“এবার তবে করবি তো আয় আমার মোকাবিলা….” – ৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনের প্রতিরোধই আজকের পথ।
সৌমী ধর
তখন ক্লাস এইট, আমাদের সরকারি হাই স্কুলের ইতিহাসের দিদিমণি প্রথমদিন ক্লাসে ঢুকে বলেছিলেন , ” আমরা ইতিহাস মুখস্থ করবো না, ইতিহাস জানবো, জানতে জানতে কল্পনা করবো, শিখবো এবং মনে রাখবো।” ছোটবেলায় তেমন করে না বুঝলেও পরবর্তীতে সময়ের সাথে উপলব্ধি করা গেছে যে, ইতিহাস শুধুমাত্র অতীতের গল্পরূপ নয়; ইতিহাস পরিস্থিতিভেদে বর্তমানের দর্পণ এবং ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক। ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ধারায়, ১৯৪২ সালের আগস্ট মাসের বিবিধ ঘটনার অবদান ভোলার নয়। কারণ সেই সময়টুকু ছিল বিনাশ এবং সৃষ্টির সন্ধিক্ষণ । ব্রিটিশ শাসকদের দীর্ঘ শোষণ, বিশ্বযুদ্ধের চপেটাঘাত, মন্বন্তরের আশঙ্কা আর ক্রিপস মিশনের অপ্রত্যাশিত ব্যর্থতা ভারতবাসীর ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে দিয়েছিলো। ১৯৪২ সালের ৮ ই আগস্ট, এ আই সি সি অধিবেশনে সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে পাশ হয় ‘ভারত ছাড়ো’ প্রস্তাব। ৯ ই আগস্ট, সূর্যোদয়ের আগেই গ্রেপ্তার হন কস্তুর্বা গান্ধী, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, মহাত্মা গান্ধী, সরোজিনী নাইডু ও ইউসুফ মেহের আলি সহ ভারতবর্ষের সমস্ত শীর্ষ নেতৃত্বরা। আন্দোলন পরিচালনার জন্য ভারতবাসী এক মুহূর্তও কেন্দ্রীয় নির্দেশের তোয়াক্কা করেনি সেদিন। সাধারণ মানুষ এবং ছাত্র-যুবসমাজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাঁধে তুলে নিয়েছিলো আন্দোলন পরিচালনার দায়িত্ব। জয়প্রকাশ নারায়ণ, অরুনা আসাফ আলি, উষা মেহতা প্রমূখ তরুণ বিপ্লবীরা প্রখর রৌদ্রের মতো ঝলসে দিতে চেয়েছিলো অত্যাচারীর মুখ। “ভারত ছাড়ো” প্রস্তাবকে গণ আন্দোলনের রূপ দিয়েছিলো আপামর ভারতবাসী।
পুঁজিবাদী শোষণ বরাবর কেড়ে নিতে চেয়েছে সাধারণ মানুষের শেষ সম্বল। কেড়ে নিতে চেয়েছে “দেশ” গড়ার মূল রসদ, ঐক্য, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং মৌলিক অধিকার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘দুই বিঘা জমি’ – তে লিখেছেন,
“এ জগতে হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি,
রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।”
১৯৪২-এর প্রেক্ষাপটে কাঙাল উপেনের এই হতাশা ছিল সমস্ত কৃষকের হাহাকারের প্রতিধ্বনি। কোটি কোটি ভারতবাসীর ভিটে হারানোর, রক্তক্ষরণের, বেঁচে থাকার রসদ হারানোর নগ্নরূপ। একদিকে, ব্রিটিশ সরকার, থুড়ি, ডাকাত সরকার যুদ্ধের অজুহাতে লুঠ করছিলো মানুষের সম্পদ এবং ফসল। কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের কবলে প্রাণ হারিয়েছিল অগুনতি মানুষ। অন্যদিকে, এদেশের জমিদার-মহাজনদের অকল্পনীয় শোষণ শ্বাসরোধ করেছিলো সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের। আমরা চলচ্চিত্র “বিয়াল্লিশ” – এ দেখি এই অসহনীয় সত্য। দেখি, কীভাবে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের দমননীতির বিরূদ্ধে , নির্মম অত্যাচারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলো । তারা প্রমাণ করে দিয়েছিলো, খেটে খাওয়া মানুষ নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে নিতে জানে। কোনো রক্তচক্ষুই দীর্ঘদিন যাবৎ চলতে থাকা অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের জমতে থাকা ক্ষোভকে স্তব্ধ করতে রাখতে পারে না। ৪২-এর আন্দোলন জাতীয়তাবাদী ক্ষমতাকে সমূলে উৎখাত করার প্রচেষ্টার পাশাপাশি সমাজ রূপান্তরের এক বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছিলো আপামর ভারতবাসীকে। মেদিনীপুরের তমলুকে ‘তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার’ গঠন ও সাতারাতে সমান্তরাল প্রশাসনিক ব্যবস্থার গঠন, শুধুমাত্র কংগ্রেসের অহিংস রাজনীতির বাস্তব রূপায়ণ ছিলো না, আপসহীন বৈপ্লবিক ও বামপন্থী আদর্শও মিলেমিশে গিয়েছিলো জনগণের মননে। মৌলিক অধিকার রক্ষার লড়াই, শ্রমের মূল্য আদায়ের লড়াই এবং শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্নই ছিল আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি। এর প্রমাণ আমরা পাই, পরবর্তী সময়ের কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব প্রত্যক্ষ করার মাধ্যমে। কাকদ্বীপ ও তেভাগার অবিস্মরণীয় কৃষক আন্দোলন শিখিয়ে দেয়, মেঠো মানুষের ন্যায্য দাবির জোয়ার একধাক্কায় চুরমার করে দিতে পারে অত্যাচারীর দম্ভ।
“কার ঘরে জ্বলেনি দীপ চির আঁধার তৈরি হও,
কার বাছার জোটেনি দুধ শুকনো মুখ তৈরি হও,
ঘরে ঘরে ডাক পাঠাই তৈরি হও জোট বাঁধো ,
মাঠে কিষাণ কলে মজুর নওজোয়ান জোট বাঁধো
এই মিছিল
এই মিছিল সবহারার সবপাওয়ার এই মিছিল….”
বুর্জোয়া শাসনের আড়ালে যারা সুবিধাবাদের রাজপ্রাসাদ গড়ে তুলতে চেয়েছিলো, তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিকের এই আন্দোলন ছিলো সর্বহারার যুদ্ধ ঘোষণা। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের সেই মেঠো সত্যই পরবর্তীতে দেশি দলদাসদের বিরুদ্ধে অদমনীয় শ্রেনীসংগ্রামের রূপ নিয়েছিলো।
ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মতো এক অবিশ্বাস্য জনজাগরণের সময়কালেও জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করে দিতে চেয়েছিলো শাসকের ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি। বর্তমান সময়ের অত্যাচারী ও ফ্যাসিবাদী বি জে পি সরকারের রাজনীতি তারই প্রতিরূপ নয় কি? আজকের ভারতবর্ষ স্বাধীন হলেও, ভারতবর্ষের মানুষকে পুনরায় পরাধীনতার অন্ধকারে তলিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে বর্তমান সরকার। রাষ্ট্রশক্তি বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন ফন্দিতে কর্পোরেট পুঁজিপতিদের হাতে ভেট স্বরূপ তুলে দিচ্ছে আমাদের জল-জমি-জঙ্গল। ধর্মের নামে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ তৈরি করে ভুলিয়ে দিতে চাইছে অত্যাচারের বিরুদ্ধে , অন্যায়ের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদের ভাষা। শোষণের রূপ বদলালেও শোষকের চরিত্র যে একই রয়ে গেছে, তা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। প্রতি পদক্ষেপেই ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে দেয়, যখন ধর্মের আফিম দিয়ে সাধারণ মানুষকে আয়ত্তে আনা যায়, তখন সহজেই বিশাল ডানা মেলে আঁধার তৈরি করে স্বৈরাচারের দানবীয় রূপ। দুর্বল করে দেয় প্রতিরোধের শক্তিকে।
আগামীর পথ প্রদর্শক হবে অতীতের ঐতিহ্য
