প্রথম আধুনিক মানুষ

রামমোহন রায় ‘প্রথম আধুনিক মানুষ’ ই বটে। কেবল ইতিহাসের পাতায় থাকা কোনো ব্যক্তিত্ব বা একজন দার্শনিক তিনি নন, আজকের দিনে রামমোহন রায় আমাদের কাছে সেই স্পর্ধা, সেই স্ফুলিঙ্গ, যা আমাদের প্রতিনিয়ত অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে, অন্ধ আনুগত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস জোগায়। রামমোহন রায় ঔপনিবেশিক ভারতের সমাজ, ধর্ম, শিক্ষা ও রাজনীতিকে নতুন যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে পুনর্বিবেচনার পথ দেখিয়েছিলেন, আজকের ভারতে এই যুক্তিবাদী-মানবতাবাদী চিন্তার বিরুদ্ধে যারা মানুষকে ধর্মান্ধতার অন্ধকূপে নিয়ে যেতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ তাদের দিকে চ্যালেঞ্জ ছোঁড়ার নাম রামমোহন রায়। রামমোহনের রাজনৈতিক চিন্তা মূলত মানবতাবাদী এবং সংস্কারবাদী চরিত্রকেই বহন করে। রামমোহন বিশ্বাস করতেন যে সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নতি সম্ভব কেবলমাত্র যুক্তি, শিক্ষা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা এবং নৈতিকতার ভিত্তিতে।

রামমোহন রায় এমন এক সময়ে জন্ম নেন, যখন ভারতীয় সমাজ ছিল কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামন্ততান্ত্রিক এবং ঔপনিবেশিক শোষণের মধ্যে আবদ্ধ। ব্রিটিশ শাসনের ফলে একদিকে যেমন ভারতীয় অর্থনীতি ও সমাজের উপর গভীর সংকট নেমে আসছিল তেমনই অন্যদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষা, আধুনিক বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ ও সাংবিধানিক চিন্তারও প্রবেশ ঘটছিল প্রগতিশীল ব্যক্তিত্বদের হাত ধরে। রামমোহন এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে এক নতুন আধুনিক ভারত নির্মাণের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন ইংরেজি শিক্ষা, আধুনিক আইনব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক শাসনের ধারণা ভারতীয় সমাজকে আধুনিক করে তুলতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে তিনি ব্রিটিশ সরকারের স্বৈরাচারী নীতি, অর্থনৈতিক শোষণ এবং ভারতীয়দের রাজনৈতিক অধিকারহীনতার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন।

রামমোহনের রাজনৈতিক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ব্যক্তি-স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্রের প্রধান কাজ হওয়া উচিত মানুষের স্বাধীনতা রক্ষা করা। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে তিনি সভ্য সমাজের অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে দেখতেন। ১৮২৩ সালে ব্রিটিশ সরকার যখন সংবাদপত্রের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, তখন রামমোহন তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। আজকের দিনে আমরা দেখছি দিনের পর দিন সাংবাদিকদের স্বাধীনতার উপরে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে, শাসকের পছন্দসই বিকৃত সংবাদ প্রচারে বাধ্য করা হচ্ছে। একের পর এক স্বাধীন সংবাদিকদের খুন করা হচ্ছে। আজকের স্বৈরাচারী শাসক গনতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ কে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার নথে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে। বারবার আঘাত আনা হচ্ছে মুক্ত চিন্তার উপরে, ব্যক্তি স্বাধীনতার উপরে, একে একে মগজ ধোলাই করা হচ্ছে সাধারণ মানুষের।

নবজাগরণের জনক রামমোহন, তাঁর সমগ্র জীবনকালে বলে গেছেন ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা, একসাথে থাকার কথা, বিভেদের বিরুদ্ধে ঐক্যের কথা । তিনি ধর্মকে মানুষের নৈতিক উন্নতির মাধ্যম হিসেবে দেখতেন, কিন্তু ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের বিরোধিতা করতেন। বেদ রামমোহনের কাছে একটা ‘way of life’, রামমোহন যখন দেখছেন সমগ্র সমাজকে ধর্মীয় গোঁড়ামি ঘিরে ধরেছে তখন তিনি সমাজকে বাঁচাতে, মানুষকে বাঁচাতে পক্ষ নেন মানুষের, তুলে ধরেন একেশ্বরবাদী ব্যাখ্যা এবং এর সাথে ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের নৈতিক দিকগুলিকেও গুরুত্ব দেন। জন্ম দেন ‘syncretic’ ধারনার, প্রতিষ্ঠা করেন ব্রাহ্ম সমাজ, বলেন পৌত্তলিকতা বর্জনের কথা। রামমোহন ধর্মকে দর্শনের মতো করে দেখেছেন, এখানেই ধর্ম আর দর্শনের সবথেকে বড়ো পার্থক্য উঠে আসে, ধর্ম মানুষকে মেনে নিতে বাধ্য করে আর দর্শন মানুষকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে। রামমোহন বিশ্বাস করতেন যে সাম্প্রদায়িক বিভেদ জাতীয় ঐক্যের পথে বাধা সৃষ্টি করে। তাই তিনি মানবতাবাদ এবং ধর্মীয় সহাবস্থানের উপর জোর দেন। আর আজ রামমোহনের ভারতে, রবীন্দ্রনাথের ভারতে আমরা দিনের পর দিন মানুষে মানুষে ধর্মের ভিত্তিতে, জাতির ভিত্তিতে, বর্ণের ভিত্তিতে ভেদাভেদ দেখছি, দেখছি শাসকের মদতে কি করে কোনো বিশেষ সম্প্রদায়কে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে “দেশ বিরোধী” বলে। ভারতভাবনাকে সম্পূর্ণ বিকৃত করে ভারত কে টুকরো টুকরো করে দেওয়া হচ্ছে, এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে একমাত্র ভারতের সাধারণ মানুষ। এছাড়াও নারীমুক্তি ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নেও রামমোহনের রাজনৈতিক অবস্থান ছিল অত্যন্ত প্রগতিশীল। তিনি সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। বিভিন্ন শাস্ত্র ঘেঁটেই রামমোহন রায় প্রমাণ করে দিলেন ‘সতীদাহ অশাস্ত্রীয়’, অবশ্য গোঁড়া ও রক্ষণশীল সমাজপতি এবং বিশেষত ব্রাহ্মণরা তার বিরোধিতা করেছিলো সাংঘাতিকভাবে। কিন্তু তাঁর লড়াই, তাঁর জেদ, তাঁর বাস্তববাদী যুক্তির কাছে হার মানতে বাধ্য হয় রক্ষণশীল নারীবিরোধী শক্তি। তাঁর আন্দোলনের ফলেই ১৮২৯ সালে ব্রিটিশ সরকার সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করে। তিনি নারীশিক্ষা, বিধবাদের অধিকার এবং নারীদের সামাজিক মর্যাদার পক্ষে কথা বলেন। তাঁর মতে, কোনো সমাজের অগ্রগতি সম্ভব নয় যদি সেই সমাজে নারীরা নিপীড়িত ও অধিকারহীন থাকে। রামমোহন শিক্ষার ক্ষেত্রেও ছিলেন প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারী। প্রাচীন ধর্মীয় শিক্ষার পরিবর্তে আধুনিক বিজ্ঞান, দর্শন এবং ইংরেজি শিক্ষার প্রসারের পক্ষে ছিলেন তিনি,দাবী রেখেছিলেন ইংরেজি শিক্ষার প্রচলনের। তাঁর মতে, আধুনিক শিক্ষা মানুষকে যুক্তিবাদী করে তোলে এবং রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটায়। তিনি মনে করতেন শিক্ষা হলো জাতীয় উন্নতির ভিত্তি। আর আজকের সময়ে একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, শিক্ষক শিক্ষিকাদের রাস্তায় নেমে নিজেদেরকে প্রমাণ করার জন্য আন্দোলন করতে হচ্ছে, একের পর এক পরীক্ষায় হচ্ছে দুর্নীতি, আর এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কারা? ভারতের সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে, পুঁজিবাদের যুগে শিক্ষাকেও ‘commodity’ তে পরিণত করা হচ্ছে, বন্দী করে দেওয়া হচ্ছে মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে, বিকৃত করা হচ্ছে ইতিহাস, চলছে মগজ ধোলাই।

রামমোহন রায় ছিলেন ভারতীয় আধুনিকতার পথপ্রদর্শকদের মধ্যে প্রথম একজন, তিনি সমগ্র জীবনে প্রচুর অপমান সহ্য করেও সমাজকে ভাবতে শিখিয়েছেন, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন, সমাজকে নতুন ভাবধারা আপন করতে শিখিয়েছেন, নতুনকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা ছিল যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ, উদারনীতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের উপর প্রতিষ্ঠিত। তাঁর চিন্তাধারা আজকের দিনে বিশেষ ভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, নারী অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রশ্নে তাঁর আদর্শ সমসাময়িক ভারতীয় সমাজ ও রাজনীতিকে নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করবে, যখনই সমাজকে উগ্র জাতীয়তাবাদের, ধর্মীয় মেরুকরণের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে, তখন আমাদের লড়াইয়ের ল্যান্ডমার্ক হবে রামমোহন রায়ের দেখানো পথ। আজও নারী আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন, স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের দাবি, বিজ্ঞানমনস্কতার প্রচার কিংবা সাম্পদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে নবজাগরণের চেতনা নতুন রূপে বেঁচে আছে। বাংলার সাংস্কৃতিক পরিসরে গান, কবিতা, নাটক, সাহিত্য ও রাজনৈতিক বিতর্ক এখনও মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায় এবং সমাজকে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে দেখতে উদ্বুদ্ধ করে। যে চেতনার সূচনা করেছিলেন রামমোহন রায়, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে যুক্তির পক্ষে দাঁড়িয়ে, নারী অধিকার ও মানবমর্যাদার প্রশ্ন তুলে- সেই চেতনা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তাই এই লড়াইয়ে আমাদের পাথেয় রামমোহনের স্পর্ধা, রামমোহনের দেখানো পথেই সমাজকে ধর্মীয় গোঁড়ামির কবল থেকে, কুসংস্কারের কবল থেকে বেড় করে আনবে আজকের যুক্তিবাদী ছাত্রসমাজ, আবারও জয় হবে যুক্তিবাদের, জয় হবে মুক্ত চিন্তার, সর্বোপরি জয় হবে মানবতার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *