ঘৃণার সময়ে “ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা”: সিনেমা কি আবার মানুষকে মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনতে পারবে?

সিনেমা কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়। একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক চেতনা এবং সামাজিক মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটে সিনেমায়। তাই শাসকশ্রেণি যখন সমাজে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তখন শিক্ষা, সংবাদমাধ্যম ও সংস্কৃতির পাশাপাশি সিনেমাকেও ব্যবহার করে। ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখা যায়, ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলি সবসময় সংস্কৃতির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। কারণ তারা জানে, মানুষের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে রাষ্ট্রক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করা সহজ হয়।


ভারতে গত এক দশকে সেই বাস্তবতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতা, বহুত্ববাদ এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের পরিবর্তে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে সিনেমার একটি অংশেও সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক বয়ানের বিস্তার ঘটেছে। The Kashmir Files, The Kerala Story, The Sabarmati Report এবং সাম্প্রতিক Dhurandhar এর মতো চলচ্চিত্রে ইতিহাস ও সমসাময়িক ঘটনাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা সমাজে ধর্মীয় বিভাজনকে আরও গভীর করেছে। এগুলি কেবল চলচ্চিত্র নয়; এগুলি এমন এক সাংস্কৃতিক রাজনীতির অংশ, যেখানে নাগরিকের পরিচয়কে ধর্ম দিয়ে নির্ধারণ করার চেষ্টা করা হয়।


এই প্রবণতা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ রাজনৈতিক বক্তৃতা যতটা মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে, সিনেমা তার চেয়ে অনেক বেশি গভীরভাবে মানুষের চেতনায় প্রবেশ করে। একটি আবেগঘন দৃশ্য, একটি সংলাপ, একটি গান বা একটি চরিত্রের মাধ্যমে ঘৃণাকে স্বাভাবিক করে তোলা যায়। দর্শক তখন মনে করেন তিনি একটি সিনেমা দেখছেন, অথচ অজান্তেই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান তাঁর মনে স্থায়ী হয়ে যায়। সংস্কৃতির ক্ষেত্র দখল করার এটাই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।


এই সময়ে আরেকটি প্রশ্নও সামনে আসে—কোন সিনেমা সহজে মুক্তি পায়, আর কোন সিনেমা বাধার মুখে পড়ে? ভারতের সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ফিল্ম সার্টিফিকেশন (CBFC)-এর ভূমিকা নিয়ে বহুবার বিতর্ক হয়েছে। পাঞ্জাব ’৯৫ (Punjab 95) দীর্ঘদিন মুক্তির অনুমতি পায়নি এবং অসংখ্য কাটের নির্দেশের মুখে পড়ে। সন্তোষ (Santosh)-এর ভারতীয় মুক্তিও জটিলতার সম্মুখীন হয়েছে। রাষ্ট্র, প্রশাসন বা সংখ্যাগুরুবাদী রাজনীতিকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে—এমন চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে বারবার বাধা তৈরি হয়েছে। অথচ সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে বলে বিতর্কিত বহু চলচ্চিত্র সহজেই দর্শকের কাছে পৌঁছে গেছে। এই বৈপরীত্য নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও ক্ষমতার রাজনীতির প্রতিফলন।


এই অন্ধকার সময়েই পরিচালক ইমতিয়াজ আলী-র ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা একটি ভিন্ন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। ছবির নামটিই যেন একটি গভীর রাজনৈতিক ও মানবিক ঘোষণা—“আমি ফিরে আসব।“ কিন্তু কোথায় ফিরে আসা? কোনো হারিয়ে যাওয়া বাড়িতে? কোনো ছিন্নমূল শৈশবে? নাকি সেই মানবিক ভারতে, যেখানে মানুষের পরিচয় ধর্মের আগে মানুষ ছিল?


দেশভাগ ছিল উপমহাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়গুলির একটি। লক্ষ লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছিলেন। হাজার হাজার নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। অসংখ্য পরিবার এক রাতের মধ্যে ভেঙে গিয়েছিল। মানুষ জন্মভূমি হারিয়েছিল, প্রতিবেশী হারিয়েছিল, আত্মীয় হারিয়েছিল। দেশভাগ কোনো ধর্মের জয় ছিল না; দেশভাগ ছিল মানুষের পরাজয়।


আজ যখন ধর্মের নামে আবার মানুষকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চলছে, তখন দেশভাগের ইতিহাস নতুন করে স্মরণ করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ ইতিহাসকে ভুলে গেলে ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে। যদি “ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা” নতুন প্রজন্মকে দেশভাগের মানবিক ট্র্যাজেডির দিকে তাকাতে শেখায়, যদি এটি ধর্মের বদলে মানুষের চোখ দিয়ে ইতিহাসকে দেখতে শেখায়, তবে এই চলচ্চিত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক হস্তক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।


এই কারণেই ছবিটির কথা ভাবলে বারবার মনে পড়ে যায় ঋত্বিক ঘটক-এর মেঘে ঢাকা তারা। ঋত্বিক ঘটক দেশভাগ নিয়ে কোনো প্রতিশোধের গল্প লেখেননি। তিনি লিখেছিলেন উদ্বাস্তু মানুষের ইতিহাস। তাঁর ক্যামেরায় সীমান্ত ছিল না, ছিল মানুষের কান্না। তাঁর ছবিতে ধর্ম ছিল না, ছিল বেঁচে থাকার সংগ্রাম। নীতার সেই আর্তনাদ—“দাদা, আমি বাঁচতে চাই”—আজও উপমহাদেশের কোটি কোটি মানুষের আর্তনাদ।


ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা আমাদের শেখায়, ইতিহাসকে ধর্ম দিয়ে নয়, মানুষ দিয়ে পড়তে হয়। কারণ ইতিহাসের প্রতিটি দাঙ্গায় যেমন মানুষ মারা যায়, তেমনই প্রতিটি দাঙ্গার পর লাভবান হয় রাজনৈতিক শক্তি। সাম্প্রদায়িকতা কখনও সাধারণ মানুষের রাজনীতি নয়; এটি ক্ষমতার রাজনীতি। যখন বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষকের সংকট, শ্রমিকের অধিকার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন ধর্মের নামে বিভাজন তৈরি করে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। তাই বামপন্থী রাজনীতি বরাবরই সাম্প্রদায়িকতাকে শুধু নৈতিক সমস্যা নয়, শ্রেণি-রাজনীতিরও একটি অস্ত্র হিসেবে দেখেছে।


আজকের ভারতের প্রয়োজন আরও বেশি সত্যজিৎ রায়, আরও বেশি মৃণাল সেন, আরও বেশি ঋত্বিক ঘটক—যাঁরা মানুষের কথা বলেন। দরকার এমন সিনেমা, যা ঘৃণার বাজারে ভালোবাসার ভাষা শেখায়; যা বিভাজনের রাজনীতির সামনে মানবিকতার রাজনীতি দাঁড় করায়; যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ধর্ম মানুষের সৃষ্টি, কিন্তু মানবতা তারও ঊর্ধ্বে।


“ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা” তাই শুধু একটি আসন্ন চলচ্চিত্রের নাম নয়; এটি এক সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। এমন এক সমাজে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, যেখানে প্রতিবেশীর পরিচয় তাঁর ধর্ম নয়, তাঁর মানবিকতা; যেখানে ইতিহাস প্রতিশোধ শেখায় না, শিক্ষা দেয়; যেখানে সিনেমা ঘৃণার বাজার তৈরি করে না, মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলে।


আজ যখন পর্দা জুড়ে বিভাজনের ভাষা ক্রমশ জোরালো হচ্ছে, তখন আমাদের আরও জোরে বলতে হবে—সভ্যতার ভবিষ্যৎ ঘৃণায় নয়, সহাবস্থানে। সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ প্রোপাগান্ডায় নয়, সত্যে। আর মানুষের ভবিষ্যৎ সাম্প্রদায়িকতায় নয়, ভালোবাসায়।
কারণ শেষ পর্যন্ত যে সভ্যতা মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখায়, সেই সভ্যতাই টিকে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *