হিরোশিমা থেকে প্যালেস্তাইন: সাম্রাজ্যবাদের হাতে মানবতার মৃত্যু!

ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত ঘটনাগুলি আসলে জন্ম নেয় ঘটনাস্থল থেকে বহু দূরে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অন্ধকার কক্ষে। যেখানে মুছে যায় মানুষের নাম, ‘লক্ষ্যবস্তু’ হয়ে ওঠে একটি শহর, একটি ভূখণ্ড এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ। ১৯৪৫-এর ৬ আগস্ট, আজকের দিনে, হিরোশিমার আকাশে ‘Little Boy’ বিস্ফোরণের মুহূর্তে ঠিক এমনই এক রাজনৈতিক বাস্তবতা দৃশ্যমান হয়েছিল। ধ্বংস হয়েছিল ইট-পাথরের তৈরি একটি শহর আর প্রায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষ। কিন্তু হিরোশিমার বিপর্যয়কে কেবল একটি বিস্ফোরণ কিংবা একটি যুদ্ধের পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত রাজনৈতিক তাৎপর্য অনুধাবন করা যায় না। কারণ সেই বিস্ফোরণের কেন্দ্রে ছিল এমন এক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, যার কাছে একটি বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন বৃহত্তর সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের তুলনায় গৌণ হয়ে উঠেছিল।


হিরোশিমাকে যদি শুধুই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি সামরিক ঘটনা হিসেবে দেখা হয়, তবে তার রাজনৈতিক তাৎপর্য অর্ধেকই বোঝা হয়। এটি ছিল সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পরিকল্পিত বর্বর ক্ষমতা প্রদর্শনের এক চরম প্রকাশ। সাম্রাজ্যবাদ অর্থনীতি, পুঁজি, সামরিক শক্তি ও ভূ-রাজনীতির মধ্য দিয়ে সে পৃথিবীকে প্রভাববলয়ে বিভক্ত করে এবং নিজের আধিপত্যকে সুসংহত করে। লেনিন যে সাম্রাজ্যবাদকে পুঁজিবাদের একচেটিয়া পর্যায় হিসেবে বিশ্লেষণ করেছিলেন, তার কেন্দ্রে ছিল পুঁজির কেন্দ্রীভবন, finance capital-এর আধিপত্য, পুঁজির রপ্তানি এবং বিশ্বের পুনর্বণ্টনকে ঘিরে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলির প্রতিযোগিতা। যুদ্ধ সেই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে নগ্ন ও সহিংস প্রকাশগুলির একটি। হিরোশিমা সেই সামরিক-সাম্রাজ্যবাদী শক্তিরই এক চরম প্রতীক—যেখানে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ মানুষের মুক্তির বদলে মানুষের উপর আধিপত্য বিস্তারের অস্ত্রে পরিণত হয়।


প্রায় আট দশক পরে প্যালেস্তাইনের ধারাবাহিক রক্তপাত ও ধ্বংসের মধ্য দিয়ে গোটা বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের সেই একই নির্মমতাকে নতুন ঐতিহাসিক রূপে প্রত্যক্ষ করছে। ১৯৪৮-এর Nakba-য় ৭ লক্ষ ৫০ হাজারেরও বেশি প্যালেস্তাইনি তাঁদের ঘরবাড়ি থেকে উৎখাত ও বাস্তুচ্যুত হন। তার পরবর্তী ইতিহাস জুড়ে দখলদারিত্ব, ভূমি-নিয়ন্ত্রণ, বসতি সম্প্রসারণ, অবরোধ এবং রাজনৈতিক অধিকারহীনতা প্যালেস্তাইনি জনগণের অস্তিত্বকে ক্রমাগত সংকুচিত করেছে। ৭ অক্টোবর ২০২৩-এ হামাসের বেসামরিক মানুষের উপর হত্যালীলা ও জিম্মি করার ঘটনাকে নিন্দা করার কোনও দ্বিধা থাকতে পারে না।


হিরোশিমার ছাইয়ে যে শিশুরা চাপা পড়েছিল, কিংবা গাজার ধ্বংসস্তূপে যে শিশুরা আজও চাপা পড়ছে—তাদের মৃত্যুকে কোনও রাজনৈতিক পরিচয়, রাষ্ট্রীয় সীমানা কিংবা ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে আলাদা করা যায় না। অথচ সাম্রাজ্যবাদ প্রতিনিয়ত মানুষের মৃত্যুকেও অসমানভাবে দেখতে শেখায়। সে মৃত্যুকে ভাগ করে, তার জন্য আলাদা আলাদা অভিধান তৈরি করে; কোথাও তা ‘যুদ্ধের অনিবার্য ক্ষতি’, কোথাও ‘আত্মরক্ষার মূল্য’, কোথাও আবার নিছক একটি পরিসংখ্যান। একজনের মৃত্যু হয়ে ওঠে সভ্যতার ট্র্যাজেডি, অন্যজনের মৃত্যু পরিণত হয় কৌশলগত প্রয়োজনীয়তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায়। মানুষের জীবনকে এই অসম নৈতিকতায় ভাগ করে দেওয়াই সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির অন্যতম গভীর সাফল্য।


এইখানেই হিরোশিমা থেকে প্যালেস্তাইনের দিকে তাকানোর রাজনৈতিক সূত্রটি স্পষ্ট হয়। দুটির ইতিহাস এক নয়, তাদের সামরিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও এক নয়। কিন্তু দুটির মধ্যে যে সূত্রটি অনিবার্য, তা হল—সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতার কাছে মানুষের জীবনের অধস্তন হয়ে যাওয়া। হিরোশিমায় সামরিক শক্তি ও প্রযুক্তি একটি শহরকে মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস করেছিল; প্যালেস্তাইনে দীর্ঘস্থায়ী দখলদারিত্ব, সামরিক আধিপত্য এবং ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতার অসমতা একটি জনগোষ্ঠীর জীবন, ভূমি ও ভবিষ্যৎকে ক্রমাগত অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। ফলে ইতিহাসের দুই প্রান্তকে এক সূত্রে বাঁধে ধ্বংসের পদ্ধতি নয়, বরং সেই ক্ষমতার কাঠামো—যেখানে রাষ্ট্রীয় ও সামরিক স্বার্থের সামনে মানুষের জীবন বারবার নিম্নগামী হয়েছে।

হিরোশিমার ছাই থেকে প্যালেস্তাইনের ধ্বংসস্তূপ পর্যন্ত তাই ইতিহাস আমাদের সম্মুখীন করে যে কথার—মানুষের জীবন রাষ্ট্র, পুঁজি, সামরিক শক্তি ও সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের অধীন থাকবে না, মানবতাই হবে রাজনীতির চূড়ান্ত মানদণ্ড।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *