“Every World Cup is written by those who refused to surrender:
ফাইয়াজ মল্লিক
বিশ্বের রাজপথ থেকে শহর, গ্রাম থেকে মহল্লা, চা এর দোকান থেকে ফুটপাথ অবধি একটাই তর্ক, একটাই আড্ডা যার নাম ফুটবল!
শহর মুড়ে আছে কখনও ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার ফ্ল্যাগে বা কখনও মেসি থেকে রোনাল্ডোর ছবিতে।
মোদ্দা কথা একটাই আর সেটা হলো “ফুটবল ফিভার”। প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্যাংচুয়ারি কেটে যাওয়ার “ফুটবল ফিভার” বা সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল এ মিশে যাওয়ার আবেগ!
তাহলে, ফুটবল ইজ জাস্ট আ গেম? নাকি আ গেম উইথ পলিটিক্যাল স্ট্রাগল ? কোনটা?
প্রশ্ন টা খুব সহজ আর উত্তর আমাদের জানা।
ইতিহাস ঘাঁটলে যা দেখতে পাই, যা জানতে পারি ফুটবল সবসময়ই ছিল খেটে খাওয়া মানুষের খেলা। দীর্ঘ বছর আগে চিন বা ইংল্যান্ডের দেশ গুলো তে তখন শুয়োর বা ভেড়ার ব্লাডারের সাথে বাতাস মুখ দিয়ে ফুলিয়ে বল বানিয়ে খেলার প্রচলন ছিলো।
এমনকি সেই সময় মজুর রা, কৃষক রা ফুটবল খেলার জন্য ফুটবল খেলা কে ব্যান করতে বাধ্য হয়েছিল ইংল্যান্ডের তৎকালীন সম্রাট দ্বিতীয় এডওয়ার্ড ও তার পুত্র তৃতীয় এডওয়ার্ড কারণ কাজের ফাঁকে শ্রমিক কৃষকরা ফুটবল কে আমোদ প্রমোদ হিসেবে ব্যবহার করতো।
আবার কখনও বিরাট মাস নিয়ে খেলা হতে থাকে ফুটবল, ঐক্যের ভয় পায় রাজা সম্রাট রা। এরপর ঠিক এভাবেই শুরু হয় ফুটবলের রেভোলিউশন। গোটা উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপ জুড়ে আস্তে আস্তে আঁচ ছড়িয়ে পড়ে এই ফুটবল নামক বিপ্লবের, ব্রাজিল আর্জেন্টিনা হয়ে কখনও ইংল্যান্ড বা পর্তুগাল। গরীব মানুষের খেতে না পাওয়ার আর্তনাদ কে দিনে ঘন্টা খানেক ভুলিয়ে রাখার নামই ছিলো ফুটবল।
পরবর্তী কালে এই বিপ্লব নামক খেলার হাত শক্ত করে ধরে কর্পোরেট সিস্টেম। পুঁজির হাত শক্ত করে শুরু হয় ক্লাব কালচার এবং বিক্রি হতে থাকে ফুটবল। গরীব মানুষের খেলা আস্ত আস্তে পরিণত হতে থাকে বড়লোক দের খেলাতে। ভুলিয়ে দিতে থাকে কাতালুনিয়ার কলোনিয়াল রেসিস্টকে।
ম্যানচেস্টার সিটি, রিয়াল মার্দিদ, লিভারপুল, পিএসজির মতো ক্লাব গুলো নামিয়ে আনে এক প্রকার অপ্রেসন ই বটে, যার প্রভাবে নিউজপেপার খুললে সামনেই বড়ো বড়ো করে লেখা থাকে “super wealthy clubs”
ফুটবল নামক এই শিল্পসত্বা কে ধীরে ধীরে ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কর্পোরেট সিস্টেম। ঝকঝকে স্টেডিয়াম,ক্যামেরার নীচে চাপা পড়ছে শ্রমিক শ্রেণীর এক সাংঘাতিক বিপ্লবের কাহিনী।
ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পুঁজিবাদী রাষ্ট্র গুলো একচেটিয়া মুনাফার দ্বারা ঘিরে রেখেছে গোটা এই ফুটবল জগতের বলয়, ফুটবলের মাঝে এক দেওয়াল বর্তমান ধনী বনাম গরীব।
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র খুব সুদৃঢ় ভাবে কন্ট্রোল করে রাখছে গোটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, দামী ক্লাব গুলো লাভ করছে আরও বেশি মুনাফা, পিছিয়ে পড়ছে অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল ক্লাব গুলো, ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া ক্লাব গুলোর ইতিহাস ও লড়াইয়ের কাহিনী।
আসলে পুঁজি কখনও ধার ধারেনি ফুটবলের, ভেবেছে মুনাফার কথা, পকেটের কথা।
১৯৯২ সাল, সোভিয়েত ব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ার পর আগ্রাসন নয়া উদারবাদের, ধীরে ধীরে গোটা বিশ্বের গায়ে আষ্ঠে পৃষ্ঠে লেগে লগ্নি পুঁজি। আমেরিকা, ইউরোপের দেশ গুলো জাঁকিয়ে বসে গোটা বিশ্ব দপ্তরে। এছাড়া ফুটবল ময়দানে বর্ণের বৈষম্য নামিয়ে এনেছে প্রথম থেকেই এই খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার প্রিভেলেজ ভাবমূর্তি।
২০০৮ এর মন্দা কাটিয়ে কিছুটা স্পিড বাড়ছে পুঁজির চাকার। রাষ্ট্র শ্রেণীর ঊর্ধ্বে, পুঁজি মানুষের ঊর্ধ্বে এরকম ব্লু প্রিন্ট ছড়িয়ে রাখার চেষ্টা বাড়ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পুঁজিবাদী দেশ গুলোর।
এক ম্যাগাজিনে পড়েছিলাম হাঙ্গেরির ফুটবল ম্যানেজারের উক্তি “the bitter struggle between communism and capitalism is fought out not only between our societies, but also in pitches”
চার বছর আগের ২০২২,ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ!
কাতারে ফুটবল বিশ্বকাপের সূচনা, রাতারাতি গড়ে উঠছে নতুন করে ঝলমলে শহর, রেস্তোরাঁ, সুবিশাল ফুটবল স্টেডিয়াম আর মাটির সাথে মিশে যাওয়া ৬০০০ এর বেশি পরিযায়ী শ্রমিকের রক্ত।
গোটা মিডল ইস্ট দেশগুলোর সাথে সাথে নেপাল, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ থেকে আসা শ্রমিক দের কর্মযাপন এবং ফলাফল মৃত্যু।
২০১১ থেকেই রমরমা ভাবে শুরু হয়ে যায় কাতারে বিশ্বকাপের শুরুয়াত তারপর ২০১১ থেকে ২০ এর মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা মিলিয়ে প্রায় ৫৯০০ জন পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে কাতারে এবং পাকিস্তানের শ্রমিকদের মৃত্যুর সংখ্যা থাকে প্রায় ৮০০ জনের মতো। কারণ একাধিক।
আসলে টিভি খুললেই ভুলে যাই আমি আমরা সব্বাই। খেটে খাওয়া মানুষের রক্তের উপর সেলিব্রেট হতে থাকে বিগেস্ট শো অফ আর্থের।
ফুটবলের সূচনা থেকে এখনও অবধি এই ফুটবলের মালিক একজনই, শ্রমিক শ্রেণীরা এবং গোটা লড়াই তাদেরই।
ব্যাক টু ২০২৬ ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ।
খোদ সাম্রাজ্যবাদের মাটিতে বিশ্বকাপ। যেমনটা হওয়া স্বাভাবিক ঠিক সেটাই করলো। ম্যাচের পর ই ইরান কে বেরিয়ে যেতে বলা হলো। ইরান, মরোক্কোর মতো দেশগুলোর হাজার হাজার সমর্থক কে দেওয়া হলো না ভিসা। কালো চামড়ার মানুষ গুলো কে টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়ে শুরু করা হলো বুলি। বাদ পড়েননি আফ্রিকার রেফারিও।
তবে সাম্রাজ্যবাদ কি কোনোদিন শেষ কথা বলতে পেরেছে?পারেনি। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই মিছিল করেছে নানা দেশের জণগণ প্যালেস্তাইনের পতাকা নিয়ে। ছিঁড়ে ফেলেছে ইজরায়েলের পতাকা। ইরানের দল সাম্রাজ্যবাদের হানায় মৃত বাচ্চাদের ব্যাগ,পুতুল নিয়ে গেয়েছে জাতীয় সংগীত। পর্তুগালের মতো দলকে মাঠে রুখে দিয়েছে লুমুম্বার দেশ। জায়ান্ট জার্মানি কে ৯০ মিনিট অবধি টক্কর দিয়েছে বছরের বছর পর ফ্রান্সের অধীনে থাকা আইভরিকোস্ট। সামোরি তু্রের আইভোরি কোস্ট। আশায় বুক বাঁধছে জর্ডনের মতো দেশগুলো। ইংল্যান্ড গোল করতে পারছে না ঘানার বিরুদ্ধে। জয় বা পরাজয় তো খেলার অংশ তবে তাদের একটা বল গোল পোস্টে ঢুকলে ঝাঁঝরা হয়ে যায় সাম্রাজ্যবাদের ঔদ্বত্য।
তাই বারংবার মনে রাখা দরকার পুঁজি যতই ড্রিবল করে এগোতে থাকুক,
স্টেডিয়াম জুড়ে বসে থাকে শুধু মানুষ আর মানুষ। হাতে থাকে প্যালেস্তাইনের পতাকা। টিফোতে লেখা থাকে ‘স্টোলেন বাই দ্যা রিচ’। আর ও কত কি!
ফুটবল চোখে চোখ রেখে বুঝিয়ে দেয় দিস গেম ইজ অলোয়েজ পলিটিক্যাল অ্যান্ড রেসিসটেন্স অফ ক্লাস স্ট্রাগল।