সংকটের মুখে গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদের পীঠস্থান-আমার ‘ভারতবর্ষ’
সৌরভ মন্ডল
“অহরহ তব আহবান প্রচারিত ,শুনি তব উদার বাণী
হিন্দু,বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পারসিক, মুসলমান,খ্রীষ্টানী
পূরব পশ্চিম আসে তব সিংহাসন –পাশে
প্রেম হার হয় গাঁথা”- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে এই বহুত্ববাদ রক্ষা করা ছিল রাষ্ট্র নেতাদের কাছে একটা বড় চ্যালেঞ্জ। ধর্মের ভিত্তিতে দ্বিখণ্ডিত ,দাঙ্গা বিধ্বস্ত একটি দেশ, স্বাধীনতার আনন্দ কে ম্লান করে দিয়েছিল দেশ ভাগের যন্ত্রণা। ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলার কাজটা সে দিন কম কঠিন ছিল না। ছিল দেশীয় রাজ্য গুলিকে ভারত বা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার সমস্যা। মুসলিম মৌলবাদের সঙ্গে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদও তখন যথেষ্ট সক্রিয়। দ্বি-জাতি তত্ত্ব অনুসারে ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলার জন্য ছিলো নানা পরিকল্পনা।
দেশ যখন স্বাধীন হচ্ছে মহাত্মা গান্ধী তখন কলকাতার বেলেঘাটায়, দেশভাগ, দাঙ্গার যন্ত্রনায় দীর্ণ। রাষ্ট্রনেতারা শত চেষ্টা করেও স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তার থেকে কোনো বিবৃতি আদায় করতে পারেননি। বেলেঘাটায় তখন একাধিক বার হিন্দুত্ববাদীরা গান্ধীজির আশ্রয়স্থল আক্রমন করেছিল। ১৯৪৮ সালের ৩০শে জানুয়ারী গান্ধীজিকে হত্যা করে তারা সেই জ্বালা মিটিয়েছিল । সে দিনের সেই বিদ্বেষের আগুনে আজও পুড়ছে সমগ্র দেশ। একথা বলাই যায়, তৎকালীন সময়ে কংগ্রেসের মধ্যেও সকলে উদারপন্থী ছিলেন না। অনেকের মধ্যেই প্রচ্ছন্নভাবে রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদের প্রতি দুর্বলতা ছিল। তবে সর্দার বল্লভ ভাই প্যটেলের বেশ কিছু কাজ প্রশ্নের ঊর্ধ্বে ছিল না। তাকে ‘লৌহ পুরুষ’ বলে জওহরলাল নেহেরুর ভাব মূর্তির বিরুদ্ধে লড়িয়ে দেবার কৌশল বিজেপি অনেক ভেবে চিন্তেই নিয়েছিল। ধর্মীয় রাষ্ট্র গড়ার প্রশ্নে মুসলমান মৌলবাদীদের সঙ্গে রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদীদের মৌলিক পার্থক্য কোনোকালেই ছিল না ।
১৯৫০ সালের ২৬ শে জানুয়ারী, বহুত্ববাদকে স্বীকৃতি দিয়েই স্বাধীন ভারতের সংবিধান কার্যকরী হল। সংবিধান দিলো সকলকে নিজ নিজ ধর্মাচরণের অধিকার, মতপ্রকাশের অধিকার, সঙ্ঘবদ্ধ হওয়া, প্রতিবাদ করার মৌলিক অধিকার সহ নানা গণতান্ত্রিক অধিকার। সংবিধানের প্রস্তাবনার শুরুতেই “আমরা ভারতের জনগণ “- এই শব্দবন্ধ স্থান পেয়েছে। ভারত কে নিজের দেশ মনে করে যারা বাস করছেন তাদের প্রত্যেককে নিয়েই এই দেশ। সংবিধানের দেওয়া অধিকার তাদের সকলের জন্য। ধর্মীয় রাষ্ট্র ও দ্বি-জাতি তত্ত্বের বিরূদ্ধে এই শব্দবন্ধের তাৎপর্য কম নয়। ইসলাম ধর্মাবলম্বী হয়েও যারা এই দেশে থেকে যান , ধর্মনিরপেক্ষতা কে মর্যাদা দেন সংবিধান তাদের সমানাধিকার দিয়েছিল। রাষ্ট্রের সেই অঙ্গীকার নতুন করে আজকের রাষ্ট্র নেতাদের মনে করিয়ে দেবার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
সংবিধান সমস্ত নাগরিককে সসম্মানে বেঁচে থাকার সমানাধিকার দিয়েছে, ব্যক্তি সম্পত্তির অধিকারকেও স্বীকৃতি দিয়েছে যা আসলে আর্থিক অসাম্যকেই বাড়িয়ে তুলবে। সেটাই বাস্তবে ঘটেছে। ভারতের সংবিধান পুঁজিবাদী উদার গণতান্ত্রিক জাতি রাষ্ট্রের ধারণার অনুসারী, কিন্তু আর্থিক বৈষম্য বৃদ্ধির সঙ্গে জাতপাত, ভাষা,লিঙ্গ ভিত্তিক সামাজিক বৈষম্য দূর করার কাজটিও যথাযথ ভাবে হয়নি যা উদার গণতন্ত্রের বিরোধী। আসলে সবই হয়েছে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও প্রচ্ছন্ন মদতে। বহুত্ববাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতান্ত্রিক অধিকার, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো যেকোন ধর্মীয় মৌলবাদীর মতাদর্শের বিরোধী। হিন্দুত্ববাদী এবং মুসলিম মৌলবাদীরা সংবিধানের মূল সুরের বিরোধী। এমনকি দেশের জাতীয় পতাকা নিয়েও হিন্দুত্ববাদীদের পক্ষ থেকে যথেষ্ট আপত্তি ছিল। হিন্দুত্ববাদীরা হিন্দু রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে অবিচল থেকেছে। রাম মন্দির,সংবিধান থেকে ৩৭০ ধারা বাতিল,এক দেশ এক আইন, সিএএ ইত্যাদি বিষয় এই তাত্ত্বিক লড়াই থেকে তারা কখনই বিচ্যুত হয়নি। এ সবের পক্ষেই জনমত গড়ে তুলতে তারা সক্রিয় থেকেছে ।
রাজতন্ত্রে রাজাকে ভগবানের দূত হিসাবে প্রচারের চল সব দেশেই ছিল। সেই প্রচার চালাতেন রাজার অনুগ্রহ প্রাপ্ত ধর্ম গুরুরা ও তার অনুগত রাজন্যবর্গ গণ। এখন আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজেই নিজেকে সেই আসনে বসাতে চান। সংসদ ভবন উদ্বোধন, রাম মন্দিরে রাম লালার প্রাণ প্রতিষ্ঠা এবং তাঁর ভুমিকা সেই ইঙ্গিতই বহন করছে। তার সঙ্গে সুর মিলিয়েছে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। কার্যত সংবাদ মাধ্যমের কোনো স্বাধীনতাই থাকছে না। ২০২৫ সালে ফ্রিডম ইনডেক্স এ ১৮০ টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ছিল ১৫১ নম্বরে আজ ২০২৬ এ ১৫৭ তে। একের পর এক সংবাদ মাধ্যম বিজেপি সরকারের প্রচার যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। দেশের প্রধান সংবাদ মাধ্যম গুলির মালিকানা আজ বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থার দখলে। মোদী সরকারের সঙ্গে সেই সংস্থাগুলির মিত্রতার কথা সকলের জানা। নয়া উদারনীতি আসলে গণতন্ত্রের বিরোধী। দেশে দেশে চরম দক্ষিণপন্থার উত্থান ঘটিয়ে গণতন্ত্র, বিজ্ঞানমনস্কতা, সামাজিকতাকে ধংস করা হচ্ছে। দেশ জুড়ে চলছে বিদ্বেষের আবহ নির্মাণ। সমগ্র রাষ্ট্র যন্ত্রের চরিত্র আজ বদলে যাচ্ছে যা ভয়াবহ দিক। বহুত্ববাদ কে আজ পুঁজিবাদ মর্যাদা দিতে চায়না। উদার গণতন্ত্রের পরিবর্তে স্বৈরাচার আজ তাদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। সু-শাসনের অজুহাতে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এর ক্ষমতা কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল করে ক্ষমতার অতিকেন্দ্রীকরণ করার সর্বগ্রাসী প্রয়াস চালানো হচ্ছে।
ধর্মীয় রাষ্ট্র পাকিস্তান মানুষের ভালো করতে পারেনি। দারিদ্র এবং তীব্র আর্থিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। রাষ্ট্র নেতাদের হত্যাই পাকিস্তানের রাজনীতির অঙ্গ হয়ে রয়েছে। পাশাপাশি ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্রের তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সৃষ্টি হওয়া বাংলাদেশেও আজ মৌলবাদীদের ভীত শক্ত হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ গুলি থেকে শিক্ষা না নিয়ে বরং তাদের দেখিয়ে ভারতকেও ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্র তীব্রতা লাভ করেছে। ফলে এই মুহূর্তে ভারতের সংবিধান বদলে দিয়ে এই স্বৈরাচারী ধর্মীয় রাষ্ট্র গড়ে তোলার বহুদিনের স্বপ্ন সার্থক করার কাজ আজ রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদী দের সামনে।
এই কঠিন সময়ে মিডিয়ার ভূমিকা, সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা এবং প্রতিটি দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক, ধর্ম নিরপেক্ষ,প্রগতিশীল , যুক্তিবাদী নাগরিক এবং অবশ্যই দেশ গঠনে সবসময়ই সবচেয়ে উল্লেখ যোগ্য ভূমিকায় অগ্রগণ্য থেকেছে ছাত্র, যুব দের ভূমিকা। এই সময়ে তা আরো বেশি প্রাসঙ্গিক । সমস্ত অংশের নাগরিকদের আজ সংবিধান, বহুত্ববাদ এবং দেশের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য এবং অধিকার রক্ষা করতে পথে নামতে হবে। অন্যথায় উদাসীন থাকা আজ স্বৈরাচার কে সমর্থন করারই সমর্থক।