বিপ্লবী চে ও আজকের Gen-Z
সায়ন্তন বসু
চে-কে স্মরণ করার অর্থ তাই কেবল তাঁর ছবি বহন করা বা পোস্টারে স্থান দেওয়া নয়। প্রকৃত অর্থে চে-কে স্মরণ করা মানে সেই রাজনৈতিক সাহসকে ধারণ করা, যা প্রচলিত ব্যবস্থার সামনে প্রশ্ন তুলতে শেখায়। সেই মানবিক সংবেদনশীলতাকে ধারণ করা, যা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের নিপীড়িত মানুষের যন্ত্রণাকে নিজের যন্ত্রণা বলে অনুভব করতে শেখায়। সেই স্বপ্নকে ধারণ করা, যা বিশ্বাস করে যে মানুষের মুক্তি, সাম্য এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ কেবল কল্পনা নয়, সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জনযোগ্য বাস্তবতা।
তথ্যের বিস্ফোরণের যুগে দাঁড়িয়ে আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও, সত্যের সংকট ক্রমশ গভীরতর হচ্ছে। স্মার্টফোনের স্ক্রিনে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের খবর অপর প্রান্তে থাকা মানুষের কাছে নিমেষে পৌঁছে গেলেও, একই সময়ে এক অদৃশ্য শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে মানুষের চিন্তা, পছন্দ-অপছন্দের অনুভূতি এবং ব্যক্তিসত্তা। প্রযুক্তি আমাদের কাছে পৃথিবীকে অনেক সহজে এনে দিলেও, বহু ক্ষেত্রে তা আমাদের সরিয়ে দিচ্ছে নিজেদের কাছের মানুষদের থেকেই।
আজকের বিশ্বের তথাকথিত সামাজিক মাধ্যম ইনস্টাগ্রাম রিলস কিংবা ফেসবুকের অন্তহীন গোলকধাঁধায় আবদ্ধ থাকা মস্তিষ্কের কারণে অচিরেই বদলে যাচ্ছে বাইরের দুনিয়া। সেকেন্ডের ভগ্নাংশে বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট। কোথাও যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো দেশের শিশুর কান্না, আর তার ঠিক পরেই কোনো ইনফ্লুয়েন্সারের দামি ব্র্যান্ড রিভিউ, তার পরেই পুঁজিবাদী সাফল্যের চটকদার ‘লাইফ হ্যাকস’ আর সবশেষে একটা ১০ সেকেন্ডের মিম, যা এই অদ্ভুত, খণ্ডিত বাস্তবতাকে কেবলই উপহাস করছে।
ডিজিটাল দুনিয়ার এই তীব্র কোলাহলের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে যে জেনারেশনটি শ্বাস নিচ্ছে, সমাজ তাকে নাম দিয়েছে ‘Gen-Z’ বা জেনারেশন জেড। কিন্তু, এই নামের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর, দীর্ঘশ্বাসে ভরা মনস্তাত্ত্বিক সংকট। এই প্রজন্ম ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি সংযুক্ত প্রজন্ম, আবার একই সাথে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি আইসোলেটেড প্রজন্মও বটে। আমাদের আজকের এই প্রজন্মের সামনে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে এক মরীচিকা “তুমি যা চাও, তা-ই হতে পারো” বা “Live Your Life, As You Want.” কিন্তু, বাস্তবতার মাটিতে পা রাখতেই দেখা যাচ্ছে কর্পোরেট দাসত্ব, লাগামহীন ইঁদুর দৌঁড়ের প্রতিযোগিতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা একটা গ্রহ, আর এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা যা মানুষকে কেবলই এক বাজারি পণ্য বা রোবট বানাতে শেখায়। যেখানে আমাদের প্রত্যেককে নিয়ন্ত্রিত হতে হয় কর্পোরেট দুনিয়ার দ্বারা।
তাই, আজকের বিশ্বে Gen-Z প্রজন্মের সংকটটা হয়তো ভাতের নয়, বরং সংকটটা ভাতের ভেতরে থাকা সেই তৃপ্তির অভাবের। সংকটটা স্বপ্নের। Gen-Z আজ এমন এক পৃথিবীতে বড় হচ্ছে যেখানে প্রতিটা অনুভূতিকে মনেটাইজ করা হয়। মানুষের দুঃখের জন্য অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট আছে, একাকীত্বের জন্য রয়েছে একাধিক ডেটিং অ্যাপস, ক্ষোভ উগরে দেওয়ার জন্য রয়েছে নিজস্ব “X handle.”
তবে এত কিছু থাকা সত্ত্বেও যা নেই, তা হলো একটি আস্থার জায়গা, একটি জ্বলন্ত আদর্শ, যার জন্য বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো যায়। চতুর্দিকে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদের সম্প্রসারণের সামনে দাঁড়িয়ে যখনই কোনো তরুণ সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখে, ঠিক তখনই পুঁজিবাদ তাকে আলগোছে গিলে নিয়ে তার ক্ষোভটাকে টি-শার্টের প্রিন্ট বানিয়ে বাজারে বিক্রি করে দেয়।
ঠিক এই শূন্যতার বিন্দুতেই, এই গভীর মনস্তাত্ত্বিক হাহাকারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একজন মানুষের নাম Gen-Z এর বুকের ভেতর এক তীব্র বৈদ্যুতিক তরঙ্গের মতো আঘাত করতে পারে। যিনি কোনো কাল্পনিক মার্ভেল সুপারহিরো নন, নন কোনোও কর্পোরেট সি ই ও। তিনি একজন রক্তমাংসের মানুষ, যিনি আজ থেকে প্রায় সাত দশক আগে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে এক অদ্ভুত আগুন জ্বালিয়েছিলেন।
আলবের্তো কোর্দার ক্যামেরায় বন্দী সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, এলোমেলো চুল আর অদম্য আত্মবিশ্বাসে ভরা মুখ। সেই মুখ আর্নেস্তো “চে” গেভারার।
Gen-Z নজরে চে ও আজকের পুঁজিবাদ
আজকের প্রজন্ম যাদের আমরা Gen-Z নামে চিনি, তারা জন্মেছে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের বহু বছর পরে। তারা কখনও শীতল যুদ্ধ দেখেনি, কিউবার বিপ্লব প্রত্যক্ষ করেনি, কিংবা লাতিন আমেরিকা, গেরিলা সংগ্রামের উত্তাল দিনগুলোরও সাক্ষী নয়। তাদের রাজনৈতিক চেতনা গড়ে উঠেছে অ্যালগরিদম, রিলস, শর্ট ভিডিও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল পুঁজিবাদের যুগে। তবুও এই প্রজন্মের এক বড় অংশ আজও চে-র প্রতি আকৃষ্ট হয়।
চে গেভারার সময় এবং আজকের সময়ের মধ্যে পার্থক্য বিশাল। চে-র পৃথিবীতে বন্দুক, গেরিলা সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক লড়াই ছিল দৃশ্যমান বাস্তবতা। আজকের পৃথিবীতে শোষণের রূপ অনেক বেশি জটিল, অনেক বেশি অদৃশ্য। একবিংশ শতাব্দীর পুঁজিবাদ কেবল শ্রমকে শোষণ করে না; মানুষের মনোযোগ, আবেগ, স্বপ্ন এবং কল্পনাকেও পণ্যে পরিণত করে। প্রযুক্তির বিস্ফোরণ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিস্তার এবং তথ্যপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতি মানবসভ্যতার জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিলেও এর সঙ্গে তৈরি হয়েছে নিয়ন্ত্রণের নতুন কাঠামো।
আজকের Gen-Z ইতিহাসের প্রথম প্রজন্ম, যারা জন্মের পর থেকেই ডিজিটাল পরিসরের মধ্যে বেড়ে উঠেছে। তাদের বন্ধুত্ব, বিনোদন, শিক্ষা, মতামত, এমনকি আত্মপরিচয়ের একটি বড় অংশও গড়ে উঠছে কর্পোরেট মালিকানাধীন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে। ফলে তারা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে মানুষ শুধু পণ্য কেনে না, মানুষ নিজেও এক ধরনের পণ্যে পরিণত হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যালগরিদমগুলো মানুষের মুক্ত চিন্তা গড়ে তোলার জন্য তৈরি হয়নি। এগুলো তৈরি হয়েছে মানুষের মনোযোগকে অনির্দিষ্ট এবং দীর্ঘ সময় আটকে রাখার জন্য। কারণ, মানুষের মনোযোগই আজকের ডিজিটাল অর্থনীতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। একজন তরুণ কতক্ষণ স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকবে, কী দেখবে, কী নিয়ে উত্তেজিত হবে, কী নিয়ে রাগ করবে, কোন বিষয়ে নীরব থাকবে এসবই ক্রমশ কর্পোরেট অ্যালগরিদমের প্রভাবাধীন হয়ে পড়ছে।
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, এটি মানুষকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছে যে ভোগই স্বাধীনতা, বাজারই পছন্দের একমাত্র উৎস এবং ব্যক্তিগত সাফল্যই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। ফলে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্নকে প্রতিস্থাপন করেছে ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড গড়ে তোলার প্রতিযোগিতা। সংগ্রামের জায়গা নিয়েছে ‘সেলফ-অপ্টিমাইজেশন’, রাজনৈতিক অংশগ্রহণের জায়গা নিয়েছে ‘কনটেন্ট ক্রিয়েশন’, আর সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা নিয়েছে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার হিসাব।
কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়। যে প্রজন্মকে প্রতিনিয়ত বলা হয় ‘তুমি চাইলে সব পারবে’, সেই প্রজন্মেরই লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী বেকারত্ব, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, ক্রমবর্ধমান শিক্ষাব্যয় এবং মানসিক চাপের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে। যে প্রজন্মকে সীমাহীন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখানো হয়, তার বড় অংশই দেখতে পাচ্ছে যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতা ক্রমশ অল্প কয়েকটি কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।
এই বৈপরীত্যই নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে,
কেন প্রযুক্তিগত অগ্রগতির যুগেও বৈষম্য বাড়ছে?
কেন উৎপাদনশীলতা বাড়লেও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা কমছে? কেন পৃথিবীতে খাদ্য উৎপাদন পর্যাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও কোটি কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত? কেন শিক্ষা মৌলিক অধিকার না হয়ে ক্রমশ ব্যয়বহুল পণ্যে পরিণত হচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই বহু তরুণ আবার ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাচ্ছে। ফিরে তাকাচ্ছে মার্ক্স, লেনিন, ভগৎ সিং এবং চে গেভারার মতো ব্যক্তিত্বদের দিকে। চে-র গুরুত্ব এখানেই। তিনি শুধু বিদ্রোহের রোমান্টিক প্রতীক নন, তিনি এমন এক রাজনৈতিক চেতনার প্রতিনিধি, যা মানুষকে শেখায় প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করতে। তিনি মনে করিয়ে দেন, ইতিহাসের প্রতিটি অন্যায় একসময় স্বাভাবিক বলে মনে করা হতো, যতক্ষণ না কেউ তাকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস দেখিয়েছে।
তবে আজকের বিশ্বে কেন “চে”-এর এই প্রাসঙ্গিকতা এবং কেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছাত্র আন্দোলন, যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ, বর্ণবৈষম্য বিরোধী সংগ্রাম কিংবা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মিছিলে চে-র ছবি বারবার ফিরে আসে?
চির প্রাসঙ্গিক “চে”
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে চে-কে শুধু একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখলে চলে না, বরং তাকে দেখতে হবে এক বৈপ্লবিক ধারণা রূপে। কারণ চে কেবলই একজন মানুষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন অন্যায়কে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে অস্বীকার করার এক রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান। তিনি ছিলেন সেই যুবকের প্রতীক, যিনি এই পৃথিবীকে যেমন রয়েছে তেমনভাবে না মেনে নিয়ে বরং যেমন হওয়া উচিত তেমনভাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
আজ যখন শিক্ষা ক্রমশ পণ্যে পরিণত হচ্ছে, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা লক্ষ লক্ষ যুবকের ভবিষ্যৎকে গ্রাস করছে, কর্পোরেট মুনাফা মানুষের প্রয়োজনের উপরে স্থান পাচ্ছে এবং যখন যুদ্ধ ও আগ্রাসনকে নতুন নতুন যুক্তিতে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে, তখন চে-র প্রশ্নগুলো আবারও ফিরে আসে, নতুন করে হয়ে ওঠে প্রাসঙ্গিক। তাই চে-কে বুঝতে হলে তাঁর ছবি নয়, বরং বুঝতে হবে তাঁর স্বপ্নকে; রোমান্টিক কিংবদন্তি সত্তার ঊর্ধ্বে গিয়ে বুঝতে হবে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনকে। আর সেই কারণেই একবিংশ শতাব্দীর Gen-Z এর কাছে চে গেভারা শুধুমাত্র অতীতের কোনো বিপ্লবী নন, বরং বর্তমানের এক জীবন্ত রাজনৈতিক উপস্থিতি।
১৯৫০ এর দশকের কিউবা মার্কিন পুঁজির নিয়ন্ত্রণাধীন থাকাকালীন দেশের সম্পদ, শিল্প ও কৃষির বড় অংশ বিদেশি কর্পোরেট স্বার্থের হাতে বন্দি ছিল। অন্যদিকে কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের জীবন ছিল দারিদ্র্য ও বঞ্চনায় পরিপূর্ণ। এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে শুরু হয় সশস্ত্র সংগ্রাম, যার অন্যতম সংগঠক হয়ে ওঠেন চে গেভারা।
মেক্সিকোতে ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে পরিচয়ের পর চে উপলব্ধি করেছিলেন, যে লাতিন আমেরিকার মানুষের দারিদ্র্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি ছিল সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফল। সেই উপলব্ধিই তাঁকে বিপ্লবের পথে নিয়ে আসে। ১৯৫৬ সালে “গ্রানমা” নৌযানে করে কিউবায় প্রবেশের পর শুরু হয় দীর্ঘ গেরিলা যুদ্ধ। সিয়েরা মায়েস্ত্রা পর্বতমালার দুর্গম অঞ্চল থেকে চে ও তাঁর সহযোদ্ধারা ধীরে ধীরে জনগণকে সংগঠিত করেন। কৃষকদের আস্থা অর্জন, শোষণের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চেতনা গড়ে তোলা এবং সশস্ত্র প্রতিরোধ এই তিনের সমন্বয়েই এগিয়ে যায় বিপ্লব।
১৯৫৮ সালের “সান্তা ক্লারার যুদ্ধ” ছিল সেই সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। চে-র নেতৃত্বে বিপ্লবী বাহিনীর বিজয় বাতিস্তা সরকারের পতনের পথ প্রশস্ত করে। অবশেষে ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি কিউবা বিপ্লব বিজয়ী হয়। এই বিজয় শুধু কিউবার জনগণের নয়, এটি ছিল বিশ্বের সমস্ত নিপীড়িত মানুষের জন্য আশার বার্তা। একটি ছোট দেশও যে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে, কিউবা সেই শিক্ষা দিয়েছিল।
কিন্তু, চে গেভারার গুরুত্ব কেবল তাঁর অতীতের বিজয়ে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। চে ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন প্রতিরোধের প্রতীক।
আজকের পৃথিবী প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হলেও বৈষম্য, যুদ্ধ, কর্পোরেট লুণ্ঠন ও পরিবেশ ধ্বংসের সংকট আরও গভীর হয়েছে। একদিকে কয়েকজন ধনকুবেরের হাতে বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, অন্যদিকে কোটি কোটি মানুষ বেকারত্ব, অনিশ্চয়তা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছে। ডিজিটাল যুগে মানুষের চিন্তা ও সংস্কৃতিকেও বাজারের পণ্যে পরিণত করা হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় চে-র জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ইতিহাস কখনোই কেবল ক্ষমতাবানদের দ্বারা নির্মিত হয় না,সংগঠিত মানুষের সংগ্রামও ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
ফলে আদর্শকে পুরনো তকমা দেওয়ার সময়ে বেড়ে ওঠা Gen-Z, সহজেই আকৃষ্ট হয় তাঁর প্রতি।
কারণ চে গেভারা দেখিয়েছিলেন যে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান, শোষিত মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং পরিবর্তনের জন্য আত্মত্যাগের মানসিকতা সমাজকে বদলে দিতে পারে। তাঁর প্রাসঙ্গিকতা এখানেই তিনি শেখান, নিরপেক্ষতার আড়ালে থেকে প্রশ্নহীন আনুগত্যের উর্ধ্বে প্রশ্নসাপেক্ষ স্বাধীনতাকে বেছে নিতে।
তাই চে গেভারা কেবল একটি টি-শার্টের ছবি নন, নন কেবল মাত্র কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র। তিনি এমন এক ধারণার নাম, যা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায় এবং একটি শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখতে সাহস জোগায়। যতদিন পৃথিবীতে বৈষম্য, শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদ থাকবে, ততদিন চে গেভারার নাম সংগ্রামী মানুষের কণ্ঠে ফিরে আসবে।
অপরাজেয় উত্তরাধিকার
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শোষণের ভাষা বদলেছে, ক্ষমতার রূপ বদলেছে, বদলেছে নিয়ন্ত্রণের কৌশল । কিন্তু বৈষম্য, বঞ্চনা এবং মানুষের উপর মানুষের আধিপত্যের বাস্তবতা এখনও রয়ে গেছে। আজকের পৃথিবীতে বন্দুকের চেয়ে অ্যালগরিদম অনেক বেশি শক্তিশালী, সেনা ঘাঁটির পাশাপাশি রয়েছে ডেটা সেন্টার, উপনিবেশবাদের পুরনো কাঠামোর পাশাপাশি রয়েছে কর্পোরেট আধিপত্যের নতুন জাল। কিন্তু শোষণের চরিত্র যতই আধুনিক হোক, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রয়োজনীয়তা কখনও পুরোনো হয় না।
এই কারণেই চে-র উত্তরাধিকার এখনও জীবন্ত। Gen-Z-এর একাংশের কাছে চে-র প্রত্যাবর্তন আসলে কোনো ব্যক্তির প্রত্যাবর্তন নয়, এটি প্রশ্ন করার সাহসের প্রত্যাবর্তন। এটি এমন এক সময়ে বিকল্প সমাজের স্বপ্ন দেখার প্রত্যাবর্তন, যখন পুঁজিবাদ নিজেকে ইতিহাসের শেষ ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
যখন কোনো ছাত্র শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে, যখন কোনো যুবক বেকারত্বের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়, যখন কোনো মানুষ যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ কিংবা বৈষম্যের বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর তোলে তখন হয়তো সে সরাসরি চে-র নাম উচ্চারণ করে না, কিন্তু তার প্রতিবাদের ভেতরে চে-র সেই অদম্য চেতনাই কাজ করে।
চে-কে স্মরণ করার অর্থ তাই কেবল তাঁর ছবি বহন করা বা পোস্টারে স্থান দেওয়া নয়। প্রকৃত অর্থে চে-কে স্মরণ করা মানে সেই রাজনৈতিক সাহসকে ধারণ করা, যা প্রচলিত ব্যবস্থার সামনে প্রশ্ন তুলতে শেখায়। সেই মানবিক সংবেদনশীলতাকে ধারণ করা, যা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের নিপীড়িত মানুষের যন্ত্রণাকে নিজের যন্ত্রণা বলে অনুভব করতে শেখায়। সেই স্বপ্নকে ধারণ করা, যা বিশ্বাস করে যে মানুষের মুক্তি, সাম্য এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ কেবল কল্পনা নয়, সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জনযোগ্য বাস্তবতা।
তাই চে গেভারা ইতিহাসের কোনো জাদুঘরে বন্দি নন। তিনি বেঁচে আছেন প্রতিটি প্রতিবাদে, প্রতিটি স্বপ্নে, প্রতিটি প্রশ্নে এবং প্রতিটি সংগ্রামে, যেখানে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস দেখায়। আর তাই আজকের পুঁজিবাদী সমাজ যতই চে ও তাঁর মতাদর্শকে মুছে ফেলার চেষ্টা করুক না কেন, বিপ্লবের চিরন্তন সত্যে তাঁদের এই বলেই উত্তর দিতে হয়,
“You can kill the dreamer, but you can’t kill the dream.”