্ষায় পাঠিয়েছে। ত্রিশূল আর গেরুয়া বসন দেখলে হিন্দুমাত্রেই শির নত করে। ধর্মের সুযোগ নিয়ে ধর্মকে কলুষিত করে হিন্দু মহাসভা রাজনীতির ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে। এই বিশ্বাসঘাতকদের আপনারা রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে সরিয়ে দিন। তাঁদের কথা কেউ শুনবেন না। আমরা চাই দেশের স্বাধীনতাপ্রেমী নরনারী একপ্রাণ হয়ে দেশের সেবা করুন।”

আদর্শিক সংঘাত- নেতাজি বনাম শ্যামাপ্রসাদ:

বিরোধটা ব্যক্তিগত ছিল না, ছিল মৌলিক আদর্শের।
কলকাতার রাজপথে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় যখন ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি করতেন, নেতাজি তার ঠিক পরেই পাল্টা জনসভা করে জাতীয় ঐক্যের কথা বলতেন। নেতাজি ধর্মকে কখনোই রাজনীতির হাতিয়ার করেননি। বরং বারবার সতর্ক করেছেন । তিনি এক উক্তির মাধ্যমে সাধারণ জনগণের কাছেই বার্তা রাখতে চেয়েছেন যে “ধর্মের ভিত্তিতে রাজনীতি করা জাতির জন্য আত্মঘাতী। যে জাতি ধর্মের নামে বিভক্ত, সে জাতি কখনো স্বাধীনতার যোগ্য হতে পারে না।” । তাই আজাদ হিন্দ ফৌজে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান একই পতাকার তলায় লড়েছিল। তিনি জানতেন, বিভাজন মানেই দুর্বলতা এবং দুর্বলতার অর্থই পরাধীনতা। নেতাজি INA-র ব্যারাকে মন্দির-মসজিদ খোঁজেননি। তিনি খুঁজেছিলেন শুধু এক ভারতীয়কে, যে ভারতীয় মাথার উপর ভারতের পতাকা উড়িয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের চোখে চোখ রেখে বন্দেমাতরম ধ্বনী উচ্চারিত করতেও দ্বিধাবোধ করবে না, কিন্ত বর্তমানে আমরা যা দেখছি আজ কিছু মানুষ আধার কার্ডে ধর্ম দেখে দেশপ্রেম মাপছে।

মুক্তি সংগ্রামের রূপকার-নেতাজির কৌশল ও ত্যাগ-

নেতাজির সংগ্রাম কোনো নিছক আন্দোলন ছিল না। সে সংগ্রাম ছিল পরিকল্পিত, রক্তাক্ত, বৈপ্লবিক যুদ্ধ।
নেতাজি জানতেন, আবেদন-নিবেদনের মাধ্যম দিয়ে ব্রিটিশদের ভারত থেকে বিদায় জানানো যাবে না । তাই তিনি বেছে নিলেন দুঃসাহসী পথ। সাবমেরিনের পথে কাবুল, বার্লিন, টোকিও। সমগ্র বিশ্ব ঘুরে তিনি বুঝিয়ে দিলেন যে, ভারতের স্বাধীনতা আন্তর্জাতিক ইস্যু। তিনি গড়লেন আজাদ হিন্দ ফৌজ। INA-র সৈনিকরা ইম্ফল-কোহিমার দুর্গম পাহাড় জয় করেছিল। অনাহারে এবং অস্ত্রের অভাবে,কিন্তু মনোবল অটুট রেখে। তিনি নারীদের যুদ্ধের প্রথম সারিতে এনেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ,জাতির মুক্তি অর্ধেক আকাশ বাদ দিয়ে সম্ভব নয় কখনোই সম্ভব নয় ।তিনি ছিলেন সেই দাবানল, যে দাবানলে ঔপনিবেশিকতার শতাব্দীর জঙ্গল পুড়ে ছাই হয়েছিল । তিনি ছিলেন সেই জলোচ্ছ্বাস, যে জলোচ্ছ্বাসে দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে খানখান হয়েছিল। তাই আজও তার নাম প্রত্যেকটি ভারতীয়র বুকের পাঁজরার ভেতর অবস্থানরত

‘গুন্ডা’, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও প্রত্যুত্তর:

যারা নেতাজিকে ‘গুন্ডা’ বলেন, তারা আসলে কাদের অপমান করছেন? ভারত স্বাধীনের আন্দোলনে যারা ভারত স্বাধীনের দাবী বুকের মধ্যে পুষে রেখে বিট্রিশদের লাঠির সম্মুখীন হয়েছিলেন , যাদের মাসের পর মাস জেল খাটতে হয়েছিলো। যারা ইম্ফলের রক্তাক্ত প্রান্তরে ব্রিটিশ ট্যাঙ্কের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন!!
ওদের অভিধানে গুন্ডার অর্থ যে বা যাঁরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে আঙুল তোলে। আমাদের অভিধানে গুন্ডার অর্থ যে অন্যায়ের সামনে মাথা নত করে না। যদি প্রতিরোধের নাম গুন্ডা হয়, তবে আমরা সেই ‘গুন্ডা’ উপাধি সগর্বে বহন করি।

সমষ্টিগত স্মৃতি ও আবেগ: ভারতীয়দের কাছে নেতাজি:

অন্ধ আবেগ নয়। ওটা ঐতিহাসিক ঋণ। আমরা যে স্বাধীন বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, তার প্রতিটি অনুতে নেতাজির ত্যাগ মিশে রয়েছে, আমরা যে তিরঙ্গা র নীচে বকচিতিয়ে দাঁড়াই, তার প্রতিটি সুতোয় INA শহীদের রক্তের দাগ রয়েছে। ওরা নেতাজির মূর্তিতে মালা পরায় । আমরা সেই পাথরের মূর্তির চোখের জল দেখতে পাই। কারণ আমরা জানি, তিনি জাতির জন্য নিজের যৌবন, পরিবার, জীবন উৎসর্গ করে দিতেও একবারও দ্বিধা বোধ করেননি

আজকের অঙ্গীকার:

যে নাম উচ্চারণ করে আমরা জয় হিন্দ বলি, সেই নামকে অপমান করার অর্থ তিরঙ্গার প্রতিটি রঙ, প্রতিটি সুতোকে অপমান করা। ইতিহাস কখনো কাঁচি ,আঠা দিয়ে তৈরি হয় না। ইতিহাস তৈরি হয় রক্ত, ঘাম এবং আত্মত্যাগের মাধ্যমে।
নেতাজি সেই ইতিহাস লিখে গিয়েছেন। আমাদের কাজ শুধু সেই ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখা।

ওরা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ইতিহাস খুঁজছে। কিন্তু আমরা ইতিহাসকে বাঁচাতে রক্ত দিতে প্রস্তুত। ওদের গুন্ডা, আমাদের নেতা ,নেতাজি!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *