ছাত্র সম্মেলন প্রসঙ্গে

সমাজ বিকাশের মৌলিক সূত্রগুলোকে অবলম্বন করে আমাদের সমাজ ও সভ্যতা এক নিরবচ্ছিন্ন ধারায় ক্রম-পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। গতিশীল পট পরিবর্তনের এই ছবিগুলো, সকল ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক পরিবর্তনের রূপের বৈশিষ্ট্যগুলো সব সময়ে আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। বিগত তিন দশক ভারতবর্ষ স্বাধীন—জাতীয় স্বাধীনতার আবরণের মধ্যে স্বয়ম্ভর অর্থনীতির ঢক্কা নিনাদের গর্জন আমাদের জনগণের ক্ষুধা দূর করতে পারেনি, লজ্জা নিবারণের জন্য সকলের বস্ত্রের ব্যবস্থা করতে পারেনি। মাথা গুঁজবার বাসস্থান আজও আমাদের দেশের বহুকোটি মানুষের হয়নি, অকাল মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষার জন্য চিকিৎসার ব্যাপক সুযোগ নেই—দেশ গড়ার জন্য জাতি গড়ার জন্য শিক্ষার সুযোগ আজও বহুকোটি মানুষের সামনে অনুপস্থিত। তৎসত্বেও অর্থনৈতিক ক্রিয়া প্রক্রিয়ার মধ্যে সমাজের বিরোধী শ্রেণীসমূহ নিজ নিজ ভূমিকা পালন করে চলেছে।

শিক্ষিত শ্রেণীগুলোর সংগ্রামের ধারাগুলো আজ বেশী বেশী করে শ্রেণী দ্বন্দ্বে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হচ্ছে। অন্তঃসলিলা স্রোতের মতনই শ্রেণীদ্বন্দ্বসমূহ ভারতীয় সমাজ দেহে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রবাহিত। তাই স্বাধীন ভারতের তিন দশকে সমাজ উপরিভাগে যেমন সব গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের লক্ষণ ফুটে উঠেছে, তেমনি রাজনৈতিক শক্তিসমূহের ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ভারসাম্যের অনেক পরিবর্তন আজ আমরা লক্ষ্য করতে পারছি।

এই পট পরিবর্তনের পটভূমিকায় বিগত দিনগুলোর ছাত্র আন্দোলনের মূল্যায়নের আলোকে আজকের ছাত্র আন্দোলন বিকাশ ও বিস্তারকে বুঝতে হবে। আজকের আন্দোলনের ফলাফল ও তার প্রতিক্রিয়াসমূহ কতদূর সার্থকতায় মণ্ডিত, কতদূর সফল তার মূল্যায়নের ভিত্তি অতীতের আন্দোলন ও সংগঠনের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে নিশ্চয়ই করতে হবে, কিন্তু নিশ্চয়ই তার সাথে তুলনামূলক বিচার করার প্রশ্নে দেখলে মূল্যায়ণ সঠিক হবে না।

প্রায়শ প্রশ্ন আসে আজকের আন্দোলন কী অতীতের আন্দোলন থেকে দুর্বল? আজকের আন্দোলন কি কম সার্থক ভূমিকা পালন করছে? আজকের আন্দোলনের প্রভাব ও ব্যাপ্তি কি অতীতের আন্দোলন থেকে ক্ষীণ ও দুর্বল? আজকের আন্দোলনের আওয়াজগুলো কি ছাত্র সমাজকে সমবেত হতে আগের মতন সঞ্জীবিত করে না? না কি আজকের ছাত্র আন্দোলনের সংগঠকরা অতীতের সংগঠকদের মতন বুদ্ধিদীপ্ত ও উৎকৃষ্ট সংগঠক নয়?

এই সব প্রশ্নগুলো প্রায়শই কোন কোন মহলে ওঠে এবং আজকের ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক ও কর্মীদের কিছুটা ভাবিয়ে তোলে। বাধ্য করে অতীত ও বর্তমানের আন্দোলনের মান ও উৎকর্ষ সম্পর্কে তুলনামূলক বিচারের বিতর্কে বা আলোচনায় অবতীর্ণ হতে। এটা খুবই একটা অসুবিধাজনক অবস্থা ছাত্র আন্দোলনের আজকের সংগঠকরা যার সম্মুখীন হন। আমি ছাত্র আন্দোলনের একজন সংগঠক ও নেতা বা কর্মী হিসাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য এই প্রশ্নের অবতারণা করছি না।

বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিকোণ থেকে একটি নির্দিষ্ট আন্দোলনের নির্দিষ্ট পরিবেশে নির্দিষ্ট সময়ের প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় নিয়েই তার গুণাগুণ তার মূল্যায়ণ করতে হবে।

আমাদের ছাত্র আন্দোলনের ভূমিকাকে আলোচনা করতে গেলে সমগ্র সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে মাথায় রেখে না করলে, তা হয়ে যাবে একান্তই একপেশে এবং যান্ত্রিক।

প্রত্যেকটি সংগ্রামের কোন একটি কালে কোন একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তার নিজস্ব ভূমিকা থাকে এবং ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই সময় ও সুযোগের সীমাবদ্ধতার মধ্যে একটি আন্দোলন তার নিজস্ব ছাপ রেখে যায়। সংগঠনের নেতৃত্ব পরিস্থিতিকে বুঝে শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামে সাধারণ লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রশ্নে তার নিজ শক্তির সমাবেশ’ ঘটিয়ে থাকে। শক্তি সমাবেশের সাফল্য ও সংগ্রামের কৌশল নিরূপণের সাফল্যের উপর নির্ভর করে নেতৃত্ব বা সংগঠকদের সাফল্য।

আমাদের রাজ্যে ছাত্র আন্দোলনের ধারা বেয়ে চললে দেখতে পাবো-প্রাক্ স্বাধীনতা যুগ থেকে শুরু করে আজকের ছাত্র আন্দোলন পর্যন্ত সময়কালের সকল ছাত্র আন্দোলনই শ্রেণী সংগ্রামে শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনে একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণভূমিকা পালন করে চলেছে। এই ভূমিকা প্রসঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা আমি পরে অন্যত্র করবো। আলোচ্য প্রবন্ধে খুব সংক্ষিপ্তসারে বিপ্লবের গতিপথে বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলনের রূপরেখা সম্পর্কে দু’একটি কথা উল্লেখ করবো।

জাতীয় মুক্তির পূর্বে সাধারণ ও প্রধান শত্রু ছিল সাম্রাজ্যবাদ। ছাত্র আন্দোলনের প্রধান শত্রুও সাম্রাজ্যবাদ ছিল। জাতীয় মুক্তি অর্জনই ছিল প্রধান লক্ষ্য। শ্রমজীবী মানুষের বাঁচার বিভিন্ন দাবীর মতন ছাত্রের জীবনেও শিক্ষার দাবীর সাথে সাথে বহু সামাজিক অর্থনৈতিক দাবী-দাওয়া ছিল। কিন্তু সমস্ত দাবী-দাওয়া আদায়ের পথে তৎকালের সকল আন্দোলনের মতন ছাত্র আন্দোলনে প্রধান আওয়াজ ছিল-ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদকে এদেশের মাটি থেকে তাড়াতে হবে।

সকলের সামনে শত্রু এক ও অভিন্ন-আন্দোলনের সামনে প্রধান আওয়াজগুলোও প্রধানতঃ ইংরেজ শাসন বিরোধী। আন্দোলনের পথ নিয়ে মতের বিভিন্নতা সত্ত্বেও জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের পটভূমিকায় সকল আন্দোলনই জনগণের নৈতিক সমর্থন লাভ করতো। জনগণের মনে স্বাধীনতার আকাঙক্ষা, জনগণের মনে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মনোভাব সব মিলিয়ে আন্দোলনের পাশে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন এসে জড়ো হতো। ছাত্র আন্দোলনগুলোও সেই সময় জনতার স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ও সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হয়নি বরঞ্চ দেশপ্রেম, জাতীয় মুক্তির আকাঙক্ষা, ইংরেজ বিরোধী মনোভাব সেই সময়কার ছাত্র আন্দোলনে শক্তি সমাবেশকে অনেক পরিমাণে নিশ্চিত করে রাখতো। পরাধীনতার গ্লানি দূর করার জন্য, জাতীয় মুক্তির জন্য যেভাবে ব্যাপক ও তীব্র আত্মত্যাগের মনোভাব স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে উঠতে পারে একটি গণতান্ত্রিক দাবীর সমর্থনে বা অর্থনৈতিক বা শিক্ষার দাবীর সমর্থনে সেইভাবে ভাবাবেগ তৈরী হতে পারে না। জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য চিত্ত ভাবনাহীন-অর্থনৈতিক বা সামাজিক অগ্রগতির আন্দোলনে ততটা গতিবেগ লাভ করতে পারে না।

যদিও ইংরেজ শাসনের ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতা, শাসনের হিংস্রতা, আন্দোলনের পথ থেকে মানুষকে বিরত করার পথে সদা সর্বদা এক বাধা সৃষ্টি করতো তেমনি অন্যদিকে সাধারণভাবে প্রধান শত্রুকে চিহ্নিত করতে কোন অসুবিধা ছিল না। নৈতিক সমর্থন পাবার সুযোগ ছিল সেই সময়কার আন্দোলনগুলোর অনেক বেশী।

তাই আমরা লক্ষ্য করেছি- “বঙ্গভঙ্গ বিরোধী” আন্দোলন ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সাল, জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে ধিক্কার সংগ্রাম, ছাত্র সংসদের দাবীতে ব্যাপক আন্দোলন, আন্দামানের বন্দীদের ফিরিয়ে আনার দাবীতে আন্দোলন, অসহযোগ ক্ষেত্রে গতিবেগ বৃদ্ধি করতে, সংগ্রামের তীব্রতাকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলার প্রশ্নে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকরে চলেছিল।

এই সকল সংগ্রামে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ ত্যাগ ও বীরত্বের অনেক নজির সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে বিশেষ করে বাংলা দেশে বহু

তরুণ অংশ নিতে শুরু করে জাতীয়তাবাদের ত্যাগের আবেগে।

এক কথায় আন্দোলনের সামনে প্রধান শত্রু ছিল এক ও অভিন্ন। তাই ছাত্রসমাজকে সমবেত করার প্রশ্নে সুযোগ ছিল পরবর্তী যুগের সুযোগগুলো অপেক্ষা অনেক ব্যাপক। স্বাধীনতাকামী, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সকলকে জাতীয়মুক্তি সংগ্রামের মঞ্চে সামিল করার ব্যাপক সুযোগ ছিল সেই সময়কার সংগ্রামগুলোতে।

যদিও ছাত্রসমাজের শিক্ষাগত দাবী, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ও বাইরে সংগ্রামের অধিকার, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দাবীগুলো নিয়ে সংগ্রামে ব্যাপকতম সমাবেশ ঘটানোর প্রশ্নে ছিল খুবই সীমাবদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদী হিংস্র আক্রমণ, সন্ত্রাস ও অত্যাচারের বল্লাহীন হুঙ্কারে সমাবেশকে করে তুলত আরও সীমাবদ্ধ।

বহু ইতিবাচক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি হয়ে ঐ সময়কালের ছাত্র আন্দোলনের সংগঠকদের কাজ করতে হতো।

বিংশ শতাব্দীর প্রথম পাঁচটি দশকের ছাত্র আন্দোলনের ধারা ও গতির বিস্তৃত মূল্যায়ন উপস্থিত না করেও আমি বলতে পারি

-যে ঐ দশকসমূহের ছাত্র আন্দোলনে পরিস্থিতি ও পরিবেশের আবেষ্টনীর মধ্যে থেকেই এক সার্থক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছে-যার ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে গণতান্ত্রিক ছাত্র আন্দোলন স্বাধীন দেশে এরাজ্যে আরও দ্রুততার সাথে বিকাশ লাভে সক্ষম হয়।

দেশ থেকে ইংরেজদের বিদায়ের ফলে আমরা বিপ্লবের একটি স্তরকে অতিক্রম করে আসি। জাতীয়মুক্তি আন্দোলনের স্তর শেষ হয়। জাতীয় স্বাধীনতা আমরা লাভ করলাম ১৯৪৭সালে।

স্বাভাবিকভাবেই আমাদের আন্দোলন ও সংগ্রামগুলোর সাধারণ শত্রু যে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ ছিল, তা আর রইলো না। জাতীয়মুক্তি সংগ্রামের স্তরকে অতিক্রম করলেও আমাদের সামাজিক অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত দাবীগুলো রয়ে গেল। রাষ্ট্রচরিত্রের পরিবর্তন ঘটলেও, জনগণের সামনে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের যে কার্যক্রম তা রয়ে গেল। বৃহৎ বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে বুর্জোয়া ও জমিদারদের সরকার কায়েম হলো-তারা সাম্রাজ্যবাদের সাথে ক্রমে বেশী বেশী করে আপোষ করতে শুরু করলো।

তার ফলে সাম্রাজ্যবাদী শোষণের অবসান ঘটলো না, একচেটিয়া পুঁজির শোষণ ক্রমে তীব্ররূপ নিতে শুরু করলো এবং সামন্ত শোষণের রূপের আংশিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আরও ব্যাপক হয়ে উঠলো। এক কথায় ত্রিবিধ শোষণ জনজীবনেরসামনে প্রধান প্রতিবন্ধকরূপে ক্রমেই বেশী বেশী করে স্পষ্ট হয়ে উঠলো। ছাত্র সমাজের শিক্ষার দাবী, শিক্ষান্তে চাকরির দাবী এক কথায় স্বাধীনভাবে বাঁচার দাবীগুলো ক্রমেই তীব্র ও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠতে শুরু করলো। আন্দোলনের প্রধান শত্রুর পরিবর্তন ঘটলো। শত্রুর বিরুদ্ধে যে ব্যাপক মঞ্চ গঠনের সুযোগ স্বাধীনতার প্রাক্কালে ছিল-জাতীয় মুক্তির পর স্বাভাবিকভাবেই তা আর রইলো না। মঞ্চ সংকুচিত হলো। সমবেত করার সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা কার্যত আরও অনেক বেড়ে গেল। গণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরে দেশীয় শক্তির মুখোমুখি দাঁড়াতে হলো দেশের গণ-আন্দোলনকে এবং ছাত্র আন্দোলনকে। পাঁচের দশক/ছয়-এর দশক ও সাতের দশকের ছাত্র আন্দোলনগুলোর ভূমিকা কার্যত

গণতান্ত্রিক বিপ্লবের অসম্পূর্ণ দাবী-দাওয়াকে কেন্দ্র করে গঠিত।

তাই সাম্রাজ্যবিরোধী স্তরের আন্দোলনের সময়কালের যে সকল সুযোগ ও সমাবেশ করার সুবিধাগুলো ছাত্র আন্দোলন পেত-জাতীয় মুক্তির পর, তা পাবার ক্ষেত্র অনেক সংকুচিত হয়ে গেল।

এই সময়কালে ছাত্রসমাজের নিজস্ব দাবীর ভিত্তিতে, গণতান্ত্রিক দাবীদাওয়ার প্রশ্নে ছাত্রসমাজকে সমবেত করার সুযোগ কেবলমাত্র পরে রইল-যদিও এর সাথে জাতীয় মুক্তির ঠিক পরের দশকটি ছিল স্বাধীন ভারতবর্ষে সুখী সমাজ গড়ায় সরকারী প্রতিশ্রুতিতে ভরা এবং ছাত্রসমাজের আশা আকাঙ্খা নিয়ে

প্রতীক্ষার সময়কাল। তাই পাঁচের দশকের ছাত্র আন্দোলন এক অতীব প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে চলেছিল। কিন্তু প্রাক্ স্বাধীনতা যুগের ছাত্র আন্দোলনে বামপন্থী চিন্তার প্রাধান্য থাকায় তার পটভূমির উপর দাঁড়িয়ে আশু ও জরুরী বিষয়গুলো নিয়ে এই দশকের ছাত্র আন্দোলন ছিল প্রচণ্ড শক্তিশালী। ছাত্রসমাজের নিজস্ব দাবীর সাথে বিভিন্ন গণ-সংগ্রামে ছাত্রসমাজের অংশগ্রহণগুলো ছিল গৌরবময়। ষাটের দশকে ছাত্রসমাজের মোহমুক্তি প্রবল বেগে ঘটতে থাকে। শুধুমাত্র আমাদের রাজ্য নয় -সমগ্র উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে সরকারী প্রতিশ্রুতির ব্যর্থতায় ছাত্র আন্দোলন অনেকগুণ গতিবেগ সম্পন্ন হয়ে ওঠে।

৬৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেসের ৯টি রাজ্যে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে তার প্রতিফলন ও সার্থকতা বাস্তব রূপ লাভকরে।

বুর্জোয়া জমিদার শাসনের তিরিশ বছরের কংগ্রেস রাজত্ব জনজীবনের সমস্যা সমাধানের প্রশ্নে মানুষকে করেছে আশাহত। শ্রমিক-কৃষক মেহনতী মানুষের উপর শোষণের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে, ছাত্রসমাজের বিপুল অংশকে বিপথে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছে। সবকিছু সত্বেও জনগণের বিভিন্ন অংশের সংগ্রাম আন্দোলনগুলো ক্রমে বড় হয়েছে-মেহনতী মানুষের শিবিরের শক্তিকে ক্রমে শক্তিশালী করেছে, তার মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর পক্ষে শক্তির ভারসাম্য ক্রমে এগিয়ে চলেছে।

এই সকল পর্যায়ের সংগ্রামে এরাজ্যে ছাত্র আন্দোলন তারদায়িত্ব পালনে আত্মনিয়োগ- সফলভাবে করেছে। এই পর্যায়গুলোকে অতিক্রম করতে গিয়ে আমরা ‘৬৯/’৭০ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারকে দেখেছি। ‘৭০-‘৭১-এর নকশালদের শিক্ষা ধ্বংস যজ্ঞের মোকাবিলা করেছি। ‘৭২-এর আধা-ফ্যাসিস্ট রাজত্ব কায়েম হতে দেখেছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে উপাচার্য খুন হতে দেখা থেকে শুরু করে কংগ্রেসীদের এক পক্ষের দ্বারা অপর পক্ষের ছাত্রনেতাকে উপাচার্যের ঘরের মধ্যে খুন হতে দেখেছি। সমগ্র পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করতে গিয়ে বন্ধুর পথে আহত হয়েছি, হোঁচট খেয়েছি, রক্ত দিয়েছি, ১৪০ জন ছাত্র কমরেডকে হারিয়েছি-এগার শতের বেশী গণ-সংগ্রামের কর্মী ও নেতাকে জল্লাদের হাতে শহীদ হতে দেখেছি। একদলীয় স্বৈরশাসনের কালো রাহুগ্রাসকে পশ্চিমবাংলার মাটি পার হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে দেখেছি-সর্বোপরি ব্যক্তি স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে দেশে বিপুল অংশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে দেখেছি -স্বৈরতন্ত্রের উত্থান ও বিপর্যয় দেখেছি।

আজ তিন দশকের এই জটিল পথ বেয়ে আমরা এরাজ্যে একটি নতুন স্থানে উপনীত হয়েছি।

গণতান্ত্রিক অধিকার আমরা ফিরে পেয়েছি রাজ্য প্রশাসনেসহযোগী প্রগতিশীল একটি বামপন্থী সরকার প্রত্যক্ষ করছি-কেন্দ্রে স্বৈরশক্তির পরাজয় ঘটেছে-সারা দেশ একদলীয় শাসনের রাহুগ্রাস মুক্ত হচ্ছে। এতটা পরিবর্তন হওয়া সত্ত্বেও ছাত্রসমাজের নিজস্ব দাবীগুলো কি শিক্ষার ক্ষেত্রে কি সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আজও রয়ে গেল।

রাষ্ট্র ক্ষমতায় বুর্জোয়া জমিদারদের অবস্থানের কোন পরিবর্তন ঘটলো না। রাজ্য প্রশাসনে বন্ধু সরকারের আগমন হলো অনেক মূল্যের বিনিময়ে।

রাজ্য ছাত্র আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক অথচ অতীব জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হলো। এই পটভূমিকায় দাঁড়িয়ে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্যে অবিচল থেকে বামফ্রন্টের সরকারকে রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করে আজকের আশুদাবীর আন্দোলনগুলোতে ছাত্রসমাজকে সমবেত করতে হবে। একাজ অতীব কঠিন ও অতীব জটিল।

এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাজ্য ও দেশের ছাত্র আন্দোলনের ভূমিকাকে আরও সংহত করার ক্ষেত্রে সংগ্রামের কৌশল ও সংগ্রামের জালকে বিস্তারের মধ্য দিয়ে ভারতের ছাত্র ফেডারেশন তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *