গণতন্ত্রের বধ্যভূমি ও প্রচারযন্ত্রের মলাট: ভারতে বিজেপির উত্থান ও মিডিয়া ট্রায়াল

নোয়াম চমস্কি এবং এডওয়ার্ড হারম্যান তাঁদের কালজয়ী গ্রন্থ ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’-এ যে প্রোপাগান্ডা মডেলের অবতারণা করেছেন, তার প্রতিটি ফিল্টার বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং বিজেপির ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়!মিডিয়া কীভাবে সম্মতি উৎপাদন করে বিজেপির মতো একটি শক্তিকে ক্ষমতার কেন্দ্রে বসিয়েছে, তার গভীরতা বুঝতে হলে আমাদের ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ‘কাঠামোগত দাসত্ব’ বুঝতে হবে। চমস্কির প্রোপাগান্ডা মডেলের অন্যতম স্তম্ভ হলো ‘সোর্সিং’। অর্থাৎ, সংবাদমাধ্যম তথ্য সংগ্রহ করে সরাসরি সরকারি দপ্তর বা প্রভাবশালী পিআর এজেন্সি থেকে। বিজেপির ক্ষেত্রে এই সোর্সিং বা তথ্যের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের আইটি সেল এবং অনুগত আমলাতন্ত্র। মিডিয়া এখন আর ফিল্ড রিপোর্ট বা ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমে বিশ্বাসী নয়, বরং হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি থেকে আসা বয়ানকে স্টুডিওতে বসে চিৎকার করে বৈধতা দেওয়াতেই তাদের সার্থকতা। এই প্রক্রিয়ায় ভারতের গণতন্ত্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ এখন কার্যত একটি ‘ইকো চেম্বার’!

কনসেন্ট বা সম্মতি উৎপাদন আসলে কোনো স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত কারিগরি যা মিডিয়া হাউজগুলো কর্পোরেট স্বার্থ এবং রাষ্ট্রশক্তির মেলবন্ধনে সম্পন্ন করে। ভারতে বিজেপির উত্থান মূলত কোনো সাধারণ নির্বাচনী জয় নয়, বরং এটি জনমানসে এক বিশেষ ধরণের বাস্তবতা বা ‘পারসেপশন’ নির্মাণের ফসল। এই নির্মাণ প্রক্রিয়ায় প্রধান বাধা হওয়ার কথা ছিল সংবাদমাধ্যমের, কিন্তু ভারতের মূলধারার মিডিয়া নিজেই সেই সম্মতি তৈরির প্রধান কারখানায় পরিণত হয়েছে। চমস্কি যেমন বলেছিলেন, “The mass media serve as a system for communicating messages and symbols to the general populace. It is their function to amuse, entertain, and inform, and to inculcate individuals with the values, beliefs, and codes of behavior that will integrate them into the institutional structures of the larger society.” ভারতে বিজেপি যখন ক্ষমতায় আসে, তখন মিডিয়া ঠিক এই কাজটিই করেছে—সাধারণ মানুষের মনে এমন সব মূল্যবোধ গেঁথে দিয়েছে যা আদতে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের সহায়ক।

২০১৪ সালের আগে থেকেই ভারতের মিডিয়া ল্যান্ডস্কেপে এক বিশাল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়, যেখানে সংবাদমাধ্যমগুলো একটি ‘মেসিয়াহ’ বা ত্রাণকর্তার ইমেজ তৈরির জন্য উন্মুখ ছিল। এই প্রক্রিয়াটি শুরু হয় তথাকথিত নিরপেক্ষতার আবরণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বয়ান তৈরির মাধ্যমে। অথচ মজার বিষয় হলো, মিডিয়া যখন পূর্ববর্তী সরকারের দুর্নীতি নিয়ে সোচ্চার ছিল, তখন তারা সচেতনভাবে বিজেপির কর্পোরেট ফিন্যান্সিং এবং তাদের বিভাজনমূলক রাজনীতিকে আড়ালে রাখতে শুরু করে। ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্টের প্রথম ফিল্টার অর্থাৎ মিডিয়ার মালিকানা এবং মুনাফার আকাঙ্ক্ষা এখানে বিশাল ভূমিকা পালন করে। ভারতের বড় বড় মিডিয়া হাউজগুলোর মালিকানা এখন মুষ্টিমেয় কিছু কর্পোরেট জায়ান্টে‌র হাতে, যাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ সরাসরি সরকারের নীতিমালার ওপর নির্ভরশীল। ফলে মিডিয়া হয়ে উঠেছে একটি কর্পোরেট লাউডস্পিকার।বাস্তবে তারা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে উন্নয়নের নামে নব্য-উদারবাদী সংস্কার এবং উগ্র জাতীয়তাবাদকে একীভূত করে ফেলা হয়। যখন মিডিয়া প্রচার করে যে ‘বিকাশ’ মানেই বৃহৎ পুঁজির অবাধ বিচরণ, তখন সাধারণ মানুষ নিজেদের অজান্তেই সেই ব্যবস্থার পক্ষে সম্মতি দিয়ে দেয় যা শেষ পর্যন্ত তাদেরই অধিকার কেড়ে নেয়।

চমস্কি বর্ণিত ‘ফ্ল্যাক’ বা কঠোর সমালোচনা ও আক্রমণের ফিল্টারটি ভারতে অত্যন্ত কদর্যভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। যদি কোনো সাংবাদিক বা বুদ্ধিজীবী সরকারি ভাষ্যের বাইরে গিয়ে সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করেন, তবে মিডিয়ার মাধ্যমেই তাঁকে ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ তকমা দিয়ে জনসমক্ষে খাটো করা হয়। এই ভীতির সংস্কৃতি অন্য সাংবাদিকদের বাধ্য করে মূল স্রোতের প্রোপাগান্ডায় গা ভাসাতে। এর ফলে মিডিয়া এখন আর সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার কাজ করে না, বরং সরকারের পক্ষ হয়ে জনগণের ওপর নজরদারি চালায়। উগ্র হিন্দুত্ববাদী চেতনার প্রসার ঘটাতে মিডিয়া এমন সব শত্রু বা ‘আদার’ তৈরি করেছে,তা সে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হোক বা ভিন্নমতাবলম্বী ছাত্র-যাদেরকে জনশত্রু হিসেবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠের মনে এক ধরণের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করা হয়। এই নিরাপত্তাহীনতাই মানুষের মধ্যে একজন ‘স্ট্রংম্যান’ বা লৌহমানবের প্রয়োজনীয়তা বোধ তৈরি করে, যা সরাসরি বিজেপির রাজনৈতিক কৌশলের অনুকূলে যায়।

অরুন্ধতী রায় তাঁর ‘দ্য এন্ড অফ ইম্যাজিনেশন’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, “To love. To be loved. To never forget your own insignificance. To never get used to the unspeakable violence and the vulgar disparity of life around you. To seek joy in the saddest places. To pursue beauty to its lair. To never simplify what is complicated or complicate what is simple.” কিন্তু ভারতের মিডিয়া ঠিক এর উল্টোটা করেছে। তারা জটিল অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোকে অত্যন্ত সরলীকরণ করে ধর্মীয় বা আবেগের রঙে রাঙিয়েছে, আবার সহজ মানবিক অধিকারের প্রশ্নগুলোকে রাষ্ট্রদ্রোহের জটিল জালে জড়িয়ে দিয়েছে। সংবাদমাধ্যমগুলো প্রাইম টাইম ডিবেটের নামে এমন এক রণক্ষেত্র তৈরি করে যেখানে যুক্তি নয়, বরং উচ্চকণ্ঠ এবং ঘৃণা জয়ী হয়। তারা কাশ্মীর থেকে শুরু করে কৃষি আইন—প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকারের ন্যারেটিভকে ধ্রুব সত্য হিসেবে প্রচার করেছে। যখন মিডিয়া সারাদিন ধরে মন্দিরের রাজনীতি কিংবা কাল্পনিক কোনো শত্রুর ভয় দেখায়, তখন বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি বা স্বাস্থ্যের মতো প্রকৃত সমস্যাগুলো জনচেতনা থেকে মুছে যায়। এভাবেই সম্মতি উৎপাদিত হয়,মানুষকে এটা বিশ্বাস করিয়ে যে তাদের বর্তমান দুর্দশার চেয়েও বড় কোনো ‘জাতীয় গৌরব’ অর্জনের পথ বিজেপিই একমাত্র দেখাতে পারে। শেষ পর্যন্ত মিডিয়া আর আয়না থাকে না, তা হয়ে ওঠে একটি সুনিপুণ প্রজেক্টর, যা বাস্তবের ওপর এক বিশেষ রঙের মলাট চড়িয়ে দেয়, আর জনগণ সেই রঙিন মলাটকেই মুক্তির সনদ বলে ভুল করতে শুরু করে। এইভাবেই মিডিয়া ফ্যাসিবাদের সেবক হয়ে গণতন্ত্রের কফিন তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে বিজেপির এই উত্থান এবং মিডিয়ার ভূমিকা আরও বেশি কৌতূহলোদ্দীপক এবং ভয়াবহ। দীর্ঘকাল বামপন্থী এবং পরে তৃণমূলীয় রাজনীতির বলয়ে থাকা এই রাজ্যে বিজেপির কোনো শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি ছিল না। কিন্তু সম্মতি উৎপাদনের যন্ত্রটি এখানে অত্যন্ত নিপুণভাবে কাজ করেছে। প্রথমেই বাংলার দীর্ঘদিনের ‘সেক্যুলার’ বা ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে মিডিয়ার মাধ্যমে ‘তোষণ রাজনীতি’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা শুরু হয়। চমস্কি যেমন বলেছিলেন যে মিডিয়ার কাজ হলো মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া, ঠিক তেমনই পশ্চিমবঙ্গের মানুষের অবচেতনে এক ধরণের অস্তিত্ব রক্ষার ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। মিডিয়ার প্রতিটি টক-শো এবং নিউজ রিপোর্টে এমনভাবে মেরুকরণ করা হয়েছে যাতে মানুষের মনে হয় যে তাদের সংস্কৃতি এবং ধর্ম বিপন্ন। যখন একটি সমস্যাকে বারবার বড় করে দেখানো হয় এবং তার একমাত্র সমাধান হিসেবে একটি নির্দিষ্ট দলকে প্রজেক্ট করা হয়, তখন ভোটারদের কাছে সেই দলটিকে বেছে নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প অবশিষ্ট থাকে না।

চমস্কি তাঁর বইতে ‘কম্যুনিজম’কে একটি বড় ফিল্টার হিসেবে দেখিয়েছিলেন যা মানুষের মনে ভীতি তৈরি করে। ভারতে এবং বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে সেই জায়গাটি নিয়েছে ‘সাংস্কৃতিক শত্রু’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’র ভয়। পশ্চিমবঙ্গের ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং কিছু প্রভাবশালী সংবাদপত্র উন্নয়ন বা কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে সরিয়ে রেখে মন্দির-মসজিদ কিংবা ধর্মীয় মিছিলের উন্মাদনাকে সংবাদের শিরোনামে নিয়ে এসেছে। এই ‘স্পেক্ট্যাকল’ বা প্রদর্শনীর রাজনীতি মানুষের বিচারবুদ্ধিকে অবশ করে দেয়। নোয়াম চমস্কি সতর্ক করেছিলেন এই বলে, “The general population doesn’t know what’s happening, and it doesn’t even know that it doesn’t know.” বাংলার সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। মিডিয়া তাদের সামনে এমন এক ‘বিকল্প বাস্তবতা’ তুলে ধরেছে যেখানে রাজ্যের প্রতিটি সমস্যার মূলে কোনো না কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের ভূমিকা রয়েছে বলে সূক্ষ্মভাবে ইঙ্গিত দেওয়া হয়। এর ফলে বিজেপির সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ আর কেবল একটি রাজনৈতিক কৌশল থাকে না, তা মিডিয়ার সৌজন্যে একটি ‘সামাজিক সত্য’ হিসেবে জনমানসে প্রতিষ্ঠা পায়।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানে মিডিয়া আরেকটি বড় অস্ত্র ব্যবহার করেছে—তা হলো ‘বাইনারি ন্যারেটিভ’। তারা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে রাজনীতি মানেই হলো হয় ‘এ’ নয়তো ‘বি’। এর ফলে ছোট দল বা অন্য কোনো আদর্শগত বিকল্পের জায়গা পুরোপুরি সংকুচিত হয়ে যায়। মিডিয়া যখন দিনরাত বিজেপি বনাম শাসকদলের লড়াইকে একমাত্র সংবাদের বিষয় করে তোলে, তখন মানুষ অবচেতনেই ধরে নেয় যে পরিবর্তনের চাবিকাঠি কেবল বিজেপির হাতেই আছে। এখানে এডওয়ার্ড সাইদ-এর ‘কভারিং ইসলাম’ বইটির কথা মনে পড়ে, যেখানে তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে পশ্চিমী মিডিয়া ইসলামকে একটি অখণ্ড ‘মনোলিথিক’ ভিলেন হিসেবে খাড়া করেছিল। ঠিক একইভাবে, বাংলার মিডিয়া প্রগতিশীল চিন্তাধারাকে ‘আরবান নকশাল’ বা ‘দেশদ্রোহী’ তকমা দিয়ে বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছে, যা প্রকারান্তরে বিজেপির দক্ষিণপন্থী বয়ানকেই শক্তিশালী করেছে।

সর্বোপরি, এই ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট বা সম্মতি উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় পুঁজির ভূমিকা অনস্বীকার্য। দিল্লির বড় বড় সংবাদমাধ্যমগুলোর কর্পোরেট মালিকরাই পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যমগুলোর বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে জাতীয় স্তরে যে মোদী-বন্দনা বা হিন্দুত্ববাদী জোয়ার তৈরি করা হয়েছিল, তার ঢেউ সুপরিকল্পিতভাবে বাংলায় আছড়ে ফেলা হয়েছে। মিডিয়া এখানে কেবল সংবাদ পরিবেশক নয়, তারা ছিল বিজেপির অঘোষিত প্রচারক। তারা এমনভাবে জনমতকে প্রভাবিত করেছে যাতে সাধারণ মানুষ নিজেদের শ্রেণীস্বার্থ ভুলে গিয়ে পরিচিতি সত্তার রাজনীতিতে লিপ্ত হয়। অর্থাৎ, কৃষক বা শ্রমিক তার অর্থনৈতিক অধিকারের কথা ভুলে নিজেকে একজন ‘হিন্দু’ হিসেবে আগে দেখতে শেখে। এই মানসিক রূপান্তরই হলো বিজেপির আসল সাফল্য, যা মিডিয়ার নিরবচ্ছিন্ন প্রোপাগান্ডা ছাড়া অসম্ভব ছিল। মিডিয়া এভাবেই গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী হওয়ার বদলে ফ্যাসিবাদের এক শক্তিশালী সেবকে রূপান্তরিত হয়েছে, যারা সত্যকে হত্যা করে সম্মতির এক বিশাল প্রাসাদ নির্মাণ করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *