নব্য উদারবাদ ও খাদ্য সংকট :
রীতম দাস
আজকের পৃথিবীতে খাদ্যের কোনো বাস্তব অভাব নেই। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি আর আধুনিক কৃষিব্যবস্থার অভাবনীয় অগ্রগতির কল্যাণে বিশ্বজুড়ে এখন প্রয়োজনের চেয়েও অনেক বেশি খাদ্য উৎপাদিত হয়। কিন্তু সভ্যতার এই চরম উৎকর্ষের যুগে দাঁড়িয়েও জাতিসংঘের প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান আমাদের এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়—প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং প্রতি রাতে এক বৃহৎ সংখ্যায় মানুষকে ক্ষুধার্ত পেটে ঘুমোতে যেতে হচ্ছে। প্রশ্ন জাগে, এই বিপুল উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও কেন এমন তীব্র হাহাকার? এই গভীর বৈপরীত্যের উৎস কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ফসলের ঘাটতি নয়, বরং এর মূল লুকিয়ে আছে গত কয়েক দশক ধরে বিশ্বজুড়ে বিস্তার হওয়া ‘নব্য-উদারবাদ’ এবং পুঁজিবাদের আগ্রাসী চরিত্র। বর্তমান পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানুষের বেঁচে থাকার এই পরম মৌলিক অধিকারটিকে তার মানবিক ও সামাজিক উপযোগিতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্রেফ মুনাফা লাভের এক তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পণ্যে রূপান্তর করেছে।
নব্য-উদারতাবাদী দর্শনের প্রধানতম শর্তই হলো জনস্বার্থ কিংবা মানবিক প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে সবকিছুকেই বাজারের অদৃশ্য হাতের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দিতে হবে। এই আত্মঘাতী নীতির প্রত্যক্ষ প্রভাবে খাদ্য আজ আর কেবল ক্ষুধা নিবারণ কিংবা জীবনধারণের মাধ্যম নয়, বরং সেটা ওয়াল স্ট্রিটের ফাটকাবাজ কিংবা বৃহৎ কর্পোরেট বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বাজারের এক লোভনীয় মাধ্যম। বাস্তবে এক দানা চাল কিংবা গম স্পর্শ না করেও, স্রেফ কম্পিউটারের পর্দায় ফাইন্যান্সিয়াল ডেরিভেটিভস কিংবা ফিউচার মার্কেটে খাদ্যশস্যের কাল্পনিক মালিকানা হাতবদলের মাধ্যমে দাম নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়। কৃত্রিমভাবে দামের এই কৃত্রিম ওঠানামার সমীকরণ তৈরি করে গুটিকয়েক একচেটিয়া ব্যবসায়ী যখন কোটি কোটি ডলার মুনাফা নিজেদের পকেটে তুলছে, তার চূড়ান্ত মূল্য দিতে হচ্ছে প্রান্তিক অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে। যখনই চাল, ডাল কিংবা ভোজ্যতেলের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তখন আমাদের বুঝতে হবে যে এই সংকট কেবলই খরা বা বন্যার ফল নয়, বরং এটি হলো বিশ্ব পুঁজির অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিণতি।
খাদ্যকে এইভাবে স্রেফ পণ্যে রূপান্তর করার এই কর্পোরেট ও রাষ্ট্রীয় যৌথ আগ্রাসন আসলে এক গভীর নব্য-ফ্যাসিবাদী প্রবণতা। নব্য-ফ্যাসিবাদ কেবল রাজনৈতিকভাবে মানুষকে দমন করে না, সে মানুষের প্রতিদিনের থালার ভাত, তার রান্নাঘরের স্বকীয়তাকেও গ্রাস করতে চায়। এই একচেটিয়া পুঁজির এক ভয়ংকর সমান্তরাল দিক হলো সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশ বাঙালি বা যেকোনো অঞ্চলের হাজার বছরের নিজস্ব খাদ্যাভ্যাসকে বদলে দেওয়ার এক সূক্ষ্ম অথচ আগ্রাসী ‘চাপিয়ে দেওয়ার রাজনীতি’। বিজ্ঞাপনের চাকচিক্য আর করপোরেট চেইনের মাধ্যমে আজ আমাদের খাদ্যসংস্কৃতিকে চাপ দিয়ে পরিবতর্ন করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, যে রাজমা কিংবা উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতি পশ্চিমবঙ্গের লোকাল ফুড বা স্থানীয় খাদ্য সংস্কৃতির অংশই ছিল না, করপোরেট বাজারের আগ্রাসনে আজ আমাদের অজান্তেই তার এক বিশাল কৃত্রিম আমদানি ও বাজার গড়ে তোলা হচ্ছে। এটা কেবল কোনো খাদ্যের ভৌগলিক বিস্তার নয়, বরং স্থানীয় বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাসকে সমূলে উপড়ে ফেলে একজাতীয় একঘেয়ে কর্পোরেট মেনু চাপিয়ে দেওয়ার নব্য-ফ্যাসিবাদী ছক।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি আরও বেশি ভণ্ডামিতে রূপ নেয় যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী ‘Vocal for Local’ বা স্থানীয় পণ্যের সপক্ষে বড় বড় স্লোগান দেয়। বাস্তবে এই স্লোগান আজ স্রেফ আইওয়াশ বা ধোঁকা মাত্র। স্থানীয় চাষি, তাঁতি বা কুটির শিল্পের সত্যিকারের স্বাবলম্বনের পরিবর্তে এই ‘লোকাল’-এর ধারণাকে অত্যন্ত চতুরতার সাথে বৃহৎ কর্পোরেট হাউসের বাণিজ্যিক মুনাফার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দেশীয় বা আঞ্চলিক ঐতিহ্যের মোড়কে আদতে করপোরেট কোম্পানিগুলো নিজেদের ব্র্যান্ডিং মজবুত করছে, যেখানে স্থানীয় প্রান্তিক কৃষক শ্রেনী যথারীতি ফসলের ন্যায্য দাম না পেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। নব্য-উদারবাদী পুঁজিবাদ স্থানীয় মানুষের আবেগ আর সংস্কৃতিকে বিক্রি করে নিজের মুনাফার খাতা ভারী করছে।
একসময় যে কৃষিব্যবস্থা ছিল কৃষকের স্বকীয় জীবিকা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, নব্য-উদারতাবাদের আগ্রাসনে আজ তা করপোরেট দাসত্বে পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক এর মতো অর্থলগ্নিকারী সংস্থাগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ঋণ প্রদানের শর্ত হিসেবে কৃষিখাতে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি কমানোর জন্য লাগাতার চাপ প্রয়োগ করে আসছে। ফলে রাষ্ট্র যখনই সার, বীজ, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের ওপর থেকে তার ভর্তুকি প্রত্যাহার করে নেয়, ঠিক তখনই প্রান্তিক কৃষকেরা পুঁজির বাজারে সম্পূর্ণ নিরুপায় হয়ে পড়েন। এর ওপর চেপে বসেছে বহুজাতিক বীজ কোম্পানিগুলোর (যেমন মনস্যান্টো-বেয়ার কিংবা কারগিল) তীব্র বীজ সাম্রাজ্যবাদ। তারা সুচতুরভাবে বাজারে এমন সব হাইব্রিড ও জিএমও (GMO) বীজ ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা থেকে পরবর্তী মৌসুমের জন্য কৃষক প্রাকৃতিকভাবে কোনো বীজ সংরক্ষণ করতে পারেন না। ফলে প্রতিবার চাষের শুরুতে কৃষককে বাধ্য হয়ে চড়া মূল্যে বহুজাতিক কোম্পানির দ্বারস্থ হতে হয়। উৎপাদনের খরচ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষক চড়া ঋণের জালে জড়িয়ে যাচ্ছেন, আর সামগ্রিক কৃষি ব্যবস্থার সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে গুটিকয়েক কর্পোরেট দানবের হাতে।
পুঁজিবাদের এই আগ্রাসী চরিত্র কেবল উৎপাদন পদ্ধতিকেই বদলে দেয়নি, বরং তা গ্রামীণ পরিবেশ ও ফসলের বৈচিত্র্যকেও ধ্বংস করছে। গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের কৃত্রিম উপযোগিতা প্রমাণ করতে গিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর উর্বর জমিতে স্থানীয় মানুষের প্রধান খাদ্যশস্য চাষের পরিধি সংকুচিত করা হচ্ছে। তার বদলে সেখানে জোরপূর্বক চাষ করানো হচ্ছে বাণিজ্যিক ফসল যেমন তামাক, পশুখাদ্যের উপযোগী ভুট্টা, তুলা কিংবা পাম(অয়েল)। কর্পোরেট মুনাফার এই মরণফাঁদে পা দিয়ে বহু দেশ আজ তাদের দীর্ঘদিনের অর্জিত খাদ্য-সার্বভৌমত্ব হারিয়ে ফেলেছে। যে ভূমি নিজের দেশের মানুষের মুখে অন্ন জোগাতে পারত, তা আজ পশ্চিম বাজারের বিলাসী পণ্যের সস্তা কাঁচামাল তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলস্বরূপ, স্থানীয় খাদ্য উৎপাদন ভেঙে পড়ছে এবং আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গসহ সমগ্র উপমহাদেশের কৃষকরা সামান্য খাদ্যশস্য আমদানির জন্য বা সারের জন্য বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীল ওঠানামার ওপর চিরকালের জন্য নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
মুক্তবাজার অর্থনীতির এই নির্মম মায়াজালে সবচেয়ে বড় বলি হচ্ছে সমাজের প্রান্তিক ও শ্রমজীবী শ্রেণি। নব্য-উদারতাবাদী অর্থনৈতিক মডেলে একদিকে যখন সাধারণ মানুষের প্রকৃত মজুরি অনুপযুক্ত থাকে বা কমতে থাকে, অন্যদিকে তখন জীবনধারণের অপরিহার্য উপাদানের ব্যয় বাড়তে থাকে আয়ের কয়েক গুণে। এই ব্যবস্থার বৈষম্য কতটা চরম, তা বোঝা যায় যখন আমরা দেখি উন্নত বিশ্বে প্রতিদিন টন টন অতিরিক্ত খাবার শুধুমাত্র অবহেলায় ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, অথচ একই সময়ে আমাদের চারপাশের কোনো অবহেলিত বস্তি কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামে অপুষ্টির শিকার হয়ে ধুঁকে ধুঁকে বড় হচ্ছে একটা আস্ত প্রজন্ম। খাবার বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুদ আছে ঠিকই, কিন্তু পুঁজিতান্ত্রিক বাজার ব্যবস্থায় তা পাওয়ার প্রধান শর্ত হলো পকেটের ক্রয়ক্ষমতা। পুঁজিবাদ ক্ষুধার্ত পেটের কান্না বোঝে না, সে বোঝে কেবল ক্রেতার আর্থিক সক্ষমতা ও মুনাফার হিসাব।
পরিশেষে এ কথা স্পষ্ট যে, বর্তমান বিশ্বের খাদ্য সংকট কোনো প্রাকৃতিক অভিশাপ বা প্রাকৃতিক কারণ নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট এবং আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে, পুঁজির দ্বারা কৃত্রিম ভাবে তৈরি করা কাঠামোগত সংকট। যতক্ষণ না পর্যন্ত খাদ্যকে কর্পোরেট মুনাফার রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত করে প্রকৃত খাদ্য সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা যাবে, এবং যতক্ষণ না খাদ্য উৎপাদন ও বণ্টনের নিয়ন্ত্রণ সরাসরি সাধারণ মানুষের হাতে ফিরে আসবে, ততক্ষণ নব্য উদারবাদের এই চক্রব্যুহ ভেদ করা সম্ভব নয়। আজকের দিনে প্রগতিশীল ও মানবিক শক্তির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক লড়াই হল সারা পৃথিবীর রাষ্ট্রক্ষমতা শ্রমজীবী মানুষের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ এর মাধ্যমে খাদ্যকে পণ্যের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে মানুষের বেঁচে থাকার অপরিহার্য অধিকার হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা
•রেফারেন্স লিংক:
১)https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S2214845024000012
২)https://www.fao.org/publications/fao-flagship-publications/the-state-of-food-security-and-nutrition-in-the-world/en?utm_source=chatgpt.com