নব্য-সাম্রাজ্যবাদ : ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ এবং উত্তর আমেরিকান ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যের সমীকরণ
অগ্নিভ রায়
আন্তর্জাতিক জোট বা যৌথ চুক্তিগুলোর আড়ালে সবসময়ই লুকিয়ে থাকে এক শক্তিশালী পরাশক্তির আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা। বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থায় সমতার স্লোগান আসলে অসমতাকে আড়াল করার একটি আইনি এবং মনস্তাত্ত্বিক কৌশল মাত্র।২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের পাতায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে যেখানে অন্তত ফুটবল নিয়ামক সংস্থা ফিফা এবং আন্তর্জাতিক মূলধারার গণমাধ্যমগুলো আমাদের রাতদিন এটাই বোঝাচ্ছে।
ইতিহাসে প্রথমবার তিনটি দেশ – যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডা যৌথভাবে এই মেগা-ইভেন্ট আয়োজন করছে। দলসংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪৮। ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪-এ। বুর্জোয়া প্রচারযন্ত্রগুলো একে ঐতিহাসিক মেলবন্ধন , সীমান্তহীন ফুটবলের উৎসব এবং উত্তর আমেরিকান ভ্রাতৃত্বের অনন্য নজির হিসেবে ব্র্যান্ডিং করতে ব্যস্ত।কিন্তু প্রগতিশীল ছাত্র ও তরুণ সমাজের রাজনৈতিক চেতনার চোখ দিয়ে যদি আমরা এই চটকদার মোড়কটি উন্মোচন করি তবে ভেতরে দেখতে পাব এক নগ্ন, নিষ্ঠুর এবং সুপরিকল্পিত ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যবাদের রূপরেখা। আপাতদৃষ্টিতে যা তিন দেশের যৌথ উদ্যোগ , তার আসল রাজনৈতিক সত্যটি হলো – এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক সাম্রাজ্যবাদী ও অর্থনৈতিক আধিপত্যকে বৈধতা দেওয়ার এক আন্তর্জাতিক দাবার ঘুঁটি। এই প্রবন্ধে আমরা বিশদভাবে বিশ্লেষণ করব কীভাবে ২০২৬ বিশ্বকাপ উত্তর আমেরিকার ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে প্রতিষ্ঠিত করছে এবং কীভাবে মেক্সিকো ও কানাডাকে কার্যত তাদের ছোট ভাই বা রাজনৈতিক অধীনস্থ রাষ্ট্রে পরিণত করা হচ্ছে।
যেকোনো যৌথ চুক্তির প্রথম শর্ত হওয়া উচিত পারস্পরিক সমতা বা ন্যায্য অংশীদারিত্ব। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের ম্যাচ বণ্টনের দিকে তাকালেই পরিষ্কার হয়ে যায় ক্ষমতার ভারসাম্য কার পক্ষে ঝুঁকে আছে। মোট ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে সিংহভাগ ৭৮টি ম্যাচ একাই আয়োজন করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বাকি মাত্র ২৬টি ম্যাচ ভাগ করে দেওয়া হয়েছে মেক্সিকো ও কানাডার মধ্যে যেখানে উভয় দেশ পাচ্ছে ১৩টি করে ম্যাচ।সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ এবং রাজনৈতিকভাবে আপত্তিকর বিষয় হলো টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বের বিন্যাস। কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে শুরু করে সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল পর্যন্ত টুর্নামেন্টের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা সফল ম্যাচগুলো এককভাবে অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে। মেক্সিকো বা কানাডার কপালে জুটবে কেবল গ্রুপ পর্বের কিছু ম্যাচ এবং শুরুর দিকের নকআউট পর্ব।এই যে বৈষম্যমূলক কাঠামো এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে Hegemony বা একচেটিয়া আধিপত্যবাদের এক ক্লাসিক উদাহরণ। এখানে মেক্সিকো এবং কানাডাকে রাখা হয়েছে কেবলই এক ধরনের কূটনৈতিক প্রলেপ বা পলিটিক্যাল উইন্ডো ড্রেসিং হিসেবে। ফুটবল বিশ্বের কাছে প্রচার করা হচ্ছে এটি একটি যৌথ উত্তর আমেরিকান বিশ্বকাপ। অথচ পর্দার আড়ালে এর সমস্ত অর্থনৈতিক লভ্যাংশ, আন্তর্জাতিক প্রচার এবং নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের একার পকেটে। সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো যেভাবে বহুপাক্ষিক জোটের নামে আসলে নিজেদের একনায়কত্ব কায়েম করে, ফিফার এই টুর্নামেন্ট কাঠামো তারই এক নিখুঁত ক্রীড়া সংস্করণ।