মনুবাদের কলমে নারী সুরক্ষা
শুভজিৎ রায়
“শিশুর প্রথম শিক্ষা মায়ের কোলে”
তাই মা শিখলে, শিশু শিখবে তার মায়ের কোলে। যখন আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা সৃজনশীল চেতনা মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণের কথা অর্থাৎ মায়ের ভাষায় শিক্ষার কথা বলে, সেখানে মনু এবং মনুবাদের দৃষ্টিতে নারী শিক্ষার কোন অধিকার নেই। মনু তার রচনার ছত্রে ছত্রে শিক্ষা শুধুমাত্র উচ্চবর্ণের পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধীকরণের কথা বলেছেন। নারীদের জন্য শিক্ষাকে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি, মনুর মতামত অনুসারে নারী যদি শিক্ষিত হয় তা হবে সমাজ এবং জগতের জন্য অকল্যাণকর। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা তার বিপরীত কথা বলে।
নারীর স্বাধীন চেতনাকেও নির্দিষ্টভাবে খর্ব করে মনু। তিনি বলেছেন নারী বাল্যকালে পিতা, যৌবনের স্বামী, বার্ধক্যকালে পুত্র, স্বামী পুত্রহীন নারী নিকটস্থ পুরুষ আত্মীয় এর অধীনে থাকবে (৫/১৪৮)। নারীর স্বাধীন কোনরূপ অস্তিত্ব থাকতে পারে না বলেই নির্দিষ্ট করে মনু এবং মনুবাদ । নারীকে সর্বদা গৃহকোণে চুলার সামনে পাক কার্যসহ বিভিন্ন গৃহ দ্রব্য পর্যবেক্ষণের নিযুক্ত রাখার পরামর্শ মনুর। (৯/১১)
মনু তার রচনায় বলেছেন, কখনোই পত্নী সহিত একপাত্রে ভোজন করবেন না (৪/৪৩) । তাতে অমঙ্গল হবে। অর্থাৎ নারীকে নিচু চোখে বা ঘৃণার চোখে দেখার কথাই বলছেন।
আবার এ কথা বলতে ও মনু পিছুপা হননি, স্ত্রীকে সূক্ষ্ম রুজু বা দড়ি ,বাঁশের বাখারি বা বেল গাছের ডাল দিয়ে আঘাত করা কোন পাপ বা দণ্ড মূলক কাজ নয় (৮/২৯৮)। পুরুষ চাইলে তা করতেই পারেন। অর্থাৎ মনুর অনুসারে , নারী পুরুষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত থাকবেন এবং তাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তাকে প্রহার করাও কোন ভিন্ন বা দণ্ডনীয় বলে চিহ্নিত হবে না।
মনুর লেখার ছত্রে ছত্রে বর্ণিত হয়েছে নারীর বাল্যবিবাহের কথা। মনু নির্দিষ্ট করেছেন নারীর বিবাহের জন্য সর্বদা তার থেকে তিনগুণ বয়সের পুরুষ । কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান দেখাচ্ছে বাল্যবিবাহের ফলে নারী তার শৈশব হারায় তার ফলে তার সামাজিক চেতনা শক্তির বিকাশ ঘটে না। হারায় মাতৃত্ব লাভের সম্ভাবনা। এমনকি বাল্যগর্ভ গর্ভবতী নারীর সন্তান প্রসবের সময় নারী ও শিশু উভয়েরই প্রাণীর আশঙ্কা দেখা দেয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উভয়েরই প্রাণহানি ঘটে। সেখানে মনুর এই প্রবণতা কোনভাবেই নারীদের পক্ষে বলে মনে হয় না (৯/৯৮) ।
নারীকে নরকের দ্বার বলে উল্লেখ করা হয়েছে মনুসংহিতায়। আর সেই নরক থেকে মুক্তি ও স্বর্গের দ্বার কি চিহ্নিত করা হয়েছে? একমাত্র পুত্র সন্তান লাভ করা। এবং সেই প্রয়োজনে নারীকে গাভী, স্ত্রী ঘোড়া ও উটের সাথে তুলনা করতেও মনুর কলম আটকে যায়নি (৯/৪৮-৪৯) । তার মতে নারী সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য হলো গর্ভধারণ করা। অর্থাৎ মনুসংহিতার দৃষ্টিকোণ থেকে নারী শুধুমাত্র সন্তান উৎপাদনের ভোগ্য বিষয়বস্তু। এই ব্যতীত তার আর যা উদ্দেশ্য তা হল পুরুষের জন্য ফাইফরমাশ খাটা। মনু এও নির্দিষ্ট করেছেন গর্ভধারণ ব্যতীত নারী জীবনের আর কোনো মহৎ উদ্দেশ্য নেই (৯/৯৬) । এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয় মনুবাদের চরম নারী বিদ্বেষী মনোভাবের কথা, পত্নী গত হলে পুরুষকে কাল বিলম্ব না করে বিবাহ করার নিদান দিলেও স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রীকে আজীবন কাল শুধুমাত্র ফলমূল গ্রহণ করে জীবন কাটানোর নিদান আছে । যা থেকে প্রমাণিত হয় নারীর স্বাধীন চেতনা এবং স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার পক্ষপাতী কতখানি ছিলেন মনু!
আবার বলা হয়েছে, নারী বন্ধ্যা অর্থাৎ সন্তান জন্মদানে অপারগ হলে তাকে দ্রুত ত্যাগ করা উচিত (৯/৭৯-৮০)। অপরপক্ষে বলা হয়েছে পুরুষ কোন কারনে অক্ষম হলে তাকে নারী ত্যাগ করতে পারবে না, তখন তাকে স্বামীর ইচ্ছাতেই নিকটস্থ কোনো আত্মীয়র সাথে রমন ক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে গর্ভবতী হতে হবে( ৯/১৪৬) । এবং তাকে এই প্রক্রিয়া ততক্ষণ পর্যন্ত সঞ্চালিত করতে হবে যতক্ষণ না পর্যন্ত তিনি পুত্র সন্তানের জননী হতে পারছেন। অর্থাৎ এখানে নারীকে ধর্ষণ করার কথা বলছেন মনু পরোক্ষভাবে । পুত্র সন্তান হলো স্বর্গ লাভের উপায় অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে পুরুষ যখন খুশি যেভাবে খুশি নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে ভোগ ব্যবহার বা পরিত্যাগ করতে পারে কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে এরূপ কোন পন্থার কথা কোথাও উল্লেখিত নেই, নারী চিরকাল ধরে পুরুষের ভোগ্য বস্তু হয়েই তার জীবন কাটাতে বাধ্য।
মনু অদ্ভুত এক যুক্তি তুলে ধরেছেন, তিনি বলেছেন নারী শস্য ক্ষেত্র, পুরুষ সেই ক্ষেত্রের মালিক (৯/৩৩-৩৪) । এবং পুরুষ সেই ক্ষেত্রের মালিক হিসেবে তার ইচ্ছে খুশি মতো ব্যবহার করতে পারবে। অর্থাৎ নারীকে এখানে পণ্য সমতুল্য বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে।।
এই আলোচনা চেষ্টা করলে, আরও দীর্ঘ করা যেতে পারে, কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত আলোচনাতেই বোঝা যাচ্ছে মনু এবং মনুসংহিতা কখনোই নারী স্বাধীনতার কথা বলে না। তাদের স্বাধীন চেতনার বা অস্তিত্বের কথাও বলে না। তা সম্পূর্ণরূপে নারীর স্বাধীনতা এবং স্বাধীন অস্তিত্বের পরিপন্থী। স্ত্রীলোকের কাজ বিপথগামী করা এবং সমাজ ও জগতকে দূষিত করা। মনুর কলম থেকে নারী জন্মকে দেখানো হয়েছে হীনজন্ম রূপে। বারবার বলা হয়েছে নারী নরকের দ্বার ,সে অকল্যাণকর সহ বর্ণবিদ্বেষী কথা। আর বর্তমানে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা RSS, বিজেপির মধ্যে এই মনুবাদী অন্ধকার চেতনা মানুষের মধ্যে প্রকট করে তোলার সচেষ্ট প্রয়াস দেখা যাচ্ছে। এবং মনুর এই নিকৃষ্ট ও বদ্ধমূল ধারণা গুলিকে বর্তমান সময়ে আধুনিক নারীদের উপর প্রতিস্থাপিত করার চেষ্টা করছে আরএসএস (RSS) বিজেপি ও মনুবাদের ধারক এবং বাহকরা। যার ফলাফল,আমরা দেখছি মণিপুরে নারীকে উলঙ্গ করে রাজপথে হাঁটানো থেকে শুরু করে প্রতিনিয়ত কন্যা ভ্রুণ হত্যার পরিসংখ্যান বৃদ্ধিতে ( এখানে সরকার কোনরূপ ব্যবস্থা না গ্রহণ করে তাদের মনুবাদী চিন্তা এবং চেতনাকে সুস্পষ্ট করে তোলে)। গুজরাটে এক রমণীর পেট চিরে ভ্রুণ কে হত্যা করা হচ্ছে। মনুর নিদান অনুসারে যেকোনো উচ্চ বর্ণের পুরুষ তার নিম্ন বর্ণের যে কোন নারীকে ভোগ করলে তা কোন পাপ কার্যরূপে চিহ্নিত হবে না, উপরন্তু তা সেই নারীর জন্যই কল্যাণকর এবং তার স্বর্গপ্রাপ্তির পথকে সুনির্দিষ্ট করবে। আর এই মানসিকতা থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়ে উত্তর প্রদেশে ধর্ষণ করা হচ্ছে মনীষা বাল্মিকী নামক শূদ্র নারীকে। মনুবাদের বর্ণবিদ্বেষী অনুপ্রেরণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রাজস্থানে শুধুমাত্র নিচু জাতির মানুষ হয়ে উঁচু বর্ণের বন্ধুর বোতল থেকে জল খাওয়ার অপরাধী খুন হতে হয় ছয় বছরের শিশুকে। তামাম দেশজুড়ে প্রতিদিন নারীর উপর অত্যাচারের পরিসংখ্যান বাড়ছে যা সুস্পষ্ট ভাবে ইঙ্গিত দেয় মনুবাদের চেতনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেননা মনুর আদর্শ এবং মনুবাদ সুস্পষ্টভাবে নারীকে শুধুমাত্র গৃহকোণে বদ্ধ করে ভোগ এবং পুরুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করার পক্ষপাতী। বর্তমান সময়ে আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় নারী শিক্ষার প্রচলন বৃদ্ধি পাচ্ছে নারী উচ্চ শিক্ষায় পুরুষের থেকে এগিয়ে যাচ্ছে কর্মক্ষেত্রে পুরুষকে সমানভাবে প্রতিযোগিতার মুখে ফেলছে তখন আরএসএস(RSS), বিজেপি ও মনুবাদী চেতনার ধারক এবং বাহকরা প্রতিনিয়ত মনুর নির্দেশিত পথে নারীকে নিয়ন্ত্রিত করার জন্য বাড়িয়ে তুলছে নারীর উপর নির্যাতনের ঘটনা। রোজ ঘটাচ্ছে পার্কস্ট্রিট থেকে সন্দেশখালি-কাকদ্বীপ থেকে কামদুনি-হাঁসখালি থেকে হাতরাস-মনিপুর থেকে আরজি কর। আবার কোথাও বেঁধে দেওয়া হচ্ছে, তাদের পোশাক, খাবার,পেশা, প্রতিদিনের জীবন যাপনের শৈলী ইত্যাদি। যা কিনা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে নারী স্বাধীনতাকে খর্ব করছে এবং তাকে প্রতিদিন ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে আবার গৃহকোণে আবদ্ধ হতে বাধ্য করছে যা সম্পূর্ণরূপে মনুবাদী চেতনার বহিঃপ্রকাশ।
কিন্তু এই মনুবাদী চেতনা যে সময় পর্বে বৃদ্ধি পাচ্ছে তখন সেই মনুবাদী চেতনাকে পদানত করার জন্য, তাকে প্রতিরোধ করার জন্য আধুনিক চেতনা সম্পন্ন এবং বৈজ্ঞানিক শিক্ষা শিক্ষিত প্রজন্ম এগিয়ে আসছে। তার উদাহরণস্বরূপ আমরা বলতে পারি, আরজি করের ঘটনার প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে তামাম দুনিয়া, রাত দখল করেছে নারীরা। মনিপুরের ঘটনায় জ্বলে উঠেছিল এদেশের তরুণ প্রজন্ম। বৃহত্তর মিছিলের বৃহত্তর লড়াইয়ের সামনের সারি থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা। তাই মনুবাদী চেতনা এবং তার ধারক এবং বাহকরা যতই চেষ্টা করুক আধুনিক চেতনা এবং বৈজ্ঞানিক শিক্ষা প্রতিদিন তাদের সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং নিকৃষ্ট চিন্তা ভাবনাকে পদানত করবে, এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক সমাজ ব্যবস্থায় নারী আর ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে বদ্ধ থাকবে না। ঠিক যেভাবে ১৯২৭ সালে ড: বি.আর. আম্বেদকর এই মনুসংহিতাকে পুড়িয়ে আধুনিক ভারতের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলেন। সেই স্বপ্নকে পাথেয় করে, আম্বেদকরদের চেতনাকে সঙ্গে নিয়ে আধুনিক ভারতবর্ষে প্রতিদিন ধংস করা হবে, পুড়িয়ে ছাই করা হবে এই মনুবাদ এবং এর ধারক এবং বাহকদের ।