এ তরঙ্গ রুধিবে কে

সম্প্রতি দেশ পত্রিকায় নকশাল নেতা অসীম চট্টোপাধ্যায় ষাটের দশকের ছাত্র-যুব আন্দোলনের একটি ময়নাতদন্ত করেছেন। ‘যৌবন-বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ’ শিরোনামে অলংকিত এই নিবন্ধে নানাবিধ লঘু-গুরু বাক্যের বিন্যাসে ষাটের দশকের ছাত্র-যুব আন্দোলনকে নকশাল আন্দোলনের মোড়কে আবৃত রাখার প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।

আটের দশক ছিল ছাত্র আন্দোলনে এক উথালপাথাল তরঙ্গময় আন্দোলনের গৌরবমণ্ডিত দশক। ষাটের দশকের সেই উত্তাল আন্দোলনের সুষমানন্দিত দিনগুলি পেরিয়ে সংগঠিত ছাত্র আন্দোলন আজ দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে নতুনতর উৎক্রান্তির লক্ষ্যে। দেশের বুর্জোয়া-জমিদার শাসককুলের এবং তাদের সেই পুতিগত নীতি কথাগুলির প্রচারকদের আতঙ্কিত হবার বিস্তর কারণ এতে রয়েছে। তাই প্রয়োজন হয় সংঘাতময় ষাট দশকের সমস্ত ইতিবাচক দিকগুলিকে অস্বীকার করার। প্রয়োজন হয় ঐ দশকে। অতিসমৃদ্ধ ছাত্র আন্দোলনের প্রধান প্রধান মর্মবস্তুগুলিকে বিকৃত করার। উল্লিখিত নিবন্ধ সেই ঘৃণ্য প্রয়োজনীয়তাকে উপজীব্য করেই গড়ে উঠেছে। ইতিহাসকে বিকৃত করার এক নগ্নতম উদাহরণ হিসেবেই তা ইতিহাসে বেঁচে থাকবে।

ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলনের প্রধান প্রধান প্রবণতাগুলিকে, পর্যায়গুলিকে, মর্মবস্তুগুলিকে প্রধানত চারটি ভাগে বিন্যস্ত করা যায়।

১) সংস্কারবাদের বদ্ধ জলা থেকে সংগঠিত ছাত্র আন্দোলনের আদর্শগত এবং প্রয়োজনগত মুক্তি।

২) গণ-আন্দোলনের সুবিস্তৃত পটভূমিতে জঙ্গী ছাত্র আন্দোলনের সূচনা এবং ব্যাপ্তি। শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের পরিপূরকের পর্যায়ে উন্নীত ছাত্র আন্দোলন।

৩) নৈরাজ্যিক নকশালপন্থী আন্দোলনের অভ্যুদয় এবং অধঃপাত।

৪) ছাত্র-যুবদের মধ্য থেকে বুর্জোয়া জমিদার শ্রেণীর সুপ্ত অনুরাগীদের জাগিয়ে তোলা এবং ক্রমান্বয়ে তাদের হিংস্র করে তোলা।

বুর্জোয়া সাংবাদিক এবং সাহিত্যিকরা প্রথম দু’টি ইতিবাচক ধারাকে তাদের নিজ শ্রেণীগত কারণেই অস্বীকার করে থাকেন। যা কিছু বিকাশশীল তাকে অস্বীকার করাই মরনোন্মুখ বুর্জোয়া ভাবাদর্শের একান্ত আনন্দের বিষয়।

প্রথম দু’টি ধারাই যাটের দশকের ছাত্র-আন্দোলনের প্রধান বিকাশশীল শক্তি। আজকের
গণ-আন্দোলনের উর্বর মাটিতে এবং আন্দোলনের অনুকূল জল-হাওয়ায় সেই ধারা দু’টিই পত্রে পুষ্পে পল্লবিত হয়ে উঠেছে। এটাই ওনাদের কাছে শঙ্কার বিষয় এবং ভয়ের ব্যাপার। সঙ্গত কারণেই তারা মহিমান্বিত করেন উল্লিখিত তৃতীয় এবং চতুর্থ ধারাটিকে। তৃতীয় ধারাটি হলো নকশালপন্থী আন্দোলন যা সংগঠিত ছাত্র আন্দোলনে অর্ন্তঘাতের কৃতিত্ববাহী। সাধারণ ছাত্র সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কতিপয় যুবকের ব্যক্তি সন্ত্রাসবাদী তথাকথিত আত্মত্যাগী আস্ফালনকেই এ ক্ষেত্রে মহিমান্বিত করে তোলা হয়। চতুর্থটি, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে বল্লাহীন সন্ত্রাস পরিচালনার উদ্দেশ্যে গঠিত ঠ্যাঙ্গারেবাহিনী-যুব কংগ্রেস, ছাত্র পরিষদ। সরকারী প্রচারযন্ত্রের আনুকূল্যে এই ঠ্যাঙ্গারেবাহিনীর তাণ্ডবকে দেশপ্রেমের নানাস্তরে বরণীয় করে তোলা হয়।

এক ঢিলে দুই পাখি মারার অতি উত্তম এই ব্যবস্থা। অর্ন্তঘাতকারী মহানদের পিঠ চাপড়ানো এবং সংগঠিত ছাত্র আন্দোলনের সকল সাফল্যকে ম্লান করে দেওয়া দু’টি উদ্দেশ্যই সাধিত হয়। সঙ্গে শাসক সম্প্রদায়ের শ্রেণীগত স্বার্থের ভিত্তিতে অটুট রাখতে ওদের মুমূর্ষু দর্শনটিকেও ক্রমাগত কোরামিন দেওয়া যায়।

দেশ পত্রিকা যে এই দু’টি পাখিকেই বেছে নেবেন এ আর আশ্চর্যের কী? তাই যাটের দশকের ছাত্র আন্দোলনের দুই অন্যতম পুরোধা বিমান বসু বা সুভাষ চক্রবর্তীর লেখা দেশ পত্রিকায় স্থান পায় না।

বর্তমান প্রবন্ধের সংক্ষিপ্ত পরিসরে সকল প্রসঙ্গের বিস্তৃত আলোচনা সম্ভব নয়। এখানে শুধু বিষয়গুলিরই অবতারণা করা হলো। পরবর্তীতে এ সম্পর্কে বিস্তৃত লিখবার আগ্রহ রইল।

  • বদ্ধজলার থেকে মুক্তি

ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে প্রসঙ্গ বুঝবার প্রয়োজনেই পঞ্চাশের দশকের ছাত্র আন্দোলনের বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলিকে মনে রাখা দরকার। তখন সদ্য আমাদের স্বাধীনতাপ্রাপ্তি ঘটেছে। প্রাক্-স্বাধীনতাকালীন সমস্ত আন্দোলনের বর্শাফলক উদ্যত ছিল সাম্রাজ্যবাদের প্রতি। সর্বস্তরের মানুষই ছিল একটা মঞ্চে সামিল। আর সে মঞ্চ ছিল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সাধারণ মঞ্চ। ব্যারিকেডের একপাশে ছিল সাম্রাজ্যবাদ, অপর পাশে দেশের মুক্তিকামী মানুষ। দেশের মুক্তি ও স্বাধীনতা অর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা সংগ্রামের পরিধিকে করেছিল ব্যাপকতর, বিস্তৃততর। রাজনৈতিক চিন্তা চৈতন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল স্বতঃস্ফূর্ততার উপাদান! লক্ষ্য একটাই – বিদেশী শত্রু হটানো।

স্বাধীনতাপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট হলো আমূল পরিবর্তিত। সদ্য স্বাধীন দেশে আন্দোলনে প্রাক স্বাধীনতা যুগের ব্যাপ্তি ও বিশালতা আশা করা গুরুতর ভ্রান্তি। দেশী শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে সঠিকভাবেই নির্ধারিত হলো লড়াই-এর কৌশল। তাকে সামনে রেখে তিল তিল করেই আন্দোলন, সংগঠন গড়ে তোলার সময় ছিল সেটা। সংস্কারবাদীতার বেড়াজালে আটক থাকা সত্ত্বেও ছাত্র আন্দোলনের মরা গাঙে বান ডেকেছে বার বার উদ্বেল হয়েছে গ্রাম-জনপদ-শহর-নগর। ‘৫৩ সালে ট্রাম ভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে, ৫৬-র বঙ্গ বিহার সংযুক্তি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে, ৫৯-এর খাদ্য আন্দোলনে ছাত্র সমাজ সামিল হয়েছে, গণ-আন্দোলনের উন্মুক্ত আলো হওয়ার স্পর্শে সজীবতা লাভ করেছে সিক্ত হয়েছে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বহতা নদীর স্রোতধারায়। কিন্তু মহাসাগরের গান শুনতে পায়নি পঞ্চাশ দশকের ছাত্র আন্দোলন।

মহাসাগরের গান সে শুনেছে ষাটের দশকে। ৬২-তে চীন-ভারত সীমানা সংঘর্ষ। ভারতে উগ্র জাতীয়তাবাদের আত্মপ্রকাশ। দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতৃত্বের একটি অংশের শাসকশ্রেণীর কাছে নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ, দেশব্যাপী উগ্র কমিউনিস্টবিরোধী সন্ত্রাস, ঘৃণার অভিমান সচকিত করেছে, সচেতন করেছে পশ্চিমবাংলার ছাত্র সমাজকে। কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে সেদিনের ঘৃণার অভিযানে নেতৃত্বকারীদের একজন, জেনারেল কারিয়াপ্পা এসেছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। বক্তৃতা প্রসঙ্গে করেছিলেন সেই স্পর্ধিত উক্তি ‘কমিউনিস্টদের সঙ্গে অভিভাবকেরা মেয়ের বিয়ে দেবেন না’। পুলিশ সমাকীর্ণ সমাবেশে জেনারেল কারিয়াপ্পার চ্যালেঞ্জ – ‘এই সভায় কে আছ কমিউনিস্ট’? সম্মিলিত স্রোতাদের মাঝখান থেকে এক শীর্ণকায় তরুণের স্পষ্ট, নির্ভীক, গর্বিত উচ্চারণ’ ‘আমি একজন কমিউনিষ্ট’। (শীর্ণকায় সেই তরুণের নাম -শংকর গুপ্ত।) আন্তর্জাতিকতাবাদী আদর্শের উজ্জ্বলপ্ত শিখায় পথ চিনে নিয়েছেন ছাত্র সমাজ। অতি উজ্জ্বল সেই সব দিন, চিরভাস্বর অমরত্বের নিশানাবাহী সেই সব অভিজ্ঞতা। সংস্কারবাদ আর উগ্র জাতীয়তাবাদের বাঁধ দিয়ে যে চঞ্চলা স্রোতস্বিনীর গতি রুদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছিল দুর্বার ছাত্র আন্দোলনের তীব্র জলোচ্ছ্বাসে সে বাঁধ ভেঙ্গে গেল, গুঁড়িয়ে গেল। ছাত্র আন্দোলন তখন মতাদর্শগত সংগ্রামের অস্ত্রে নিজেকে সজ্জিত করেছে, শ্রমিক-কৃষকদের আন্দোলন, গণ-আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছে, সমাজ পরিবর্তনের মহাসংগ্রামের দুরন্ত সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ার গান শুনেছে।

১৯৬৩-৬৪-র সংগঠন ও প্রচারের কর্মসূচীর পর ‘৬৫-র মাঝামাঝিতেই ছাত্র আন্দোলন মাথা উঁচু করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে সমাজ শত্রুদের মুখোমুখি

  • ‘৬৫-র ট্রামভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলনে। তিনটি বছর পরে সেটাই ছিল প্রথম সক্রিয় প্রতিরোধ। শ্রীঅসীম চ্যাটার্জি দাবি করেছেন ‘৬৬-র সেপ্টেম্বরে গড়ে ওঠা প্রেসিডেন্সির ছাত্র আন্দোলনেই শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের প্রথমতম সংযোগ ঘটে। এটি একান্তই ইতিহাসের বিকৃতি। কারণ ‘৬৩-৬৪ সালে জয়া কারখানার শ্রমিকদের লড়াইকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবাংলার শ্রমিকশ্রেণী যে লড়াই শুরু করেছিল, ছাত্র আন্দোলনে ছিল তার অন্যতম সহায়ক শক্তি। জয়ার গেটে অতন্দ্র প্রহরায় রত ছাত্র সমাজ যাপন করেছে অনেক বিনিদ্র রজনী। ১৯৬৪-র ২৮শে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ছাত্র কনভেনশনের উদ্বোধক কোন শিক্ষাবিদ ছিলেন না, উদ্বোধন করেছিলেন জয়া শ্রমিকদের ঐতিহাসিক লড়াইয়ের প্রিয় নেতা হরিদাস মালাকার। পরম্পরা থেকে পরম্পরায় এই সব কিছুই ছিল সংস্কারবাদের বদ্ধজলা থেকে বিপ্লবী ছাত্র আন্দোলনের মুক্তির সূচনা।

নৈরাজ্যের প্রভুদয় এবং অধঃপাত

নকশালবাড়ির ঘটনা শুরু হয় ১৯৬৭ সালে। এই নকশাল কথাটিই তীব্র বামপন্থী বিচ্যুতি এবং হঠকারিতার সমার্থক। নকশাল আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কিন্তু ছাত্র আন্দোলনে বামপন্থী বিচ্যুতির সৃষ্টি হয়নি। অতিবামপন্থা সি পি আই (এম) পার্টি গঠিত হবার পাশাপাশি গড়ে উঠেছিল। প্রকৃতপক্ষে সি পি আই (এম) পার্টি তৈরি হয়েছিল সংশোধনবাদ এবং সংকীর্ণতাবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে। পার্টির মধ্যে এবং নবগঠিত বি পি এস এফ (যাদের বামপন্থী বলে অভিহীত করা হতো) সংগঠনের মধ্যেও অতি বামপন্থার অনুগামী কিছু কর্মীর অস্তিত্ব ছিল। ‘৬৪ সালে আগস্ট মাসে নবগঠিত বি পি এস এফ-এর কলকাতা জেলার সম্পাদক কে হবেন এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলে। শেষ পর্যন্ত অতিবামদের পরাজিত হতে হয়, বিমান বসুই নির্বাচিত হন। রাজ্য নেতৃত্বের মধ্যেও এক চতুর্থাংশ অতিবামপন্থার দিকে ঝুকে পড়ে। ১৯৬৫-র জুলদই মাসে বেলঘরিয়াতে বি পি এস এফ-র কাউন্সিল সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই অধিবেশনে শৈবাল মিত্র, আজিজুল হক স্বাক্ষরিত একটি দলিল উপস্থাপিত হয়। ঐ দলিলে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সমস্ত শিক্ষাকে অগ্রাহ্য করে একটি শিশুসুলভ স্লোগানের প্রস্তাব করা হয়। ঐ দলিলের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল, জনগণ বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত কিন্তু শ্রমিকশ্রেণী ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে আছে। অতএব ছাত্রদেরই বিপ্লবের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে হবে। সুতরাং ছাত্র ফেডারেশনের মূল স্লোগান হওয়া উচিত জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব। বলা বাহুল্য ছাত্র প্রতিনিধিদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের মতে এই প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়। পরবর্তীকালে ছাত্র নেতৃত্বের একটি বিরাট অংশ গ্রেপ্তার হয়ে যায় অথবা আত্মগোপন করে। কিন্তু সংগঠনের অভ্যন্তরে মতাদর্শগত সংগ্রাম চলতেই থাকে। এই মতাদর্শগত ভ্রান্তিই পরে নকশাল আন্দোলনের সময় অতি বাম ছাত্র নেতৃত্বকে নকশাল আন্দোলনের যুক্ত করে। অসীমবাবু দাবি করেছেন, ছাত্র সংসদগুলি এবং ছাত্রদের ব্যাপকতম অংশের সমর্থন নকশালপন্থীরা পেয়েছিল। এটাও তথ্যের বিকৃতি মাত্র। প্রকৃত পক্ষে নকশালদের আধিপত্য ছিল প্রেসিডেন্সি, বিদ্যাসাগর, স্কটিশচার্চ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আংশিক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আংশিক, কৃষ্ণনগর কলেজ, বহরমপুর কে এন কলেজ, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, বীরভূমের দু-একটি কলেজ ছাড়া হুগলী, হাওড়া, কলকাতার বিচ্ছিন্ন কয়েকটি পকেটে। কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, পশ্চিম দিনাজপুর, মালদা, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, দক্ষিণ ২৪ পরগনা প্রভৃতি জায়গায় নকশালপন্থী ছাত্র আন্দোলনের কোনো অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে। কোনো গণ-ভিত্তি নিয়ে নকশালপন্থী আন্দোলন কখনো গড়ে ওঠেনি। এই আন্দোলনের সকল বৈশিষ্টাই নিহিত ছিল কৃতিপয় অগ্রণী ছাত্রের রাজনৈতিক তৎপরতার মধ্যে। প্রেসিডেন্সি কলেজের কয়েকজন আবেগতাড়িত ছাত্র এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার ফলে এই আন্দোলনকে মেধাবী ছাত্রদের আন্দোলন বলে অনেক সময় চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু এই বহিরঙ্গের আড়ালেই নকশালপন্থী আন্দোলনে বেশ কিছু সমাজবিরোধীও প্রবেশাধীকার পেয়েছিল। সব মিলিয়ে আন্দোলনের প্রধান প্রধান ভ্রান্তিগুলি

ছিল এই: ১) এরা প্রবীণদের নেতৃত্বকে অস্বীকার করল কিন্তু মেনে নিল আর দু’জন প্রবীণের নেতৃত্ব। একজন মাও সে তুঙ্ আকরেক জন চারু মজুমদার। বিপ্লবী আন্দোলনের শিখর চুড়ায় যার অবস্থান ছিল সেই মাও শেষ জীবনে যে ভ্রান্তির শিকার হয়েছিলেন তাতে সংক্রামিত হয়েছিলেন আমাদের দেশের নকশালপন্থী ছাত্র-যুবরা। আর চারু মজুমদার তাকেই করেছিলেন অন্ধ অনুকরণ। চীনের পার্টি যাকে ‘বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ’ বলে অভিহিত করেছিল আসলে তা ছিল শীতের পূর্বাভাষ। বিকাশমান গণ-আন্দোলনে শৈত্য প্রবাহ আনবার জন্য সাম্রাজ্যবাদী ও শাসকশ্রেণীর চক্রান্তের শিকার হয়েছিলেন নকশালপন্থী ছাত্র-যুবরা।

২) ভারতবর্ষের রাজনৈতিক, সামাজিক দ্বন্দ্বগুলির মার্কসবাদী চর্চায় প্রবেশ না করে অন্ধভাবে চীনের অনুকরণ। আসলে নকল-নবীশিদের দৌড় নাটক পর্যন্ত, বিপ্লবে তাদের কোনো স্থানই নেই।

৩) বুর্জোয়া ব্যাবস্থায় যে যত বেশি পড়াশুনা করে সে ততবেশি মুর্খ এই স্লোগান তুলে যে ন্যূনতম শিক্ষাব্যবস্থা এদেশে প্রচলিত ছিল তাকেও ধ্বংস করা। সংগত কারণেই সংগঠিত ছাত্র আন্দোলনকে শিক্ষাব্যবস্তাকে রক্ষা করার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করতে হলো। ফলতঃ আক্রান্ত হতে হলো, জীবনও দিতে হলো। আক্রান্ত হলেন আশিষ দে, মৃণাল ঘোষ দস্তিদার প্রমুখ ছাত্র নেতৃত্ব, কলেজের পরীক্ষা চালু রাখতে গিয়ে জীবন দিলেন প্রশান্ত সরকার, মোহনলাল বোস। শাসকশ্রেণী চাইল শিক্ষার বিস্তার না ঘটাতে আর নকশালপন্থীরা চাইল প্রচলিত ন্যূনতম ব্যবস্থাটুকুকে বানচাল করতে।

৪) ব্যক্তি হত্যা এবং সন্ত্রাস চূড়ান্তভাবে অধঃপতিত করল নকশালপন্থী ছাত্র আন্দোলনকে। নকশালদের দখল করা এলাকায় জনগণের চোখ, ওরা ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীতে পরিণত হলো। জোর করে চাঁদা আদায়, বাড়ি-ঘর দখল, জবরদস্তি খাওয়ার আদায়, ব্যাপক উৎপীড়ন, খুন ও জখম নকশালদের জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন তো করলই এমন কি কোথাও কোথাও বামপন্থীদের সম্পর্কেও মানুষের মনে ঘৃণা জাগিয়ে তুলল। এছাড়াও আরো অনেক কারণই অধঃপতনের এই প্রক্রিয়াকে দ্রুত করেছিল। পরবর্তীকালে ওরাও নিজেদের আংশিক সমালোচনা করেছে। এ প্রবন্ধে সে আলোচনার অবকাশ নেই।

নকশাল পন্থীদের রাজনৈতিক দেউলেপনার আর একটি নিদর্শন মূর্তি ভাঙার আন্দোলন। যে কোনো দেশের সংগ্রামরত মার্কসবাদীরা অতীত সমাজের বা কিছু মন্দ তা বর্জন করে, যা কিছু ভাল, সামাজিক অগ্রগতিতে যা সাহায্য করে তা গ্রহণ করে এবং সে ঐতিহ্যকে স্বীকার করে। বিদ্যাসাগরের মূর্তিভাঙা কোনো শিশুসুলভ চপলতার ব্যাপার নয়। ঊনবিংশ শতকে বাংলাদেশের সামন্তরক্ষণশীল সমাজে বিধবাবিবাহ, স্ত্রী শিক্ষার প্রসার প্রভৃতি বিষয়ে বিদ্যাসাগরের অবদান, বাংলাদেশের সামাজিক আন্দোলন পশ্চিমবাংলার গণ-আন্দোলনের ভিত্তি প্রস্তুত করতে সাহায্য করেছে। কমিউনিস্ট আন্দোলন বাংলাদেশে যে উর্বর জমি পেয়েছে, বিহার ও উত্তর প্রদেশে যা পাওয়া যায়নি – এর জন্য আমাদের পূর্বসূরীদের অবদান অস্বীকার করা ভুল। অনেক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের রেনেসাঁ আন্দোলনের পুরোধা রা সমাজ সংস্কারের জন্য যে ভূমিকা পালন করেছিলেন তাদের অজান্তেই সেখানে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ক্ষেত্র তৈরি হয়ে গিয়েছিল। নকশালপন্থী ছাত্র-যুবদের ভ্রান্ত রাজনীতিই তাদের কবরে যাবার পথ প্রস্তুত
করেছিল। এমনিতেই তারা ছিলেন জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন একটি অগ্রণী সম্প্রদায় , তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সাম্রাজ্যবাদ ও শাসকশ্রেণীর উদ্যোগ। কাজেই নকশালপন্থীরা পশ্চিমবাংলার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে আন্দোলনের হত্যাকারী হিসাবেই চিহ্নিত থাকবে। শাসকশ্রেণীর পক্ষে তখনও চেষ্টা হয়েছে এদের মহিমান্বিত করার, এখনও ওদের কবর থেকে তুলে আনার চেষ্টা চলছে, গৌরবের প্রলেপ দেবার প্রচেষ্টা চলছে।

সুপ্ত অনুরাগীদের ইতিবৃত্ত

ভারতবর্ষ বুর্জোয়া জমিদার শ্রেণীর শাসনের অধীন। এদের শাসনের প্রভাব ভারতে সর্বত্রই পরিব্যাপ্ত, পশ্চিমবাংলাও তার অধীন। এটি অতীতেও ছিল, বর্তমানও আছে। এই শ্রেণীগুলির প্রভাবাধীন ছাত্র-যুবকেরা ১৯৬৬ সাল পর্যন্তই ছিল প্রধানত সুপ্ত। সাধারণত সাধারণ নির্বাচনে কিছু ভূমিকা পালন ছাড়া, ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলিতে অংশগ্রহণ করাই ছিল এদের সাধারণ রাজনৈতিক কর্মসূচী। এই সময়কাল পর্যন্ত পশ্চিমবাংলায় শাসক কংগ্রেস দলের মুখ্য প্রভাব প্রধানত বিস্তৃত ছিল গ্রামাঞ্চলে। বিপরীতে বামপন্থীদের, কমিউনিস্টদের প্রভাব ছিল কলকাতায়, শ্রমিক অধ্যুষিত অঞ্চলে। এজন্য পশ্চিমবাংলায় জেলা এবং মহকুমা সদরগুলিতে প্রধানত ওদের আধিপত্য ছিল।

৬৭-র যুক্তফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠার পরবর্তীতে এ বাংলার বিস্তির্ণ গ্রামাঞ্চলে তীব্রতম শ্রেণীসংগ্রামের জোয়ার আসে। বেনামী জমি দখলের লড়াই, ক্ষেতমজুরদের মজুরি বৃদ্ধি এবং ভাগচাষীদের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম ছড়িয়ে পড়েছিল রাজ্য জুড়ে। এক ঘুমন্ত রাজপুত্র যেন জেগে উঠেছিল দুনিয়া কাঁপানো শক্তি নিয়ে। পশ্চিমবাংলার গ্রামে প্রতিষ্ঠিত সামন্ততন্ত্রকে আঘাত করতে লেগেছিল বারবার। কেঁপে উঠেছিল সামন্ত ব্যবস্থা। এতক্ষণ পর্যন্ত নির্বিবাদে যা ভোগ করে আসছিল গায়ের জমিদার জোতদারদের দল সব হারানোর আশঙ্কায় তারাও জোট বাধল, ঐক্যবদ্ধ হলো। ফলে গ্রামীণ উচ্চবর্গের সন্তানেরাও এই জোট বাধার সাথে অগ্রসর হলো। যারা ছিল এতটা কাল সুপ্ত, ঘুমন্ত, তারা এবার জেগে উঠল, তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলল। এই অংশকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠল ছাত্র পরিষদ, যুব কংগ্রেস। এরা সংখ্যাতে ছিল বড় এবং যথেষ্ট শক্তিধর। বেআইনী এবং বাড়তি জমি রক্ষার সংগ্রাম, পরগাছা থাকবার চিরকালীন রোগ তাদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের সাথে জড়িয়ে গেল। এরাই হয়ে উঠল হিংস্র এবং রক্ত লোলুপ। এর সঙ্গে শহরে মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তদের জড়াবার জন্য কংগ্রেস ফ্যাসিবাদী কৌশলের আশ্রয় নিল। কৌশল দু’টি – (১) কিছু চটকদারী স্লোগান (২) সংগঠনকে ক্রমাগত হিংস্র করে তোলা। এই চটকদারী স্লোগান ছিল – ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা – গরিবী হঠাও প্রভৃতি। বামপন্থী স্লোগানের আড়ালে কংগ্রেসের আসল চেহারা লুকোনোর প্রচেষ্টা চলল। যারা এতদিন স্লোগান দিত ‘মুখে আনলে ভিয়েতনাম, ঘুচিয়ে দেব বাপের নাম’। তারাই ভিয়েতনাম জিন্দাবাদ বলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ভিয়েতনাম থেকে হাত মিছিল করল। দেওয়ালে দেওয়ালে লেখা হলো-ওঠাও, সোভিয়েত চেকোস্লোভাকিয়া থেকে হাত ওঠাও, চীন সাম্রাজ্যবাদ তিব্বত থেকে হাত ওঠাও। এক্ষেত্রে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। এই বাহিনীকেই ক্রমাগত হিংস্র এবং আক্রমণমুখী করে তুলে সত্তরের আধাফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসের ভিত্তি রচিত হয়েছিল।

কথা শেষের কথা

ইতিহাসের অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত হয়েছে যে সেই নকশাল বিপ্লবীরা আজ শতধা বিদির্ণ এবং পরিত্যক্ত। ছাত্র পরিষদ এবং যুব কংগ্রেসের স্বরূপ উন্মোচিত। জনগণের বিচারে এরা একান্তই ঘৃণিত। বিপ্রতীপে ব্যাপ্তি, গভীরতা, সাফল্য এবং অগ্রগতির পতাকা ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের হাতে। দেশ পত্রিকার সম্পাদকদের অসীম চ্যাটার্জির মতো নেতৃকুলকে বই-এর মলাটেই আটকে রাখতে হবে আর সংবাদপত্রের শিরোনামে প্রিয় সুব্রতকে রাখতে হবে। এতদসত্ত্বেও গণসংগ্রামের তরঙ্গশীর্ষে দীনেশ মজুমদার, বিমান বসু, সুভাষ চক্রবর্তীরাই থাকবে। প্রশ্ন একটাই – এই তরঙ্গ রুধিবে কে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *