Rss কি ছাতি পার আম্বেদকর ! আম্বেদকর !
দেবাদৃত আচার্য
নাগপুরে শাখায় আম্বেদকর !আম্বেদকর! ধ্বনি আজও দেওয়ালের পাঁজর ভেদ করে আঘাত করে , কারণ এই নাম! এক সাংবিধানিক চাবুক, এক সংবিধান ,এক কলম এবং কোটি কোটি মানুষের আত্মসম্মানের ঠিকানা।
কারণ এই নামের পিছনে আছে মহাডের জলের লড়াই, কালারাম মন্দিরের রুদ্ধ দুয়ারে প্রথম আঘাত।বিদেশের ইউনিভার্সিটি থেকে ডিগ্রি এনে বস্তির ছেলেকে বুকচিতিয়ে বলা,‘শিক্ষিত হও, সংঘবদ্ধ হও, সংগ্রাম করো’। গোলটেবিল বৈঠকে দলিতের ভোটের অধিকার ছিনিয়ে আনার জেদ, খসড়া কমিটির চেয়ারে বসে লেখা সংবিধান যেখানে অস্পৃশ্যতা অপরাধ। তাই নাগপুরে আম্বেদকর শুধু স্লোগান নয়, এ একটা ইতিহাসের কড়া জবাব।
মনুসংহিতা বনাম সংবিধান: লড়াইটা কোথায়
লড়াইটা দুই ভারতের। একটা ভারত মনুসংহিতার চোখে দেখা, আরেকটা আম্বেদকরের কলমে লেখা। মনুসংহিতায় সমাজকে চার বর্ণে ভেঙে জন্মসূত্রে কাজ আর মর্যাদা ঠিক করে দেয়। শূদ্রের জন্য বেদপাঠ নিষিদ্ধ, নারীর জন্য স্বাধীনতা নিষিদ্ধ, । এটা স্তরভিত্তিক অসাম্যের পাকা দলিল।
অন্যদিকে আম্বেদকরের সংবিধান জন্মের বদলে কর্মকে, বর্ণের বদলে নাগরিকত্বকে সামনে আনে। সাম্যের অধিকার , ধর্ম-জাত-বর্ণের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা , অস্পৃশ্যতা বিলোপ ইত্যাদি করে থাকুক প্রতিটি ভারতীয়- র বুকে! আম্বেদকর প্রকাশ্যে মনুস্মৃতি পুড়িয়ে বলেছিলেন, “সামাজিক বৈষম্য”। সেদিন মনুস্মৃতি দাহের গন্ধে মনুবাদীদের বুকের পাঁজর কেঁপে উঠেছিল।
আরএসএস-এর দ্বিতীয় সরসংঘচালক গোলওয়ালকর Bunch of Thoughts-এ লিখলেন, মনুস্মৃতিই ছিল “আমাদের সমাজের প্রাচীন সংবিধান”। ১৯৪৯ সালে সংবিধান কার্যকরী হলে আরএসএস-এর মুখপত্র Organiser অভিযোগ করল, এতে “ভারতীয় কিছুই নেই”। তাই সংঘাতটা ব্যক্তি বনাম ব্যক্তি নয়। “সংঘাতটা দুটো আইনগ্রন্থের একটা মানুষকে বাঁধে,আরেকটা মুক্ত করে।”
মনুসংহিতার চোখে নারী ও শূদ্র
মনুসংহিতার নবম অধ্যায়, পুরোটাই নারীর অধীনতা নিয়ে রচিত। “ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি” নারী কখনোই স্বাধীন থাকার যোগ্য নয়। বাল্যে পিতা রক্ষা করবে, যৌবনে স্বামী, বার্ধক্যে পুত্র। স্বামী দুশ্চরিত্র, মদ্যপ, জুয়াড়ি হলেও স্ত্রীর কাছে সে দেবতা। স্ত্রী-ধর্ম হল নিঃশর্ত সেবা। বিধবা বিবাহকে পাপ নাম দেওয়া হয়েছে এবং সতীদাহকে পুণ্য। নারীর ধনসম্পত্তিতে অধিকার নেই, যেটুকু আছে সেটা স্ত্রীধন ,তাও স্বামীর নিয়ন্ত্রণে। শিক্ষার অধিকার নেই, কারণ মনুসংহিতার মতে নারী স্বভাবদোষে উচ্ছৃঙ্খল হয়ে যেতে পারে। এই বিধানগুলোই হাজার বছর ধরে নারীকে ঘরের কোণে আটকে রেখেছিল। এবং বর্তমানেও সেই ছাপ খোলার চেষ্টা অনবরত চলছে।
মনুসংহিতা শূদ্রের জন্য একটাই কাজ নির্দিষ্ট করেছে দ্বিজাতির সেবা। মনুসংহিতা মতে, ব্রাহ্মণ কষ্টে পড়লে শূদ্রের ধন কেড়ে নিতে পারে, কারণ শূদ্রের নিজস্ব ধন থাকতেই পারে না। বেদমন্ত্র কানে গেলে গলন্ত সীসা ঢেলে দাও, উচ্চারণ করলে জিভ কেটে নাও। একই অপরাধে ব্রাহ্মণের জন্য জরিমানা, আর শূদ্রের জন্য প্রাণদণ্ড। জমির মালিকানা, অস্ত্র ধারণ, সন্ন্যাস গ্রহণ সব নিষিদ্ধ। শূদ্রের উন্নতি মানেই ধর্মের গ্লানি, এটাই মনুসংহিতার বিধান। এই বিধানই ভারতের সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠীকে দুশো বছর ধরে দাস বানিয়ে রেখেছিল। আম্বেদকর একেই বলেছিলেন ” ধাপে ধাপে সাজানো অসাম্য”
ব্রাহ্মণ্যবাদ : প্রতি পদে বাধা
আম্বেদকর গোটা জীবন ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে একটানা যুদ্ধ করেছিলেন। শৈশবে স্কুলে জল খেতে না পাওয়া দিয়ে শুরু। বরোদায় মহারাজার অধীনে সামরিক সচিব পদে যোগ দিয়েও থাকার জন্য হিন্দু হোস্টেলে জায়গা পাননি, শেষে পার্সি ধর্মশালায় নাম লুকিয়ে থাকতে গিয়ে ধরা পড়ে অপমানিত হয়ে চাকরি ছাড়েন। আইনমন্ত্রী হয়েও হিন্দু কোড বিল পাশ করাতে গিয়ে যখন দেখলেন কংগ্রেসের ভেতরেই ঘোর বিরোধিতা, তখন ১৯৫১ সালে তিনি পদত্যাগ করেন। ধর্ম, শাস্ত্র, আর সামাজিক রীতিনীতির নামে প্রতিটা পদে তাঁকে আটকানো হয়েছে।
লাখ লাখ অপমানের পরও এই রাষ্ট্র-সমাজের প্রতিটা দরজা বন্ধ দেখার অভিজ্ঞতাই আম্বেদকরকে সংবিধানের মূল কারিগর বানিয়েছে। যে মানুষটাকে স্কুলে জল খেতে দেওয়া হয়নি, সে-ই খসড়া কমিটির চেয়ারম্যান হয়ে লিখলেন রাষ্ট্র ধর্ম, জাতি, বর্ণ, লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্য করা যাবে না , যাকে মন্দিরের চৌকাঠে আটকে দেওয়া হয়েছিল, তিনিই লিখলেন সব নাগরিকের ধর্ম পালন ও প্রচারের স্বাধীনতা থাকবে। যার বই ছোঁয়ার অধিকার ছিল না, তিনিই লিখলেন, বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার। যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো শিশুকে বস্তায় ওপরে বসতে না হয়। ব্যক্তিগত যন্ত্রণা থেকে তিনি রাষ্ট্রের দর্শন তৈরি করলেন।
আম্বেদকরের স্বপ্নের ভারত এখনো অসম্পূর্ণ
আম্বেদকর চেয়েছিলেন ‘প্রবুদ্ধ ভারত’ — যেখানে সাম্য, স্বাধীনতা, ভ্রাতৃত্ব শুধু প্রস্তাবনার শব্দ নয়, মাঠের বাস্তব। কিন্তু হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে রোহিত ভেমুলাকে যখন গলায় দড়ি দিতে হল , তখন সে লিখে যায় “আমার জন্মই আমার মারাত্মক অপরাধ”, তখন বুঝি স্বপ্নটা এখনো দূরে। যখন নিয়ামগিরি পাহাড় বাঁচাতে ডো্ংরিয়া কন্ধ আদিবাসীকে বুলেটের সামনে দাঁড়াতে হয়, যখন পাথালগাড়ি আন্দোলনের জন্য গ্রামের প্রত্যেকটা বাসিন্দা UAPA-তে জেলে যায়, তখন বুঝি সংবিধানের প্রথম পাতাটা পুরোপুরি চালু হয়নি। আম্বেদকরের স্বপ্নের ভারত লড়ছে — বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘরে, জঙ্গলের পথে। যতদিন একটা রোহিত-ও মরবে, যতদিন একটা আদিবাসী গ্রামও উচ্ছেদ হবে, ততদিন ‘জয় ভীম’ স্লোগানটা শুধু স্মরণ নয়, রণহুঙ্কার হয়েই থাকবে।