সুকান্ত ভট্টাচার্য: ক্ষুধা, সংগ্রাম ও বিপ্লবের কবি
সাগ্নিক চাকী
আধুনিক বাংলা কবিতা ও সাহিত্যের অন্যতম প্রাণবন্ত এবং প্রভাবশালী কবি ও নাট্যকার সুকান্ত ভট্টাচার্য। ১৯২৬ সালের ১৬ই আগস্ট কলকাতার কালিঘাটে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মাত্র বিশ বছর নয় মাসের সংক্ষিপ্ত জীবনকালেই বাংলা কবিতায় তিনি যে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন, তা যেন একটি দেশের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া বিপ্লবেরই সমতুল্য। তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের পরিধি ছিল মাত্র ছয় বছর। প্রধানত কবিতা লিখলেও তিনি গান, গল্প, প্রবন্ধ ও নাটকও রচনা করেছিলেন। তাঁর স্বল্পায়ু জীবন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অসামান্য অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র একুশ বছর বয়সের আগেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু এই অকালমৃত্যু তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের দীপ্তিকে একটুও ম্লান করতে পারেনি। বরং রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা কবিতার গতিপথে তিনি এক মৌলিক পরিবর্তন আনেন। বাংলা কবিতাকে নিছক রোমান্টিকতা, প্রেম ও সৌন্দর্যের জগৎ থেকে বের করে এনে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেন ক্ষুধার্ত, নিপীড়িত ও শ্রমজীবী মানুষের কঠোর বাস্তবতার মধ্যে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেখানে অতীন্দ্রিয় আদর্শবাদ, মানবতাবাদ ও আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যের নানা স্তর অনুসন্ধান করেছেন, সুকান্ত সেখানে কবিতার শিকড়কে প্রোথিত করেছেন বস্তুগত বাস্তবতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের মাটিতে।
সুকান্তের শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল ভারতের ইতিহাসের এক উত্তাল সময়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪৩-এর ভয়াবহ বঙ্গদুর্ভিক্ষ এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলনের শেষ পর্যায়—এই সমস্ত ঘটনা তাঁর মানসিক গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। একই সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্ট ফেডারেশনের মতো বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গেও তিনি যুক্ত হন। এই অস্থির সময়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা তাঁর কবিতায় জন্ম দেয় এক তীব্র বিপ্লবী বাস্তববোধ। ব্যক্তিগত বেদনা ও সমষ্টিগত দুঃখ তাঁর কবিতায় একাকার হয়ে যায়।
সুকান্ত কলকাতার কমলা বিদ্যামন্দিরে পড়াশোনা শুরু করেন এবং পরে বেলেঘাটা দেশবন্ধু হাই স্কুলে অধ্যয়ন করেন। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি ছাত্র আন্দোলন এবং বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৪৪ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। ১৯৪৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও উত্তীর্ণ হতে পারেননি এবং এরপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি ঘটে। কিন্তু তাঁর শিক্ষা থেমে যায়নি; বরং সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনসংগ্রাম সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই হয়ে উঠেছিল তাঁর প্রকৃত শিক্ষার ক্ষেত্র।
অত্যন্ত অল্প বয়স থেকেই সুকান্ত সমাজকে দেখেছিলেন অর্থনৈতিক বৈষম্যের দৃষ্টিকোণ থেকে। সমাজের বিত্তবান ও বঞ্চিত মানুষের মধ্যে গভীর বিভাজন, তাঁর চেতনাকে আলোড়িত করেছিল। এই কারণেই তাঁর কবিতায় মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গির গভীর প্রভাব লক্ষ করা যায়। কিন্তু তিনি কখনোই কঠোর বা আড়ষ্ট মতাদর্শের ভাষায় কবিতা লেখেননি বরং সহজ, পরিচিত এবং সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় মার্কসবাদী চেতনাকে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।
তাঁর কবিতা কোনো রাজনৈতিক প্রচারপত্রের মতো নয়, সেখানে আছে ক্ষুধা, বেদনা, অসহায়ত্ব, নিপীড়ন, রাষ্ট্রীয় হিংসা এবং দারিদ্রের হৃদয়বিদারক ছবি। একই সঙ্গে আছে নতুন সমাজের স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের প্রতি অদম্য আশাবাদ। তাঁর কাছে কবিতা ছিল নিছক নান্দনিকতার বিষয় নয়; কবিতা ছিল শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর এবং পরিবর্তনের অস্ত্র।
এই সময়েই তিনি কমিউনিস্ট পার্টি প্রকাশিত দৈনিক ‘স্বাধীনতা’-র ‘কিশোর সভা’ বিভাগ সম্পাদনা করতে শুরু করেন। ১৯৪৪ সালে অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট রাইটার্স অ্যান্ড আর্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত কাব্যসংকলন ‘আকাল’-এর সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। খুব অল্প বয়সেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে শিল্প কোনো অভিজাত বিলাসিতা নয়; শিল্প হতে পারে নিপীড়িত মানুষের মুক্তির সংগ্রামের হাতিয়ার।
১৯৪৩ সালের বঙ্গদুর্ভিক্ষ সুকান্তের কবিচেতনাকে গভীরভাবে বদলে দেয়। দুর্ভিক্ষের সময় তিনি ত্রাণকার্যে অংশ নেন এবং কলকাতার অনাহারী মানুষের জন্য খাদ্য ও রেশন সংগ্রহে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। নিজের চোখে ক্ষুধা, মৃত্যু ও দারিদ্র্যের যে নির্মম চিত্র তিনি দেখেছিলেন, তা তাঁর কবিতার অন্যতম প্রধান প্রেরণায় পরিণত হয়। শ্রমজীবী মানুষের দুর্দশা এবং তাদের সম্ভাব্য বিদ্রোহ তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে। এই কারণেই তিনি বাংলা সাহিত্যে ‘কিশোর কবি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
সুকান্তের কবিতার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল—তিনি সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকে কেবল অসহায় ভুক্তভোগী হিসেবে দেখেননি; বরং তাঁদের ইতিহাস নির্মাণের সক্রিয় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর ‘রানার’ কবিতার ডাকবাহক রাতের অন্ধকারে দূর-দূরান্তে চিঠি পৌঁছে নিয়ে যায়। সেই রানার হয়ে ওঠে অগণিত পরিশ্রমী অথচ অবমূল্যায়িত শ্রমজীবী মানুষের প্রতীক। মার্কসবাদ যেমন ইতিহাসকে শ্রেণিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে পরিবর্তনের পথে অগ্রসর হতে দেখে, সুকান্তের কবিতাতেও তেমনি রয়েছে পরিবর্তনের আহ্বান এবং বিপ্লবী আশাবাদ।
‘ছাড়পত্র’ এই দৃষ্টিকোণ থেকে সুকান্তের এক অনন্য কাব্যদলিল। ১৯৪০-এর দশকের দরিদ্র ও শোষিত মানুষের জীবন, তাদের ক্ষুধা, বঞ্চনা এবং প্রতিবাদের ছবি এই কাব্যগ্রন্থে শক্তিশালীভাবে ফুটে উঠেছে। ‘ভালো খাবার’ কবিতায় ধনপতি শোষক শ্রেণির প্রতীক। কবিতার শেষ পঙ্ক্তিতে ধনপতির স্বীকারোক্তি—“সবচেয়ে ভালো খেতে গরিবের রক্ত”—শোষক ও শোষিতের সম্পর্কের নির্মম বাস্তবতাকে এক তীব্র ব্যঙ্গের মাধ্যমে প্রকাশ করে।
‘পুরানো ধাঁধা’ কবিতায় সুকান্ত সমাজের শ্রেণিবৈষম্যের দিকে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দেন— “বলতে পারো বড় মানুষ মোটর কেন চড়বে?
গরিব কেন সেই মোটরের তলায় চাপা পড়বে?”,আবার তিনি প্রশ্ন করেন— “বলতে পারো ধনীর বাড়ি তৈরি যারা করছে,
কুঁড়েঘরে তারা কেন মাছির মতো মরছে?” – এই প্রশ্নগুলির মধ্যেই নিহিত রয়েছে তাঁর রাজনৈতিক চেতনা। যারা সমাজের সম্পদ ও প্রাসাদ নির্মাণ করে, তারাই কেন সেই সমাজে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত—এই বৈপরীত্যই সুকান্তকে ব্যথিত করেছে।
‘হে মহাজীবন’ কবিতায় তিনি প্রচলিত রোমান্টিক কাব্যসৌন্দর্যের ধারণাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে ক্ষুধার বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসেন—“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়,
পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।”- বাংলা কবিতায় পূর্ণিমার চাঁদ ঐতিহ্যগতভাবে সৌন্দর্য, প্রেম ও রোমান্টিকতার প্রতীক। কিন্তু সুকান্তের কাছে ক্ষুধার্ত মানুষের চোখে সেই চাঁদ আর সৌন্দর্যের প্রতীক নয়—তা হয়ে ওঠে ‘ঝলসানো রুটি’। এই একটিমাত্র উপমার মধ্যেই তিনি দেখিয়ে দেন, ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে বিমূর্ত সৌন্দর্যের চেয়ে এক টুকরো খাদ্যের মূল্য কত বেশি।
‘ঘুম নেই’ কবিতায় ক্ষুধার্ত শিশুর নিদ্রাহীন রাতের সঙ্গে তিনি আরামপ্রিয় সমাজের উদাসীনতাকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়েছেন। শিশুর ক্ষুধা, মানুষের অসহায়ত্ব এবং সমাজের বৈষম্য সেখানে এক গভীর মানবিক বেদনার রূপ নিয়েছে।
সুকান্তের কবিতার আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ ও ব্যবহারিক বস্তুগুলিকেও শ্রেণিসংগ্রামের প্রতীকে রূপান্তরিত করতে পেরেছিলেন। ‘দেশলাই কাঠি’ কবিতায় ছোট, ক্ষুদ্র ও আপাতদৃষ্টিতে দুর্বল দেশলাই কাঠি হয়ে ওঠে নিপীড়িত মানুষের প্রতীক। এককভাবে তারা হয়তো ক্ষুদ্র ও দুর্বল, কিন্তু একত্রে জ্বলে উঠলে তারাই শোষণের কাঠামোকে আগুনে পুড়িয়ে দিতে পারে।
‘সিগারেট’ কবিতায় শ্রমজীবী মানুষকে এমন এক শক্তিরূপে দেখা যায়, যাকে পুঁজিবাদী শোষণ ব্যবহার করে শেষ পর্যন্ত ছুড়ে ফেলে দেয়। ‘অভিযান’ এবং ‘একটি মোরগের কাহিনী’-র মতো কবিতায়ও বাস্তববাদ ও আদর্শবাদের এক অনন্য সমন্বয় দেখা যায়।
সুকান্ত রবীন্দ্রনাথ ও কাজী নজরুল ইসলামের অনুরাগী ছিলেন। তাঁদের কাছ থেকে তিনি আবেগ, মানবতাবোধ এবং বিদ্রোহের শক্তি গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তাঁর কবিতা শেষ পর্যন্ত নিজের একটি স্বতন্ত্র পথ নির্মাণ করে। তিনি রোমান্টিকতার আবেগকে আরও তাৎক্ষণিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার দিকে পরিচালিত করেন। তাঁর কবিতায় উঠে আসে বঞ্চিত মানুষের জীবন, শ্রমজীবী মানুষের দুঃখ এবং শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
তাঁর সাহিত্যচেতনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল দেশপ্রেম। ভারতের স্বাধীনতা তিনি নিজের চোখে দেখে যেতে পারেননি। তবু একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে। বিশেষত নবজাতকের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর অঙ্গীকার এক অসাধারণ মানবতাবাদী আদর্শের পরিচয় দেয়— “এ পৃথিবীকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি,
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।” – এই পঙ্ক্তিতে শুধু একটি শিশুর প্রতি ভালোবাসা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায়সঙ্গত ও মানবিক পৃথিবী নির্মাণের প্রতিশ্রুতিও নিহিত রয়েছে।
মাত্র বিশ বছর নয় মাসের জীবনেই সুকান্ত বাংলা সাহিত্যে এমন এক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।১৯৪৭ সালের ১৩ মে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবনাবসান ঘটে। স্বাধীন ভারতের সূর্যোদয় দেখার মাত্র কয়েক মাস আগে তাঁর জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। কিন্তু তাঁর কণ্ঠ থেমে যায়নি। তাঁর কবিতা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সাহিত্য কেবল সৌন্দর্যের অনুসন্ধান নয়; সাহিত্য হতে পারে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা, মানুষের মুক্তির স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের অঙ্গীকার।
সুকান্তের সাহিত্য আমাদের শেখায় যে কবির দায়িত্ব কেবল স্বপ্ন দেখা নয়, সেই স্বপ্নকে বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত করা। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বৈষম্য, শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একটি মানবিক সমাজের স্বপ্ন দেখাই তাঁর কবিতার অন্যতম প্রধান শক্তি। তাঁর বিশ্বাস ছিল মানুষের সংগ্রামের মধ্যেই নিহিত রয়েছে পরিবর্তনের সম্ভাবনা।
আজকের প্রজন্মের কাছেও তাই সুকান্ত ভট্টাচার্য শুধুমাত্র অতীতের একজন কবি নন। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন করার সাহস, বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার প্রেরণা। তাঁর কবিতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের পৃথিবীকে আরও ন্যায়সঙ্গত, মানবিক ও বাসযোগ্য করে তোলার সংগ্রাম কখনো শেষ হয় না।
এই কারণেই সুকান্তের কণ্ঠ আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর অকালপ্রয়াণ তাঁর জীবনকে সংক্ষিপ্ত করেছে, কিন্তু তাঁর স্বপ্নকে নয়। তাঁর কবিতার মধ্যে দিয়ে জীবন্ত হয়ে আছে সংগ্রাম, প্রত্যয়, মানবতা এবং নতুন ভোরের প্রত্যাশা।