মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ-উন্মাদনা – প্রভাব রুটি-রুজিতে

মফস্বলের কোনো এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সকালে টেবিলের উপর রাখা খোলা খবরের কাগজে যখন বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকে – “মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের উত্তেজনা” তখন খবরটি পড়ে অনেকেরই মনে হতে পারে এটা তো অনেক দূরের ঘটনা। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে মরুভূমির দেশে যুদ্ধ হচ্ছে, তার সঙ্গে আমাদের কি সম্পর্ক থাকতে পারে? কিন্তু বাস্তবতা খুব দ্রুত এই ধারণাকে ভেঙে দেয়।


কয়েক সপ্তাহ কিংবা কয়েক মাসের ব্যবধানে বাজারে গিয়ে যখন দেখা যায় রান্নার গ্যাসের দাম বেড়েছে, পেট্রোল ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন খরচ বাড়ছে, খাদ্যপণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠছে, তখন বুঝতে আর বাকি থাকে না যে দূরের সেই যুদ্ধ আসলে অতটাও দূরের নয়।
আজকের বিশ্বায়িত অর্থনৈতিক কাঠামো এমনভাবে গড়ে উঠেছে যেখানে আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রতিটি বড় সংঘাত অর্থনীতির মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের জীবনে প্রবেশ করে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সেই বাস্তবতার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক ক্ষমতার সংঘর্ষের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত। এই অঞ্চলে পৃথিবীর মোট তৈলভাণ্ডারের একটি বড় অংশ কেন্দ্রীভূত, ফলে জ্বালানি সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এখানে বহু দশক ধরেই চলমান। তেল, বাণিজ্যপথ এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, এই তিনটি উপাদান মধ্যপ্রাচ্যকে আধুনিক বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম কৌশলগত ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলেছে। ফলে এখানে সংঘটিত প্রতিটি যুদ্ধ বা সামরিক উত্তেজনা কেবল একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নয়; বরং তা বিশ্বের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। তবে এই যুদ্ধের প্রভাব কি কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে?


আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতির আন্তঃনির্ভরশীল কাঠামোর কারণে সেই যুদ্ধের প্রভাব ধীরে ধীরে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি ও সমাজে প্রতিফলিত হয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, বাণিজ্যিক ব্যয়ের পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা শেষ পর্যন্ত এসে পড়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের উপর। ফলে যে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় রাষ্ট্র ও ক্ষমতার দখলের জন্যে, সেই যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকেই। ফলত মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে কেবল দূরের একটি আন্তর্জাতিক সংঘাত হিসেবে দেখা যায় না; বরং তা এমন একটি বিশ্ব রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ, যেখানে যুদ্ধের আগুন সীমান্তের ভেতরে জ্বলে উঠলেও তার ছাই ছড়িয়ে পড়ে বহু দূরের সমাজ ও মানুষের জীবনে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ইতিহাস

মধ্যপ্রাচ্য আজকের বিশ্বরাজনীতিতে এমন একটি অঞ্চল যেখানে যুদ্ধ, সামরিক উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রায় স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই বাস্তবতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ উপনিবেশবাদী ইতিহাস এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পরিকল্পিত ভূরাজনীতি। বিংশ শতকের শুরুতে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ইউরোপীয় শক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকে নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী পুনর্গঠন করে। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের নেতৃত্বে তৈরি সেই রাজনৈতিক কাঠামো কখনোই স্থানীয় জনগণের ঐতিহাসিক কিংবা সামাজিক বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি, বরং তা গড়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার একটি কৌশল স্বরূপ। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বহু রাষ্ট্রের জন্মই ঘটে একটি অস্থির রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে দিয়ে।
পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চলে বিপুল তেল ও প্রকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডার আবিষ্কৃত হওয়ার পর বিশ্বের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। শিল্পায়িত বিশ্ব অর্থনীতির জ্বালানি চাহিদা পূরণের জন্য এই সম্পদ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ফলে জ্বালানি সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়। যে শক্তি মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, সে বিশ্ব অর্থনীতির উপরও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে, এই বাস্তবতাই পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক শক্তির নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। এর ফলেই মধ্যপ্রাচ্য ধীরে ধীরে বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতার স্থায়ী ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

মার্কিন আধিপত্যবাদ ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যে একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটে এবং যুক্তরাষ্ট্র দ্রুতই বৈশ্বিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যায়। সেই প্রক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্য তার কৌশলগত নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। তেলের উপর প্রভাব, সামরিক ঘাঁটি স্থাপন এবং রাজনৈতিকভাবে অনুগত শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা, এই তিনটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব বিস্তার করে।
ফলে যখনই কোনো দেশ তার প্রাকৃতিক সম্পদের উপর স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে বা একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পথ অনুসরণ করার চেষ্টা করেছে, তখন সেই দেশের উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক চাপ কিংবা সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ চালিয়ে সেই দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতির সমীকরণে থাবা বসিয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বহু সংঘাত কেবলমাত্র স্থানীয় বা আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব নয়, বরং এগুলো বৈশ্বিক আধিপত্য বজায় রাখার বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই কাজ করে।

ইসরায়েল প্রসঙ্গ এবং কৌশলগত জোট

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ইতিহাসে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এবং মার্কিন আধিপত্যের অংশীদারি একটি অন্যতম রাজনৈতিক অস্থিরতার অংশ। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্যালেস্টাইন প্রসঙ্গ এই অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী সংকটে পরিণত হয়। যার ফলে প্যালেস্টাইনের জনগণের ভূমি, রাজনৈতিক অধিকার এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত রয়ে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষণে প্রায়ই দেখা যায় যে ইসরায়েল কেবল একটি আঞ্চলিক রাষ্ট্র নয়, এটি মধ্যপ্রাচ্যে একটি বৃহত্তর কৌশলগত জোটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলকে সামরিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিকভাবে সমর্থন করে আসছে। এই সমর্থন কেবলমাত্র রাজনৈতিক সম্পর্কের বিষয় নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী সামরিক ও রাজনৈতিক উপস্থিতি বজায় রাখার কৌশলের সঙ্গেও যুক্ত। যার ফলে প্যালেস্টাইনের প্রসঙ্গের সমাধান ক্রমাগত জটিল হয়ে ওঠে এবং এই অঞ্চলটি বারবার যুদ্ধ উন্মাদনা ও বিশ্বরাজনীতির হটস্পট হয়ে ওঠে।

ট্রাম্পের নীতি ও নয়া যুদ্ধউন্মাদনা

সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তোলে। তার শাসনকালে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে একধরনের আগ্রাসী কৌশল দেখা যায় যেখানে কূটনৈতিক সমঝোতার পরিবর্তে শক্তি প্রদর্শন, একনায়কতন্ত্র এবং রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে আসা এবং ইসরায়েলকে ঘিরে একাধিক একতরফা কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ভারসাম্যকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই নীতির ফলে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় এবং মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের সম্ভাবনা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই ধরনের নীতি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে আরও মেরুকৃত করে তোলে এবং যুদ্ধের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয়।

যুদ্ধের অর্থনীতি ও বিশ্বব্যবস্থার বাস্তবতা

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে বোঝার ক্ষেত্রে যুদ্ধের অর্থনীতির প্রশ্ন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় অস্ত্রশিল্প, জ্বালানি বাজার এবং সামরিক জোট একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। যুদ্ধ কিংবা যুদ্ধের সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক অস্ত্রবাণিজ্যের বাজারকে সম্প্রসারিত করে এবং একই সঙ্গে জ্বালানি সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার নতুন সমীকরণ তৈরি করে। ফলে যুদ্ধ অনেক ক্ষেত্রেই একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ হিসেবে কাজ করে। তাই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সেই বাস্তবতারই অন্যতম প্রতিফলন যেখানে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কৌশলগত স্বার্থ, জ্বালানি রাজনীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তবে এই সংঘাতের প্রভাব কি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে? বাস্তবে, আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতির আন্তঃনির্ভরশীল কাঠামোর কারণে এই যুদ্ধের প্রভাব দ্রুত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিফলিত হয়। জ্বালানির দাম, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর তার সরাসরি প্রভাব পড়ে। আর সেই প্রভাব শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে।

দূরের যুদ্ধের কাছের প্রভাব

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অনেক সময় আমাদের কাছে দূরের কোনো সংবাদ বলে মনে হলেও,টেলিভিশনের পর্দায় দেখানোএই যুদ্ধের আগুন আদতে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামো এমনভাবে তৈরি হয়েছে যেখানে একটি অঞ্চলের যুদ্ধ খুব দ্রুতই সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। ইরান ও ইসরায়েলের সংঘাত সেই বাস্তবতারই চিত্র মাত্র। মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা বর্তমানে কেবল দুই রাষ্ট্রের সামরিক সংঘাত নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি রাজনীতি, বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ এবং বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষমতার লড়াই। আর সেই লড়াইয়ের মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হচ্ছে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষকে। কৃষককে, শ্রমিককে, ছোট ব্যবসায়ীকে, মধ্যবিত্ত পরিবারকে এমনকি স্কুল শিক্ষার্থী পড়ুয়াদেরও। আজ শহরের বাজারে দাঁড়িয়ে যে মানুষ সবজি কিনতে গিয়ে অবাক হচ্ছেন, গ্রামের কৃষক যিনি ডিজেলের দাম নিয়ে চিন্তিত, কিংবা যে মা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে গ্যাস সিলিন্ডারের খরচ নিয়ে হিসাব মেলাতে পারছেন না, তাদের জীবনের সঙ্গে এই আন্তর্জাতিক সংঘাতের যোগ আজ সরাসরি মিশে গিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালী। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য এই সমুদ্রপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের একটি বড় অংশ যায় এই পথ দিয়ে। ইরান–ইসরায়েল সংঘাতের ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি পরিবহনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে দ্রুত। ভারতের মতো একটি আমদানি নির্ভর দেশে সেই অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি অনুভব করা যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের ভিতরেও জ্বালানি সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধির চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা কেবল পরিসংখ্যানগত নয়,বরং এর প্রভাব আজ স্পষ্ট হয়ে উঠছে সাধারণ মানুষের জীবনে।


আজ বহু জায়গায় রান্নার গ্যাস একটি বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। গ্যাস বুকিং করার পরেও অনেক ক্ষেত্রে সিলিন্ডার সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না। সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে, অপেক্ষা করতে হচ্ছে দীর্ঘদিন। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অনেক জায়গায় বৃদ্ধি পাচ্ছে LPG সিলিন্ডারের কালোবাজারি,ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হচ্ছে ২০০০ থেকে ৩০০০ টাকা দিয়ে গ্যাস সিলিন্ডার কিনছে।
একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ যখন মাসের হিসাব করেন, তখন তার আয় একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকে। কিন্তু গ্যাসের মতো মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম যখন এতটা বেড়ে যায়, তখন সেই সংসারের হিসাব ভেঙে পড়ে। একজন গৃহবধূর কাছে এই সংকট কেবল অর্থনীতির পরিসংখ্যান নয়, এটি প্রতিদিনের বাস্তব লড়াই। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে তাকে ভাবতে হচ্ছে “আজ গ্যাস বাঁচিয়ে কীভাবে কাল রান্না করা যাবে।”

জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি পরে বাজারে। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলে প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়ে যায়। সবজি, ডাল, চাল, রান্নার তেল, সবকিছুর দাম ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে আরম্ভ করে। শহরের বাজারে একজন মধ্যবিত্ত মানুষ যখন বাজারের থলি নিয়ে দাঁড়ান, তখন তিনি বুঝতে পারেন আগের সেই পরিমাণ টাকায় আর প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা যাচ্ছে না।
এই সংকট আরও গভীরভাবে অনুভব করছেন আজকের ভারতের শ্রমজীবী মানুষ। একজন দিনমজুর শ্রমিক দিনের শেষে যে মজুরি পান, তা দিয়ে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানো প্রায় অসম্ভব। তাই বর্তমান সময়ের প্রতিটি সংসারের অবিচ্ছেদ্য অংশ LPG গ্যাস এর এই আকাল সাধারণ মানুষের জন্য কোন বিভীষিকার চেয়ে কম কিছু নয়।


তবে এই জ্বালানি সংকটের প্রভাব যখন কর্পোরেট গণ্ডি ছাড়িয়ে স্কুলের চার দেওয়ালের মধ্যে এসে পৌঁছায় তখন সেটি কেবলমাত্র আর রান্নার জ্বালানি রূপে থাকে না বরঞ্চ সেটি ভারতবর্ষের স্কুলগুলিতে চালু থাকা মিড-ডে মিলের ক্ষেত্রে একটি বড় প্রশ্ন চিহ্ন হয়ে ওঠে। যেখানে আজও অসংখ্য শিক্ষার্থী মধ্যাহ্নকালীন আহারের জন্যে মিড-ডে মিলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আজ রান্নার গ্যাসের সরবরাহে সমস্যা তৈরি হওয়ায় অনেক জায়গায় রান্নার কাজ ব্যহত হচ্ছে। কোথাও খাবার তৈরি করতে দেরি হচ্ছে, কোথাও বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। শহর কলকাতায় আজ তার প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট, হোস্টেল গুলিতে শিক্ষার্থীরা কোথাও কোথাও না খেয়ে রয়েছে, অর্থাৎ যে যুদ্ধ দুদিন আগে পর্যন্ত টিভির পর্দায় সীমাবদ্ধ ছিল তার প্রভাব আজ এসে পড়েছে ভারতবর্ষের মানুষের রুটি রুজিতে। তাই যে যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হচ্ছে এদেশের এমন মানুষদের, সেই যুদ্ধ আর যাই হোক খুব বেশি দূরের যুদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতির সংঘাত আসলে কত গভীরভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ তারই এক জ্বলন্ত নিদর্শন।

বিশ্ব জুড়ে যুদ্ধের উত্তেজনা ও আন্তর্জাতিক অস্থিরতার এই সময়ে যখন সাধারণ মানুষ উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, তখন একটি দায়িত্বশীল সরকারের প্রথম কর্তব্য হওয়া উচিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম স্থিতিশীল রাখা এবং জনজীবনের নিরাপত্তা ও স্থিতি বজায় রাখা—এই কাজগুলোই হওয়া উচিত রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন,মানুষের প্রত্যাশার জায়গায় আজ স্পষ্ট হয়ে উঠছে মোদি সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও নীতিগত অদূরদর্শিতা। মোদী সরকারের এক দশকের ব্যর্থ অর্থনৈতিক নীতির ফল আজ স্পষ্ট। কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করে ফ্যাসিবাদী কায়দায় অগণতান্ত্রিক ভাবে নীতি নির্ধারণ করছে এই সরকার। জ্বালানি নীতি থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণ, সব ক্ষেত্রেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যার বোঝা শেষ পর্যন্ত এসে পড়েছে সাধারণ মানুষের উপর।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার বদলে অনেক ক্ষেত্রেই সেই শক্তির সঙ্গেই তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে দেশের মানুষের জীবন বিপন্ন করে তুলেছে এই সরকার।

এই কারণেই আজ প্রয়োজন কেবল আন্তর্জাতিক যুদ্ধনীতির বিরোধিতা করা নয়, একইসঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে এমন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নীতির বিরুদ্ধেও প্রশ্ন তোলা, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। কারণ রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি যুদ্ধোন্মাদনায় নয়, মানুষের জীবনযাত্রার নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায়। অন্তত ইতিহাস আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়।


তাই যুদ্ধ কখনোই মানবতার ঊর্ধ্বে নয়। যারা যুদ্ধের রাজনীতি ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের পাশে দাঁড়ায়, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদেরই ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড় করায়। যুদ্ধের শেষে বিনাশ তাদেরই হয়, এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *