আমাদের উপনিবেশ নেই, সাম্রাজ্যবাদ আছে

সাম্রাজ্যবাদ তার পোশাক বদলেছে। এবার আমাদেরও তাকে চিনে নেওয়ার চোখ বদলাতে হবে।

ভারতের স্বাধীনতা যে শকওয়েভ শুরু করলো পৃথিবীতে, তার আরেক পোষাকী নাম ছিল ডিকলোনাইজেশন। বিগত কয়েক শতকজুড়ে, ইওরোপীয় জাতি (জাতির উল্লেখ কেন করলাম? আসলে ঔপনিবেশবাদ মৌলিকভাবে জাতিগত শোষণ। ফ্রাঞ্জ ফানোনের মতে মার্ক্সীয় অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং জাতিগত বিদ্বেষের সীমারেখা একসাথে মিলেমিশে ছিল – আপনি শেতাঙ্গ তাই বিত্তবান, আপনি বিত্তবান তাই শ্বেতাঙ্গ) এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকা জুড়ে যে উপনিবেশের জাল বিস্বার করেছিল, তা একে একে কোথাও আপাত শান্ত ভাবে, আর কোথাও প্রত্যক্ষ হিংসায় একে একে স্বাধীনতার স্বাদ পেতে শুরু করে। ক্রমাগত এই স্বাধীনতার স্বাদ পৃথিবী জুড়ে এক নতুন বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ তৈরি করেছিল। আমরা ভাবলাম, সাম্রাজ্যবাদের দানব হয়তো অবশেষে তার নখ-দাঁত খুইয়ে অবশেষে অন্তিম শ্বাস ফেললো। বিশ্বজুড়ে শুরু হলো প্রজাতান্ত্রিক গণতন্ত্রের এক নতুন অধ্যায়, আ নিউ ওয়র্ল্ড অর্ডার। কিন্তু গল্পটা বড্ড সরল, টু গুড টু বি ট্রু। আর তাই, সবকিছুকেই একটু সন্দেহের আতসকাঁচের তলায় দেখতে হবে।

                সাম্রাজ্যবাদ কী? সাম্রাজ্যবাদ এমন এক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, যেখানে একটি প্রভাবশালী এবং কর্ত্তৃত্বপূর্ণ জাতি, অপর কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠীর জমি, শ্রম, খনিজ, বিভিন্ন কাঁচামাল, এবং বাজারকে নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য আত্মসাৎ করে থাকে। এই রাজনৈতিক দখলদারি মানবজাতির রাজনৈতিক চেতনা বিকাশের শুরু থেকেই বর্তমান। গত চার-পাঁচ শতকে এই সাম্রাজ্যবাদ এক দানবীয় রূপ নেয় যা গোটা দুনিয়াজুড়ে গ্রাস করেছে, এবং অসংখ্য স্থানীয় সংস্কৃতি এবং সভ্যতাগুলোকে ধ্বংস করে গেছে। এই সব সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশগুলো থেকে লুঠ করা সম্পদের জোরে যে পুঁজি ইওরোপে জড়ো হলো, তার অর্থনৈতিকজাড্যে ইওরোপে শুরু হলো শিল্পবিপ্লব, এবং পুঁজির গুণোত্তর বৃদ্ধি। পুঁজির অদৃশ্য হাত শুরু করলো তার নিজের খেলা। পুঁজির উত্তরোত্তর পুঞ্জিভবন থেকে পুঁজিবাদ।

                পুঁজিবাদের কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্যের সাথে সাম্রাজ্যবাদের এক জায়গায় দারুণ মিল। আর তা হলো নিরন্তর সম্প্রসারণ। সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাম্রাজ্যবাদ ক্রমাগত জমির জন্য, সম্পদের জন্য সাম্রাজ্যের ক্রমাগত প্রসার জরুরি হয়ে উঠেছিল। তেমনই বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের চেয়ে বেশি মুনাফার জন্য পুঁজিবাদেরও ক্রমাগত সম্প্রসারণ এক এসেনশিয়াল বৈশিষ্ট্য। পুঁজিবাদের অসীমক্ষুধা ধীরে ধীরে সমস্ত দুনিয়াকেই গ্রাস করে ফেলতে শুরু করে। “পুঁজিবাদের ঝাণ্ডাবাহকেরা সারাদুনিয়া জুড়ে ছুটে বেড়ায়, সর্বত্র ঘাঁটি বানায়, সর্বত্র তার জাল বিস্তার করে, এবং বিশ্বকে নিজেদের আদলে গড়ে তোলে”।

                সাম্রাজ্যবাদ যেরকম সাদা চামড়ার বোঝা-র দোহাই দিয়ে সারাদুনিয়ার সাংস্কৃতিক এবং সভ্যতার ধ্বংস ডেকে এনে তার ধ্বংসস্তুপের উপরে বসে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদ এর এক অদ্ভুত জেনেটিক কাইমেরার জন্ম দেয়। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদ, যাকে বর্তমানে আমরা নব্য-সাম্রাজ্যবাদ বলে চিনি। কীভাবে হলো এই জন্ম? আসলে ইওরোপীয় বিশ্বজোড়া সাম্রাজ্য যখন বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কায় নড়বড়ে, তখন, ১৯৪৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যামশায়ারের ব্রেটন উডে বসে বিশ্বযুদ্ধের মিত্রশক্তিরা। তৈরি হয় ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড এবং পরবর্তীকালে পরিচিত হওয়া বিশ্বব্যাঙ্ক। বিশ্বের আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থাকে ডলারের সাথে জুড়ে, মার্কিন অর্থনীতিকে বিশ্বপরিচালনার শক্তি দিয়ে দেওয়া হয়। ইওরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের সূর্য অস্তমিত হলো, এবং শুরু হলো মার্কিন নব্য-সাম্রাজ্যবাদের যুগ।

                মাইকেল পারেন্তি এই সাম্রাজ্য-বিশ্লেষণ করে বলেন, সাম্রাজ্যবাদ কোনো বহুপুরাতন উপনিবেশের ইতিহাস নয়, বরং আধুনিক পুঁজিবাদীব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদকে বিবর্তনের মাধ্যমে এক নতুন পোষাক, নবরূপ দান করেছে। পারেন্তি বলেন, পুঁজিবাদ হয়তো বা সাম্রাজ্যবাদ ছাড়া বেঁচে যাবে, কিন্তু সে সাম্রাজ্যবাদকে ছেড়ে দিতে পারবেনা। কেন? কারণ পুঁজির গুণোত্তর প্রগতির জন্য সাম্রাজ্যবাদ হলো সবচেয়ে সহজ, লোভনীয় পদ্ধতি। বন্দুকের সাম্রাজ্য বিবর্তিত হয়ে পুঁজির সাম্রাজ্যে পরিণত হয়, এ তার এক ধরণের জেনেটিক রূপান্তর। প্রথম বিশ্বের জন্য তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি আজও, ডিকলোনাইজেশনের প্রায় আট দশক পার করেও সবচেয়ে লাভজনক জায়গা। পারেন্তি তাঁর এগেইনস্ট এম্পায়ার বইতে তথ্য দিচ্ছেন, মার্কিন কর্পোরেট মুনাফার সিংহভাগ আসে উন্নয়নশীল দেশগুলির অপারেশন থেকে। কেন? কারণ সস্তার শ্রমিক, প্রায়-শূন্য কর্পোরেট কর, হাস্যকর শ্রমনীতি (এই আমাদের দেশের উদাহরণই ধরা যায় ওলা বা ইনফোসিসের মালিকদের হাস্যকর কমেন্টগুলো ভাবুন), পরিবেশ বাঁচানোর দায়িত্বের প্রতি বুড়োআঙুল দেখানোর মজা (ইউনিয়ন কার্বাইড এবং ভূপাল গ্যাস দুর্ঘটনা) এইসবকিছুর জন্যই উন্নয়নশীল তৃতীয় বিশ্ব আজও সবচেয়ে লাভের জায়গা।

                তাহলে, ইন্টারনেটের বহুচর্চিত, বহুখিল্লিত, সেই মিম-লাইন সিরিয়াসলিই জিজ্ঞেস করতে হয়, এ কীভাবে ঘটে? আমরা কি সত্যিই স্বাধীন? পুঁজিবাদকে মার্ক্স রক্তচোষার সাথে তুলনা করেছিলেন। যেকোনো শয়তান-ই বিভিন্ন ছল, চালাকির আশ্রয় তো নেবেই তাইনা? দুরাত্মার ছলের অভাব নেই। প্রথম যে ভুয়ো কথা এই পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদ ছড়িয়ে থাকে, তা হলো তৃতীয় বিশ্ব ঐতিহাসিক ভাবেই দরিদ্র অঞ্চল ছিল, অনুর্বর জমি আর অলস জনজাতিই দায়ী এই কম উন্নয়নের জন্য। আদতে তৃতীয় বিশ্ব ছিল, বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদের ভাণ্ডার, সেই কারনেই ঔপনিবেশিক শক্তির মূল লক্ষ্যই ছিল এগুলো। বিজয়ী এবং দখলদারি শক্তিগুলি ইতিহাসজুড়ে উপনিবেশের সম্পর্কে যে হেজিমনি তৈরি করে রাখে, তা আজও চর্বিত-চর্বন হয়ে চলে। দ্বিতীয় মিথ্যা হলো জনবিস্ফোরণের মিথ। আমাদের সাধারণ মানুষও বিশ্বাস করে, আমাদের এই উপমহাদেশের সবচেয়ে বড়ো বাধা হলো অ্যাত্ত পপুলেশন। সত্যিটা হলো, হল্যান্ড বা বেলজিয়ামের জনঘনত্ব ভারতের চেয়ে বেশি বা সমান হলেও মাথাপিছু জিডিপিতে এরা ধরা ছোঁয়ার বাইরেই। আজকের বায়োপলিটিক্সের যুগে মানবসম্পদ প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়েও আগে, সেখানে জনসংখ্যা তো লায়াবিলিটি নয় বরং অ্যাসেটের সম্মান পাওয়ার কথা।

প্রথম বিশ্ব আজও ঠিক করে কোন কোন দেশ কার্বন-এমিশন কীভাবে কমাবে, কতো কমাবে, কোন দেশ নিউক্লিয়ার শক্তির অধিকারী হতে পারবে, কে পারবেনা। ভুলে গেলে চলবেনা, আজ যখন ইরান মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, ভারতের ক্ষেত্রেও এই ক্ষমতার কাঠামো অচেনা নয়। ১৯৯৮ সালে অটলবিহারী-সরকারের সময়ে পোখরান-II পারমাণবিক পরীক্ষার পর ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক দেশের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছিল। অর্থাৎ কোন রাষ্ট্র কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, কোন রাষ্ট্র পারমাণবিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পাবে এবং কোন রাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হবে—এসব সিদ্ধান্তও যে ক্ষমতার অসম বণ্টনের সঙ্গে যুক্ত, তা এই ঘটনাতেও স্পষ্ট। ভুলে গেলে চলবেনা, ১৯৯৮ নয়, ২০২৬ এও মার্কিন সেনেটে বিল পাশ করে বলা হয়, ভারত রাশিয়া থেকে তেল কিনলে আরোও আরোও টারিফ আরোপ করা হবে। 

৯ই অগস্টের নাগাসাকির বুকে বিস্ফোরিত পারমাণবিক বোমা যেমন বিশ্বযুদ্ধের অন্তিম ঘন্টা ঘোষণা করে, রূপকার্থে তা যেন পুরোনো দুনিয়ার নিয়ম শেষ করে মানবসভ্যতার এক নতুন যুগের সূচনা করে। নতুন যুগের নতুন সাম্রাজ্যবাদ কেবল বন্দুক নয়, বরং বন্দুকের চেয়ে বিনোদন যে ক্ষমতার আরও বড়ো উৎস, তার সার বুঝে ফেলেছিল। বামপন্থীরা যখন আকাদেমিক চুলচেরা বিশ্লেষণে ইডিওলজিকাল স্টেট আপারেটাসের কার্যপদ্ধতির শবব্যবচ্ছেদে ব্যস্ত, হলিউডি হেজিমনি তখন দুনিয়াকে ভিলেইন হিসেবে রুশ-টানে-ইংরিজি-বলা প্রায়-মিলিটারি লিডার অথবা চীনা মাফিয়া প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু করে (ঠাণ্ডালড়াই শেষ হলে, হলিউড ভিলেইনরা বদলে মধ্যপ্রাচ্যের টেররিস্ট হয়ে গেলো)। আমরাও হাঁ করে পুঁজিবাদের স্পেক্টাকুলার স্পেকটাকলের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখে গেলাম, ভিলেইন চিরকালই বহিরাগত, তা সে বিশ্ববিদ্যালয় হোক, দেশ হোক, বা পৃথিবী।

স্বাধীনতা, বা বলা ভালো ডিকলোনাইজেশন কখনই শান্তিপূর্ণ নয়। কিন্তু উপনিবেশকে ছেড়ে কি আর এমনি এমনি দেওয়া যায়? স্বাধীনতার প্রথম শর্ত হিসেবে পারেন্তির ভাষায় এক কম্প্রাডোর শ্রেণীর প্রতিষ্ঠা করা হয়, যারা তার নিজের দেশকে বিদেশি নব্য-ঔপনিবেশীয় শক্তির ক্লায়েন্টে পরিণত করতে সাহায্য করে। সেই সূত্রেই অর্থনীতির ধারা কোন খাতে বইবে, তা স্থির করে দেয় নিও-লিবেরাল আন্তরাষ্ট্রীয় সংঘগুলি। নব-উপনিবেশগুলির ‘উন্নয়ন’-এর জন্য বিদেশীসাহায্য আসে শ্রমনীতি শিথিল করার শর্তে। ডেভলপমেন্ট ফান্ড হিসেবে অস্ত্র এবং সামরিক সাহায্য করা এবং অস্ত্রব্যবসার খোলাবাজারের চাহিদা বজায় রাখতে কম-আঁচে নিরন্তর সংগ্রাম চলতে থাকে কোনো ক্লিয়ার জয়ী-পরাজিত না ঠিক করেই। এক নিরন্তর শত্রু, প্রত্যেক নব্য-উপনিবেশগুলির জন্য তৈরি করা হয়, যাতে দশকের পর দশক ধরে উন্নয়ন খাতে নয় বরং সামরিক খাতে দেশের বাজেটের সিংহভাগ যেতে পারে। দশকের পর দশক নিও-লিবেরাল খোলাবাজার তৈরি করে এমন এক স্বায়ত্তশাসক শ্রেণী, যারা বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন নীতিনির্ধারক। আজ আমাদের পার্লামেন্টে খাদ্যনীতিনির্ধারক সগর্বে বলেন, তাঁর হেঁসেলে পেঁয়াজ ঢোকে না, কাজেই পেঁয়াজের দামের সাথে তার কোনো লেনাদেনা নেই। পাব্লিক ট্রান্সপোর্ট থেকে পাব্লিক এডুকেশন কীভাবে হবে যাঁরা স্থির করেন, সেই কম্প্রাডোর শ্রেণী না চড়েন ট্রামে-ট্রেনে-বাসে, না তাঁদের বাড়ির শিশুরা সরকারি স্কুল-কলেজের ধার-পাশ দিয়ে যায়। 

কিন্তু এখানেই নব্যসাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে বড় কৌশলটি লুকিয়ে আছে। উপনিবেশকে চিরকাল সরাসরি শাসন করার প্রয়োজন নেই; বরং এমন একটি দেশ তৈরি করাই যথেষ্ট, যে দেশটি স্বাধীন—কিন্তু তার স্বাধীনতার ব্যবহারিক পরিসরটি নির্ধারিত হয় অন্যের প্রয়োজন অনুযায়ী। পতাকা তার নিজের, সংসদ তার নিজের, প্রধানমন্ত্রী তার নিজের; কিন্তু পুঁজির প্রবাহ, ঋণের শর্ত, বাজারের নিয়ম, প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কাঠামো তাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্ব এক জিনিস নয়। অর্থাৎ, নব্যসাম্রাজ্যবাদের জন্য সবসময় বিদেশি শাসকের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় এমন একটি দেশীয় ক্ষমতাশালী শ্রেণির, যারা বিদেশি পুঁজির সঙ্গে নিজেদের স্বার্থের সমীকরণটি বুঝে নেয়। আর এখানেই নব্যসাম্রাজ্যবাদ ও তার শক্তি, তার পুরনো পূর্বসূরি সাম্রাজ্যবাদের চেয়ে আরও সূক্ষ্ম।

পুরনো সাম্রাজ্যবাদ বলত, “আমি তোমাকে শাসন করব।”

নব্যসাম্রাজ্যবাদ বলে—“তুমি নিজেই নিজেকে শাসন করো; শুধু এমনভাবে করো, যাতে আমার স্বার্থ অক্ষুণ্ণ থাকে।”

এই পার্থক্যটি খুব সামান্য মনে হলেও আসলে এটাই গোটা ব্যবস্থাটির মূলসূত্র।

একজন ঔপনিবেশিক শাসককে প্রতিরোধ করা তুলনামূলকভাবে সহজ। তাকে চেনা যায়—তার পোশাক আলাদা, তার পতাকা আলাদা, তার ভাষা আলাদা, তার সেনাবাহিনী আলাদা। কিন্তু নব্যসাম্রাজ্যবাদের ক্ষমতা কাজ করে অনেক বেশি অদৃশ্যভাবে। এখানে শোষকের মুখটি অনেক সময় স্থানীয়। নীতিনির্ধারক স্থানীয়। কর্পোরেট মালিক স্থানীয়। সংসদ স্থানীয়। সংবাদমাধ্যমও স্থানীয়। অথচ গোটা কাঠামোটি এমনভাবে সাজানো থাকে যে স্থানীয় স্বার্থ এবং বৈশ্বিক পুঁজির স্বার্থ ক্রমশ একে অপরের প্রতিশব্দ হয়ে ওঠে।

তাই নব্যসাম্রাজ্যবাদকে কেবল ‘বিদেশিরা আমাদের শোষণ করছে’ এই সরলীকরণে বোঝা যায় না। প্রশ্নটি আরও কঠিন: কার স্বার্থে আমাদের অর্থনীতি পরিচালিত হচ্ছে? কার জন্য আমাদের শ্রম সস্তা রাখা হচ্ছে? কার জন্য আমাদের বাজার খুলে দেওয়া হচ্ছে? কার জন্য রাষ্ট্রীয় সম্পদ বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এই ব্যবস্থায় কারা লাভবান হচ্ছে?

এই প্রশ্নগুলি করলে দেখা যায়, নব্যসাম্রাজ্যবাদ আসলে বিদেশি শক্তি বনাম দেশীয় জনগণের একটি সরল দ্বন্দ্ব নয়। এটি বিদেশি পুঁজি, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং দেশীয় ক্ষমতাশালী শ্রেণির একটি জটিল জোট, যেখানে লাভের শৃঙ্খলটি সীমান্ত অতিক্রম করে। আসল প্রশ্নটি আরও গভীরে – কীভাবে একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এমনভাবে কাজ করে, যেখানে পৃথিবীর এক অংশের সমৃদ্ধি অন্য অংশের সস্তা শ্রম, সম্পদ এবং রাজনৈতিক দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকে?

সেই প্রশ্নটি আমাদের নিজেদের দিকে তাকাতে বাধ্য করে।

নব্যসাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে সফল রূপ সেইটেই, যেখানে শোষণকে আর শোষণ বলে মনে হয় না; তাকে বলা হয় উন্নয়ন (অথবা বিকাশ?)

– শ্রমের সস্তাকরণকে বলা হয় ‘competitive advantage’!

– রাষ্ট্রীয় সম্পদের বেসরকারিকরণকে বলা হয় ‘reform’!

– বিদেশি পুঁজির প্রবেশকে বলা হয় ‘investment’!

– ঋণের শর্তকে বলা হয় ‘fiscal discipline’!

– আর একটি দেশের বাজারকে বহুজাতিক পুঁজির জন্য খুলে দেওয়াকে বলা হয় Liberalization!

শব্দ বদলায়। নীতি বদলায়। প্রতিষ্ঠান বদলায়। কিন্তু প্রশ্নটি থেকে যায়—কার জন্য?

স্বাধীনতা কেবল নিজের পতাকা, নিজের সংবিধান, নিজের সংসদ কিংবা নিজের সরকার থাকার নাম নয়। একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখনই অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন সেই স্বাধীনতা তার জনগণের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক জীবনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বাস্তব ক্ষমতায় পরিণত হয়। অন্যথায় স্বাধীনতা থেকে যায় কাগজে—আর নির্ভরতা কাজ করে বাস্তবে। নব্যসাম্রাজ্যবাদ আমাদের ঠিক এই জায়গাতেই প্রশ্ন করে। সে আর বন্দুক নিয়ে এসে বলে না, “তোমার দেশ আজ থেকে আমার”!  সে বরং এমন একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করে, যেখানে দেশটি নিজের বলেই মনে করে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলি শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক পুঁজির প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। তার শাসক স্থানীয়, তার ভাষা স্থানীয়, তার সংসদ স্থানীয়—কিন্তু তার অর্থনীতির যুক্তি অনেক সময় আর স্থানীয় থাকে না। এই অদৃশ্যতাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি — উপনিবেশ-শূন্য ঔপনিবেশবাদ — কলোনাইজেশন উইদাউট কলোনিজ!

কিন্তু এখানেই আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ হেগেলীয় ধাক্কা আসবে। নব্যসাম্রাজ্যবাদ সর্বশক্তিমান নয়। ইতিহাসের কোনো সাম্রাজ্যই সর্বশক্তিমান ছিল না। যে ডিকলোনাইজেশন একদিন ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের কয়েক শতকের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পেরেছিল, সেই ইতিহাসই আমাদের শেখায় যে ক্ষমতার কোনো কাঠামোই চিরস্থায়ী নয়। সাম্রাজ্যবাদ তার পোশাক বদলেছে মানেই তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি। সমস্ত প্রক্রিয়াই, যাকে শাশ্বত বলে মনে হয়, তার পতনের কারণগুলো তার মধ্যেই নিহিত থাকে। সেই সব কারণগুলোকে চিহ্নিত করে সেখানেই আঘাত দেওয়া প্রয়োজন। লড়াই থামেনি, লড়াই থামেনা, বরং লড়াইটির চরিত্র বদলেছে।

আজকের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই তাই কেবল বিদেশি পতাকা নামিয়ে নিজের পতাকা তোলার লড়াই নয়। এটি অর্থনীতির ডিকলোনাইজেশন, জ্ঞানের ডিকলোনাইজেশন, সংস্কৃতির ডিকলোনাইজেশন এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের কল্পনাশক্তির ডিকলোনাইজেশন। কে উন্নত, কে অনুন্নত; কোন জ্ঞান ‘বিশ্বজনীন’, কোন জ্ঞান ‘স্থানীয়’; কোন অর্থনীতি ‘স্বাভাবিক’, কোন অর্থনীতি ‘অদক্ষ’—এই সমস্ত পূর্বনির্ধারিত মাপকাঠিকেও প্রশ্ন করতে হবে।কারণ সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য তখনই ঘটে, যখন শাসিত মানুষ শাসকের ভাষাতেই নিজের পরাজয়কে ব্যাখ্যা করতে শুরু করে।

তাই প্রশ্নখানা শুধু ‘আমেরিকা কী করছে?’ নয়। প্রশ্নটি হল, আমরা কোন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করছি? কার শ্রমের ওপর আমাদের উন্নয়ন দাঁড়িয়ে আছে? কার জমি, কার জল, কার খনিজ, কার সময় এবং কার ভবিষ্যৎ দিয়ে আমাদের সমৃদ্ধি তৈরি হচ্ছে? আর যে উন্নয়ন আমাদের সামনে রাখা হচ্ছে, তার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আসলে কে লাভবান হচ্ছে?

আমাদের সামনে তাই স্বাধীনতার দ্বিতীয় অধ্যায়টি এখনও লেখা বাকি।

প্রথম স্বাধীনতা আমাদের বিদেশি শাসকের কাছ থেকে রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। দ্বিতীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন হল—রাষ্ট্রটিকে কি আমরা পুঁজির শাসন থেকে ফিরিয়ে নিতে পারব? এই প্রশ্নের উত্তর কোনো একটি দেশের সংসদে, কোনো একটি নির্বাচনে, কিংবা কোনো একটি সরকারের হাতে নেই। কারণ নব্যসাম্রাজ্যবাদ আন্তর্জাতিক; তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধও তাই আন্তর্জাতিক হতে বাধ্য। শ্রমিকের লড়াই, কৃষকের লড়াই, ছাত্রের লড়াই, পরিবেশের লড়াই, জ্ঞান ও সংস্কৃতির লড়াই—এগুলি আলাদা আলাদা দ্বীপ নয়। তাদের নিচে যে অর্থনৈতিক সমুদ্র, তার স্রোত একই বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।স্বাধীনতা তাই কোনো সমাপ্তি নয়। স্বাধীনতা একটি অসমাপ্ত প্রক্রিয়া।

১৯৪৭ আমাদের একটি পতাকা দিয়েছিল।
আজকের প্রশ্ন—সেই পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে আমরা কি সত্যিই নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরা নির্ধারণ করতে পারি?

যদি না পারি, তবে ডিকলোনাইজেশন এখনও শেষ হয়নি।

সাম্রাজ্যবাদ তার পোশাক বদলেছে। এবার আমাদেরও তাকে চিনে নেওয়ার চোখ বদলাতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *