অপেক্ষা, উপেক্ষা, প্রেম, যুদ্ধ আর কাস্ত্রো!
দেবাঞ্জন দে
হাভানা বিশ্ববিদ্যালয় তখন স্বৈরাচারী সরকারের মাফিয়াচক্রের দখলে। সশস্ত্র সুগার মাফিয়ারাই তখন কন্ট্রোল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত কিছু। ইউনিয়নের দখল নিয়ে চলে বিস্তৃত অপরাধ চক্র। ঠিক এরকম একটা সময়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো বেপরোয়া একটা ছেলে। দু’চোখে মুক্তির স্বপ্ন, প্রতিবাদের মেজাজ, বদলের ভাষ্য ফেরি করা ছেলেটা বন্ধুদের একত্রিত করে ফার্স্ট ইয়ারেই কনটেস্ট করলো ক্লাস প্রতিনিধির ভোটে! উল্টোদিকের মাফিয়াচক্র মনোনীত প্রার্থীকে হারিয়ে দিলো ১৮১-৩৩ ভোটের ব্যবধানে।
খানিকটা চোয়াল শক্ত হলো হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুুক্তিকামী ছাত্রদের। ভুরু কুঁচকালো মাফিয়ারা। পরের বছর বেপরোয়া ছেলেটা কনটেস্ট করতে গেলো ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি পদে। এই পদে তার আগে বছরের পর বছর মাফিয়া কন্ট্রোলড্ প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে কেউ দাঁড়ানোর সাহস দেখায়নি! স্পর্ধা দেখালো স্মিত হাসি আর ঝরঝরে বক্তৃতায় সরকারি লেখাপড়ার ব্যবস্থায় খরচ কমানোর কথা বলা ছেলেটা। প্রমাদ গুনলো মাফিয়ারা, কেঁপে গেলো সরকার! বেরিয়ে পড়লো অস্ত্রশস্ত্র। ক্যাম্পাসের ভেতর সশস্ত্র মাফিয়া টাইকুনরা বন্দুক উঁচিয়ে ঘিরে ফেললো তাকে। খুনের হুমকি দিয়ে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলো ক্যাম্পাস থেকে। ঘোষণা হলো এর জন্য হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ে নো এন্ট্রি!
ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে ছেলেটা ছুটলো হাভানার বিখ্যাত সমুদ্র সৈকতে। বিপুল ক্যারিবিয়ান মহাসাগরের সামনে নিজের ক্ষুদ্রতা, হতাশা, যন্ত্রণা, গ্লানি থেকে হাঁটু গেড়ে নিজের মুখ ঢেকে হাউহাউ করে কাঁদলো একলা, নিঃসঙ্গ ছেলেটা। সমুদ্রের গর্জন ঢেকে দিলো সেই কান্নার আওয়াজ। আর খুঁজে দিলো মন-মগজের ভেতরে এক নতুন সমষ্টিগত গর্জনের সন্ধান- বিপ্লব! ছেলেটার নাম ফিদেল! হ্যাঁ, লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী রক্তপ্রবাহের সবচেয়ে উজ্জ্বলতম তারা ফিদেল কাস্ত্রো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী দুনিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটানো একমাত্র ছাত্রনেতা- সমাজতন্ত্র গড়ার যুদ্ধে নামার আগে যার ছাত্র আন্দোলন ছাড়া আর কোনো অভিজ্ঞতাই ছিলো না!
সোভিয়েত পতনের পর যে হাভানার সমুদ্রসৈকতে ফিদেল কাস্ত্রো ঘোষণা করেছিলেন সমাজতন্ত্রের অমরত্ব, সেই একই জায়গায় ছাত্র ফিদেলের কান্না তাকে চিনিয়েছিলো রাজনীতির হৃদস্পন্দন। ঐ নিঃসঙ্গ কান্না, ঐ ছটফটানি, ঐ একা থেকে কয়েকজনে পৌঁছনোর ব্যাকুলতাই গড়ে তুলেছিলো ভবিষ্যতের পেন্টাগনের ঘুম কেড়ে নেওয়া বিপ্লবীকে। সেদিন কান্না থামিয়ে ফিদেল ছুটেছিলো বন্ধুর কাছে, হাতে নিয়েছিলো ফাইভ বুলেটের ব্রাউনিং পিস্তল! বাকি বন্ধুদের নিয়ে ফিরে গিয়েছিলো ক্যাম্পাসে। মুক্ত করেছিলো ক্যাম্পাস, মুক্ত করেছিলো দেশকে বাতিস্তার শাসন থেকে, মুক্তির ডাক পাঠিয়েছিলো গোটা লাতিন আমেরিকায়। সমাজতান্ত্রিক নির্মাণের নতুন মডেল হাজির করেছিলো দুনিয়ার সামনে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বিপ্লবকে রক্ষা করার দায়বদ্ধতায় সারাক্ষণ বয়েছে সেই ব্রাউনিং পিস্তলটা!
ফিদেল কাস্ত্রো- অপেক্ষা আর উপেক্ষার অদ্ভূত বিক্রিয়া সহ্য করার সীমাহীন ক্ষমতা নিয়ে গড়ে ওঠা এক রক্তমাংসের হিরো! যে হিরো নিজের কান্না থেকেই খুঁজে পেয়েছিলো বিপ্লবী কনভিকশন। মনকাডায় উপেক্ষিত হওয়ার পরে যে ট্রায়ালে বলেছিলো, আবারও সুযোগ পেলে একইভাবে মনকাডা আক্রমণ করবে, একই স্পর্ধায়, একই সংখ্যায়, টেকনিকের কিছু খুচরো ভুল শুধরে নিয়ে! ঔদ্ধত্য? হ্যাঁ, বিপ্লবী ঔদ্ধত্য, যা ছাড়া বিপ্লবী চেতনা গড়ে ওঠে না!
তিলতিল করে অপেক্ষার পাহাড় পেরিয়ে গড়ে তুলেছিলো ট্রেনড্ বিপ্লবী রেজিমেন্টেড্ বাহিনী। ফিরে এসেছিলো নিজের দেশের মানুষের কাছে মুক্তির পতাকা নিয়ে। গ্রানমা থেকে নেমে কারাভান অফ ফ্রিডম যখন সান্তিয়াগো ডি কিউবায় পৌঁছোয় তখন লাখ লাখ মানুষ মুক্তির আনন্দে শপথ নিচ্ছে সমাজতন্ত্রের নির্মাণে। জনতার ইতিহাস মুক্ত করেছে একজন বিপ্লবীকে, যে গড়ে উঠেছে অপেক্ষা আর উপেক্ষা নিয়েই। কিউবার সমাজতান্ত্রিক নির্মাণ এই সফল বিক্রিয়ার মধ্যেই পথ চলেছে এতো দূর, হাজারো আক্রমণ পার করে। পথ চলছে ঠোঁটে চুরুট, স্মিত হাসি, বুকে বারুদ, চোখে স্বপ্ন, হাতে ব্রাউনিং, কাঁধে বিপ্লবকে রক্ষা করার দায়, গায়ে জলপাই রঙের মিলিটারি সুটে ফিদেল আলেক্সান্দ্রো কাস্ত্রো রুজের হাত ধরেই।