এই ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যবাদের সবচেয়ে মর্মান্তিক শিকার মেক্সিকো। ফুটবল সংস্কৃতির দিক থেকে বিচার করলে উত্তর আমেরিকায় মেক্সিকোর ঐতিহ্য যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বহুগুণ প্রাচীন, সমৃদ্ধ এবং জনপ্রিয়। মেক্সিকো এর আগে ১৯৭০ এবং ১৯৮৬ সালে এককভাবে দুটি ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ সফলভাবে আয়োজন করেছে। মেক্সিকোর এস্তাদিও আসতেকা স্টেডিয়ামটি ফুটবলের মক্কা হিসেবে পরিচিত, যেখানে পেলে এবং মারাদোনার মতো কিংবদন্তিরা বিশ্বজয় করেছেন। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল (সকার) আজও মূলধারার এক নম্বর খেলা নয়। সেখানে ফুটবলকে দেখা হয় মূলত একটি কর্পোরেট ইভেন্ট হিসেবে।অথচ এই মেগা-টুর্নামেন্টে মেক্সিকোর মতো ফুটবল ঐতিহ্যে বলীয়ান একটি দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী বা অপ্রধান চরিত্রে নামিয়ে আনা হয়েছে। এটি মেক্সিকোর নিজস্ব ফুটবল সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় গর্বের ওপর এক বড় আঘাত।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে নিজের পেছনের উঠোন বা Backyard মনে করে এবং অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করে (যেমন নাফটা বা ইউএসএমসিএ চুক্তির মাধ্যমে) ঠিক সেই একই কায়দায় ফুটবলের মঞ্চেও মেক্সিকোকে নিজের অধীনস্থ অংশীদার হিসেবে ব্যবহার করছে। মেক্সিকোর ফুটবল আবেগকে পুঁজি করে মার্কিন কর্পোরেটরা মুনাফা লুটবে অথচ মেক্সিকো পাবে কেবলই উচ্ছিষ্ট! এটি বুর্জোয়া সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের এমন এক রূপ যা ফুটবল ঐতিহ্যকে টাকার জোরে গিলে খায়।
লেনিন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন কীভাবে আধুনিক যুগে পুঁজিপতি রাষ্ট্রগুলো সরাসরি সামরিক দখলের চেয়ে ফাইন্যান্স ক্যাপিটাল বা আর্থিক পুঁজির মাধ্যমে অন্য দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ২০২৬ বিশ্বকাপও সেই ফাইন্যান্স ক্যাপিটালের একটি বড় হাতিয়ার।এই টুর্নামেন্টের মূল স্পন্সর, সম্প্রচার স্বত্ব এবং বিপণন ব্যবস্থার সিংহভাগই মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে। ম্যাচগুলো যখন মেক্সিকো বা কানাডায় অনুষ্ঠিত হবে তখনো তার সিংহভাগ মুনাফা শুষে নেবে ওয়াল স্ট্রিটের পুঁজিপতিরা। এই যৌথ আয়োজনের ফলে মেক্সিকো ও কানাডাকে বাধ্য করা হচ্ছে তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও আইনি কাঠামোকে মার্কিন কর্পোরেটদের স্বার্থে বদলে ফেলতে। স্টেডিয়াম সংস্কার থেকে শুরু করে পর্যটন খাতের যে বিশাল বিনিয়োগ, তার বড় অংশই মার্কিন ঠিকাদার এবং লজিস্টিক কোম্পানিগুলোর পকেটে যাবে। অর্থাৎ, অন্য দুই দেশের সম্পদ ও মানবশ্রমকে ব্যবহার করে মার্কিন পুঁজি নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করছে। খেলাকে এখানে ব্যবহার করা হচ্ছে বাজার সম্প্রসারণের এক সুদৃশ্য অনুঘটক হিসেবে।
গত কয়েক দশকে মধ্যপ্রাচ্যে আগ্রাসন, বিশ্বজুড়ে ড্রোন হামলা এবং নব্য-উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতি চাপিয়ে দেওয়ার কারণে বৈশ্বিক মঞ্চে আমেরিকার যে যুদ্ধবাজ বা লুটেরা ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে, এই বিশ্বকাপকে ব্যবহার করা হচ্ছে সেই কলঙ্ক ধুয়ে ফেলার জন্য। বিশ্ববাসীকে দেখানো হচ্ছে আমেরিকা আজ এক মহান উৎসবের কারিগর, তারা তিন দেশের মধ্যে মিলন ঘটিয়েছে। কিন্তু এই ছদ্ম-উদারতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে তাদের আসল চেহারা। মেক্সিকো বা কানাডা যেখানে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের এই জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন তাদের বৈশ্বিক মোড়লগিরিকে আরও এক দশকের জন্য বৈধতা দেওয়ার রাজনৈতিক চাল।
আমরা যারা ছাত্র রাজনীতি করি, আমাদের বুঝতে হবে যে জাল টিকিট বা গ্যালারির উন্মাদের চেয়ে এই রাজনৈতিক সমীকরণ অনেক বেশি বিপজ্জনক। এই মেগা-উৎসব আমাদের চোখকে অন্ধ করার জন্য তৈরি বুর্জোয়াদের এক আধুনিক আফিম।২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আমাদের এই রাজনৈতিক পাঠই দেয় যে, পুঁজিপতিদের মঞ্চে সমতার কোনো স্থান নেই; সেখানে জোটের নামে আসলে আধিপত্যেরই জয়গান গাওয়া হয়। মাঠের ভেতরের লড়াইকে উপভোগ করার পাশাপাশি মাঠের বাইরের এই নব্য-সাম্রাজ্যবাদী চালকে রুখে দেওয়াই হোক প্রগতিশীল ছাত্র সমাজের মূল রাজনৈতিক দায়িত্ব।
শেষে এটুকুই বলতে পারি –
সাম্রাজ্যবাদী কর্পোরেট সংস্কৃতি নিপাত যাক!
জনগণের ফুটবল দীর্ঘজীবী হোক!