আমাদের”ঈশ্বর”
সায়ক দাস
আজ ২৬ শে সেপ্টেম্বর। তারিখটি আপাত দৃষ্টিতে অন্যান্য তারিখের মতই সাধারণ মনে হলেও আদতে সেটা নয়। আজ এই উপমহাদেশ তথা বিশ্বের অন্যতম অগ্রগামী, প্রগতিশীল মানুষ এবং সমাজসংস্কারক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ২০৬ তম জন্মবার্ষিকী। অনেকের মনে হতেই পারে যে মানুষটি আজ থেকে ১৩৫ বছর আগে মারা গেছেন তাকে নিয়ে বর্তমান সময়ে আলোচনা করার সার্থকতা কি! আসলে বিদ্যাসাগর তৎকালীন সময়ের থেকে কয়েক সহস্র বছর এগিয়ে থাকা একজন মানুষ। আমার মতে, ঊনবিংশ শতকের থেকেও আজকের ভারতবর্ষে যখন এক নয়া ফ্যাসিবাদী শক্তি দাঁত নখ বের করেছে তখন বিদ্যাসাগর আরো অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন। আজকের সমাজে যেখানে এখনও মেয়েরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে গণ্য হয়, দিনকে দিন মেয়েদের স্কুলছুটের পরিমাণ ক্রমবর্ধমান, নারী শিক্ষার অবস্থা শোচনীয়, নারী পাচার এবং বাল্য বিবাহের হার ক্রমশ বেড়েই চলেছে, প্রত্যেক পদে পদে মেয়েদের ওপর নানান ভাবে নেমে আসছে পুরুষতন্ত্রের খাড়ার ঘা তখন এই মানুষটি আরো শত গুণ বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে শুধুমাত্র বিদ্যাসাগরের জন্মদিন ও মৃত্যুদিনে তাঁর প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করে থেমে থাকলেই হবে না। বরং বিদ্যাসাগরের ভাবনা এবং মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে আজকের যুগেও যুক্তিবিরোধী, সাম্প্রদায়িক, কুসংস্কারগ্রস্ত এবং প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে নতুন সমাজ গড়ার কাজের অংশীদার আমাদের প্রত্যেককে হতেই হবে। যতদিন না আমাদের সমাজে নারী পুরুষের ভেদাভেদের সীমারেখা মিলিয়ে যাচ্ছে এবং যতদিন না সমাজ কুসংস্কারমুক্ত, যুক্তিবাদী, প্রগতিশীল, বিজ্ঞানমনষ্ক হচ্ছে ততদিন তিনিই আমাদের প্রেরণা হয়ে থাকবেন। আজ থেকে দেড়শো বছর আগে বিদ্যাসাগর নারীদের যে মুক্তির আলো দেখিয়েছিলেন সেই উত্তরাধিকার বহন করে নিয়ে যাওয়া যুক্তিবাদী ছাত্রসমাজ হিসেবে আমাদের একান্ত কর্তব্য। বিদ্যাসাগর সমাজের অচলায়তন ভেঙে কিভাবে সমাজকে কুপমণ্ডুকতার অন্ধকার থেকে এই বের করে এনেছিলেন তা যুগের পর যুগ উদাহরণ হয়ে থাকবে। ১৮৩৯ সালে হিন্দু ল কমিটির পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে যে প্রশংসাপত্রটি পান, তাতেই প্রথম তাঁর নামের সঙ্গে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিটি ব্যবহৃত হয়। সংস্কৃত কলেজে অধ্যয়নের পর তিনি ১৮৪১ সালে প্রশংসাপত্র লাভ করেন। দেবনাগরী হরফে লিখিত এই সংস্কৃত প্রশংসাপত্রে কলেজের অধ্যাপকগণ ঈশ্বরচন্দ্রকে ‘বিদ্যাসাগর’ নামে অভিহিত করেন। বিদ্যাসাগর শিক্ষকতা করে সেই সময় ৩০০ টাকা বেতন পেতেন। সেই টাকার অতি সামান্য অংশ নিজের ভরণপোষণের জন্য রেখে পুরোটাই ব্যয় করতেন সমাজের হিতকর কাজে। শিক্ষা প্রসারের জন্য বিদ্যাসাগরের প্রথম কাজ ছিল বাংলা ভাষায় শিক্ষার পথ প্রশস্ত করা এবং বাংলা ভাষায় উচ্চমানের পাঠ্য পুস্তক রচনা করা। তৎকালীন সময়ে বাংলা ভাষা ছিল কথোপকথনের ভাষা অথচ সংস্কৃতভাষা ছিল এতই দুর্বোধ্য যে সাধারণ ঘরের ছেলে-মেয়েদের ভালো ভাবে শেখাই সম্ভব হত না। এই বাধা দূর করতে বিদ্যাসাগর প্রথমে সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমণিকা এবং ব্যাকরণ কৌমুদী রচনা করলেন। ১৮৫৫ সালে বর্ণ পরিচয় প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ রচনা করলেন। তার আগেই লেখা হয়ে গেছে শিশুশিক্ষার দ্বিতীয় পুস্তক বোধোদয়। কালক্রমে তিনি দেশীয় ভাষায় কুসংস্কারমুক্ত, যুক্তিবাদী শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য রচনা করলেন আখ্যানমঞ্জরী, কথামালা। তাঁর জীবনচরিত, স্বরচিত গ্রন্থগুলির বিষয়বস্তু থেকেই তাঁর বিজ্ঞানমনস্কতা, কুসংস্কারমুক্ত মানসিকতা ও বাস্তববাদী মনের পরিচয় পাওয়া যায়। বিদ্যাসাগর বীরসিংহ গ্রামে সম্পূর্ণ নিজ ব্যয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অবৈতনিক বিদ্যালয়। তৎকালীন ডি পি আই গর্ডন ইয়ংকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি সরাসরি অবৈতনিক শিক্ষার পক্ষে সওয়াল করেন কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন সমাজের হতদরিদ্র শ্রেণীর মানুষ তাদের সন্তানদের তবেই ইস্কুলে পাঠাবেন যদি শিক্ষা অবৈতনিক হয়। বিদ্যাসাগর বিশ্বাস করতেন সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন , গণিত , বিজ্ঞান ইত্যাদি শাস্ত্র সম্পর্কে নারী সমাজের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুললে তবেই নারীদের মধ্যে প্রোথিত এতদিনকার জীর্ণ কু-আচারের অবসান ঘটবে। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে ‘বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব’ প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আলোড়ন পড়ে গেল। বিদ্যাসাগরের বই সেই আমলে ১৫ হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল। এরপর তাকে সম্মুখীন হতে হল ভয়ংকর বিরুদ্ধাচারণের। তাঁর যুক্তিকে খন্ডন করার জন্য প্রকাশিত হতে লাগলো একের পর এক পুস্তক। সেই বছরেরই শেষের দিকে বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহের স্বপক্ষে একটি আবেদনপত্র লেখেন। তাঁর লেখা আবেদনপত্রে বিধবা বিবাহের পক্ষে স্বাক্ষর হয়েছে মাত্র ৯৮৭ টি ( বিধবা বিবাহের পক্ষে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিচারপতি দ্বারকানাথ মিত্র, অক্ষয়কুমার দত্ত, প্যারীচরণ সরকার, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।), অথচ বিধবা বিবাহের বিপক্ষে সব মিলিয়ে স্বাক্ষর ছিল প্রায় লক্ষের কাছাকাছি। অর্থাৎ, বিধবা বিবাহের পক্ষের সেই আবেদন সামাজিক স্বীকৃতি পায়নি। কিন্তু তারপরেও তিনি সেই আবেদনপত্র লন্ডনের ব্যবস্থাপক সভায় প্রেরণ করেন এবং আইন করে বিধবা বিবাহ চালু করেন। এই প্রসঙ্গে লেনিনের একটি উক্তি গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। রুশ বিপ্লবের পর যখন অনেকে মনে করেছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের আয়ু হয়তো সীমিত তখন লেনিন মন্তব্য করেছিলেন “আমরা যদি বিফলও হই, যে প্রক্রিয়া শুরু হল তা থামবে না।” বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহের সামাজিক প্রসারের ব্যর্থতার ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। বিধবা বিবাহের আইনি স্বীকৃতি আদায়ের মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে সামাজিক প্রগতির গতিরোধ করা পাথরের চাঁইটাকে তিনি যেভাবে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিয়েছিলেন, তার পথ ধরেই বিধবা বিবাহের সামাজিক স্বীকৃতির পথ হয়েছিল প্রশস্ত। বিধবা বিবাহ প্রচলন ছাড়াও বাল্যবিবাহ এবং বহুবিবাহ রোধে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা সর্বজনবিদিত। নারী স্বাস্থ্য বিষয়ক বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা থেকে তিনি বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে এই ধারণা পোষণ করেন যে অপরিণত আধারে পরিণত শিশুর বিকাশ সম্ভব নয়। বর্তমান সময়ের আধুনিক গবেষণার অনেক আগেই মাতৃ স্বাস্থ্যের বিজ্ঞানটি তিনি তুলে ধরেছিলেন তাঁর “বাল্যবিবাহের দোষ” গ্রন্থে। এ কথা অনস্বীকার্য যে বিদ্যাসাগরের মত মহামানবের জন্য নারী সমাজ মনুবাদী অভিশাপ থেকে অনেকাংশে মুক্তি পেয়েছে কিন্তু বর্তমানেও অনেকক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ চালু আছে। আজও কোনো বিধবা মহিলা পুনর্বিবাহ করলে অনেকক্ষেত্রেই সামাজিক ভাবে তার ওপর নিপীড়ন ও অত্যাচার নেমে আসে এবং তাকে কোণঠাসা করা হয়। আজও একজন বিধবা মহিলাকে প্রতি পদক্ষেপে সোশ্যাল জাজমেন্টের বোঝা মাথায় করে চলতে হয়। এ সবের বিরুদ্ধে বিদ্যাসাগরের দেখানো পথেই সংগ্রাম জারি রাখা বামপন্থী ছাত্র সমাজ হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের আশু কর্তব্য। বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী শিক্ষার প্রসারের উদ্দেশ্যে তিনি ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে মেট্রোপলিটন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীকালে কলেজে উন্নীত হয়। বর্তমানে যেই কলেজ বিদ্যাসাগর কলেজ হিসেবে পরিচিত। মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন ছিল সাম্রাজ্যবাদী আত্মগর্বর বিরুদ্ধে প্রথম সফল স্বদেশি প্রতিবাদ। সাম্রাজ্যবাদী শিক্ষানীতির আওতায় নির্ভেজাল ‘নেটিভ’ বাঙালি পরিচালনায় একটি কলেজ, তার বাঙালি ছাত্র ও শিক্ষকরা নিজেদের ক্ষমতা দেখালেন। প্রথম এফ এ পরীক্ষায় এই বিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা অসম্ভব ভালো ফল করলো। সাদা চামড়ার মানুষরা যে-চোখে বাঙালিদের দেখতে অভ্যস্ত ছিলেন, সেই চোখে আঙুল দিয়ে কলেজের প্রতিষ্ঠাতা-অধ্যাপক-ছাত্ররা তাই বারবার মিলিতভাবে দেখিয়ে দিলেন: তোমাদের ধারণা ভুল, সুযোগ পেলে আমরাও সবই করতে পারি। এই স্কুল প্রথম চালু হয়েছিল ভাড়া বাড়িতে। ১৮৭৬ সালে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এই স্কুলে। প্রফুল্লচন্দ্র রায় এই স্কুলকে “জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান” নামে আখ্যায়িত করেন। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে রবি ঠাকুর মন্তব্য করেছিলেন — “সংস্কৃত কলেজের কর্ম ছাড়িয়া দিবার পর বিদ্যাসাগরের প্রধানকীর্তি মেট্রোপলিটান ইনস্টিটুশ্যন। বাঙালির নিজের চেষ্টায় এবং নিজের অধীনে উচ্চতর শিক্ষার কলেজ-স্থাপন এই প্রথম। আমাদের দেশে ইংরাজি শিক্ষাকে স্বাধীনভাবে স্থায়ী করিবার এই প্রথম ভিত্তি বিদ্যাসাগর-কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হইল। যিনি দরিদ্র ছিলেন তিনি দেশের প্রধান দাতা হইলেন; যিনি লোকাচার রক্ষক ব্রাহ্মণপণ্ডিতের বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন তিনি লোকাচারের একটি সুদৃঢ় বন্ধন হইতে সমাজকে মুক্ত করিবার জন্য সুকঠোর সংগ্রাম করিলেন— এবং সংস্কৃত বিদ্যায় যাঁহার অধিকারের ইয়ত্তা ছিল না তিনিই ইংরাজিবিদ্যাকে প্রকৃতপ্রস্তাবে স্বদেশের ক্ষেত্রে বদ্ধমূল করিয়া রোপণ করিয়া গেলেন।” এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন হল “যিনি দরিদ্র ছিলেন তিনি দেশের প্রধান দাতা হইলেন” এই কথাটি। যে প্রসঙ্গে রবি ঠাকুর এই কথাটি বলেছিলেন সেখানে অর্থদানের বিষয়টি কোনো ভাবেই আসেনা। এখানে দান অর্থে শিক্ষাদান বোঝানো হয়েছে। বিদ্যাসাগরের মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠার এই কীর্তিকে রবীন্দ্রনাথ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একটি স্বাবলম্বী পদক্ষেপ হিসেবেই মূল্যায়ন করেছেন। সংস্কৃত বিদ্যার মত প্রাচীন দেশীয় ধারার সহিত ইংরেজি শিক্ষার মত আধুনিক বিদেশীয় ধারার মধ্যে সেতুবন্ধন করেছিলেন বিদ্যাসাগর। তাঁর কাছে দুটি ভাষা ছিল কেবল বাহন মাত্র, সেই ভাষার মধ্য দিয়ে যে প্রগতিশীল ও যুক্তিবাদী ভাবধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হয় সেটাই আসল। মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রসার এবং নারীশিক্ষার প্রসারের কথা মাথায় রেখে তিনি স্কুল ইন্সপেক্টর থাকাকালীন প্রায় ৩৫ টির কাছাকাছি মডেল স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিদ্যাসাগরের খুব একটা ধর্মে বিশ্বাস ছিল না। তাঁর তৈরি করা শিক্ষানীতি এবং পাঠক্রম ছিল সম্পূর্ণ অ-ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ । জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে শিক্ষক এবং ছাত্রেরা বিদ্যাসাগরের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলির অংশ হয়ে উঠেছিলেন। যে-বর্ণপরিচয় দিয়ে গ্রাম-শহরের লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়ের লেখাপড়া শুরু হত, কালের নিয়মে তার বদলে অন্য বই এসেছে। কিন্তু যে-আধুনিক শিক্ষার আদর্শ নিয়ে বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের পাঠক্রম সংস্কার করেছিলেন, ছাত্রদের টেনে এনেছিলেন মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন-এ, খুলে দিয়েছিলেন জনশিক্ষার পথ, তার প্রাসঙ্গিকতা সুদূর ভবিষ্যতেও হারাবে না।
১৮৫০ সালে বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের সাহিত্য অধ্যাপক হন এবং ১৮৫১ সালে উক্ত কলেজের প্রিন্সিপাল পদে যোগ দেন। বিদ্যাসাগরই প্রথম সংস্কৃত কলেজের দ্বার শূদ্রদের জন্য উন্মুক্ত করেন। দুর্ভিক্ষের সময় তিনি অন্নসত্র খুলে সকলকে দুই বেলা খাওয়াতেন। যাঁরা অন্নসত্রে খেতে লজ্জা পেতেন, তাঁদের বাড়িতে গোপনে চালডাল বা টাকাও পাঠাতেন। এজন্য কখনই তিনি লোকের দানের উপর নির্ভর করতেন না। ১৮৫৬ সালে তাঁর বিধবা বিবাহ আইন প্রবর্তিত হওয়ার পর অসংখ্য বিধবা মহিলাকে নিজ ব্যয়ে এবং নিজ উদ্যোগে বিবাহ দিয়েছিলেন। এই কারণ একসময় তাঁর ধারের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৫০,০০০ এ গিয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমানে RSS এর মূল উপজীব্য হল ধর্মীয় সাপ্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, অলৌকিক চিন্তা এবং মানুষে মানুষে জাত ধর্মের ভেদাভেদ করা। এই প্রেক্ষাপটে এই মধ্যযুগীয়তা দূরীকরণে আমাদের প্রতিনিয়ত ফিরে যেতে হবে বিদ্যাসাগরের ধর্মভাবনা এবং ঈশ্বরভাবনায়। তাঁর মতে ঈশ্বরভাবনা এবং ধর্মীয় ধ্যানধারণা মানুষের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়, প্রচার বা বিতর্কের বস্তু নয়। বর্তমানে বিজেপি ঠিক তার উল্টো কাজটাই করে চলেছে। লোকাচার বা সংস্কার বোধের সাথে কখনো মানবধর্মের কোনো দ্বন্দ্ব বাঁধলে তিনি সর্বদা নির্দ্বিধায় মানবধর্মের পক্ষ বেছে নিতেন। তাঁর লেখা বোধোদয়ের দ্বিতীয় সংস্করণে একটি ক্ষুদ্র নিবন্ধে ঈশ্বরকে নিরাকার চেতনায় নির্মাণ করেন। আরএসএস শিক্ষাকে গৈরিকীকরণের আগে যদি একবার বিদ্যাসাগরের ধর্মভাবনা সম্পর্কে কিছু জ্ঞান অর্জন করতে পারতো তাহলে ইতিহাস বিকৃতির করাল গ্রাস থেকে রক্ষা পেতো ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা। বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ রদ ও সর্বোপরি বিধবাবিবাহ প্রচলনে তাঁর শাস্ত্র বিশ্লেষণ প্রকৃতপক্ষে ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের বিরূদ্ধে আঘাত। নির্মম দেশাচারের তিনি ছিলেন ঘোর বিরোধী। প্রচলিত গোড়া ধর্মচেতনায় বিদ্যাসাগর বিশ্বাস করতেন না, তাইই তো তিনি বেদান্ত দর্শনকে ভ্রান্ত দর্শন হিসেবে আখ্যা দেওয়ার মত দৃঢ় পদক্ষেপ দেখাতেও দ্বিধা বোধ করেননি। নবজাগরণের অন্যতম ব্যক্তিত্ব বিদ্যাসাগরের আদর্শগত ভিত্তি ছিল দুটি — ব্যক্তিস্বতন্ত্র ও মানবতা। বিদ্যাসাগরের সারা জীবনের কর্মধারা তাঁর সমাজবিপ্লবী সত্তার পরিচায়ক। বিশিষ্ট মার্কসবাদী ইতিহাসবেত্তা হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের ভাষায়, “বিদ্যাসাগর যুগে মানুষ ও সমকাল প্রস্তুত ছিল না বৈপ্লবিক উদ্যোগের জন্য। এটাই হল বিদ্যাসাগর-জীবনের (এবং অন্যান্য বহু ভারতীয় মহামতির জীবনের) ট্রাজেডি।” প্রতিক্রিয়াশীল হিন্দু সমাজ বিদ্যাসাগরের অন্ধ বিরোধিতাই শুধু করেনি, বিদ্যাসাগরকে খুনের চেষ্টাও হয়েছিল তাদের তরফে।
’বিদ্যাসাগর চরিত চারিত্র পূজা’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিদ্যাসাগর সম্পর্কে লিখেছিলেন — ‘… বিদ্যাসাগরের জীবন বৃত্তান্ত আলোচনা করিয়া দেখিলে এই কথাটি বারবার মনে উদয় হয় যে, তিনি যে বাঙালী বড়লোক ছিলেন তাহা নহে, তিনি রীতিমত হিন্দু ছিলেন। তাহাও নহে, তিনি তাহা অপেক্ষাও অনেক বেশি বড় ছিলেন, তিনি যথার্থ মানুষ ছিলেন।’
ঊনবিংশ শতকের শুরুর দিকে বাংলার সমাজজীবনে নবজাগরণ যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল বিদ্যাসাগরের উপস্থিতি তাতে এক ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করেছিল। ডিরোজিওর দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে বিদ্যাসাগর সর্বদা নিজেকে সমাজসংস্কার এবং শিক্ষাপ্রসারের মত জনহিতকর কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন। যে বিদ্যাসাগর সমস্ত সামাজিক কুসংস্কার কে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করে শিক্ষার অধিকার নারী ও পুরুষ উভয়ের সমান তা প্রতিষ্ঠা করার জন্য রক্ষণশীলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, সেই বিদ্যাসাগরের বিষয়ে কবিগুরু বলেছিলেন, ‘বিধাতা সাত কোটি বাঙালী গড়িতে গড়িতে একটি মানুষ সৃষ্টি করিয়াছিলেন।’
বিদ্যাসাগর তাঁর জীবনকালে যে ভাবনা আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন, তার ওপর নির্ভর করে কুসংস্কার, পুরুষতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা, ইতিহাস বিকৃতি এবং মধ্যযুগীয় বর্বরতার বিরুদ্ধে জনমত গঠনের মাধ্যমে বিদ্যাসাগরের আদর্শকে প্রয়োগ করতে আমরা চিরকাল সচেষ্ট থাকবো। বর্তমানে আরএসএস যেভাবে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক পদস্খলন ঘটাচ্ছে, এমতাবস্থায় এই দৃঢ়চেতা, প্রগতিশীল মানুষটির দেখানো পথই হোক আমাদের একমাত্র পথ।