ইউ আর আ লায়ার, মিস্টার ওয়াল্টজ
মাল্যবান গাঙ্গুলী
আমেরিকার হাবভাবটা এমন, গোটা পৃথিবীর যেন সে মালিক! গোটা দুনিয়াকে সংশোধন করার দায়দায়িত্ব ঐশ্বরিকভাবে অর্পিত আমেরিকার ঘাড়ে। আমেরিকা যা বলবে, যা করবে, তাই হলো আদর্শ গণতন্ত্র! তারা নির্দ্বিধায় যে কোনো ব্যবস্থাকে বেআইনি, অগণতান্ত্রিক বলে পাণ্ডিত্য ফলাবে কলার তুলে! যে কোনো সময় তারা সন্ত্রাসবাদী দমনের নামে একের পর এক দেশে একতরফা যুদ্ধ চালাবে, বেনজির গণহত্যা সংগঠিত করবে! তারা সেই সমস্ত অবৈধ, মানবতাবিরোধী কাজের নামে একের পর এক মিথ্যাচার চালাবে, আর তারা প্রত্যাশা করবে, বাকিরা চুপটি করে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করবে। গত ২৬ অক্টোবর রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ যে চর্বিতচর্বণ শুরু করেছিলেন, তার বিষয় ছিল সমাজতান্ত্রিক কিউবা, ফিদেলের লড়াকু কিউবা। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চকে মিথ্যে, আজগুবি তাৎক্ষণিক বক্তৃতার আসর হিসেবে দেখতে পারেনি কিউবা। কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ চিৎকার করে মার্কিনি সাহেবের চোখে চোখ রেখে বললেন, “ইউ আর আ লায়ার, মিস্টার ওয়াল্টজ!”
কিউবা! এক অদ্ভুত স্বপ্নের দেশ, যারা হারতে শেখেনি। দুমড়েছে, মুচড়েছে, তবু মৃত মহাদেশে এক চিলতে রোদ্দুর হয়ে রূপকথা ফেরি করেছে প্রান্তিকতার মুখে মুখে। কোনো চকচকে, চোস্ত নিয়তি থালায় সাজানো ছিল না, অনিশ্চয়তা আর অনবরত শত্রুহানার মুখে কিংবদন্তি হয়ে ঘুরেছে ফিদেলের দেশ। হাজার মৃত্যুপরোয়ানা, গুপ্তহত্যার ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে কিউবা পৃথিবীর গ্লোবের পরতে পরতে রঙিন ডানায় উড়েছে, এক ছোট্ট নীড়ে অনন্ত আকাশের মতো হৃদয়নির্মাণের সহজপাঠ লেখা হয়েছে গেরিলা বিপ্লবীদের জলপাই রঙের চেহারার স্মিতহাস্যে। অতিমারির আর্তনাদের সেই দিনে কফিন সাজানো প্রান্তরে খুন হয়ে যাওয়া চে গ্যেভারা, তাঁর উত্তরপ্রজন্মকে সাথে নিতে ফিরলেন স্টেথোস্কোপ কাঁধে নিয়ে, সমাজতান্ত্রিক কিউবার চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভিনব অগ্রগতি মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ জানালো, প্রাণের জয়গান গাইলো। মানবসভ্যতার পুষ্পবৃষ্টি মাথায় নিয়ে চিরশাশ্বত কিউবার তো অজাতশত্রু হওয়ারই কথা ছিল আদর্শবাদের ইউটোপিয়ায় বোধিসত্ত্ব তপস্বীর স্বীয়সিদ্ধান্তে? কিন্তু ওই যে, শ্রেণী! মুনাফার জন্যে ফিদেলের কিউবা ভ্যাকসিনের কালোবাজারি করেনি, ফিদেলের কিউবা মানুষকে অপারেশন থিয়েটারে রেখে তার পরিজনের গলায় মৃত্যুসমান ঋণের রিসিপ্ট ধরিয়ে দেয়নি। ফিদেলের কিউবা সবার জন্যে শিক্ষা দিয়েছে, অন্ধ-কুসংস্কার-ধর্মীয় কূপমন্ডুকতার বদলে বিজ্ঞানের বিজয়শঙ্খ বাজিয়েছে। তাই…শ্রেণীসংগ্রাম জারি থেকেছে। প্রতিপক্ষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘদিন যাবৎ! ওষুধ আসতে দেয়নি, জ্বালানি আসতে দেয়নি। ফিদেলের কিউবা থেকে গেছে সভ্যতার আশীর্বাদে, অমরত্বের অমলিন মন্ত্রে। তাই, প্রয়াত নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর নামে মিথ্যাচার করতে হয়, দুনিয়ার শোষিত মানুষের নায়ক ফিদেলকে এক লহমায় দৈত্যে রূপান্তর করার জন্যে যা যা করার, সব করতে হয়!
কিন্তু, মিস্টার ওয়াল্টজ! আপনাকে কে অধিকার দিলো কিউবার দিকে চোখ তুলে তাকানোর? কে অধিকার দিলো আপনাকে রাষ্ট্রসঙ্ঘের মঞ্চে ফিদেল আর কিউবাকে কলঙ্কিত করার? আপনার মতে, ফিদেল নাকি বিপ্লবের পরে কিউবার মেহনতি মানুষের সম্পদ কেড়ে নিয়ে তাদের ক্রীতদাস বানিয়েছিল! কে বিচার করবে? আপনার ওয়াশিংটন, যারা কিনা লগ্নিপুঁজির স্বার্থে সমাজের অধিকাংশ সম্পদ মুষ্টিমেয় কর্পোরেটের হাতে তুলে দিয়ে সাধারণ মার্কিন নাগরিকের রক্ত চুষে খায়? কে বিচার করবে? যারা বিল গেটস, ইলন মাস্কদের সেলিব্রিটির সিংহাসনে বসিয়ে মার্কিনী বিশ্বের বিশ্বকর্মাদের অভিবাসী, মুসলমান আর বামপন্থী হওয়ার অপরাধে খুন করতে চায়? আপনাদের থেকে গণতন্ত্র আর মুক্তির অমৃতবাণী শিখতে হবে, যারা আমেরিকার বাইরে আশিটা স্বাধীন, সার্বভৌম দেশে প্রায় আটশোটি সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে দেশগুলির আত্মনির্ভরতাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়? যারা তৃতীয় বিশ্বের সম্পদশীল ও বৃহৎ সম্ভাবনাসম্পন্ন দেশগুলির কপালে বন্দুক রেখে ট্রিগারে আঙুল দিয়ে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ গায়ের জোরে লুঠ করে এবং দেশগুলির কৃষি-শিল্পকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করে তাদের বাজার দখল করে? ওয়াল্টজ সাহেব, আপনি এই স্পর্ধা দর্শানোর কনভিডেন্স কিংবা নির্দেশ কোত্থেকে পেয়েছেন? ফরেইন মিনিস্টার মার্কো রুবিও? যিনি ঔপনিবেশিক ইতিহাসের নির্লজ্জতার দিকে তাকিয়ে মাথা হেঁট করাকে ন্যাকামি মনে করেন, যিনি কোনো রাখঢাক না রেখেই প্রকাশ্যে কিউবার সরকার ফেলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে সিআইএ’র ভাড়াটে বাহিনীতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান? অথবা, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আপনার কৃতকর্মের অনুপ্রেরণা? যিনি আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধী, দানবীয় নেতানিয়াহুকে সাথে নিয়ে প্যালেস্তাইন সহ মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে বড় অপরাধ সংগঠিত করে চলেছেন নির্দ্বিধায়? যিনি আমেরিকার অর্থনীতি ভেঙে পড়ার মুখোমুখি হয়েও নিজের লালসা সম্বরণ করতে না পেরে ইরানে যুদ্ধপরিস্থিতি তৈরি করছেন ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করে? মিস্টার ওয়াল্টজ, ভাঙনের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন। আজ থেকে তিন দশক আগে ইতিহাসের পরিসমাপ্তির স্বপ্নে মশগুল হওয়া ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা ইউটার্ন নিয়েছেন, আপনারা স্বর্ণলঙ্কার পতনের আভাস পাচ্ছেন না? নাকি নিজেদের অবশ্যম্ভাবী সর্বনাশকেই উতরে যেতে চাইছেন ফিদেলের নামে মিথ্যাচার করে?
আজকে প্রশ্ন এটা নয়, যে কিউবা কিংবা মার্কিনবিরোধী মুক্তিকামী পৃথিবীতে বামপন্থা টিকে থাকতে পারবে কিনা! আজকে এটাই প্রশ্ন, আমেরিকা টিকে থাকবে কতদিন? আজকে আর কিউবা সহ লড়াকু পৃথিবীর সাফল্যের ধারাবিবরণী লেখার প্রয়োজনীয়তা নেই, বরং আজকে লিখতে হবে ক্লিন্টন, বুশ, ওবামা, বাইডেন, ট্রাম্পদের অপরাধের ইতিহাস ও বর্তমান বয়ে চলা আমেরিকা রাষ্ট্র টিকবে কিনা? টিকলেও আর ক’দিন? যখন এই প্রবন্ধ লিখছি, তখন আমেরিকায় ছয় লক্ষ গৃহহীন মানুষ রাস্তায় ঘুমোচ্ছে। আমেরিকায় জীবনধারনের জন্যে জরুরি চারশো ডলার এখন প্রাপ্তবয়স্ক চল্লিশ শতাংশ মার্কিন নাগরিকের পকেটে নেই, অসীম দারিদ্র্য গ্রাস করেছে তাদের। আমেরিকা এমন একটা দেশ, যেখানে ইনসুলিনের খরচ পার্সোনাল গাড়ির মান্থলি ইএমআই’র থেকে বেশি, যেখানে মানুষ বেঁচে থাকার জন্যে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ওষুধের খরচও কমাতে বাধ্য হয়। মহান আমেরিকা, যেখানে মানুষের গড় বয়স কমছে, যেখানে শিশুমৃত্যুর হার কিউবার থেকে বেশি। যেখানে মজদুরের ন্যূনতম মজুরি গত পনেরো বছরে বাড়েনি, যেখানে স্কুল সহ উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের চাকরির স্থায়িত্ব নেই এবং তাঁদের মাইনে এতোই কম যে দুটো করে চাকরি নিয়ে সংসার চালানোর খরচ যোগাতে হয় মাষ্টারমশাইদের। যেখানে মানুষের নিরাপত্তা নেই, অপরাধ প্রতিদিন বেড়ে চলেছে এবং প্রতিবাদ করলেই জেলে যেতে হয়। রাজনৈতিক কারণে জেল খাটা মানুষের সংখ্যা আমেরিকায় যখন সর্বোচ্চ! ২০২৫ সালে আমেরিকার পুলিশ গুলি চালিয়ে ১,১৪৩ জন মানুষকে খুন করেছে। মানবাধিকারের ধারপাশ দিয়ে না গিয়ে গুয়েনতানামো উপসাগরীয় দ্বীপে বিচারহীন ভাবে অসংখ্য মানুষকে আটক করে রেখেছে আমেরিকা। আমেরিকার ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিসের রিপোর্ট অনুযায়ী, শুধুমাত্র ২০২৪ সালে এক বছরে সাড়ে পাঁচ লক্ষ যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। ওই বছরেই দশ হাজার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে খুন হতে হয়েছে বর্ণবৈষম্যের শিকার হয়ে। এই আমেরিকা স্বাধীনতার কথা বলছে? এই আমেরিকা আর্থিক সমৃদ্ধির কথা বলছে? এই আমেরিকা মানবাধিকারের কথা বলছে? সিরিয়াসলি?
সমাজতান্ত্রিক কিউবারকে পিষে মারার জন্যে দীর্ঘকাল যাবৎ ইকোনমিক ব্লকেড চালিয়ে যাচ্ছে হোয়াইট হাউস। আটকে দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্যে প্রয়োজনীয় জ্বালানি। দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যা চললেও চলতি বছরে সেই মাত্রা বৃদ্ধি পায়। মেক্সিকো ও ভেনেজুয়েলা থেকে কিউবায় আসা জ্বালানির পথেও বাধা তৈরি করে ট্রাম্প প্রশাসন। দিনে বারো থেকে কুড়ি ঘন্টা বিদ্যুৎ সংযোগহীন হয়ে থেকেছে গোটা কিউবা! আটকে দেওয়া হয়েছে খাবার, আটকে দেওয়া হয়েছে জরুরি ওষুধ পরিষেবা। জাতিসঙ্ঘের গত বছরে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালে অক্টোবর মাসে কিউবার প্রয়োজনীয় ওষুধের মৌলিক তালিকার ৫১ শতাংশের ঘাটতি ছিল। ১৯৯২ সাল থেকে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদ আমেরিকাকে কিউবার ওপর জারি করা অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেওয়ার আবেদন জানিয়ে এসেছে, কর্ণপাত করার ন্যূনতম প্রয়োজনীয়তাই বোধ করেনি ওরা। ওদের এক ও অভিন্ন লক্ষ্য ছিল, কিউবাকে খতম করা। কিউবা শেষ হয়নি। কিউবা শিরদাঁড়া টানটান করে লড়ে যাচ্ছে। গত ২৮ অক্টোবর কিউবায় মার্কিনী অবরোধ তোলার প্রশ্নে ভোটগ্রহণ সংগঠিত হয়। কিউবার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে পৃথিবীর ১৩০টি দেশ। আমেরিকার পক্ষে মাত্র ভোট মাত্র ১৭টি দেশের। ভোটদানে বিরত থেকেছে ২৫টি দেশের সরকার। অর্থাৎ, কিউবা অভূতপূর্ব সমর্থন পাচ্ছে গোটা দুনিয়া থেকে। জাতিসঙ্ঘে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চিরাচরিত ঔদ্ধত্যে মিস্টার ওয়াল্টজ কিউবাকে বলছেন,“ব্যাক আপ!” পশ্চাদপসরণের প্রশ্নই ওঠে না, কিউবার দৃঢ় ও নির্ভীক প্রত্যুত্তরে সাহস আর অপরাজেয়, অবিনশ্বর, অদম্য স্বপ্ন ছড়িয়ে পড়ছে। আর হ্যাঁ, কিউবা একা নয়। শতাব্দীসঞ্চিত অপমান আর মিথ্যাচারের জবাব সমস্বরে দিতেই হবে, “ইউ আর আ লায়ার, মিস্টার ওয়াল্টজ!”