উন্নয়নের নামে প্রকৃতির লুঠ: গ্রেট নিকোবরের আর্তনাদ

ভারতের মানচিত্রের একদম শেষ প্রান্তে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশির মাঝে লুকিয়ে আছে এক অমূল্য রত্ন — নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। যেখানে লক্ষ বছর পুরোনো রেন ফরেস্ট আছে, আছে বিরল সব প্রাণী, বিরল ফুল ও উদ্ভিদ। কিন্তু এই শান্ত দ্বীপে এখন বাজছে ধ্বংসের দামামা। বাহাত্তর হাজার কোটি টাকার এক বিশাল প্রকল্পকে সরকার বলছে “উন্নয়ন”। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বাজাচ্ছেন মৃত্যু ঘণ্টা।


আজ আমরা জানব কীভাবে একটি শান্ত দ্বীপকে কর্পোরেট স্বার্থের হাতে সঁপে দেওয়া হচ্ছে আমাদের অজান্তে। আসুন দেখি, গ্রেট নিকোবর মেগা প্রজেক্ট সত্যিই উন্নয়ন, নাকি এক সাজানো লোকঠকানো পরিকল্পনা।


এই প্রকল্পের নাম “গ্রেট নিকোবর হোলিস্টিক ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট”। এখানে তৈরি হবে বিশাল এক কন্টেইনার বন্দর, গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দর এবং আধুনিক স্মার্ট সিটি। লক্ষ্য — ভারতের অর্থনীতিকে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে দেওয়া। শুনতে খুব ভালো লাগে। কিন্তু মুদ্রার উল্টোপিঠ কি আমরা দেখছি?


এই কংক্রিটের শহর গড়তে কাটা পড়বে প্রায় দশ লক্ষ গাছ। ধ্বংস হবে প্রায় ১৩০ বর্গকিলোমিটার চিরহরিৎ অরণ্য। সরকার বলছে, এর বদলে হরিয়ানায় গাছ লাগানো হবে। কিন্তু গ্রেট নিকোবরের হাজার বছরের প্রাচীন রেন ফরেস্টের অভাব কি হরিয়ানার চারা গাছ পূরণ করতে পারে? পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন — কখনোই নয়।


এই অরণ্য শুধু গাছের সমষ্টি নয়; এটি পৃথিবীর জলবায়ুর ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কয়েক হাজার বছর ধরে এই বন বিপুল পরিমাণ কার্বন শোষণ করে এসেছে। গাছ কাটা হলে সেই কার্বন আবার বায়ুমণ্ডলে ফিরে যাবে, যা বিশ্ব উষ্ণায়নকে আরও ত্বরান্বিত করবে। অরণ্য ধ্বংসের ফলে স্থানীয় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে, বদলে যেতে পারে বৃষ্টিপাতের ধরণ ও দ্বীপের আর্দ্রতা।


নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কাছে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ ও সমুদ্রের তলদেশ খননের ফলে বঙ্গোপসাগরের প্রাকৃতিক স্রোতের গতিপথ বদলে যেতে পারে। সমুদ্রের বাস্তুসংস্থান ও তাপমাত্রার ভারসাম্য নষ্ট হলে নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের আচরণ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে সুন্দরবন ও পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় অঞ্চলে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে থাকা সুন্দরবনের দ্বীপগুলো আরও বিপদের মুখে পড়বে।


এই দ্বীপ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লেদারব্যাক সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রজনন ক্ষেত্র। সমুদ্র খনন ও বন্দর নির্মাণের ফলে এই কচ্ছপগুলোর অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে। গ্রেট নিকোবরের মেগাপোড পাখি — যে মাটিতে ঢিবি বানিয়ে ডিম পাড়ে — বন ধ্বংস হলে পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।


নিকোবর ম্যাকাক নামের এক বিশেষ প্রজাতির বানর, যাদের বিচরণক্ষেত্র এই গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের বনাঞ্চল, তারাও এই প্রকল্পের ফলে ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়বে। বনভূমি ধ্বংস হলে এই বিরল প্রজাতির বাসস্থান সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে এবং ভবিষ্যতে নিকোবর ম্যাকাক পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।


প্রবাল প্রাচীরকে বলা হয় “সমুদ্রের রেন ফরেস্ট”। কারণ এগুলো অসংখ্য মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর প্রজনন ক্ষেত্র। সমুদ্র খননের ফলে জল ঘোলা হয়ে পলি জমবে, আর ধীরে ধীরে মারা যাবে এই প্রবাল প্রাচীরগুলো। কোটি কোটি বছর ধরে গড়ে ওঠা একটি প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র কি কয়েকজন ব্যবসায়ীর মুনাফার জন্য ধ্বংস করে দেওয়া যায়?


এবার আসা যাক সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়ে। এই প্রকল্পের গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরির দায়িত্ব পেয়েছে আদানি গোষ্ঠী। সমালোচকদের একাংশ বলছেন, এটি উন্নয়নের আড়ালে কর্পোরেট লুঠের এক নগ্ন উদাহরণ। দেশের সম্পদ, জমি ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সাধারণ মানুষের সম্পদ। অথচ সেগুলো তুলে দেওয়া হচ্ছে মুষ্টিমেয় কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতে। প্রশ্ন উঠছে — এই বন্দর কি সত্যিই দেশের জন্য, নাকি বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর মুনাফার জন্য?


তড়িঘড়ি করে পরিবেশ ছাড়পত্র দেওয়া, আদিবাসীদের আপত্তিকে উপেক্ষা করা এবং গণশুনানির প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এটি কি গণতন্ত্রের পথ, নাকি লুঠতন্ত্রের আরেক রূপ?


গ্রেট নিকোবরের গভীর অরণ্যে বাস করেন শম্পেন জনজাতি — বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও বিচ্ছিন্ন আদিম জনগোষ্ঠী। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের প্রায় কোনো সম্পর্ক নেই। এই অরণ্যই তাদের খাদ্যের উৎস, সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা এবং আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের কেন্দ্র। অরণ্যই তাদের কাছে ঈশ্বর।


কিন্তু শুধু শম্পেনরাই নন, এই প্রকল্পের কারণে বিপদের মুখে পড়বেন নিকোবরি জনগোষ্ঠীর মানুষও। নিকোবরিরা এই দ্বীপের অন্যতম প্রধান জনবসতি এবং বৃহৎ বসতি স্থাপনকারী জনগোষ্ঠী। তাদের বর্তমান গ্রাম, নারকেল বাগান এবং সমুদ্রনির্ভর জীবনযাত্রা এই প্রকল্পের ফলে গভীর সংকটের মুখে পড়বে। নারকেল বাগান তাদের জীবিকার প্রধান উৎস। অথচ প্রস্তাবিত মেগা প্রজেক্টের কারণে তাদের সেই ভূমি ও বাসস্থান ছেড়ে সরে যেতে বাধ্য করা হতে পারে।


নৃতত্ত্ববিদদের মতে, নিকোবরিদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সমুদ্রনির্ভর জীবনযাত্রা এই বিশাল আধুনিকীকরণের চাপে ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। ১৯৭০-এর দশকে ভারত সরকার দেশের বিভিন্ন অংশ থেকে প্রাক্তন সেনাকর্মী ও তাদের পরিবারকে এই দ্বীপে বসতি স্থাপনের জন্য পাঠিয়েছিল। বর্তমানে এখানে সাতটি প্রধান গ্রাম রয়েছে, যেখানে কয়েক প্রজন্ম ধরে এই পরিবারগুলো বসবাস করছে। কিন্তু প্রস্তাবিত মেগা প্রজেক্টের জন্য সাধারণ মানুষের কৃষিজমি ও ঘরবাড়ি অধিগ্রহণ করার পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে। অর্থাৎ উন্নয়নের নামে আবারও সাধারণ মানুষকেই উচ্ছেদের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।


উন্নয়নের নামে বাইরে থেকে বিপুল জনসংখ্যা আনা হলে দ্বীপের সামাজিক ভারসাম্যও বদলে যাবে। স্থানীয় সংস্কৃতি ও জনজীবনের ওপর তার গভীর প্রভাব পড়বে। যে দ্বীপ ২০০৪ সালের সুনামির ক্ষত আজও বহন করে চলেছে, সেখানে আবার প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাতের এক নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে।


এই দ্বীপের ম্যানগ্রোভ অরণ্য শুধু নিকোবরকেই রক্ষা করে না; এটি ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ এবং অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোকেও ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা থেকে আংশিক সুরক্ষা দেয়। নিকোবরের পরিবেশ ধ্বংস হলে বঙ্গোপসাগরের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়বে। আর তার ফল ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব হয়ে একদিন পৌঁছে যাবে আপনার-আমার ঘরেও।


আজ রাষ্ট্রসংঘ থেকে শুরু করে বিশ্বের একাত্তর জন বিজ্ঞানী পর্যন্ত এই প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের বক্তব্য একটাই — প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে যে উন্নয়ন, তা শেষ পর্যন্ত উন্নয়ন নয়; তা ধ্বংস ও বিনাশ ডেকে আনে।


সবশেষে প্রশ্ন একটাই — উন্নয়ন কি শুধুই কংক্রিট, বন্দর আর কর্পোরেট মুনাফার নাম? উন্নয়ন কি মানুষের পাশাপাশি প্রকৃতি, পরিবেশ ও আদিবাসী সমাজকে রক্ষা করে এগোনোর নাম নয়?


একটি সমাজ তখনই সত্যিকারের উন্নত হয়, যখন সেখানে মানুষ ও প্রকৃতি একসঙ্গে বাঁচতে পারে। বন ধ্বংস করে, জীববৈচিত্র্য হত্যা করে, আদিবাসীদের অস্তিত্ব সংকটে ঠেলে দিয়ে যে উন্নয়ন গড়ে ওঠে, তা আসলে উন্নয়ন নয় — তা ধ্বংসের অন্য নাম।


আজ গ্রেট নিকোবর শুধু একটি দ্বীপ নয়; এটি এক প্রতীক। একদিকে কর্পোরেট মুনাফাকেন্দ্রিক উন্নয়নের মডেল, অন্যদিকে প্রকৃতি, মানুষ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার সংগ্রাম। একজন প্রগতিশীল ও বামপন্থী চিন্তাধারার ছাত্র হিসেবে এই প্রশ্ন তোলা জরুরি — উন্নয়ন কার জন্য? মানুষের জন্য, নাকি মুনাফার জন্য?


প্রকৃত উন্নয়ন সেই, যা প্রকৃতি ও মানুষ — উভয়ের মর্যাদা রক্ষা করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *