চির বিদ্রোহী বীর, চির উন্নত যার শির
“যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস, যেনো লেখা হয় আমার রক্ত লেখায় তাদের সর্বনাশ”
স্বাগতিকা সেন
‘সপ্তাহান্তে বিকেলবেলা আরও অনেকের সঙ্গে জগুবাবুর বাজারের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকি। হকার কতক্ষণে ধূমকেতুর বাণ্ডিল নিয়ে আসে। হুড়োহুড়ি কাড়াকাড়ি পড়ে যায় কাগজের জন্য। কালির বদলে রক্তে ডুবিয়ে লেখা এই সব সম্পাদকীয়।”
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তাঁর ‘কল্লোল যুগ’ এ যাঁর এবং যাঁর পত্রিকা সম্পর্কে এ কথা লিখেছেন, ততদিনে ব্রিটিশ শাসক তাঁর নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। তিনি ‘ধূমকেতু’র সম্পাদকীয়তে অগ্ন্যুৎপাত ঘটাচ্ছেন, ‘পূর্ণ স্বরাজ’ এর দাবী জানাচ্ছেন। বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে উৎসর্গ করা তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’ এবং রাজনৈতিক প্রবন্ধের সংকলন ‘যুগবাণী’ বাজেয়াপ্ত হয়েছে। বিহারের সমস্তিপুরে প্রেয়সী (পরবর্তীতে স্ত্রী প্রমীলা) আশালতার কাছে প্রথমে আত্মগোপন এবং পরবর্তীতে কুমিল্লায় পৌঁছলে রাজদ্রোহের মামলায় প্রেসিডেন্সী ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহোর এজলাসে, ১৯২৩ সালে এক বছরের জন্য সশ্রম কারাদণ্ডে তাঁকে দণ্ডিত করা হয়েছে। আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে দেখা করতে যাওয়া অভিন্ন হৃদয় বন্ধু পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় ‘বসন্ত’ এনে দিয়েছেন তাঁর হাতে। প্রতিক্রিয়ায় উত্তেজিত, অভিভূত, আপ্লুত হয়ে যাওয়ার মিশ্র অনুভূতি দেখে ইউরোপীয় ওয়ার্ডার পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলে জানা গেলো- “পোয়েট টেগোর ডেডিকেটেড আ বুক টু হিম”…
আলিপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে হুগলি জেলে তাঁকে বদলি করা হলে সহবন্দী মৌলবী সিরাজউদ্দিন, গোপালচন্দ্র সেনের সাথে রাজনৈতিক বন্দীদের প্রতি অব্যবস্থা, প্রতিশোধমূলক দুর্বিচারের প্রতিবাদে অনশনে বসলেন তিনি। অনশন থামিয়ে দেওয়ার অনুরোধ বহু মানুষের। কথাশিল্পী তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলেন, দেশবন্ধুর গোলদীঘির বাড়ির সভার সিদ্ধান্তে সুরাবর্দি সাহেব সহ তাঁর মাতা জাহেদা খাতুনের আকুতিও টলাতে পারলোনা তাঁকে। “আদর্শবাদীকে আদর্শ ত্যাগ করতে বলা হত্যার সামিল” বিশ্বাস করা রবীন্দ্রনাথও তাঁর পুত্রসম স্নেহের পাত্রকে টেলিগ্রাম করেন-“গিভ আপ হাঙ্গার স্ট্রাইক, আওয়ার লিটারেচার ক্লেইমস ইউ”। এহেন স্নেহ শ্রদ্ধার সম্পর্কে, সৃষ্টির মাহাত্ম্যের তুলনা আনা মুর্খামির পরিচয় বটেই। তবুও সে সময়ে ‘শনিবারের চিঠি’ সহ বেশ কিছু পত্র পত্রিকায় রবীন্দ্র পরিমন্ডলের বহু বিদ্বজ্জন তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা মোহিতলাল মজুমদারের ‘আমি’র ভাব নিয়ে সৃষ্টি বলে কলমের খোঁচা দিয়েছেন। এর প্রত্যুত্তরে ‘ফণীমনসা’ গ্রন্থের তাঁর ‘সাবধানী ঘন্টা’ কবিতাটি রবীন্দ্রনাথকে বিদ্ধ করে লেখার মতো গুজবও ছড়িয়েছেন। আসলে নজরুলের ‘রবীন্দ্রনাথ’-কে কিম্বা রবীন্দ্রনাথের ‘নজরুল’কে সংকীর্ণতার গন্ডিতে বাঁধা যায়, এমন সাহস দেখানোও দায়। রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রে বাঁধতে চাইলে তো রবীন্দ্র-নজরুলের এই সহাবস্থান আরো দৃঢ়। “মাথার উপর জ্বলিছেন রবি”বলে ‘আমার কৈফিয়ত’ দিলেন যিনি, যাঁর সুহৃদ, অভিন্ন হৃদয় বন্ধু মুজফ্ফর আহমেদ যাঁকে ‘রবীন্দ্র হাফিজ’ আখ্যা দিয়ে অত্যুক্তি করেননি, সেই কবি কাজী নজরুলের বহুমুখী, বহুমাত্রিক জীবন। শব্দের সীমাবদ্ধতায় আলোচনার দিকগুলির দরজা বন্ধ হয়ে যেতে চায়। তবুও নজরুল বিশেষজ্ঞ, সাহিত্যিক, সমালোচকদের আলোচনা, বক্তব্য ধার করে যেটুকু তুলে, গুছিয়ে রাখা যায় তার অপটু চেষ্টা বই এই প্রবন্ধ বেশী কিছু নয়।
সাল ১৯২০। ৮৯ নম্বর বেঙ্গলী রেজিমেন্ট ভেঙে যাওয়ার পরে করাচি থেকে নজরুল চলে এলেন কলকাতায়, তাঁর বাল্যবন্ধু শৈলজানন্দের বোর্ডিং হাউসে। সাহিত্যপ্রেমী মুজফ্ফর আহমেদের সাথে যোগাযোগের ভিত্তিতে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র অফিস লাগোয়া একটি ঘরে মুজফ্ফর আহমেদের সাথেই তাঁর বাসস্থান নির্ধারিত হলো। সাহিত্য থেকে ধীরে ধীরে সরে আসা মুজফ্ফর আহমেদ তখন শ্রমিকের নেতা, তবুও দশ বছরের ব্যবধানের অসম বয়সী এই দুই বন্ধুর যুগল সম্পাদনায় ‘নবযুগ’ সান্ধ্য দৈনিক প্রকাশিত হতে থাকলো এবং সেইসময়কার তাঁর সেই জ্বালাময়ী প্রবন্ধগুলি পরে তাঁর রাজনৈতিক প্রবন্ধ সংকলন ‘যুগবাণী’ নামে প্রকাশিত হলো। পরবর্তীতে ৮/এ’র টার্নার স্ট্রিটের বাড়িতে ‘নবযুগ’ অফিসের পাশে দুই বন্ধুর একত্রিত আস্তানায় মানুষের সংগ্রাম, দারিদ্র্য, রুটি রুজির লড়াইয়ের কথা উঠে আসে নজরুলের লেখায়, যার প্রথম পাঠক হন অবশ্যই তাঁর তখনকার সবসময়ের সাথী মুজফ্ফর আহমেদ। ব্রিটিশ সরকার ‘নবযুগ’ বন্ধ করে দিলে সাহিত্যের অঙ্গনের বেশ কিছু বন্ধুর প্ররোচনায় নজরুল দেওঘর যান ক্লাসিক সাহিত্যচর্চায় মন দিতে। ফিরে এসে ৩/৪ সি তালতলা লেনের বাড়িতে আবার বেশ কিছু দিন মুজফ্ফরের সাথে একত্রে থেকে পত্রিকা প্রকাশ, তার সাথে আপোষহীন দ্বন্দ্বের লড়াইয়ে পা মেলানো। বন্ধুত্বে ঘাটতি হয়েছে বেশ কিছু সময়ে, নদীর স্রোতে চড়া পরেছে, তাতেও উভয়েই উভয়ের হাত ছাড়েননি কভু। পরবর্তীতে ব্যক্তি নজরুলের জীবনধারণ , জীবন পরিচর্যায় বহু সিদ্ধান্তের, যা তাঁর জন্য মঙ্গলজনক নয়, তার বিরোধিতা করেছেন মুজফ্ফর আহমেদ। বন্ধুত্বের প্রগাঢ়তায় এই জিনিস স্বাভাবিক । ১৯২১ এর নভেম্বরে দুজনের একত্রিত সিদ্ধান্ত হলো, কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার কাজে তাঁরা মনোনিবেশ করবেন। ফৌজ নজরুল রুশ বিপ্লবে প্রভাবিত হলেও ‘ধূমকেতু’ সম্পাদনা করতে গিয়ে সর্বহারা রাজনীতির সংঘটিত জীবনের বিপরীতে গিয়ে খানিকটা রোমান্টিক বিপ্লবী জাতীয়তাবাদের স্রোতে ভাসলেন। ১৯২৩ এ কারামুক্তির পর ততদিনে কানপুর ষড়যন্ত্র মামলায় বন্দী হলেন তাঁর প্রিয়, অভিন্ন হৃদয় বন্ধু মুজফ্ফর। তাঁর প্রেরণায়, আব্দুল হালিম, কুতুবুদ্দিন আহমেদ, শামসুদ্দিন হোসেন, হেমন্তকুমার সরকারের প্রত্যক্ষ উদ্যোগে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের প্রাগভূমিকা হিসেবে গড়ে উঠলো- ‘লেবার স্বরাজ পার্টি’, নজরুল তার মুখপত্র ‘লাঙল’ সম্পাদনা করতে গিয়ে শ্লোগান তুললেন-“লাঙল যার, জমি তার”। দারুণ অর্থাভাবের মধ্য দিয়েও নির্বাচন লড়লেন।নজরুলের কালজয়ী কবিতা ‘সাম্যবাদী’, ‘কৃষকের গান’ এবং ‘সব্যসাচী’ প্রকাশিত হলো ‘লাঙল’ থেকে। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ‘অনুশীলন’, ‘যুগান্তর’এর মতো দলে শরীরচর্চার পাশে বৈপ্লবিক চিন্তাধারা অনুশীলনের প্রভাব, ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গ, ১৯১১ এ বঙ্গভঙ্গ রদ, ১৯১২ সালে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তর, ১৯১৪র প্রথম বিশ্বযুদ্ধ- দারুন প্রভাব ফেলেছিল তরুণ নজরুলের ওপর। বহুজনের মতে ‘অনিকেত’ নজরুলের ‘হাবিলদার’ নজরুল হয়ে ওঠার পিছনে শুধুই অর্থ উপার্জন; একথা যে অনর্থক- তা নজরুলের- পরিচয়, বন্ধুত্বর ঊর্ধ্বে গিয়ে রাজনৈতিক সচেতনতার ফলাফল। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়া কামাল আতাতুর্ক’কে আদর্শ করে তিনি সৃষ্টি করেছেন ‘কামাল পাশা’। ১৯২৬ সালে কৃষ্ণনগরে ‘বঙ্গীয় কৃষক শ্রমিক দল’ এর সম্মেলনে উদ্বোধনী সঙ্গীত গেয়েছিলেন স্বরচিত শ্রমিকের গান, তখন তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সদস্য, সর্বশক্তি দিয়ে লড়ে যাচ্ছেন। প্রিয় বন্ধু মুজফফর আহমেদের অনুরোধে ফরাসী কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ইউগেন পট্টিয়েরের লেখা এবং পিয়েরে ডি গেটারের সুরে রচিত ‘ইন্টারন্যাশনল’ এর বাংলা অনুবাদ করলেন ‘অন্তরন্যাশনাল’, তাঁর ‘গণবাণী’ পত্রিকায় লিখলেন ‘কান্ডারী হুঁশিয়ার’,’ছাত্রদলের গান’, ‘চল চল চল’, শ্রমিকদের নিয়ে শেলীর লেখা কবিতার ভাবানুবাদ করলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে চীন দেশের নেতা জিয়াং জিয়েসি ভারত সফরে আসলে গ্রামোফোন কোম্পানির অনুরোধে তাঁকে নিয়ে গানও রচনা করেছিলেন নজরুল, যদিও কান পেতে, মন দিয়ে শুনলে বোঝা যায়, গানটির অভ্যন্তরে লুকিয়ে ছিলো চীন ও ভারতের নিপীড়িত মানুষের কান্না।
লেটোদল থেকে নজরুলের জীবনে গানের সূত্রপাত। সৈনিক জীবনে পাশ্চাত্য ফরাসী সঙ্গীতের সাথে পরিচয় ঘটে সামরিক ব্যান্ডের হাত ধরে। ১৯২৪ থেকে ১৯২৬ নাগাদ যে গানগুলিতে নজরুলের উদ্দীপনার স্ফুরণ ঘটে, সেগুলির বেশীরভাগই স্বদেশী সুরের। প্রেম, প্রকৃতি, তাল, ছন্দের মাধুরীতে ১৯৩০ সাল অবধি বহু গজল বেরিয়েছে তাঁর কলম থেকে। এছাড়াও ঠুমরী, টপ্পা, কীর্তন, ভাটিয়ালি সঙ্গীতেও তাঁর ছিলো অবাধ বিচরণ। ভীমপলশ্রী, ভৈরবী, বৃহন্নট কেদারা, খাম্বাজ, মালকোষ, বেহাগ, বাগেশ্রী সহ বিভিন্ন রাগকে নির্ভর করে গান তৈরি করেছেন অজস্র। আবদুল আজিজ আল আমান সম্পাদিত ‘অপ্রকাশিত নজরুল’ উল্টোলে জানা যায় মার্গ সঙ্গীত বিষয়ে গভীর পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং অধ্যয়ন করেছিলেন তিনি। তাঁর ছ’টি গীতিসংকলন- ‘সুরসাকী’,’জুলফিকার’,’বনগীতি’,’গুলবাগিচা’,’গীতিশতদল’,’গানের মালা’। ‘বেণুকা’,’দোলনচাঁপা’ নামের দুটি রাগিণীরও উদ্ভাবক তিনি। ‘জনসাহিত্য সংসদ’ এর অনুষ্ঠানে সভাপতিত্বে নজরুল বলেছেন- “কাব্য ও সাহিত্যে আমি কী দিয়েছি, জানি না। আমার আবেগে যা এসেছিল তাই আমি সহজভাবে বলেছি। আমি যা অনুভব করেছি তাই আমি বলেছি। ওতে আমার কৃত্রিমতা ছিল না। কিন্তু সংগীতে যা দিয়েছি, সে-সম্বন্ধে আজ কোন আলোচনা না হলেও ভবিষ্যতে যখন আলোচনা হবে, ইতিহাস লেখা হবে তখন আমার কথা সবাই স্মরণ করবেন, এ-বিশ্বাস আমার আছে। সাহিত্যে দান আমার কতটুকু তা আমার জানা নেই। তবে এইটুকু মনে আছে, সংগীতে আমি কিছু দিতে পেরেছি।” একাধারে কবি, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, নাট্যকার, অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক, রাগ সঙ্গীতের স্রষ্টা নজরুল ছিলেন শতাব্দীর বাংলা গানের উৎকর্ষের বিচারের পাঁচ সঙ্গীতজ্ঞের সর্বকনিষ্ঠ। বাকিরা সর্বাগ্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং অন্যরা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন এবং অতুলপ্রসাদ সেন। সাহিত্য এবং সঙ্গীত সাধনায় নজরুলের প্রেমচেতনায় মানুষের হৃদয় তাঁর কাবাঘর, চেতনা তাঁর মন্দির। নজরুলের অদ্বৈতবাদী চেতনা সার্বজনীন প্রেম চেতনায় উত্তীর্ণ হয়েছে। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে স্রষ্টা অর্থাৎ ‘আল্লা’ তাঁর কাছে প্রভু এবং নিজেকে তিনি প্রেমিকের আসনে বসিয়েছেন। বর্ধমানের চুরুলিয়া গ্রামের বালক নজরুল, হাজি পালোয়ান নামক সুফি সাধকের খাদেম ছিলেন। সৈনিক জীবন থেকেই ইরানী কবি হাফিজকে পড়েছেন, দারুনভাবে পড়েছেন মির্জা গালিবকে, মোহিত হয়ে গেছেন মীরের কবিতা পড়ে।
” তব প্রেমে উন্মাদ ভুলিল সেলিম, সে যে রাজাধিরাজ… চন্দনসম মাখিল অঙ্গে কলঙ্ক লোকলাজ।” মস্ত বড়ো প্রেমিক না হলে এই লাইন লেখা যায় না।এঙ্গেলস লিখেছিলেন, “বিশাল রক্তক্ষয়ের পরও অনেক কাল ধরে থেকে যায় পুরনো অভ্যাস, রীতিনীতি ও সংস্কারের অবশেষ ভাবনা। সেই অভ্যাস ভাঙা খুব সহজ ব্যাপার নয়। তাঁর জন্য নিজের সঙ্গে নিজের নড়াই চালিয়ে যেতে হয়।” ১৭৮৯ এর ফরাসী বিপ্লব থেকে কিছু শিক্ষা গ্রহণ করে, ১৯১৭র রুশ বিপ্লব থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে নারীর স্বাধীন স্বত্বার স্বীকৃতি দিতে পেরেছিলেন নজরুল। কলকাতার বেনিয়াপুকুরের ৬ নম্বর হাজি লেনে ‘আহলে হাদিস’ মতে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তাঁর প্রেয়সী আশালতা সেনগুপ্তের সাথে। এবং এখানেই এঙ্গেলসের কথাগুলোর যথার্থতা। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র বিশ্বাস করতেন – “দুটি প্রস্ফুটিত হৃদয়ের পবিত্র ও সুগভীর মিলনই বিবাহ। দেশের বেশিরভাগ নারীও জানে না তাঁর স্বামী তারে সত্যি ভালবাসে কি না। পুরুষেরও অজানা থেকে যায় তাঁর স্ত্রী প্রকৃত অর্থে তাঁকে কতটা ভালবাসে। কিন্তু বছরের পর বছর তারা একসঙ্গে ঘরকন্না করে।” কথাশিল্পীর সাথে গভীর আলাপ থাকার সুবাদে নজরুলও বোধহয় বিশ্বাস করতেন, হৃদয়ানুভুতির প্রশ্নটাই মুখ্য। বাইরের মন্ত্র তন্ত্র আচার বিচার সংস্কারের গোঁড়ামি নিরর্থক। ছোটোবেলার দুলি, স্কুল বেলার আশালতার সাথে নজরুলের বিয়ের পর নজরুল তাঁর নাম দেন প্রমীলা। মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধকাব্য’এ প্রমীলা যেখানে অনার্য নারীর মুক্তির চেতনা। অন্য ধর্মের বাউন্ডুলে, চাকরীহীন, বাসস্থান হীন, ব্রিটিশ সরকারের রোষানলে পড়া, জেলখাটা কবি ছেলের সাথে বিয়ের কথায় সংস্কারে বাঁধেনি আশালতার মা গিরিবালা দেবীর। নজরুলের মতো বেহিসাবি, অস্বচ্ছল মানুষের হাত ধরতে দুবার ভাবেননি প্রমীলা। ১৯২৪ এ হুগলীর চকবাজারে প্রথম সংসার পাতা, ১৯২৬ নাগাদ কৃষ্ণনগরে স্থানান্তর হয়ে পুনরায় কলকাতায় এসে বহুবার বহু বাড়ি বদল। আবার হুগলীতে গেলে প্রথম পুত্রের মৃত্যু, দ্বিতীয় পুত্র অরিন্দমের বসন্ত রোগে মৃত্যুর পর তাকে কবর দিতে পারার পয়সা জোগাড় করতে পারেননি। সন্তান বিয়োগের শোকের থেকে বড়ো শোক এই দুনিয়ায় আর কিই বা হতে পারে। জসীমউদ্দীন লিখেছিলেন, অরিন্দমের মৃত্যুর পর নজরুল ডিএম অফিসের এককোণে বসে হাসির কবিতা লিখছেন এবং চোখ জবা ফুলের মতো লাল। প্রিয় পুত্রের শেষ শয্যায় অনুবাদ করলেন ‘রুবাইয়াত ই হাফিজ’। উৎসর্গ পত্রে জানালেন- “তোমার মৃত্যু শিয়রে বসে “বুলবুল ই সিরাজ” হাফিজের রুবাইয়াতের অনুবাদ আরম্ভ করি। যেদিন অনুবাদ শেষ করে উঠলাম, সেদিন তুমি আমার কাননের বুলবুলি – উড়ে গেছ। যে দেশে গেছ সে কি বুলবুলিস্তান, ইরানের চেয়েও সুন্দর? জানি না তুমি কোথায়? যে লোকেই থাক, তোমার শোক-সন্তপ্ত পিতার এই শেষদান শেষ চুম্বন বলে গ্রহণ ক’রো।” প্রিয় পুত্র বিয়োগের শোক তাপ নিয়ে দুই পুত্র সব্যসাচী এবং অনিরুদ্ধকে নিয়ে সাজানো সংসারেও কবির বেহিসাবি খরচ, হঠাৎ করেই মোটরগাড়ি কিনে বুলবুলের মৃত্যু শোক মেটানোর হঠকারী সিদ্ধান্ত পরিবারের আরো বেশি অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বটবৃক্ষের ছায়া দিয়ে গেছেন নজরুলের শ্বশ্রুমাতা গিরিবালা দেবী। ১৯৩৮ এ স্ত্রী প্রমীলার পক্ষাঘাত এবং ১৯৪২ এ আকাশবাণীর অনুষ্ঠানে হঠাৎই নজরুলের চিরতরে কন্ঠরোধ হলো, মস্তিষ্কের কোশগুলি শুকিয়ে গিয়ে অ্যালজাইমারে আক্রান্ত হলেন। শ্যামবাজারের মন্মথনাথ দত্ত রোডের বাড়িতে থাকাকালীন কাঁসার বাসন বন্ধক দিয়ে অন্নসংস্থান করেছেন , কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত ‘জগত্তারিণী’ পদক বহুবার বন্ধকী রেখে সংসার চালিয়েছেন, যা পরে পুত্রবধূ কল্যাণী কাজী ছাড়িয়ে এনেছেন। নজরুল পত্নী প্রমীলা- এই পরিচয়ের ঊর্ধ্বেও প্রমীলা দেবীর গুণের পরিচয় মেলে তাঁর সৃষ্টি ‘শঙ্কিতা’, ‘করুণা’ কাব্যে। প্রমীলা দেবী তাঁর স্বামীর অন্তরঙ্গ বন্ধু মুজফ্ফর আহমেদকে দাদা মানতেন। প্রমীলা দেবীর সেই দাদার কথায় নজরুল কোনো গান রচনা করে সুর ভুলে গেলে ধরিয়ে দিতেন স্ত্রী প্রমীলা। প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী আঙ্গুরবালা দেবী ও ইন্দুবালা দেবী তাঁদের পরম শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় কাজী দা এবং তাঁর স্ত্রীর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছেন- পক্ষাঘাতগ্রস্ত প্রমীলা শুয়ে শুয়ে স্টোভে নজরুলের প্রিয় খাবার তৈরী করেছেন, তাঁকে খাইয়ে দিয়েছেন। পরবর্তীতে প্রমীলা দেবীর প্রয়াণের পর টালা পার্কের ভাড়াবাড়ী ছেড়ে পুত্র সব্যসাচীর এন্টালির ক্রিস্টেফার রোডের সরকারী ফ্ল্যাটে চলে আসার সময়েও কি আবেশে দিশেহারা কবি, প্রমীলা দেবীর বিছানার দিকে তাকিয়ে থাকতেন, তার অনুভূতি আছে, শব্দ নেই। যন্ত্রণা আছে, প্রকাশ নেই।
আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামের খড়ের ছাওয়া মাটির বাড়িতে মে মাসের ২৪ তারিখ জন্মালেন নজরুল। ১৮৯৯। বাবা কাজী ফকির আহমেদ ৯ বছরের ছোট্ট দুখু মিয়াকে রেখে অকালে মারা যান। গ্রামের মক্তব থেকে নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মক্তবে শিক্ষকতা, মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করতে হয় দুখু মিয়াকে। চাচা কাজী বজলে করিমের থেকে আরবী, ফার্সী, উর্দু ভাষায় অগাধ জ্ঞান অর্জন করেন সেই বয়স থেকেই।পাড়াপড়শীদের চাপে রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুলে ভর্তি হলেও পরে তিনি নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। স্কুল ছেড়ে বাসুদেবের কবিদলে যোগ দেন, পরে বর্ধমান আন্ডার ব্রাঞ্চ রেলওয়ের গার্ড সাহেবের খানসামা এবং তারপরে আসানসোলের এক রুটির দোকানে কাজ শুরু করেন। রুটির দোকানে কাজ করতে গিয়ে দারোগা রফিজউল্লাহ সাহেবের সঙ্গে পরিচিতি ঘটলে প্রথমে ময়মনসিংহের দরিরামপুর স্কুল এবং শেষে আবার নিজের প্রথম স্কুলে ফিরে আসেন। এই সিয়ারসোল রাজ স্কুলে সতীশচন্দ্র কাঞ্জিলালের কাছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, হাফিজ নুরুন্নবীর কাছে ফারসী ভাষা এবং নগেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ের কাছে সাহিত্যচর্চা করেন। করাচীর সেনানিবাসে থেকে প্রথম লেখা প্রকাশ করেন- ‘বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী’।
ছেলেবেলা থেকেই কষ্টের জীবন তাঁর। বড়ো হওয়ার সাথে সাথে জীবন বহু মোড় নিয়েছে। বিচ্যুতি হয়েছে। বন্ধু নামের অনেকেই কাছে এসেছে; তবে সাথে থেকেছে খুব কম। সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে পিছলেছেন। তিনি ঝঞ্ঝা, তিনি চঞ্চল, তিনি দুর্দম, তিনি বজ্র, তিনি দুর্জয়। তাঁর এই ভীষণ বোহেমিয়ান জীবনেও সবসময় সাথে রেখেছেন নিজের ‘সাম্যবাদী’ চিন্তাকে। কমিউনিস্ট পার্টি, শ্রমিক কৃষকের পার্টি তৈরী করার জন্য একসময়ে জানকবুল লড়াইয়ের চিন্তা থাকার পরেও বিভিন্ন কারণে সেখানে থিতু হতে পারেননি। তাতে কখনো শ্রেণীর থেকে বিচ্যুতি হয়নি। বন্ধু, কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মুজফ্ফর এর ‘গণবাণী’ পত্রিকা সম্পর্কে কোনো ব্যক্তির কলমের আক্রমণের পাল্টা জবাব ও দিয়েছেন, কথার বাণে বিদ্ধ করেছেন। তৎকালীন জাতীয় শিক্ষা প্রসঙ্গে ‘যুগবাণী’তে যা লিখেছেন, আজও ছাত্র রাজনীতির ময়দানে বড়োই প্রাসঙ্গিক বোধ হলো বলে অক্ষরে অক্ষরে টুকে দিলাম- “শুনিয়াছি, ‘বন্দেমাতরম’-এর যুগে যখন স্বদেশি জিনিসের সওদা লইয়া দেশময় একটি হইহই ব্যাপার, রইরই কাণ্ড পড়িয়া গিয়াছিল, তখন অনেক দোকানদার বা ব্যবসায়ীগণ বিলাতি জিনিসের ট্রেডমার্ক বা চিহ্ন দিব্যি চাঁচিয়া-ছুলিয়া উঠাইয়া দিয়া তাহাতে একটি স্বদেশি মার্কা মারিয়া লোকের নিকট বিক্রয় করিতেন। এখন যে-পদ্ধতিতে জাতীয় শিক্ষা আমাদের ভবিষ্যৎ আশা-ভরসাস্থল নব-উদ্ভাবিত জাতীয় বিদ্যালয়ে দেওয়া হইতেছে, তাহাও ঠিক ওই রকম বিলিতি শিক্ষারই ট্রেডমার্ক উঠাইয়া ‘স্বদেশি’ মার্কা লাগাইয়া দেওয়ার মতো। শিক্ষায় যা একটু মৌলিকতা দেখা যাইতেছে, তাহা কিন্তু বিশেষ দ্রষ্টব্য নয়। ওরকম এক-আধটু নূতনত্ব যে কেহ একটি নূতন জিনিসে লাগাইতে পারে। যদি আমাদের এই জাতীয় বিদ্যালয় ওই সরকারি বিদ্যাপীঠেরই দ্বিতীয় সংস্কাররূপে আত্মপ্রকাশ করে, তাহা হইলে আমরা কিছুতেই উহাকে আমাদের জাতীয় বিদ্যালয় বলিয়া স্বীকার করিতে পারি না, বা গৌরবও অনুভব করিতে পারি না।”
এবার মোদ্দা কথা হলো, এই সব তথ্য যেকোনো মানুষ যেকোনোভাবে যেকোনো জায়গা থেকেই সংগ্রহ করতে পারেন। আমার ভূমিকা এখানে নগণ্য। কিন্তু এই সার্বিক আলোচনার সারবস্তু বলতে গেলে ফরাসি দার্শনিক জঁ পল সার্ত্রেকে ধার করতে হয়। তিনি নজরুলের কাজকে ‘লিটারেচার এঙ্গেজ’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ তা একাধারে সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ, রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত এবং আমূল হস্তক্ষেপমূলক সাহিত্যকর্মের ঐতিহ্য। নজরুলের চেতনে মননে সবসময় ছিলো সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদের বলিষ্ঠ বোধ। নজরুল কখনোই যান্ত্রিক মার্ক্সিস্ট নন, রেজিমেন্টেডও নন, তবে তাঁর মার্কসবাদের সাথে সম্পৃক্ততা দিয়ে তৈরী অমর সৃষ্টি গুলোকে মার্কসবাদ থেকে বিচ্ছিন্ন করলে তাঁর সৃষ্টির ভাবকে বিকৃত করা হয়। নজরুল যে ‘লাঙল’ পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন, তার পৃষ্ঠায় কাস্তে হাতুড়ি প্রতীক মুদ্রিত হতো।
যবনিকা টানার আগে যে কটা কথা এই এতো কথার পরে না বললে নিজেকে অপরাধীর থেকে কম মনে হবেনা- তা হলো আজকের দিনে বিজেপির মতো ভয়ঙ্কর ফ্যাসিস্ট শক্তি তার নয়া রূপ নিয়ে বাংলার মাটিতে ঠাঁই নিয়েছে (দখল শব্দটি ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহৃত নয়। বাংলার মানুষের, বাংলার মানুষের মগজের দখল নেওয়ার এতো হিম্মত এখনো বিজেপির হয়নি) । তৃণমূল তাকে জায়গা করে দিয়েছে। বিজেপি প্রতিদিন সাম্প্রদায়িকতার নিকৃষ্টতম উদাহরণ হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে নিজেদের, হিংস্রতার দাঁত নখ বের করছে। আর একদম এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমরা। মাঝখানে কোনো অস্বচ্ছতার দেওয়াল নেই। আমাদের সামর্থ্য কম, শক্তি খানিক বেশীই বোধহয়। আমাদের সংস্কৃতিতে, চিন্তায়, চেতনায় রবীন্দ্রনাথ আছেন, আছেন নজরুল। আমাদের পাড়ার মোড়ে মোড়ে খুদেদের রবীন্দ্র নজরুল সুকান্ত আবৃত্তি, গান ইত্যাদি কমিয়ে দিচ্ছে যারা প্রতিদিন এর বিপরীতে “ভারত কা বাচ্চা বাচ্চা, বোলো জয় শ্রী রাম”এর মন্ত্র গেলাচ্ছে, “জাতের নামে বজ্জাতি সব, জাত জালিয়াত খেলছ জুয়া”র বিষ ঢোকাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি আমাদের লড়াই।
আমার দেশ, আমার রাজ্যের ওপর এই নিদারুন আক্রমণ নেমে এসেছে বহু আগেই। প্রতিদিন তার প্রভাব বাড়ছে। আর আমরা যারা ভুখা মানুষ, নজরুলের মতোই শ্রমিক কৃষকের পার্টির লোক, আমাদের দায়িত্ব অনেক। আমার বাংলার মাটিতে, আমার ভারতবর্ষের মাটিতে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, সাম্যবাদের পক্ষে, সমাজতন্ত্রের পক্ষে আমাদের হাতিয়ার শক্ত হোক। কালো জামা, কাঁধে সাদা শাল জড়ানো, কোঁকড়া চুলের একটি লোক আমাদের হক কথা সোচ্চারে বলতে শেখাক-
“যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস, যেনো লেখা হয় আমার রক্ত লেখায় তাদের সর্বনাশ”