কলকাতার রেড রোড থেকে নোম্যান্সল্যান্ডের কিসসা
ত্রিয়াশা লাহিড়ী
রেড রোডে দু’দিন ‘মোল্লা’রা ঈদের নামাজ পড়লে বহু কলকাতাবাসীর যাতায়াতে ভারী গোঁসা হত৷ যানজটের কারণে অফিস যেতে দেরি হত। এখন বিজেপি সরকারের নিদান অনুযায়ী, ১৪ তারিখ থেকে ২১ তারিখ পর্যন্ত ৭ দিন ধরে রেড রোড বন্ধ৷ ২১ জুন আন্তর্জাতিক যোগা দিবস। ওইদিন কলকাতায় আসবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তার সাথে থাকবেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং কেন্দ্র ও রাজ্যের একাধিক মন্ত্রী। যে রাস্তা নামাজ পড়ার জন্য আধঘন্টা বন্ধ থাকলে যানজটের ঠেলায় কলকাতার বাবু-বিবিরা দুর্ভোগের শিকার হতেন, এখন সাত দিন রাস্তা বন্ধ রেখে যোগাসনের নামে সার্কাস দেখতে তাদের নিশ্চিত খারাপ লাগবে না!
রেড রোডে নামাজ পড়ার ঐতিহাসিক তাৎপর্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছিল দেশভাগের যন্ত্রণার বিনিময়ে। ১৫ আগস্ট, ১৯৪৭। ঠিক তিনদিন পর রমজান মাসের শেষ জুম্মা। দেশভাগের সময় আদর্শগত সংঘাত মুসলমানদের মধ্যে বিভাজনের রেখা এঁকে দেয়। তার আগে পর্যন্ত ঈদের নামাজ পড়া হত শহীদ মিনারের নীচে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে মুসলমানরা দেশভাগকে সমর্থন করেছিল, দেশভাগের বিপক্ষে থাকা মুসলমানরা তাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ পড়তে চায়নি৷ ভারতের মাটিকে ভালোবেসে তারা রেড রোডে নিজেদের ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি দেশভাগের বিরোধিতা করেছিলেন। বিভাজনের বিরুদ্ধে তাদের দৃঢ় অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। বিজেপি-আরএসএস জানে, এই ইতিহাস মুছে ফেলতে না পারলে, মানুষে-মানুষে বিভেদ তৈরি করা যায় না, সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ানো যায় না। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে রামপ্রসাদ বিসমিলের সাথে ছিলেন আসফাকউল্লাহ খান, গান্ধীর পাশে ছিলেন খান আবদুল গাফফার খান, মওলানা আবুল কালাম আজাদ। এছাড়াও স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন সৈয়দ হাসান ইমাম, মহম্মদ আলি, শওকত আলি, আব্দুল বারি, সাইফুদ্দিন কিছলু, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ। এই সংগ্রামে মুসলমান নারীদের কথাও স্মরণ করতে হয়। যাদের নাম বরাবর অতলে তলিয়ে গেছে। বেগম হজরত মহল, হাজারা বেগম, অরুনা আসাফ আলি, রিজিয়া খাতুন, বেগম সখিনা লুকমান, মুনিরা বেগম সহ আরো অনেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়েছেন। আর এদের বিপরীতে, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে আরএসএস-এর অবদান শূন্য। আরএসএস-এর বীর বিপ্লবী বিনায়ক দামোদর সাভারকার জেলে বসে ১০ বার পাতার পর পাতা মুচলেকা লিখে জমা দিয়েছিলেন ব্রিটিশদের কাছে।
রেড রোডে মুসলমানদের পথ আটকে নামাজ পড়া দেখে যারা অত্যন্ত বিরক্ত হত, তারা গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে দু-হাত তুলে ভোট দিয়েছে। তৃণমূলের দুর্নীতি-টুর্নীতি নিশ্চয়ই ফ্যাক্টর। তবে মোল্লাদের টাইট দেওয়াটাও তো একটা ব্যাপার! এখন তাদের সুদিন দেখার পালা। বাংলা জুড়ে বিজেপির শাসন জারি হয়েছে। তাদের স্বপ্নপূরণ হয়েছে৷ বাংলায় পরিবর্তন এসেছে। মুসলমানদের এত বছরের ঈদ-উজ-জোহা পালনের অভিজ্ঞতা রাতারাতি বদলে গেছে। তাদের দীর্ঘদিনের খাদ্যাভাসের অধিকারের উপর একাধিক বিধিনিষেধ আরোপিত হয়েছে। এই ঈদে বাঙালি মুসলমানরা কুরবানি দিয়েছে তাদের ধর্মপালনের সাংবিধানিক অধিকার। তাদের ওবিসি সংরক্ষণ বাতিল হয়েছে। এসআইআর-কে ঢাল করে, সুপরিকল্পিত ভাবে বহু সংখ্যালঘুর ভিটেমাটি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বিজেপির বিধায়করা বেলগাছিয়ার মতো জায়গায়, মঞ্চ থেকে হুঙ্কার ছেড়ে বলেছেন, মুসলিমদের কোনোরকম সরকারি প্রকল্পের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে না। তোপসিয়ায় বেছে বেছে মুসলমানদের বাড়িতে বুলডোজার চলেছে। বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, মুসলমানরা সত্যিই প্রতিনিয়ত আতঙ্কে ভুগছে। যেকোনো ধরনের ঝামেলা এড়াতে প্রায় সমস্ত আক্রমণই এখনো অবধি তারা নিশ্চুপে মেনে নিয়েছে। কিন্তু এতকিছুর পর হিন্দুদের কি কোনো লাভ হল?
লাভ কী হল জানিনা! তবে আমাদের চোখের সামনে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের ক্ষতির লিস্টিটা দিন দিন নিঃসন্দেহে বাড়ছে। প্রথমে মুসলমানদের টাইট দিতে গিয়ে হিন্দু গোরু ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলেন৷ হাটে গোরু নিয়ে গিয়ে তারা ঘরে ফিরে গেলেন। মুসলমানরা গোরু কিনলেন না। এরপর নির্বিচারে লাগাতার হকার উচ্ছেদ শুরু হল৷ বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেওয়া হল খেটে খাওয়া মানুষের ঘরবাড়ি-দোকানপাট। আজ তাদের মাথার উপর ছাদ নেই৷ উজাড় হয়ে বসে আছেন খোলা আকাশের তলায়। গরীব-গুর্বো মানুষগুলো ক্ষমতার রাজনীতির কাছে হেরে গিয়ে কোনোরকমে দিন গুজরান করছেন৷ গর্ভবতী-প্রসূতি মায়েদের শরীর-স্বাস্থ্যের কথাও ভাবেনি বিজেপি সরকার। ভেঙে দেওয়া বাড়িগুলোর পড়ুয়াদের স্কুলের জামা, বইখাতা, অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রী কোথায়, কেউ জানেনা। ওরা কবে আবার স্কুলে যাবে? আদৌ যাবে?
বামপন্থী দলগুলো বরাবরের মতো সহায়সম্বলহীন মানুষের পাশে থাকার যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। রাজপথ থেকে আইনি লড়াইতে তারাই এখনো গরীবের হকের দাবিতে লড়ছে। বুলডোজারের সামনে থেকে লড়েছেন বাংলার আপামর বিজেপি-বিরোধী জনগণ। ৮০ জন বিধায়ক থাকা সত্ত্বেও যখন পশ্চিমবাংলার প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে, তখনও শেষতক লড়াই চালিয়েছেন বামপন্থী দলসমূহ। যাদবপুরে পুলিশের লাঠির মুখে পিছু হটেনি তারা। রক্ত ঝরেছে, তবু বিনা যুদ্ধে জমি ছাড়েনি। প্রিজন ভ্যানেও হাতে শক্ত করে ধরে রেখেছে সংবিধান। হকার পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের যেকোনো সমস্যায় পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে ভারতের ছাত্র ফেডারেশন। হাবড়ায় কমিউনিটি কিচেন চলছে সিপিআই(এম)-এর পক্ষ থেকে। উচ্ছেদ হওয়া মানুষেরা বিজেপিকে ভোট দিয়ে আজ আক্ষেপ করছেন। তারা বলছেন, যেদিন বাড়ি ভাঙা হয়েছে, সেই রাত থেকে একমাত্র লাল ঝান্ডাই তাদের খবর রেখেছে। অন্য কোনো দলের কোনো নেতা, কোনো মন্ত্রী, কিংবা বিধায়ক— কাউকে তারা এই দুর্দিনে পাশে পায়নি।
হকার উচ্ছেদকে সমর্থন করছিলেন অনেকেই। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে এতগুলো পরিবারকে পথে বসিয়ে দিতে দেখে অনেকে পৈশাচিক আনন্দে মেতে উঠেছিলেন। তবে ট্রেনে চলাচল করা নিত্যযাত্রীরা হকার উচ্ছেদের পর ব্যাপক সমস্যায় পড়েছেন৷ আগে যে দামে স্টেশন থেকে একটু চা, মুড়ি, পরোটা, ঘুগনি কিনে খাওয়া যেত; হলদিরাম, মিও আমোর বা ওয়াও মোমোর মতো ঝাঁ চকচকে বড়সড় দোকানগুলোতে ওই দামে যে কিছুই পাওয়া যাবে না, সে কথা তারা জানেন। আমরাও জানি, গরীবের ছোটখাটো দোকানগুলোর জায়গায় তৈরি হবে অনেক অনেক বেসরকারি দোকান৷ যেমনটা হয়েছে শিয়ালদহ স্টেশনে, যেমনটা হয়েছে হাওড়া স্টেশনে। খাবারের দোকান থেকে শপিং মল, গয়নার দোকান– সবই দখল করবে স্টেশন চত্বর। ট্রেনে যারা রোজ যাতায়াত করেন, তাদের নাগালের বাইরেই থাকবে সেসব দোকানের যাবতীয় দ্রব্য৷ এমনকি আজ যারা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন, তাদের মধ্যেও অনেকে এই সমস্যার সম্মুখীন হবেন বৈকি!
ক্ষমতায় আসার আগে শুভেন্দু অধিকারী পূর্ব মেদিনীপুরের সভা থেকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বিজেপি বাংলায় ক্ষমতায় আসলে গ্যাসের দাম ৪৫০ টাকা হবে৷ সেই প্রতিশ্রুতির কথা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বাড়ল রান্নার গ্যাসের দাম, পেট্রোল-ডিজেলের দাম। প্রায় ৯০০টি জরুরি ওষুধের দাম বেড়েছে ১০ শতাংশ পর্যন্ত। জনসাধারণের পকেটে টান। এখন পেটের ভাতটুকু জোটাতে হিমশিম খেয়ে উঠছেন নিন্ম-মধ্যবিত্তরাও। দিন আনা দিন খাওয়া মানুষগুলো অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের রাজ্যেরই কি এমন বেহাল দশা? বলা বাহুল্য, ১২ বছর ভারতীয় জনতা পার্টি কেন্দ্রের মসনদে বসে দেশীয় সম্পদের সিংহভাগ ধীরেসুস্থে নানা চক্রান্ত করে আম্বানি-আদানিদের হাতে তুলে দিয়েছে। রেল, শিল্প, ব্যাঙ্ক, বীমা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জল, জঙ্গল, জমিন; সবই এখন পুঁজিপতিদের দখলে। যার ফলে দেশের অর্থনীতি কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। গত ৫০ বছরে ভারতে সর্বোচ্চ বেকারত্ব তৈরি হয়েছে। রেকর্ড গড়েছে মোদী সরকার। পড়ুয়ারা পড়াশোনা ছেড়ে অসংগঠিত ক্ষেত্রে সস্তার শ্রমিক হিসেবে জোম্যাটো, সুইগি, ব্লিঙ্কিট, র্যাপিডো, ওলা, উবার, ইনড্রাইভ, জেপটোর মতো কোম্পানিগুলোতে কাজ করছে। এই গিগ ওয়ার্কারদের না আছে মান, না আছে জীবনের দাম। আর যেটা নেই, সেটা আরো অনেকেরই নেই— ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। বহু শিক্ষিত বেকার যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির খোঁজ করছে৷ প্রত্যেক বছর বিভিন্ন প্রবেশিকা পরীক্ষা, চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। তারপরও এনটিএ-এর মতো দুর্নীতিগ্রস্ত বেসরকারি সংস্থাকেই পুনরায় সেসব পরীক্ষাগুলো নেওয়ার দায়িত্ব দিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার। গত ৩ মে নীট পরীক্ষা বাতিল হওয়ার পরে এখনও পর্যন্ত ১১ জন পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। দেশ জুড়ে শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করছে৷ নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার বিরোধিতা করে সরব হয়েছে এসএফআই সহ বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্র সংগঠন। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয়, এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধতার স্বর কিছুতেই বিজেপির মন্ত্রীদের কানে পৌঁছাচ্ছে না। নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে তারা নির্লজ্জের মতো প্রতিবাদী পড়ুয়াদের উপর নির্মম আক্রমণ করছে।
ইতিমধ্যে একটি মর্মান্তিক ঘটনা দেখলাম সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে। বিহারে চাকরির পরীক্ষা দিতে যাবার পথে ট্রেনের অতিরিক্ত ভীড়ে অক্সিজেনের অভাবে একজন চাকরিপ্রার্থীর মৃত্যু হয়েছে। এই লজ্জাজনক ঘটনার দায় নেবে না বিজেপি সরকার? বিজেপির নেতারা ভোটের আগে বলেছিল, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসলে বেকার যুবদের অ্যাকাউন্টে ৩,০০০ টাকা করে ঢুকবে৷ মহিলারা ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর ১,৫০০ টাকা পেতেন। সেই টাকাও বেড়ে হবে ৩,০০০৷ কারোর অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকেছে? এখন ফর্ম ফিল আপের জটিলতায় সাধারণ মানুষ জেরবার। কথা ছিল, সরকারি চাকরিজীবীদের বকেয়া ডিএ মিটিয়ে দেবে নতুন সরকার। মিটিয়েছে? অন্তত বেছে বেছে হিন্দুদের তো এই সুযোগগুলো দিতে পারত! উপরন্তু, সরকারি চাকরিজীবীদের উপর নানাধরণের ডু’জ অ্যান্ড ডোন্ট’স-এর ফিরিস্তি চাপানো হয়েছে। তারা সামাজিক মাধ্যমে কী করবেন, কোথায় যাবেন, কোথায় কী বলবেন, কী লিখবেন— সব ঠিক করে দেবে বিজেপি সরকার৷ অর্থাৎ যারা সরকারি চাকরি করবেন তাদের সকলকে শুভেন্দু অধিকারীদের অঙ্গুলিহেলনে চলতে হবে। তাদের অভিধান থেকে ‘ব্যক্তিস্বাধীনতা’ শব্দটাই মুছে ফেলতে হবে৷ এতদিন বাজারে ছিল ‘কর্পোরেট স্লেভ’৷ বিজেপির আমলে কি তবে সরকারি চাকুরিজীবীরা হবেন ‘গভর্মেন্ট স্লেভ’?
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়িতে সবার আগে স্মার্ট মিটার বসাতে হবে। তারপর বাকিদেরও ঘরে ঘরে স্মার্ট মিটার বসানো বাধ্যতামূলক করা হবে। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার বহুদিন ধরেই বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ বন্টনের বেসরকারিকরণ করতে চাইছে৷ সেই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রয়োজন প্রিপেড স্মার্ট মিটার। যে স্মার্ট মিটারের বেসরকারি মালিক, গ্রাহকের উপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দেবে৷ আগে বিদ্যুৎ পুড়লে যে বিল আসত, স্মার্ট মিটার বসানোর পর সেই বিল কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। আর তার সাথে সাথে সরকারি বিদ্যুৎ পরিষেবা চলে যাবে বেসরকারি সংস্থাগুলোর হাতে। পুঁজিপতিরা মুনাফা লুটবে গরীব-মধ্যবিত্তের রক্ত শুষে৷ বিদ্যুতের দাম হবে আকাশছোঁয়া। এক্ষেত্রেও কি হিন্দুরা বিশেষ কোনো সুবিধা পাবে?
কোথাও কোথাও তো আবার হিন্দুবীরদের দাপাদাপিতে হিন্দুদেরই প্রাণ ওষ্ঠাগত! হিন্দুদের বাড়ির পাঁচিলে হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি কেন থাকবে— সেই নিয়ে একটা হুলুস্থুল কান্ড করেছে তারা। হকার উচ্ছেদের সময় যত দোকান ভেঙেছে, তার মধ্যে বেশিরভাগ দোকানেই হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি বা ছবি ছিল৷ বিজেপির বুলডোজার বাছাই করেছে সেসব? বাদ দিয়েছে তাদের? হিন্দুদের রুটি-রুজির সংস্থান রেহাই পেল? বিজেপি বলেছিল, এসআইআর করে রোহিঙ্গাদের খুঁজে তাদের দেশছাড়া করবে৷ দেখা গেল, এসআইআর-এ বাদ যাওয়া ৯১ লাখ নামের ৬৩ শতাংশই হিন্দু। ভোটাধিকার খর্ব হল তাদেরও। নোটবন্দির পর ভোটবন্দির ফলে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে হয়ারানির শিকার হলেন সকলেই।
ইদানীংকালে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বিজেপি মব কালচারকে স্বাভাবিক করে তুলেছে৷ প্রায় রোজই দেখছি, দেশের আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে পুলিশ কাউকে অর্ধনগ্ন করে ঘোরাচ্ছে, কারোর কোমরে দড়ি পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এসব মধ্যযুগীয় বর্বরতা দেখে কোনো প্রগতিশীল মানুষ খুশি হতে পারে না। অবিশ্যি রাজ্যে ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতায় থাকলে মব কালচারের উত্থান হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিছুদিন আগে, কুলতলিতে কেরালা থেকে আসা এক ব্যক্তিকে, তার ভাষা বুঝতে না পেরে, চোর ‘কিংবা’ ছেলেধরা সন্দেহ করে লোকজন তার কোমরে দড়ি বেঁধে বেধড়ক পিটিয়েছে। এই গণপিটুনি মবতন্ত্রের ফসল। যে দেশে গণতন্ত্র থাকে, সংবিধান থাকে, আইন থাকে; সেই দেশে আইনানুসারে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত হওয়া, এবং তারপর অভিযুক্ত দোষী প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী তাদের শাস্তি দেওয়ার রীতি প্রচলিত থাকার কথা। পূর্ববর্তী রাজ্য সরকারের দল ভেঙে যাওয়ায় অনেকেই খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়ছেন। প্রাক্তন বিধায়কদের ডিম ছুঁড়ে মারা, তাদের গাড়ি ভাঙচুর করা, গায়ে হাত তোলা, এমনকি মহিলা সমর্থকের জামা টেনেহিঁচড়ে ছিঁড়ে ফেলার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনাকে জনগণের নামে চালিয়ে দেওয়া যে বিজেপির স্ট্র্যাটেজি, তা বুঝে নেওয়া তেমন কঠিন কাজ নয়। যেকোনো বামপন্থী-প্রগতিশীল-সাধারণ সুনাগরিকের এই মব কালচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো আজ এই সময়ের দাবি। যারা আজ এই মবতন্ত্রকে, এই উগ্রপন্থাকে, বুঝে অথবা না বুঝে তোল্লাই দিচ্ছেন— মনে রাখবেন, ভবিষ্যতে আপনি কখনো বিজেপি সরকারের বিরোধিতা করলে ওরা আপনাকেও ছাড়বে না। যে ভয়াল সময়ের মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি, যখন সমস্ত ক্ষমতার রাশ হাতে নিয়ে বসে আছে সর্বগ্রাসী ফ্যাসিস্ট সরকার, তখন আমাদের সকলের ফ্যাসিবাদকে আরো গভীর মনোযোগের সাথে চিনে নেওয়ার, বুঝে নেওয়ার প্রয়োজন আছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাভাষী মুসলমানদের সঠিক আইনি প্রক্রিয়া না মেনে বাংলাদেশে জোরপূর্বক ‘পুশ ইন’ করতে চাইছে ভারত সরকার। ভারত সরকার যাদের ‘বাংলাদেশি’ বলে দাগিয়ে দিচ্ছেন, তারা অনেকেই দাবি করেছেন তাদের ভোটার কার্ড, আধার কার্ড সহ অন্যান্য পরিচয়পত্র রয়েছে। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসে ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’-এই নীতির মাধ্যমে, কমপক্ষে শ-খানেক মানু্ষকে বেআইনিভাবে ‘অনুপ্রবেশকারী’র তকমা দিয়েছে৷ তাদের ভারতের সীমান্তরক্ষীরা রাতের অন্ধকারে কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে ওপার বাংলায় পাঠানোর চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা৷ পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে যখন ‘ডিম থেরাপি’ চলছে, তখন সীমান্তে বসে আছে বুভুক্ষু মায়েরা৷ সন্তানদের বুকে আঁকড়ে ধরে অপেক্ষায় আছে তারা। নাওয়া নেই৷ খাওয়া নেই৷ ঝড়-বাদলের রাত পেরোচ্ছে দু-দেশের মাঝে বসে। ইশ! যদি কেউ নোম্যান্সল্যান্ডের নিরুপায় শিশুদের দিকে কয়েকটা ডিম ছুঁড়ে দিত!
আমরা দেশভাগ দেখিনি। কিন্তু এখন বোধহয় দেশভাগের ক্ষত-বিক্ষত রূপের কিছুটা ছবি দেখছি৷ মিল কি নেই একেবারেই? ওই ন্যালাখ্যাপা লোকটা, যাকে নিয়ে দু-দেশের সীমান্তরক্ষীরা বিবাদে জড়িয়ে পড়ল– তার জন্ম কোথায়? তার কাছে যারা বৈধ নথিপত্র চায়, তারা কোনোদিন দু-বেলা দু-মুঠো খাবার জোগাড় করে দিয়েছে? তার কাছে কি সত্যিই মানচিত্রের কোনো গুরুত্ব আছে, অথবা থাকা উচিৎ? সে চিনেছে সর্ষে ক্ষেতের চোখ ধাঁধানো হলুদ ফুল। সেই ফুলের দলেরও কি আদৌ কোনো দেশ আছে? শুকনো মুখের কিশোরী রোজিনা কি জানে দেশের সংজ্ঞা? কোন দেশ নেবে তাদের? কোথায় যাবে তারা? লক্ষ্মী-রুকসানারা কবে পাবে তাদের ঠিকানা? শঙ্খ ঘোষের ‘দেশান্তর’ কবিতার শেষ অংশটি যেন সারা বিশ্বের এমন লাখো লাখো উদ্বাস্তুদের জন্যই লেখা— “তারপর, ভোরের সামান্য আগে / সীমান্তসান্ত্রির গুলি বুকে এসে লাগে— / মরণের আগে ঠিক বুঝতেও পারি না আমি শরীর লুটাব কোন্ দেশে।”