১৯৪২ সালের আন্দোলনে টিম ক্যাপ্টেনের ভূমিকা পালন করেছিলো ছাত্র ও যুবসমাজ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চার দেওয়াল ভেঙে তাঁরা দখল করেছিলেন রাজপথ। ঠিক যেভাবে জেন জি ছাত্রসমাজ লাগাতার আন্দোলনে ছিনিয়ে আনলো নিজেদের দাবি। গোদি থেকে টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে আনলো স্বৈরাচারী, খুনি ধর্মেন্দ্র প্রধান-কে। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় সরকারি যোগাযোগ ব্যবস্থা মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ করেছিলেন তাঁরা। আর, এ যুগের ছাত্ররা ডিজিটাল মাধ্যমে মুহূর্তে কয়েকশো ছাত্রের প্রতিরোধের আগুন ছড়িয়ে দিলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, মায় বিদেশের মাটিতেও।
তরুণ সমাজকে বশীভূত করার জন্য যে মারাত্মক কৌশল প্রয়োগ করছে বর্তমান সরকার, তার জাল কেটে বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের। সারাদিন ধরে একটা ভার্চুয়াল নজরদাড়ির মধ্যে থাকার পর রাতে ফোনে ঢোকে খুদে খুদে নোটিফিকেশন। গান শুনিয়ে, রিল দেখিয়ে, ঘুম পাড়ানোর ডাক। দ্বিতীয় জন্মে, ফ্যাসিবাদী ঘুমপাড়ানিরা ফিরে আসে যন্ত্রগর্ভে। স্ক্রোলে তখন নতুন ঠাকুরমা, অ্যালগরিদম দেবী। এই তথাকথিত শান্তির আড়ালে আসলে চলছে মানুষের প্রতিবাদের স্নায়ুকে, ধর্মীয় গাঁজাখুরি এবং মিথ্যে ন্যারেটিভ এর জঙ্গলে নিখোঁজ করে দেওয়ার অপচেষ্টা। যাতে বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ কিংবা রাষ্ট্রীয় অনাচার নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলার কথা ভাবতে না পারে। যাতে ছাত্রসমাজ তথা ভারতবর্ষের সমস্ত মানুষকে, না-শোনার দেশ, না-দেখার দেশ, না-বোঝার দেশের নাগরিক করে তোলা যায়। তাহলে সুবিধা হয়, ভারতবাসীর প্রাপ্য নাগরিক অধিকারগুলো কেড়ে নিতে।
আজকের ছাত্রসমাজ হাড়ে হাড়ে জানে, নীরবতা সমাধান নয়। মাথার ভেতর অ্যালার্ম যখন বিপদের সাইরেন বাজাচ্ছে, তখন ঘুমের অভিনয় করে বেঁচে থাকা আত্মহত্যার সামিল। একমাত্র পথ হলো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন, সামগ্রিক প্রতিরোধ। সেদিনের মতো আজও ছাত্রদের চেতনা কেবল ক্যাম্পাসের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। তা অবলীলায় মিশে যাচ্ছে কলকারখানার শ্রমিকের ঘামে, উন্নয়নের নামে হকার ভাইদের চুরমার হয়ে যাওয়া স্বপ্নের টুকরোয়, খেটে খাওয়া মানুষের তিলে তিলে জমতে থাকা কষ্টে, রাগে, প্রতিক্রিয়ায়। নতুন ভারত গড়তে তাই রাত জাগছে আজকর ছাত্র সমাজ। দিল্লির যন্তর-মন্তর থেকে কলকাতার রাজপথ হয়ে চেন্নাই অথবা অরুণাচল প্রদেশ, গোটা দেশ জুড়ে বিরুদ্ধতার স্বর শক্তিশালী হচ্ছে। যে রাষ্ট্র ক্ষমতা পোষ মানাতে চেয়েছে তরুণ প্রজন্মকে সেই প্রজন্মই আজ বিদ্রোহ ঘোষণা করছে। আরও ঐক্যবদ্ধ, বৃহত্তর, দৃশ্যমান, শক্তিশালী নতুন প্রজন্ম দেশ গড়তে চাইছে নতুন করে। মেনে নেওয়ার বিরুদ্ধে জেনে নেওয়ার ফাইটের স্পিরিট তো লুকিয়ে আমাদের দেশের স্বাধীনতার আন্দোলনে, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে। তাকেই আশ্রয় করছে আজকের ছাত্রছাত্রীরা। অন্যায় সহ্য করতে করতে তৈরি হওয়া রাগ বা কষ্টের ধর্ম হয়না, জাত হয়না, লিঙ্গ হয়না। স্বৈরাচারী সরকারের গড়ে তোলা এসব কৃত্রিম দেওয়াল ভেঙে দিয়ে, কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদের মুখোশ টেনে ছিঁড়ে ফেলার লক্ষ্যে, শিক্ষার অধিকার, বেঁচে থাকার অধিকার ছিনিয়ে আনার লক্ষ্যে কাটিয়ে ফেলতে হবে সমস্ত জড়তা। অতীতের আন্দোলনের ঐতিহ্যের পাশাপাশি সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের জয়ের উপর আস্থা রেখেই সাম্রাজ্যবাদী, ফ্যাসিবাদী সরকারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলতে হবে-
“এবার তবে করবি তো আয় ‘আমাদের’ মোকাবিলা।”