ইতিহাসের বিনির্মান বিকৃতিকরণ ও ক্ষমতায়ন বনাম সত্যসন্ধানের রাজনীতি ; জনতার প্রশ্নেই টিকে থাকে ইতিহাস

Who controls the past controls the future. Who controls the present controls the past”.- জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত এই উক্তি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় সভ্যতার ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতায়নের মানদন্ডের কথা৷ পৃথিবীর ইতিহাসে প্রতিটি যুগে প্রতিটি রাষ্ট্রব্যবস্থায় যখন যাঁরা শাসকের ভূমিকায় থেকেছে তখনই তারা ইতিহাসকে ব্যবহার করেছে নিজেদের স্বার্থে, নিজেদের ক্ষমতায়নের হাতিয়ার রূপে৷ কখনো তা হয়ে উঠেছে শাসকের মিথ্যা স্তুতিকাব্য, কখনো বা লোপাট করা অর্ধসত্য কাহিনী আর কখনো বা পাল্টে ফেলা ন্যারেটিভ- এই সকল সত্যিমিথ্যার ধোঁয়াশা নিয়েই যুগাতিযুগ ধরে বয়ে চলেছে আসমুদ্রহিমাচলের “ইতিহাস”।


বর্তমান রাজনীতির অন্যতম বড় এবং প্রভাবশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এই ইতিহাসের বিকৃতিকরণ বা ‘হিস্টোরিক্যাল রিভিশনিজম’। কারণ, ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ নয়, ইতিহাস হলো একটি জাতির আত্মপরিচয়ের কথন৷ শাসকগোষ্ঠী জানে এই আত্মপরিচয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই একটি জনসমষ্টির মনস্তত্ত্বকে শাসন করা হয়ে ওঠে সহজ৷ আর এই নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে যদি জনমানসে তৈরি করা যায় একধরণের উগ্র জাতীয়তাবাদ বা ধর্মীয় মেরুকরণ, তবে তা আরও বেশি দীর্ঘমেয়াদী ভাবে মজবুত করে তোলে শাসকদলের ভোটব্যাংক কে।


অপরদিকে, ​বিকৃত ইতিহাসের অন্যতম বড় কৌশল হলো অর্ধসত্যের ব্যবহার। কোনো একটি ঐতিহাসিক ঘটনার সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে, কেবল একটি নির্দিষ্ট অংশকে বড় করে দেখানো যা বর্তমান শাসকের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডার সাথে মিলে যায় একরৈখিকতায়। একে বলা হয় ‘চেরি-পিকিং’। এর ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল ও নকলের ফারাক বোঝা হয়ে পড়ে কঠিন। কারণ উপস্থাপিত তথ্যের একটা অংশ হয়তো সত্যি, কিন্তু তার সামগ্রিক অর্থটি সম্পূর্ণ মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।


এই ইতিহাস বিকৃতিকরণের প্রথম পদক্ষেপ যেখান থেকে শুরু হয় তা হলো পাঠ্যপুস্তক৷ বর্তমান বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে স্কুল-কলেজের সিলেবাস থেকে এমন সব অধ্যায় বা ব্যক্তিত্বকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়, যা বর্তমান সরকারের ভাবাদর্শের বিরোধী। যেমন ইতিহাস থেকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে মোঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া জারি আছে৷ একই সঙ্গে আবার সংযোতিত করা হচ্ছে নানান হিন্দুত্ববাদী কাল্পনিক বা অতিরঞ্জিত বীরত্বগাথা।


অপরদিকে আমরা দেখতে পাচ্ছি শত বছরের পুরনো শহর, রাস্তা বা রেলস্টেশনের নাম পাল্টে ফেলা হচ্ছে রাতারাতি৷ পরিবর্তিত নাম হিসেবে শাসকদল বেছে নিচ্ছে নিজেদের আদর্শের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাম । এই প্রবণতা এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক কলোনিয়ালিজমের ধারক এবং বাহক, যা মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে দেয় পুরনো ইতিহাস ঐতিহ্য কে ।


সিনেমা, ওটিটি সিরিজ এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রোল-আর্মিকে ব্যবহার করে ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোর চরিত্রহনন বা অতি-মানবিকীকরণ, প্রোপাগান্ডা ভিত্তিক সিনেমা নির্মান সাধারণ মানুষের মনে তৈরি করে ভুয়ো ইতিহাসের প্রতি এক নিঃশর্ত আস্থা৷ যার ফলস্বরূপ মাথা চারিয়ে জেগে ওঠে বিদ্বেষ ও ঘৃণার রাজনীতি৷ মানবিক অবক্ষয়কে হাতিয়ার করে ফুলে ফেঁপে ওঠে ক্যাপিটালিসম্- যা গৈরিক ফ্যাসিবাদের অন্যতম আত্মপ্রকাশ৷
ইতিহাসের এই রাজনৈতিক বিনির্মান একাধারে সামাজিক বিভাজন ও মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারারকে চালিত করছে নেতিবাচকতার দিকেই৷ ​যখন ইতিহাসকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, জাতি বা গোষ্ঠীর চশমা দিয়ে দেখানো হয়, তখন সমাজে ‘আমরা’ বনাম ‘ওরা’ তত্ত্ব জোরালো হয়ে ওঠে। আসল ইতিহাসে যেখানে সহাবস্থান বা জটিল সামাজিক সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল, বিকৃত ইতিহাসে তা হয়ে দাঁড়ায় কেবলই দুটি পক্ষের আদিম লড়াই। এর ফলে সমাজের বুকে তৈরি হয় দাঙ্গা বা হিংসার বাতাবরণ। একই সঙ্গে একটি প্রজন্ম যখন একপেশে এবং বিকৃত ইতিহাস পড়ে বড় হয়, তখন তাদের মধ্যে ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ বা সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার ক্ষমতা ধীরে ধীরে লোপ পায়। তারা প্রশ্ন করতে ভুলে যায়। আর শাসকদল জানে সেই হীরকরাজার বাণি- “ওরা যত বেশি জানে তত কম মানে”৷ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড়ো হাতিয়ার হলো প্রশ্ন করার স্বাধীনতা৷ আর এই প্রশ্নমুখর জনতাই যে কোনো ফ্যাসিবাদি রাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে বড়ো ” থ্রেট”৷


কিন্তু, দিনের শেষে ইতিহাসের ধারাভাষ্যের গতি নিয়ন্ত্রন করতে পারে এমন শাসকগোষ্ঠীকে ইতিহাস এখনো দেখেনি৷ সাময়িকভাবে ক্ষমতার বাঁধ দিয়ে এর গতিপথ বদলে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও চিরকালীন প্রবহমানতার ধারাকে বদলে ফেলা যায় না। কারণ , আজ যে শাসক ইতিহাস পরিবর্তন করছেন, আগামীকাল তিনি নিজেই থেকে যাবেন কেবল ইতিহাসের পাতায় —রাজনীতির পরম্পরা অনুযায়ী তখন হয়তো অন্য কোনো শাসক এসে তাঁর ইতিহাসকেও লিখবেন নতুন করে । আর দিগন্তের লাল সূর্যাস্তের আকাশে, কাস্তে হাতুড়ির শব্দে হেনরিরা সমস্বরে গেয়ে ওঠে ব্রেখট এর গান-
“পড়তে জানে এমন এক মজুরের প্রশ্ন”…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *