ইতিহাসের আলোয় শ্যামাপ্রসাদ
সৌরভ মন্ডল
ইতিহাসের পাতায় মিথ্যার মিথে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী, বিজেপি যাকে পশ্চিমবঙ্গের ‘জনক’ বলে ইতিহাস বিকৃত করে ইতিহাসের পাতায় তাকে নতুন মোড়কে স্থান দেবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। ইতিহাসের পাতা উল্টালে বা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের নিরিখে তার রাজনৈতিক জীবন আসলে চরম সাম্প্রদায়িক ও সুবিধাবাদী ক্ষমতার লিপ্সার এক দীর্ঘ দলিল।
দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের রক্তঝরা লড়াইয়ের পাশে দাঁড় করালে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর ভুমিকা শুধু ফ্যাকাসে নয়, প্রশ্ন চিহ্নও আছে। তথ্য, ইতিহাস ও যুক্তি কি বলে দেখা যাক?
১) মুসলিম লীগের সুবিধা নিয়ে মন্ত্রীত্ব দখল এবং জাতীয়তাবাদী মিথ্যা স্বপ্নের মুখোশ খুলে যায়-
১৯৪১ সালের ১২ ডিসেম্বর তৎকালীন সময়ে স্বাধীনতা আন্দোলনকারীদের একটা বড় অংশ জেলবন্দী ছিল এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন তুঙ্গে, ঠিক সেই সময়ে ফজলুল হকের কোয়ালিশন সরকারে যোগ দিলেন হিন্দু মহাসভার শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী। জোট সঙ্গী কে? মুসলিম লীগ। অর্থাৎ মুসলিম লীগের কোলে বসে মন্ত্রীত্ব নেওয়া, তাতে জাতীয়তাবাদের সব মুখোশ খুলে যায়।
যে মুসলিম লীগ ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে ‘দ্বিজাতি ত্বত্তে’র ভিত্তিতে পাকিস্তান দাবি করেছে ,সেই মুসলিম লীগের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে শ্যামাপ্রসাদের অসুবিধা হয়নি এবং ১৯৪২ সাল পর্যন্ত তিনি বহাল তবিয়তে মন্ত্রীত্ব করেন। অবশেষে পদত্যাগ করেন গভর্নরের সাথে মতান্তরের কারণে, মোটেও আদর্শের কারণে নয়।
আজ বিজেপি, তাকে নিয়ে পশ্চিমবাংলার জনক বলে চিৎকার করে অথচ এই ব্যাক্তিই মুসলিম লীগের সাথে হাত মিলিয়ে প্রথম তোষণের সরকার চালিয়েছেন এটা দ্বিচারিতা নয় তো কী?
২) ভারত ছাড়ো আন্দোলন দমনের ব্লু প্রিন্ট এবং ব্রিটিশ তোষণের ইতিহাস-
১৯৪২ এর ৮ ই আগস্ট ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সুত্রপাত। ব্রিটিশ বিরোধী এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের লড়াইয়ে বাংলার গ্রামেগঞ্জে থানা আক্রমণ, রেল লাইন উপড়ে ফেলার কাজে ছাত্র যুবদের ভুমিকা অবিস্মরণীয়। ব্রিটিশ পুলিশ গুলি চালাচ্ছে। মাতঙ্গিনী হাজরা লুটিয়ে পড়ছেন মাটিতে। তখন বাংলার অর্থমন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী কী করছেন? ব্রিটিশ গভর্নর জন হারবাট কে চিঠি লিখছেন-
“ The question is how to combat this movement in Bengal ? The administration should make it clear that in war time any body who impedes the war effort must be resisted the movement must be suppressed”
অর্থাৎ যখন দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিচ্ছেন ভারতবাসী তখন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ব্রিটিশ প্রভুকে স্ট্র্যাটেজি শেখাচ্ছেন কিভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামী দের পেটাতে হবে। ইতিহাস একে ‘তোষামোদ’ ছাড়া আর কী নাম দেবে? এই চিঠি এখনও ন্যাশানাল আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে।
৩) মননে সাম্প্রদায়িকতার বীজ এবং লঙ্গরখানা নিয়ে ধর্মীয় বিভাজন প্রস্তুতিকরণ-
শ্যামাপ্রসাদের নিজের লেখা ‘Leaves From A Diary’ পড়লেই তার মনোভাব বোঝা যায়। ১৯৪৩ এর বাংলার দুর্ভিক্ষের সময়ে কমিউনিস্ট সংগঠন,ছাত্র সংগঠন সবাই লঙ্গরখানা স্থাপন করছে যেখানে যেকোনো ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বসে খাচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে শ্যামাপ্রসাদ লিখেছিলেন-
“The system of feeding hindus and muslim together in the same kitchen was resented by a large section of hindus…
it was not proper to heart religious sentiments at a time of distress.”
ভাবুন মানুষ না খেতে পেয়ে মরছে আর উনি চিন্তিত হিন্দু ধর্মীয় ভাবাবেগ নিয়ে। এক সঙ্গে খেতে বসলে জাত যাবে। দুর্ভিক্ষের সময়ে যিনি অস্পৃশ্যতা ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের কথা ভাবেন তিনি কোন। ভারতের স্বপ্ন দেখতেন? এটাই তার রাজনীতির আসল চেহারা।
৪) পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির জনক তকমা আসলে বিজেপির বানান মিথ্যার মিথ এবং ইতিহাস বিকৃতির প্রমাণ-
বঙ্গভঙ্গ রুখতে ‘হিন্দু মহাসভা’ আন্দোলন করেছিলো এটা সত্য কিন্তু বঙ্গভঙ্গের জন্য প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিল? তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে, ১৯৪৭ সালের ২০ জুন ‘বঙ্গীয় আইনসভা’য় ভোটাভুটি হয়। সেই ভোটাভুটিতে কংগ্রেসের ৫৪ জন, কমিউনিস্টদের ২ জন এবং হিন্দু মহাসভার ১ জন পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের সাথে রাখার পক্ষে ভোট দেন।
৩ রা জুন মাউন্টব্যাটেন প্ল্যান ঘোষণার পর নেহেরু-প্যাটেল-মাউন্টব্যাটেন দফায় দফায় বৈঠক করেন। সেই সময় শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভার পক্ষে জনমত প্রস্তুত করতে ব্যস্ত। ফলত: শ্যামাপ্রসাদ পশ্চিমবঙ্গকে বাঁচিয়েছেন এটা ইতিহাসের চরম বিকৃতির একটা নমুনা।
৫) ব্রিটিশ প্রভুদের খুশি করতে ছাত্রদের উপর অত্যাচারের ইতিহাস-
১৯৩৮ সাল নাগাদ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সামরিক ট্রেনিং বা ইউনিভারসাল ট্রেনিং কোর্সের ছাত্ররা ব্রিটিশ ইউনিয়নের পতাকাকে স্যালুট জানাতে অস্বীকার করায় শ্যামাপ্রসাদ ওই বিভাগের ছাত্রদের প্রকাশ্য চাবুক মারার নির্দেশ দেন এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে দুই ছাত্র ধরিত্রি গঙ্গোপাধ্যায় ও উমাপদ মজুমদারকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করেন। পরবর্তী সময়ে এই স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বাংলার ছাত্র সমাজ রুখে দাঁড়ালে বাধ্য হয়ে বহিষ্কারের সিধান্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন।
৬) নেহেরুর মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ কোনো আদর্শগত কারন নাকি সুবিধাবাদ!
১৯৫০ সালে লিয়াকত-নেহেরু চুক্তির প্রতিবাদে শ্যামাপ্রসাদ মন্ত্রীত্ব ছাড়েন।বলেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুদের নিরাপত্তা নেই। ভালো কথা। কিন্তু ১৯৪২ সালে যখন বাংলার হিন্দু মুসলিম তরুণরা ব্রিটিশের গুলিতে মরছে তখন তিনি সেই ব্রিটিশের মন্ত্রী হয়ে আন্দোলন দমনের বুদ্ধি দিয়েছিলেন।
১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষে ৩০ লাখ মানুষ মরলো। তিনি মন্ত্রী থাকা স্বত্তেও রেশন ব্যবস্থা ঠিক করতে পারেননি অথচ লঙ্গরখানায় হিন্দু মুসলিম একসঙ্গে খাওয়া নিয়ে তার আপত্তি ছিল। ব্রিটিশ জ্যাক ইউনিয়নের পতাকাকে ভারতের মাটিতে কুর্নিশ না জানানোর জন্য বেত্রাঘাত এবং ছাত্রদের শিক্ষাঙ্গন থেকে বহিস্কার করার সিদ্ধান্ত। এটা আদর্শ না সুবিধা অনুযায়ী অবস্থান বদল! না ব্রিটিশ প্রভুকে খুশি রাখা, কোনটা সঠিক?
বিজেপি আজ তাকে মহান বানাচ্ছে । বাংলার মানুষের কাছে প্রশ্ন ১৯৪২ এর সেই চিঠির দায় কে নেবে? লঙ্গর খানায় ভুখা মানুষের পাশে না থেকে জাত পাত নিয়ে বিভাজন এর চেষ্টা করেছেন। ছাত্রদের উপর অত্যাচার করেছেন ইত্যাদি…
ইতিহাস মনে রাখে কে বা কারা স্বাধীনতার জন্য লড়েছিল আর কে স্বাধীনতা সংগ্রামী দের বিরুদ্ধে লড়েছিল। ‘জনক’ তকমা লাগিয়ে দিলেই কোনোকিছু হঠাৎ করেই সত্যি হয়ে যায় না।