আজকের তামান্নারা
দেবাদৃত আচার্য
পলাশির প্রান্তর। পলাশির প্রান্তরে মিরজাফরদের ষড়যন্ত্রে সিরাজের পরাজয় যেভাবে ইতিহাসের পাতায় রয়ে গেছে তেমনই এই মাটিতেই ২৩ জুন নদিয়ার কালীগঞ্জে আরেকবার জঘন্য রাজনীতির শিকার হলো আমাদের ছোট্ট তামান্না। সেই ঘটনার বর্ষপূর্তি আজ। যার হাতে ছিল তুলি, চোখে ছিল ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন। আট বছরের মেয়েটা আঁকতে ভালোবাসত, পাড়ার ছোটদের রং মেলানো শেখাত, আর বলত — বড় হয়ে গরিব কাকুদের বিনা পয়সায় চিকিৎসা করব।
উপনির্বাচনের বিজয় মিছিল। বাজির আলো, স্লোগানের ঝড়। সেই উল্লাসের মাঝেই একটা বোমা। আর বোমার আঘাতে নিভে গেল একটা অপূর্ণ ইচ্ছের নাম। তামান্না মানে ইচ্ছে। কিন্তু সেই ইচ্ছেটাই রাজনীতির ধ্বংসের খেলায় বলি হয়ে গেল। এটাই কি স্বাধীন বাংলার ছবি? শতকের পর শতক কেটে গেলো বিশ্বাসঘাতকতা এখনও বেঁচে আছে, শুধু চরিত্রগুলো বদলেছে।
আজ এক বছর পর দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি — তামান্না একা নয়। ওর মতো “আজকের তামান্নারা” রোজ মরছে। কেউ বোমায়, কেউ বুলডোজারে, কেউ ক্ষুধায়, কেউ অবহেলায়। কালীগঞ্জের তামান্না খবরের কাগজে জায়গা হয়তো পেলো কিন্তু যাদবপুরে, শিয়ালদা, কোচবিহারের যে বাচ্চাগুলো মিছিলের পাশে দাঁড়িয়ে, লজেন্স কুড়োতে গিয়ে পিষে যায়, ওদের নাম কেউ জানে না। ওরাও তো তামান্না। ওদেরও তো খাতা-পেন্সিল ছিল, আঁকার ইচ্ছা ছিল।
রাজনীতি আজ কোথায় নেমেছে এটা ভাবা জরুরি। একদল উন্নয়ন এর নামে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের বিষ ছড়াচ্ছে। বাংলাকে হিন্দু-মুসলিমের দুটো খোপে ভাগ করতে চাইছে। মেরুকরণের আগুনে রুটি সেঁকছে। আরেকদল বিজয় এর নামে মিছিল করে, বাজি ফাটায়, আর সেই বাজির বারুদে নিষ্পাপ শিশুর দেহ ছিন্নভিন্ন হয়। একটা শিশুর লাশের উপর দাঁড়িয়ে কেউ
” হিন্দু খতরে মে হ্যায় বলে”, কেউ “বিজয় আমাদের” বলে।
তামান্না মারা যাওয়ার পর আমরা কী দেখলাম? মোমবাতি মিছিল। পোস্টার। টিভি ডিবেট। কে দায়ী? এই তর্ক আর বিতর্ক। তদন্ত কমিটি। তারপর? তারপর সব চুপ। বিচারহীনতার বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে ফাইল। তামান্নার খাতার অর্ধেক আঁকা সূর্যটা আজও অসম্পূর্ণ। ওর স্বপ্নের হাসপাতালের ইট আজও গাঁথা হলো না। কারণ রাজনীতির কাছে তামান্নার জীবনের দাম একটা ভোটের চেয়েও কম।
পাশাপাশি এই মুর্দা রাজনীতিতে প্রকাশ্যে চলছে বুলডোজার রাজ। অবৈধ তকমা মেরে হকার উচ্ছেদ হচ্ছে। ফুটপাতের দোকান ভাঙছে। রিকশাওয়ালার রুটির দোকান গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। ঘর ভাঙছে, স্বপ্ন ভাঙছে। যে বাবা রোজগার হারিয়ে সন্তানের স্কুলের ফি দিতে পারছে না, সেই বাবার ছেলেটাও তো আজকের তামান্না। যে মেয়েটা উচ্ছেদের ধুলো মেখে পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে, সেও তো তামান্না। বোমা শুধু বারুদ দিয়ে হয় না। বুলডোজারও একরকম বোমা। ওটাও স্বপ্ন ভেঙে মাটিতে মিশিয়ে দেয়।
তামান্নার মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় — ক্ষমতার লড়াই যখন চরমে ওঠে, তখন নিষ্পাপ প্রাণের দাম সবচেয়ে কমে যায়। শিশুর নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এগুলো আর ইস্যু দাঁড়ায় না। ইস্যু হয় তুমি কোন দল? তোমার ধর্ম কী?। এই বাংলা রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিদ্যাসাগরের বাংলা ,সেই বাংলাতেই আজ শিশুর রক্ত দিয়ে রাজনীতির হোলি খেলা হয়। এর থেকে লজ্জার আর কী আছে?
তামান্না শুধু কালীগঞ্জের মেয়ে ছিল না। ও ছিল বাংলার মেয়ে। ওর মতো হাজার হাজার তামান্না রয়েছে এই ভারতবর্ষের বুকে । যারা ডাক্তার হতে চায়,আর্টিস্ট হতে চায়। কিন্তু ওরা বড় হওয়ার আগেই এই জঘন্য সমাজের বলি হয়ে যায়। কেউ রাজনীতির বলি, কেউ দারিদ্র্যের বলি, কেউ সিস্টেমের বলি।
তাই আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা যদি শুধু তামান্নার জন্য চোখের জল ফেলি, তাহলে ভুল করব। কাঁদতে হবে আজকের সব তামান্নার জন্য, তিলোত্তমা’র জন্য। ওই বাচ্চাটার জন্য, যে বুলডোজারে ঘর হারিয়ে রাস্তায় বসে আছে। ওই মেয়েটার জন্য, যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুনে স্কুল হারিয়েছে। ওই ছেলেটার জন্য, হকার বাবার উচ্ছেদ হওয়া দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ খুঁজছে।
তামান্নার জন্য বিচার চাই। খুনিদের শাস্তি চাই। দোষী যেই হোক, শাস্তি চাই। কিন্তু বিচারের থেকেও বড় কথা তামান্নাদের আর মরতে দেওয়া যাবে না। এমন এক বাংলা চাই, যেখানে কোনো মায়ের কোল বোমার আঘাতে খালি হবে না। যেখানে বিজয় মিছিলের আগে শিশুর নিরাপত্তার মিছিল বেরোবে। যেখানে বুলডোজার চলার আগে মানুষের ঘরের কাগজ দেখা হবে। যেখানে রাজনীতিবিদরা ভোটের আগে দেশের বাচ্চাদের স্কুলের খবর নেবেন ।
পলাশির প্রান্তর আমাদের শিখিয়েছিল — বিশ্বাসঘাতকতা করলে জাতি ধ্বংস হয়। আজকের তামান্নারা আমাদের শেখাচ্ছে — শিশুর রক্ত নিয়ে খেললে ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়। পলাশির ষড়যন্ত্রকারীদের আমরা ঘৃণা করি। আর আজকের সমাজের শত্রু কারা? যারা শিশুর লাশের উপর রাজনীতি করে, যারা সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ায়, যারা বুলডোজার দিয়ে গরিবের স্বপ্ন ভাঙে ,ওরাই আজকের বিশ্বাসঘাতক!
তামান্না, এক আগুনের নাম। প্রতিবাদের নাম। সে একা না, তার সাথে আছে আজকের হাজারো তামান্নারা । তাদের অপূর্ণ ইচ্ছেগুলোই হোক আমাদের আগামীর পথ। তাদের আঁকা অসম্পূর্ণ সূর্যটা আমরা সম্পূর্ণ করব। তাদের স্বপ্নের হাসপাতাল আমরা বানাব। কথা দিলাম!!!