গ্যালারির প্রতিধ্বনি: বিশ্বকাপের ক্যানভাসে ফ্যাসিজমের আঁচড়

“…O partigiano porta mi via
O bella ciao, bella ciao, bella ciao ciao ciao
O partigiano porta mi via
Che mi sento di morir..”

১৯১৫ র সময়কালে ইতালির শাসক তখন বেনিতো মুসোলিনি, পশ্চিম ইউরোপ জুড়ে উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির শোরগোল, রুশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং তাঁর ফলস্বরূপ পূর্ব হয়ে পশ্চিমে কমিউনিজমের প্রবেশ। আন্তোনিও গ্রামসি এর হাত ধরে ইতালীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা। আর, সেই পার্টি তথা কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায় ক্লাব “ইউএস লিভরনো”। বর্তমানে ইতালির সিরিয়া সি ডিভিশনে খেলে ইউএস লিভরনো। সাফল্যের গ্রাফে অবনতি আসলেও লিভরনো তার জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত রাজনৈতিক আদর্শের প্রশ্নে আপসহীন। মাঠের লড়াইয়ে উত্থান-পতন থাকলেও নিজেদের বিশ্বাসের জায়গায় তারা সবসময় একই ফর্মে অবিচল। যেখানে, আজও ওড়ে কমিউনিস্টদের পতাকা, আর ম্যানি হাইস্টে ওয়েবসিরিসের এই “বেলা চাও” গানটি আদতে লিভরনো ক্লাবের সমর্থকদের গান। ফুটবল এবং ফ্যাসিজমের যে যোগসূত্র, তাঁর সূচনা এখানেই।

শ্রেণী সংগ্রাম, বিপ্লব, ফুটবল— জন্মলগ্ন থেকেই একে অন্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইতিহাস বলে, রাষ্ট্রের দমননীতি, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দমনের হাতিয়ার হিসেবে খেলাধুলা, বিশেষত ফুটবল এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যখন ইউরোপ দ্বিমেরুকরণের উত্তাল পরিসরে প্রবিষ্ট হয়েছিল, তখন একদিকে পুঁজিবাদ বনাম সমাজতন্ত্র; অপরদিকে গণতন্ত্র এবং স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে অহরহ সংঘাতের জন্ম নিচ্ছিল। জাতি, বর্ণ ও ধর্মের পার্থক্য, সবকিছুর মৌলিকতা ভাঙছিল মানুষের চিন্তা ও সহমর্মিতার ভিত্তিকে। যদিও মুসোলিনি এই অবস্থায় প্রথম ঝড় তুলেছিলেন, তবে তাঁর রাজনৈতিক কৌশল ও ক্ষমতা অবশেষে জার্মানিতে হিটলার এবং স্পেনে ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো দ্বারা অনুসৃত হয়েছিল। ফ্যাসিবাদ, উপনিবেশবাদের একই কলামে ফুটবলকে রাখা হয়ে থাকে; ফুটবল, ফুটবল মাঠের গ্যালারি এই ফ্যাসিবাদ বিরোধী, উপনিবেশবাদ বিরোধী শক্তির অস্তিত্বের প্রতীক রূপে লড়াই জারি রেখে এসেছে। যা একটা বৃহৎ ক্যানভাসে, ধ্রুপদী ধারাবাহিকতার অংশ কিংবা সমাজ বিজ্ঞানের দর্শনরূপে প্রতীয়মান।

ফরাসি বিপ্লব, অটোমান সাম্রাজ্য, জারতন্ত্র, অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যবাদের পতনের পর, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইউরোপে জাতীয়তাবাদী চেতনার দাপট বাড়তে শুরু করে। ১৯০৪ এ ফিফা গঠিত হওয়ার পর, ফুটবল, ক্লাব পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে স্থানান্তরিত হয়। মুসোলিনির শাসনকালে ১৯২৬ র সময়ে “কার্টা ডি ভিয়ারেজিও” এর মাধ্যমে ফুটবলকে পুনর্গঠন করার পর থেকেই ফুটবল এবং ফ্যাসিবাদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপিত হয়। ফ্যাসিবাদ খেলাটিকে পুনর্গঠন করতে এবং এটিকে প্রচার ও জাতীয় পরিচয়ের হাতিয়ার হিসেবে শাসনের প্রয়োজন অনুসারে ঢেলে সাজাতে উদ্যোগী হয়। একই সময়ে, কার্টা ডি ভিয়ারেজিও উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল- “সিরিয়া এ”। তবে, হ্যাঁ, ফ্যাসিবাদীদের হস্তক্ষেপ ইতালীও ফুটবলকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল এবং এর সংগঠন, স্টেডিয়াম ও সাফল্যের মাধ্যমে খেলাটির উপর এক স্থায়ী ছাপ রেখে গিয়েছিল। ১৯৩০ এর ফুটবল বিশ্বকাপ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী ধারণা এবং নীতির বাস্তবায়ন কার্যকর হতে শুরু করে। যদিও, ফ্যাসিবাদকে টিকিয়ে রাখতে মুসোলিনি উগ্র জাতীয়তাবাদকে প্রোমোট করার তাগিদ বোঝেন। এবং যার ফলস্বরূপ ১৯৩৪ এবং ৩৮ এর বিশ্বকাপ ও ১৯৩৬ এর অলিম্পিকে অর্জিত বিষয়গুলোকে কার্যকরভাবে কাজ লাগান।

★মুসোলিনি, ৩৪ এর ফ্যাসিবাদী বিশ্বকাপ★

১৯৩৪ এ ইতালির ফুটবল বিশ্বকাপ জয়, তৎকালীন ফ্যাসিস্ট দলের মুখপত্র “ইল পোপালো ডি’ইতালিয়া” অনুযায়ী ছিল “vision of Harmony, Discipline, Order and Courage”। যার বাস্তব চিত্রটা ছিল একদমই পরিপূরক। মুসোলিনির উগ্র জাতীয়তাবাদী মনোভাব, ম্যাচ পরিচালকদের প্রভাবিত করার দক্ষতা, বিশ্বকাপ আয়োজক সংস্থাকে উৎখাত করার ক্ষমতা— ইতালিকে ১৯৩৪ এর বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিল। সেই বিশ্বকাপেই মুখোমুখি হয়েছিল ইতালি এবং অস্ট্রিয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ের অন্যতম সেরা “ফলস-নাইন” হিসেবে খ্যাত ছিলেন অস্ট্রিয়ার ম্যাথিয়াস সিন্ডলার। পাশাপাশি কার্ল সেস্তা, স্মিটিক, রুডি হিডেন এর মতো রক্ষণভাগ। তবুও, ইভান একলিন্ড নামক এক রেফারির দ্বারা বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গিয়েছিল হুগো মাইসল, জিমি হোগানের “Wunderteam”। মুসোলিনির প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠা এই ম্যাচ পরিচালক, পরবর্তীতে ইতালি বনাম চেকোস্লোভাকিয়ার ফাইনাল ম্যাচটিও পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। টুর্নামেন্টের শুরুটাই ছিল মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী দর্শনের মতো, একই দিনে ৮টি নকআউট ম্যাচ এবং টুর্নামেন্ট এর দূর্বল প্রতিপক্ষদের ছেঁটে ফেলা। ইতালির হয়ে সেবার খেলেছিলেন ৩০ বিশ্বকাপের আর্জেন্টাইন ফুটবলার এনরিক গুইতা, লুইস মন্তি, আত্তিলিও ডিমারিয়া। মুসোলিনির এরূপ ক্ষমতার সামনে দাঁড়াতে পারেনি লিকলিকে শরীরের “পেপারম্যান” নামে খ্যাত ম্যাথিয়াস সিন্ডলার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের হারের ধাক্কা, ক্ষয়ক্ষতি সামাল দিয়ে, ক্ষমতায় আসা ডেমোক্রেটিক পার্টি অব অস্ট্রিয়ার সুবাদে “রেড ভিয়েনা” নামের সেই শহরে ফুটবলের শৈল্পিক সত্তাকে উজ্জীবিত করার নতুন আকাঙ্ক্ষা যখন ফুটে উঠতে শুরু করেছিল, সেইসময়ে দাঁড়িয়ে পোজোর ইতালি এবং মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের ক্ষোভে চিরতরে শেষ হয়ে গিয়েছিল অস্ট্রিয়ার সেই “ভুন্ডারটিম”। ফ্যাসিবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং স্বৈরাচারী ক্ষমতার আস্ফালনের পরিণাম, যা আদতে, সুনিশ্চিত করেছিল মুসোলিনির জয়, ফ্যাসিস্ট শক্তির জয়। এবং এর ফলস্বরূপ, আগামী ৯০-১০০ বছরের জন্য বিশ্বফুটবলের মঞ্চে ফ্যাসিজম ভীতিজনক রূপ নেয় এবং ফ্যাসিবাদের প্রচারণার মঞ্চ হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করে।

★নাৎসি জার্মানি এবং ফুটবল★

নাৎসি আমলের জনপ্রিয় জার্মান দলটির নাম ছিল “F.C. GELSENKIRCHEN-SCHALKE 04”। নাৎসি শাসক হিটলার উগ্র জাতীয়তাবাদ তৈরিতে খেলাধুলা এবং দর্শকসমাগমের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। তাই, মুসোলিনির মতোই, ১৯৩৬ এর বার্লিন অলিম্পিক কে তিনি ব্যবহার করেছিলেন। এছাড়াও, হিটলারের নাৎসি দল ক্ষমতা গ্রহণের পর জার্মানি জুড়ে নতুন লীগ ব্যবস্থা চালু করে, যার নাম ছিল “গাউলিগা”। শালকে দলটার একটা সংখ্যাগুরু অংশ হিটলারের ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টির সমর্থনে ছিল। এমনকি জার্মান অধিনায়ক ফ্রিটস্ শেপান, নাৎসি কৌশলের প্রতি প্রকাশ্যে তাঁর সমর্থন জানিয়েছিলেন। ফুটবলের প্রতি হিটলারের সেরূপ কোনো ভালোলাগা না থাকেলও, বিশ্বমঞ্চে শান্তিপূর্ণ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ ভাবমূর্তি বজায় রেখে ইহুদি-বিদ্বেষী কর্মকাণ্ড ও ইউরোপ জয়ের পরিকল্পনা আড়াল করার উদ্যেশ্যেই তিনি ফুটবলকে ব্যবহার করেছিলেন। আর ১৯৩৬ এর বার্লিন অলিম্পিক্স আদতে “হিটলারের অলিম্পিক্স”/ “নাৎসি অলিম্পিক্স” নামেই আখ্যায়িত। নাৎসি শাসনকালে যেসকল দল জার্মানি সফর করেছিল, তাঁদের প্রত্যেককেই কুখ্যাত “নাৎসি স্যালুট” দিতে বাধ্য করা হত। তবে উল্লেখ্য, জার্মানির বিরুদ্ধে ৬-৩ ব্যবধানে জয়ী ব্রিটিশ জাতীয় দলের এগারো জন ফুটবলারই হিটলারের জার্মানির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছিল, ব্যতিক্রম স্ট্যান কালিস। FA এর সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি এই খেলায় অংশগ্রহণ করতে আপত্তি জানিয়েছিলেন। এছাড়াও প্রসঙ্গত, ৩৬ এর বার্লিন অলিম্পিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জেসি ওয়েন্স ১০০ মিটার দৌড়ে স্বর্ণপদক জেতেন। প্রত্যাশিতভাবেই, জার্মানিতে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকে একজন কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীড়াবিদের পদক জয়ে হিটলার ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। এবং বলেছিলেন,“savages and immoral like blacks should not be allowed to compete with the upper class and sophisticated”।

১৯৩৮, জার্মান সেনাবাহিনী অস্ট্রিয়া জয় করে। যার সুযোগ নেন হিটলার, অস্ট্রিয়ান এবং জার্মান উভয় দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে এক শক্তিশালী নাৎসি জার্মান টিম গঠনের পরিকল্পনা করেন তিনি। ম্যাথিয়াস সিন্ডলারের মতো কিছু অস্ট্রিয়ান ফুটবলার নিজের দেশ এবং আদর্শের সাথে আপোস করতে এবং স্বৈরশাসকের এরূপ নিয়ম মেনে চলতে প্রস্তুত ছিলেন না। স্বভাবতই, ৩৮ এর বিশ্বকাপের, ঠিক এক বছর পর, মাত্র ৩৬ বছর বয়সে তাঁকে তাঁর বাড়িতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় এবং নাৎসি নথিতে তাঁকে “pro-jewish” ও “socialist” হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। হিটলারের শাসনাধীন জার্মানি, নাৎসি দমনপীড়ন ফুটবলের মাধ্যমে জাতীয় সাফল্য অর্জনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল।

ইতিহাস খুব কমই সরলরৈখিক হয়, এবং ১৯৩০ এর দশকের ইতালির ফ্যাসিবাদী ফুটবল থেকে আজকের স্টেডিয়ামের নব্য-ফ্যাসিবাদ পর্যন্ত পথটিও মোটেই সরাসরি নয়। ১৯৪৩ নাগাদ ফ্যাসিবাদের পতনের মাধ্যমে ইতালীয় ক্রীড়াজগতে ফ্যাসিবাদ মুক্তির সূচনা হয়। ১৯৮২ সালে, যখন ব্রাজিল একটি একনায়কতান্ত্রিক শাসনে ছিল, ব্রাজিলের খেলোয়াড় সক্রেটিস করিন্থিয়ান্সের জার্সি পরে সামগ্রিক দখলদারির বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার জন্য আহ্বান জানান। ১৯৮২ সালে ইংল্যান্ডের সাথে যুদ্ধে পরাজিত মালভিনাস দ্বীপের জন্য আর্জেন্টিনার জনগণ ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ কোয়ার্টার-ফাইনালে ন্যায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। ৯০ এর সময়কালে ইংল্যান্ডে শ্রমিক ধর্মঘট চলাকালীন, ধর্মঘটের সমর্থনে লিভারপুল ম্যাচের আগে রবি ফাউলার মাঠে নেমেছিলেন স্লোগান লেখা টি শার্ট গায়ে, যা আজও লিভারপুল ক্লাবের সমর্থকদের স্লোগান “you will never walk alone”। আবার, স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময়, শ্রমিক সংগঠনের কর্মীদের তৎপরতায় মাদ্রিদ শহরের বুকে তৈরি হয়েছিল ফুটবল ক্লাব “রায়ো ভালেন্সিও”।

সাম্প্রতিক একটি ঘটনা, স্পেনের কোপা দেল রে কাপের ফাইনালে মুখোমুখি, আতলেতিকো মাদ্রিদ এবং রিয়েল সোসিয়েদাদ। ম্যাচ শেষ হয় টাই ব্রেকারের মাধ্যমে। রিয়েল সোসিয়েদাদ জয়ী হয়। তাঁদের গ্যালারিতে ছিল ফ্যাসিবাদ বিরোধী টিফো এবং একদা তাঁদের সমর্থক শহীদ জাবালেতার পোস্টার ও জার্সি। সাথে লেনিন ও লাল পতাকা। অতিদক্ষিণপন্থী রিকার্ডো গুয়েরার হাতে, এক উয়েফা লিগের ম্যাচ শেষে তাঁকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। আতলেতিকো আলট্রাস, যারা প্রকৃত পক্ষে একটি নিও ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠী, তাঁদের হাতে প্রাণ গিয়েছিল জাবালেতার। কিন্তু, ফুটবল এতটাই সুন্দর যে, সোসিয়েদাদ সমর্থকরা তাঁদের সাথীকে মনে রেখেছে, তাঁকে নিয়ে বিজয় উৎসব করেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে, একদিকে রাজ্য দেশ জুড়ে, ফ্যাসিস্ট শক্তির আগ্রাসন, তো অপরদিকে দিন বিশেক পর শুরু হতে চলা ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬। রাজ্য, দেশ ছাড়িয়ে পৃথিবীর কোণায় কোণায় ফুটবল সমর্থকদের দীর্ঘ ৪ বছরের অপেক্ষার অবসান। আর, তাঁরই মধ্যে, বিশ্বজুড়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন আগ্রাসনী নীতি, স্বৈরাচারী ক্ষমতার আস্ফালনের মুখোমুখি একাধিক জাতীয় দল এবং তাঁদের সমর্থকরা। বিশেষত উল্লেখ্য, ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি ও অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডে নাখোশ ফুটবলপ্রেমীরা চাইছিলেন না যে, এমন দেশে বিশ্বকাপের আসর বসুক। এদিকে, ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণাধীন গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য ট্রাম্পের জেদ, আরও এই পরিস্থিতিকে কঠোরতর করে তুলেছে। ইরানের উপর ইজরায়েলের সামরিক শক্তির আগ্রাসন, তাতে মার্কিন সমর্থন, বর্তমানে দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপের ঠিক দোরগোড়ায় ইরানের জাতীয় দল এবং তাঁদের সমর্থকদের, এক জটিল সমস্যার সম্মুখীন করেছে। এদিকে, নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য বিশ্বকাপের ক্রীড়াঙ্গনকে এক স্বপ্ন হিসেবে দেখছেন ট্রাম্প।

ইতিহাস সাক্ষী যে, আন্তর্জাতিক ফুটবলে সংকীর্ণ বা অনুদার জাতীয়তাবাদ সবসময়ই নেতিবাচক ফল বয়ে আনে, বিপরীতে আন্তর্জাতিক চিন্তা ও দর্শনের সমন্বয়ই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ, আত্মকেন্দ্রিকতার ঊর্ধ্বে গিয়ে আত্মমনস্কতার প্রাধান্যতা। ফুটবল মূলত মুক্তির গান গায় এবং সৃজনশীলতার নৈবেদ্য গ্রহণ করে। মাঠের উদ্দাম গতি আর হৃদয়ের গভীর আবেগ তখনই সার্থকতা খুঁজে পায়, যখন তা সৃষ্টিশীলতার ছোঁয়ায় আর মুক্ত হাওয়ায় প্রাণ পায়। ঐতিহাসিক ধারবাহিকতা মেনে এবারও আন্তর্জাতিকতাবাদের আদর্শই জয়ী হবে বলে ধরে নেওয়া যায়। তবে জীবন যেমন অনিশ্চয়তায় ঘেরা, ফুটবলও ঠিক তেমন, এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে হাজারো সম্ভাব্যতার রোমাঞ্চ। আর, বিল শ্যাঙ্কলির করা বিখ্যাত উক্তিটির যথার্থতাও এখানেই, “Some people think football is a matter of life and death. I assure you, it’s much more serious than that.”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *