প্রতিরোধের ময়দানে ভারত সেরা ইস্টবেঙ্গল

ভারতসেরা ইস্টবেঙ্গল। শিরোনামে। ফ্রন্ট পেজে।


দীর্ঘ অন্ধকারের শেষে মশালের আলো জ্বলে উঠলে একদিকে যেমন অস্তিত্ব জুড়ে আশার সঞ্চার হয়, তেমনই আবার এই আলোর অস্তিত্ব বিশ্বাসে পরিণত হতেও খানিক সময় লাগে! আসলে এখনো বিশ্বাস হচ্ছেনা, ইস্টবেঙ্গল ভারতসেরা হয়েছে। ২২ বছর তীব্র অন্ধকার পেরোনো হাজার হাজার উদ্বাস্তু জনতার কাছে ইস্টবেঙ্গলের লীগ জয়ের মুহূর্তের স্বাদটা অনেকটা এরকমই।


কাঁটাতার পেরোনোর যন্ত্রণার মতো এরাজ্যের উদ্বাস্তু বাঙালের দীর্ঘ ২২ বছরের যন্ত্রণা যেন একরাতে, এক লহমায় মুছে গেছে। পিঠে দাগের টিটকিরি অস্তিত্বের লড়াইয়ের স্পর্ধা হয়ে জেগে উঠেছে ফের। উদ্বাস্তু কলোনি মশাল জ্বালছে আবার।


দ্রুত উৎপাদন, দ্রুত ব্যবহার আর দ্রুত পরিত্যাগের বর্তমানের ফাস্ট ফ্যাশনের মতো একের পর এক কোচ পাল্টেছে ইস্টবেঙ্গল। রাইডার- মরগ্যান- ফালোপা- কোলাসো- এলকো স্যাটোরি- বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য- খালিদ- আলেহান্দ্রো- ফাওলার- কুয়াদ্রাত। জমানা বদলেছে, তবু স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে। বারবার হতাশ হয়ে অবসন্ন ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে স্টেডিয়াম থেকে ফিরতে হয়েছে সমর্থকদের। অনেকবার তীরে এসে তরী ডোবার মতো পরিস্থিতির মধ্যে দিয়েও যেতে হয়েছে ইস্টবেঙ্গলকে।


তবু ইস্টবেঙ্গল হেঁটে গেছে! যেমনটা উদ্বাস্তু মিছিল হেঁটে চলে– পাবনা থেকে পেশোয়ার হয়ে সুদূর প্যালেস্তাইন অবধি! ইস্টবেঙ্গল হেঁটেছে ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে। ভিটেমাটি, স্বজনহারার শোক বওয়া কাঁধের ভার বয়েছে। ঝিনাইদহের কাঠা জমির আলপথ পেরিয়ে বিঘে বিঘে সংগ্রাম লিখেছে। শ্যাওলা জমা ভাঙা পাঁচিলের গা বেয়ে অস্তিত্বের মিছিল করেছে। মানসম্মান খুঁইয়ে ফের মাথা উঁচু করে বাঁচবার রসদ খুঁজেছে। কান্নাভেজা ক্লান্ত শরীর নিয়ে সারিসারি মানুষ মাটির সন্ধানে হেঁটেছে। দল গড়েছে, সংগঠন করেছে, সংঘবদ্ধ হয়েছে। উদ্বাস্তু মানুষ বৃত্ত বড়ো করেছে, কলোনির বস্তিতে যৌথখামার গড়েছে। গড়ে উঠেছে ইউসিআরসি। গড়ে উঠেছে বিজয়গড়- আজাদগড়- সমাজগড় ইত্যাদি আরও কত্তসব গড়। কত্তসব কলোনি। ট্র্যাডিশনাল টিটকিরি থেকে অত্যাধুনিক মিম- ট্রোলের অপমান সয়ে হেঁটেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। রাষ্ট্রের কাগজ দেখতে চাওয়া হায়েনাদের মুখে প্রতিরোধের স্লোগান ছুড়ে হেঁটে গেছে রোজ। স্বপ্ন এসে ধরা দিতে বাধ্য হয়েছে। কিশোরভারতীর সিমেন্টের গ্যালারিতে অঝোরে কেঁদে চলেছেন বছর ৬২-র প্রৌঢ়। বলে চলেছেন– ‘সবাই আওয়াজ দেয়, সবাই আওয়াজ দেয়, আমরা কিছু জিতি না, আমার ৬২ বছর বয়স হয়ে গেল, মরার আগে ভাবিনি আমরা চ্যাম্পিয়ন হব!’ মাঠে নেমে এসেছে আস্ত গ্যালারি! প্রেমিক-প্রেমিকা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে চলেছে। এই কান্না আনন্দের। যন্ত্রণা মুক্তির। প্রশান্তির।


উৎসবের মেজাজে যা লিখতে যাচ্ছি, সেটা হয়তো না লিখলেও চলত। কিন্তু উদ্বাস্তু মন ফের উদ্বাস্তু হতে দেখতে চায়না এই বাংলার উদ্বাস্তু জনতাকে।


উদ্বাস্তু বাঙাল জনতা যেন ফের উদ্বাস্তু হয়েছে। শুধু বাঙাল জনতা বললে অতিসরলীকরণ করা হয়। উদ্বাস্তু হয়েছে পুরো বাঙালি জাতিটাই। নিজের অতীত ইতিহাস থেকে, নিজের লড়াইয়ের আদর্শ থেকে প্রতিদিন উদ্বাস্তু হয়ে চলেছে আপামর বাংলার গণমানুষ। বিচ্ছিন্ন হয়ে চলেছে নিজের শেকড় থেকে। উদ্বাস্তু কবিতায় অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের লেখা এক্ষেত্রে ভীষণ প্রাসঙ্গিক – “কেউ উৎখাত ভিটে-মাটি থেকে, কেউ উৎখাত আদর্শ থেকে।” বহু প্রজন্মের ভিটে, জীবন-জীবিকা, গ্রাম-মহল্লা, সংস্কৃতি, পরিচয় থেকে উচ্ছিন্ন হয় লক্ষ লক্ষ মানুষ। দায় বহন করে যেতে হয় প্রজন্মের পর প্রজন্মকে।


১৯৪৭ উত্তর ভারতবর্ষ জন্ম দিয়েছিল নতুন কিছু শব্দবন্ধের, তাদের মধ্যে অন্যতম শব্দ ‘পার্টিশন’। একে একে এসেছে কাঁটাতার, রিফিউজি, বর্ডার স্লিপ, জবরদখল, পি এল ক্যাম্প! আমাদের প্রজন্মের কাছে কার্যত বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে এসব শব্দ। জায়গা নিয়েছে নতুন সব শব্দ। অনুপ্রবেশ, অবৈধ অনুপ্রবেশ, এনআরসি- সিএএ ইত্যাদি ইত্যাদি! আরএসএসের একপেশে ও বিকৃত ইতিহাস, সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ও বিদ্বেষের রাজনীতি যা জাতপাত, গরিব-বড়লোক,নারীপুরুষে বিভাজন করেছে- সেই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের আগুনে কার্যত ঝাঁপ দিয়েছে বাঙালি। ফের উদ্বাস্তু হয়েছে বাঙালি– নিজের ভাবনা থেকে, নিজের চেতনা থেকে। এরাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই শুরু হয়েছে পুনর্বাসন ছাড়াই হকার উচ্ছেদ। উচ্ছেদকে বৈধতা দিতে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে উন্নয়নের বাণী শোনাচ্ছে যারা– তারমধ্যে একটা বিপুল অংশের পূর্বজরা উচ্ছেদের শিকার হয়েছে। লাগু হয়েছে থ্রিডি মডেলে সিএএ। ডিটেক্ট, ডিলিট আর ডিপোর্ট। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছে– CAA-এর আওতায় যারা নেই, তাদেরকে রাজ্য পুলিশ বিএসএফের হাতে তুলে দেবে। লাখ লাখ বাঙালিকে ফের উদ্বাস্তু হতে হবে। যে বা যারা মনে করছে, এই উদ্বাস্তু হবার লিস্টে শুধু মুসলিমদের নাম সংযোজন হবে, তাদের চিন্তার জগৎকে কবেই উদ্বাস্তু বানিয়ে ছেড়েছে এদেশের ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতি, কর্পোরেট- কমিউনাল রাজনীতি।


ইস্টবেঙ্গল ভারতসেরা হয়েছে। যার দেওয়া গোলের সুবাদে ইস্টবেঙ্গল আজ ভারতসেরা, তার নাম বাশিম রশিদ। রিফিউজি রশিদ। ফিলিস্তিনি রশিদ। যুদ্ধবিধ্বস্ত রশিদ। উৎখাত হবার যন্ত্রণা সঙ্গী করে যেদিন রশিদ কলকাতায় পা রেখেছিল, সেদিন থেকে রশিদের পেছনে পড়েছিল সাম্রাজ্যবাদী ইজরাইলের অনলাইন প্রমোশনে ব্যস্ত ইস্টবেঙ্গল জনতারই একাংশ, যারা আসলে নিজেদের লড়াইয়ের ইতিহাসভাবনা থেকে উদ্বাস্তু হয়ে ফ্যাসিবাদের করাল গ্রাসের শিকার। মনে পড়ে? ১৭ আগস্ট, ২০২৫। ময়দানের বড়োম্যাচের আগেরদিন যখন বাবার মৃত্যুসংবাদ শুনে রশিদ ছুটে গিয়েছিল নিজের দেশে, সেদিনও এরাই রশিদের বাবাকে হামাসের জঙ্গি বানিয়ে ইজরাইলকে ধন্যবাদ জানিয়েছিল। কিন্তু রশিদ আঁকড়ে ধরেছিল ক্লাবটাকে। রশিদ জানতো এটাই তার ঘরবাড়ি, এদেশে তার একমাত্র আস্তানা– কারণ দেশত্যাগের যন্ত্রণা, বাস্তুহারার দৈন্য আর
উদ্বাস্তুর জীবনসংগ্রামের ইতিবৃত্ত কেবল এই ইস্টবেঙ্গলই জানে। “এই সব উদ্বাস্তু মানুষেরা খুঁজে বেড়ায় তাদের দেশ,” –বিষ্ণু দে তার “জল দাও” কবিতায় লিখছে আসলে এই রশিদদের কথা। আল আমনাদের কথা। ইস্টবেঙ্গল এই উদ্বাস্তুদের স্মৃতিতে ঘেরা, স্বপ্নে মাখা একটা আস্ত দেশ। ছিন্নমূলের চার দেওয়াল এক ছাদ। সব আয়লান কুর্দিশের ঘরে ফেরার সিজদা। দেওয়াল তুললেই ঘর, ভেঙে ফেললেই পৃথিবী– এই আপ্তবাক্য থেকে বিস্মৃত হওয়া মানে আপামর বাঙাল জনতার ফের উদ্বাস্তু হওয়া।


ফুটবল একটি আদ্যোপান্ত রাজনৈতিক খেলা! তাই মোহনবাগান গ্যালারিতে যখন বিজেপি নামক একটি অসভ্য, বর্বর দলের পা চেটে টিফো খোলা হয়, মোহনবাগান আল্ট্রাস তার প্রতিবাদ জানায়। সিএএ- এনআরসির বিরুদ্ধে ইস্টবেঙ্গল গ্যালারিতে দেখা যায় “কাগজ আমরা দেখাবো না” টিফো। এই আকালে, বিভেদের রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াইতে আসলে নিজেদের সংঘবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। কেউ একা হাঁটবেনা। না ইস্টবেঙ্গল, না মোহনবাগান। ইংল্যান্ডের বন্দরশ্রমিকদের দল লিভারপুলের সভ্য সমর্থকরা যখন গেয়ে ওঠে “You’ll Never Walk Alone”, কলকাতার কোনো এক কলোনি যেন সেই সুরেই আওড়ে চলে–
“কিছুই কোথাও যদি নেই
তবু তো কজন আছি বাকি
আয় আরো হাতে হাত রেখে
আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি।”


ফুটবল দুনিয়ার এক সমাজতান্ত্রিক ম্যানেজার, বিল শ্যাঙ্কলি বলতেন– আমি বিশ্বাস করি বেঁচে থাকার এবং সত্যিকার অর্থে সফল হওয়ার একমাত্র উপায় হল সম্মিলিত প্রচেষ্টা, যেখানে সবাই একে অপরের জন্য কাজ করবে, সবাই একে অপরকে সাহায্য করবে এবং দিনের শেষে প্রত্যেকেরই পুরষ্কারের ভাগ থাকবে!


ইস্টবেঙ্গল হাঁটবে। উচ্ছেদের বিরুদ্ধে, উৎখাতের বিরুদ্ধে, বিভাজনের বিরুদ্ধে। শুধু ছিন্নমূল বাঙালিই না, আসমুদ্রহিমাচল বাংলা হাঁটবে। শিয়ালদহ স্টেশনের বাইরে গতকাল যেমন হাজার হাজার উৎখাত হওয়া হকারের মুষ্টিবদ্ধ হাত ওপরে উঠেছে, এই হাত ধীরে ধীরে লক্ষ থেকে কোটি হবে। কলুটোলা লেনের কোনো এক গলিতে ফের স্লোগান লেখা হবে– “আমরা উচ্ছেদ চাইনা, আমরা ভালোবাসা চাই”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *