পশ্চিমবঙ্গ দিবস – মুখ ও মুখোশ
সায়ন্তন বসু
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা হলো, যারা মুখে “অখণ্ড ভারত”-এর স্লোগান দিতেন, ক্ষমতার সমীকরণে ও সাম্প্রদায়িক স্বার্থে তারাই আবার বাংলার বুকে প্রথম বিভাজনের কুঠারটি চালিয়েছিল।
১৯৪৭ সালের মে মাসে, যখন ভারত ভাগ হবে কি হবে না তা নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন হিন্দু মহাসভার নেতা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে চিঠি লিখে ও দেখা করে জোর দিয়ে বলেছিলেন “ভারত ভাগ না হলেও,বাংলাকে ভাগ করতেই হবে।”
দেশ এবং সম্প্রীতির ইতিহাসের আলোয় তাঁর এই ভূমিকাকে কেন এক গভীর বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হয়, তা বুঝতে নিচের তথ্যগুলো তলিয়ে দেখা প্রয়োজন :-
১. স্বাধীনতার মূল স্রোত ও সম্প্রীতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা
১৯৪৭ সালে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর দাদা তথা তথকালীন বিশিষ্ট নেতা শরৎচন্দ্র বসু
এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বুঝতে পেরেছিলেন যে বাংলা ভাগ হলে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসবে। তাঁরা ধর্ম নির্বিশেষে একটি ‘স্বাধীন ও ধর্মনিরপেক্ষ অখণ্ড বাংলা’ (United Bengal) গড়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন, যেখানে বাঙালি নিজের পরিচয় নিয়ে বাঁচবে।
তবে, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং হিন্দু মহাসভা এই সম্প্রীতির ও ঐক্যের প্রচেষ্টাকে পিছন থেকে ছুরিকাঘাত করেন। তাঁরা প্রচার করেন যে অখণ্ড বাংলায় হিন্দুরা মুসলিমদের দাসত্ব করে বেড়াবে।
এই তীব্র সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়ানোর ফলে অখণ্ড বাংলার প্রস্তাব ভেস্তে যায়।
২. সাম্রাজ্যবাদের সাথে হাত মিলিয়ে দেশভাগের ব্লুপ্রিন্ট
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ভাবলে অবাক লাগতে পারে, যে মানুষটি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ১৯৪২-এর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন দমনের জন্য ব্রিটিশ গভর্নরকে চিঠি লিখেছিলেন, তিনিই ১৯৪৭ সালে বাংলার বুক চিরে কাঁটাতার বসানোর জন্য ব্রিটিশ ভাইসরয়ের কাছে সবচেয়ে বেশি দরবার করেছিলেন।
ঐতিহাসিক নথির প্রমাণ:
ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেনের সাথে বৈঠকে শ্যামাপ্রসাদ পরিষ্কার জানান, ক্যাবিনেট মিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি একটি দুর্বল কেন্দ্রের অধীনেও অখণ্ড ভারত গঠিত হয়, তাহলেও তিনি বাংলায় হিন্দু মুসলিম সহাবস্থান মানবেন না।
আসাম ও বাংলাকে ভেঙে হিন্দু প্রধান অংশ আলাদা করতেই হবে। অর্থাৎ, অখণ্ড ভারতের বুলি কেবলই একটি আড়াল ছিল, আসল লক্ষ্য ছিল ধর্মীয় মেরুকরণ।
৩. সাধারণ মানুষের হয়রানি এবং উদ্বাস্তু বিপর্যয়
দেশভাগ বাংলার মানুষের জন্য এনেছিল কোটি কোটি মানুষের চোখের জল, দাঙ্গা এবং ভিটেমাটি হারানোর হাহাকার।
আদতে যা কখনোই প্রকৃত স্বাধীনতার অংশ হতে পারে না।
শ্যামাপ্রসাদ এবং তৎকালীন উচ্চবর্ণের জমিদার-বুর্জোয়া সমাজ নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখতে সাধারণ গরিব হিন্দু-মুসলিম কৃষক-শ্রমিকের দীর্ঘদিনের যৌথ সংস্কৃতি ও সম্প্রীতিকে বলি চড়িয়েছিলেন।
ক্ষমতার লোভে বাংলাকে এমনভাবে খণ্ডিত করলেন, যার মাশুল আজও দুই বাংলার সাধারণ মানুষকে উদ্বাস্তু হয়ে, দাঙ্গার শিকার হয়ে দিতে হচ্ছে।
কিছু বিশেষ তথ্য সূত্র
১. “Partition of Bengal: Significant Aspects” – অমলেন্দু দে
(এখানে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের তৎকালীন চিঠি, ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন এবং জওহরলাল নেহেরুকে লেখা স্মারকলিপির বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে, যেখানে তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন যে ভারত যদি অখণ্ডও থাকে, তবুও মুসলিম লীগের ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাবের অধীনে হিন্দুদের জন্য বাংলাকে ভাগ করতেই হবে।)
২. “The Great Divide: Britain-India-Pakistan” – এইচ. ভি. হডসন
(লর্ড মাউন্টব্যাটেনের তৎকালীন সংস্কার উপদেষ্টা এইচ. ভি. হডসন তাঁর বইতে উল্লেখ করেছেন, ২ মে ১৯৪৭ সালে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় মাউন্টব্যাটেনকে স্পষ্ট জানান: “Even if India is not partitioned, Bengal must be partitioned” বা ‘ভারত ভাগ না হলেও বাংলা ভাগ হতেই হবে’।)
৩. “বাংলা ভাগ হল: হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও দেশবিভাগ” – জয়ন্তী বসু
(বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোক সমাজ এবং হিন্দু মহাসভা কীভাবে অখণ্ড বাংলার প্রস্তাবকে বাতিল করে বাংলা ভাগের জন্য জনমত তৈরি করেছিল, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ এই বইতে পাওয়া যাবে।)
৪. “The Trailing Clouds of Glory” – শরৎচন্দ্র বসু (সম্পাদিত প্রবন্ধ)
(শরৎ বসু এবং সোহরাওয়ার্দীর ‘স্বাধীন অখণ্ড বাংলা’ (United Bengal) গঠনের প্রস্তাবকে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কীভাবে ব্রিটিশ শক্তি ও কংগ্রেসের সহায়তায় ভেস্তে দিয়েছিলেন, তার সমসাময়িক দলিল এই বইতে স্পষ্ট।)
তাই ইতিহাস জানতে হবে ও বুঝতে হবে। কারণ, বিকৃত ইতিহাস ও অর্ধসত্য ইতিহাসই একটি জাতিকে চিরতরে সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্যে যথেষ্ট।
শেষ কথা:
যে মানুষ নিজে মুখে অখণ্ড ভারতের কথা বলে কাজে বাংলাকে টুকরো করার জেদ ধরেছিলেন এবং বাঙালি জাতির ঐক্যকে চিরতরে ধ্বংস করেছিলেন, আজ তাঁকে কোন মুখে ‘দেশপ্রেমিক’ বা ‘পশ্চিমবঙ্গের রূপকার’ বলা যায়?
কিংবা পশ্চিমবঙ্গ দিবস সম্পূর্ণভাবে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কে উৎসর্গ করা একজন ভারতীয় বাঙালি হিসেবে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।