জলবায়ু পরিবর্তন : রাজনীতির উত্তাপ, উত্তাপের রাজনীতি।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে পরিবেশের ওপর হিংস্র আক্রমণের নজির বহু পুরনো। পরিবেশের বিরুদ্ধে যে অঘোষিত যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল প্রথম বিশ্বের দেশগুলি, তারই পথ অনুসরণ করে গোটা পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় আজ পরিবেশ’কে পন্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ফলে তাপমাত্রা যেমন বাড়ছে, তেমনই সমুদ্র প্রবাহের পরিবর্তন, বৃষ্টি অনিয়ম, নানান মহামারীর প্রকোপ ইত্যাদি বাড়ছে। তাই সমকালীন বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুতর সমস্যা, যার সম্পর্কে এক্ষুনি সচেতন না হলে এর ফল হবে ভয়ানক।

ধ্বনি দেশ বা সমাজের ধ্বনি অংশের মানুষের নানাবিধ কার্যকলাপের ফলে পরিবেশের যে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, তার ফলে যেকোনো অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে থাকা মানুষ ক্ষতির সম্মুখীন হলেও বেশি প্রভাব পরছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির ওপর। ইতিহাস বারবার এবিষয়ে সাক্ষ্য প্রমাণ দিয়েছে যে পরিবেশ ধ্বংস আসলে রাজনীতির সাথে ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িয়ে। আরো ভালোভাবে বললে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা পরিবেশ ধ্বংসের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। যার ফলে এই বিশ্বায়নের যুগে অন্যান্য সামাজিক-অর্থনৈতিক সম্পর্কের মতো পরিবেশ আন্দোলনেরও যে শ্রেণীগত দিক আছে, তা অস্বীকার করলে ভুল হবে। ইতিহাসের শিক্ষা এটাই।

বাস্তুতন্ত্রের সংকট এবং পরিবেশগত অর্থনীতি নিয়ে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় আলোচনা শুরু হয়েছে ইতিমধ্যে। এমনকি জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সামান্য সচেতনতা দেখাতে গিয়ে সহনযোগ্য উন্নয়ন বা সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্টের কথাও মাঝেমধ্যে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এই বিষয়টি শুনতে এতোটা সহজ লাগলেও আদতে তা এতো সহজ হবে না। প্রযুক্তির উন্নতি ঘটিয়ে মানুষ প্রকৃতি থেকে সম্পদ আদায়ের পরিমাণ বাড়ালেও তার থেকে উৎপাদিত পণ্যের মালিকানা থেকে যাচ্ছে মুষ্টিমেয় ব্যাক্তির হাতে। অধিক মুনাফা অর্জনের লোভে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে বারবার। এই প্রসঙ্গে মার্কস মনে করছেন, পুঁজিবাদী সমাজ সামগ্রিকভাবে পরিবেশ ধ্বংসের মধ্যে দিয়েই বেঁচে থাকে। অধিক মুনাফা অর্জনের লোভে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর যে আধিপত্য তৈরি করেছে পুঁজিবাদী ব্যাবস্থা, তার ফলে মানব সমাজ এবং পরিবেশের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে এক বিপাকীয় চ্যুতি বা Metabolic Rift.
যার ফলে পরিবেশ থেকে, বাস্তুতন্ত্র থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে শ্রমজীবী মানুষ, আদিবাসী মানুষ। জল জঙ্গল জমির অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তাঁরা।

নয়া উদারবাদী অর্থনীতির আধিপত্য যাতে বজায় থাকে এবং পুঁজি আহরণের কাজ সক্রিয় রাখতেই প্রাকৃতিক সম্পদের মৌরসীপাট্টা নিয়ে বসে আছে প্রথম বিশ্বের দেশগুলি এবং তাদের দোসর হাতেগোনা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ। ইউরোপের তাপপ্রবাহ, আফগানিস্তানের ভূমিকম্প, পূর্ব আফ্রিকার তীব্র খরা, অ্যামাজনের গাছ কেটে ফেলায় আবহাওয়া পরিবর্তন, রাজস্থানে পেপসিকো কোম্পানির জন্য ভূগর্ভস্থ জলসংকট বা সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ কেটে ফেলায় কৃষি জমির লবনাক্ত হয়ে যাওয়া আসলে সেই সমস্ত মুনাফালোভী বাণিকদের কাজের ফল। সিকিম, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশে বন্যার ভয়াবহতা আমরা দেখেছি। এখন দক্ষিণবঙ্গের অনেক অঞ্চল বন্যার কবলে। অল্প বৃষ্টি হলেই জলের তলায় চলে যাচ্ছে ঘাটাল, খানাকুল, আরামবাগ, উদয়নারায়ণপুরের মতো অঞ্চল৷ বন্যা প্রতিরোধের ফলে যে ভূমিকা নেওয়ার কথা সরকারের, তা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে তাঁরা। উল্টে শাসক-কর্পোরেটের একাধিক কার্যকলাপের ফলে নষ্ট হচ্ছে নদীর বাস্তুতন্ত্র, নদীর স্বাভাবিক স্বাস্থ্য এবং গতিপথ। একদিকে ভোটের আগে শুধু মাস্টার প্ল্যানের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে নদীর ধারে গড়ে উঠছে একাধিক বেআইনি বহুতল। পণ্য হিসেবে বিক্রি হচ্ছে নদীর হাওয়া ও দৃশ্য।
এবং বন্যা পরবর্তী অবস্থায় রাজ্য ও কেন্দ্রের রাজনৈতিক কোন্দলে চাপা পরে যাচ্ছে বন্যার্ত মানুষের আর্তনাদ। মধ্যপ্রদেশের ছতরপুরে বেতোয়া নদীর সংযোগ প্রকল্পের ফলে ঘরহারা হওয়ার আদিবাসী মানুষ প্রতিবাদে নেমেছেন অভিনব পদ্ধতিতে। আবার সুন্দরবন অঞ্চলে ইতিমধ্যেই সমুদ্রের নোনা জল চাষের জমিতে ঢুকে যাওয়ায় জমির গুনগত মান হ্রাস হচ্ছে। সর্বত্র বিপদের সম্মুখীন হতে হচ্ছে সমাজের প্রান্তিক অংশের মানুষদের। যদিও শহর অঞ্চল এর চেহারা অন্য। অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং বসতি স্থাপনের ফলে গোটা শহর হয়ে উঠেছে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’। সেখানেও শীতল থাকার অধিকার কেবল রয়েছে কিছু মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে। আর্থসামাজিক অবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছে গেছে, যেখানে নূন্যতম গাছের ছায়ায় বসতে পারে না গরীব মানুষ, কারণ উচু উচু হাইরাইসের দৌলতে শহরে সবুজ গাছ আর তেমন নেই! এবং হকার থেকে শুরু করে গিগ ওয়ার্কার্স ও অন্যান্য স্বল্প আয়ের মানুষেরা এই তাপ প্রবাহের দ্বারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গোটা ভারতবর্ষে ১০০ বছরে তাপমাত্রা বেড়েছে ০.৭% সেলসিয়াস। এবং উল্লেখযোগ্যভাবে শেষ কয়েকবছরে এর পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস থেকে গরমের মাত্রা টের পাওয়া যাচ্ছে। ‘সুপার এল নিনো’ প্রভাব নিয়ে মাথায় হাত পরিবেশ বিজ্ঞানীদের। গোটা ভারতের বিভিন্ন শহরে অত্যাধিক উষ্ণতার জন্য প্রাণ হারিয়েছেন অনেক মানুষ। পৃথিবীর সবথেকে উষ্ণতম শহরগুলির বেশিরভাগই ভারতবর্ষে অবস্থিত। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পথ অনুসরণ করেই এদেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জলবায়ু পরিবর্তনকে মানতে চাননি। উল্টে এই নরেন্দ্র মোদির সরকার পরিবেশ ধ্বংসের নীলনকশা EIA2020 বিল সামনে এনেছেন। যার ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অবাধ লুন্ঠনের ছাড়পত্র পেয়ে কর্পোরেট হাঙররা।

জাতি সংঘের পরিবেশ বিষয়ক দুটি সংস্থা থেকে কিছু গবেষণার রিপোর্ট ছাপা হয়েছে, এবং সেখানে বলা হচ্ছে— ২০১৫ সালে প্যারিসে সংগতি হওয়া জলবায়ু সম্মেলনে এই শতাব্দীতে বিশ্বের তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখবার কথা ঠিক হলেও অধিকাংশ দেশ এই বিষয়ে সচেতনতা দেখাচ্ছে না।
ধ্বনি দেশ গুলি অতিরিক্ত পরিমাণে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যাবহার বজায় রাখছে। এমনকি ২০২৩ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ কমানোর যে চুক্তি করেছিল দেশগুলি, সেটাও পূরণ করতে ব্যর্থ তাঁরা। এই সমস্ত অর্থনৈতিক ভাবে শক্তিশালী দেশগুলির বিশ্বাসভঙ্গের ফলে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে দরিদ্র উন্নয়নশীল দেশগুলি। গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত ক্লোপ২৭ সম্মেলনে যে সমস্ত বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম বিষয় ‘লস এন্ড ডেমেজ’; অর্থাৎ যে সমস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলির সমাজ, অর্থনীতি, বাস্তুতন্ত্র জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ধ্বংস হচ্ছে, তাদেরকে অর্থনৈতিক সাহায্য করতে হবে ধ্বনি দেশগুলিকে। কিন্তু এই সাহায্যের প্রসঙ্গে ধ্বনি দেশগুলির সদুত্তর মিলছে না। যতোটা সাহায্য করবার কথা তা তাঁরা করছে না।

বেশ কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, যে কর্পোরেট আধিপত্যের ফলে বাস্তুতন্ত্রে ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, তাঁরাই আবার মুখোশের আড়ালে জলবায়ু সংক্রান্ত সচেতনতার কথা বলছে। এমনকি জলবায়ু সম্মেলনকে স্পনসর করছে। মাইক্রোসফট, ইউনিলিভার, হিটাচি, জাগুয়ার-ল্যান্ড রোভার এবং আইকিয়া ইত্যাদির মতো কোম্পানির ব্র্যান্ডিং থাকছে জলবায়ু সংক্রান্ত বিষয়ে। জলবায়ু বিষয়ক আলোচনা মঞ্চে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নেতৃত্বের সাথে একসাথে বক্তব্য রাখতে দেখা গেছে ‘অ্যামাজন’ কোম্পানির কর্ণধার ধনকুবের জেফ বেজোসকে। অন্যদিকে দাঁড়িয়ে জেফ বেজোস আমেরিকার এমন সব রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্বকে অর্থনৈতিক সাহায্য করেছেন, যারা জলবায়ু পরিবর্তনকে পরিহাস করেছেন। অস্বীকার করেছে। জলবায়ু আন্দোলনকারীরা একাধিক কারণে ক্ষুব্ধ জেফ বেজোসের মতো একাধিক ব্যাক্তির ওপর। উপরোক্ত এই উদাহরণ গুলির মধ্যে দিয়ে একটি জিনিস স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছে, পুঁজিবাদী শক্তি মুনাফার লোভে যেকোনো পর্যায়ে যেতে পারে। কোনো পুঁজিপতিকে যদি মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়, তাহলে সে গলার দড়িটিও বেঁচতে পিছুপা হবে না।

এই ছোট্ট আলোচনা আসলে এই কথাটিই বলতে চেয়েছে, অন্যান্য সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বিষয় গুলির মতো জলবায়ু পরিবর্তনও এই সময়ে দাঁড়িয়ে একটি জলজ্যান্ত সমস্যা। অতীত থেকে শুরু করে এযাবৎ কাল পর্যন্ত বিশ্ব তথা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে পরিবেশ বাঁচানোর লড়াইয়ের সাক্ষী থেকেছে সাধারণ মানুষ। কখনো সে লড়াই হয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠের বিরুদ্ধে, কখনো কারখানার দূষিত জল নদীতে মেশার বিরুদ্ধে আবার বসতভিটা থেকে মানুষকে উচ্ছেদ করে খনি বানানো বিরুদ্ধে। নয়া উদারবাদী সমাজে যে অর্থনৈতিক বিভাজন, যে জীবন-জীবিকার লড়াই, তার সাথে হাতেহাত ধরে পথ হাঁটছে জল জঙ্গল জমি রক্ষার লড়াই।

পরিবেশ ধ্বংসের পেছনে রয়েছে রাজনীতি। তাই পৃথিবীকে বাঁচাতে, আগামী প্রজন্মকে বাঁচাতে এই মুহুর্তে আমাদেরও প্রয়োজন পরিবেশ বাঁচানোর বিকল্প রাজনীতি। বিকল্প ভাষ্য। যা নিয়ন্ত্রণ হবে না মুক্তবাজারের দ্বারা। এছাড়া আমাদের আর কোনো পথ নেই। সময়ও নেই। এই লড়াই আমাদের শেষ পর্যন্ত লড়ে যেতে হবে, এই হোক পরিবেশ দিবসে আমাদের শপথ।

তথ্যসূত্র:- বিবিসি, নেচার, উইকিপিডিয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *