শতবর্ষে আর এস এস : হিন্দুত্বের বিবর্তন(২)
গৌতম রায়
একটা দীর্ঘ সময় জুড়ে আরএসএস, তাদের গোপন কর্মসূচির অন্যতম প্রধান অঙ্গ হিসেবে জম্মু-কাশ্মীর কে সংবিধান প্রদত্ত বিশেষ মর্যাদার অবসানের বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে আসছিল ।আরএসএসের এই গোপন কর্মসূচি সব সময় প্রাতিষ্ঠানিকতার নিরিখে প্রকাশ্যে বা গোপনে এসেছে। তাদের রাজনৈতিক সংগঠন, অতীতের হিন্দু মহাসভা, ভারতীয় জনসংঘ বা সাম্প্রতিককালের বিজেপির কেন্দ্রীয় আইনসভা আসন সংখ্যার নিরিখে, বা বিভিন্ন রাজ্যে শাসন ক্ষমতা থাকবার নিরিখে এই গোপন কর্মসূচির গোপনীয়তা বা প্রকাশ্যে আসার বিষয়টি সব সময়েই নির্ভর করেছে।
একক গরিষ্ঠতা নিয়ে আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি যখন দ্বিতীয় বার কেন্দ্র সরকার গঠন করে , তখন সংসদের প্রথম অধিবেশনেই তারা কাশ্মীরের জন্য সংবিধানে যে ৩৭০ এবং ৩৫ এর ক ধারার, বিশেষ মর্যাদা হিসেবে স্বীকৃত ছিল, তার অবসান ঘটায়। এই বিষয়টিকে তারা যে সংসদে আনতে চলেছে তেমন কোনও আভাস ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের সময়ও প্রকাশ্যে হিন্দুত্ববাদী শিবির দেখায় নি। এমনকি বিজেপির অন্দরমহলের খবর রাখে, এমন সংবাদমাধ্যমগুলিও, বিজেপি সরকারের কর্মসূচি সম্পর্কে একটা শব্দ উচ্চারণ করে নি।হয় এই সংবাদ মাধ্যমগুলি বিজেপির প্রতি আনুগত্য প্রকাশের নিরিখে সমস্ত কিছু জেনেও গোটা ব্যাপারটা গ্রহণ করে গেছে। আর তা না হলে, হিন্দুত্ববাদী শিবিরের এই কর্মসূচির বিষয়টি এত উচ্চ স্তরে, এত গোপনীয়তার মধ্যে কার্যকরী হয়েছে যে, বিজেপির বা আরএসএসের ঘরের খবর রাখা লোকজনদের পক্ষেও, কাশ্মীর ঘিরে কি হতে চলেছে বিজেপি সরকারের দ্বারা ,সেটা জানা সম্ভবপর হয়নি।
আরএসএসের শতবর্ষ পালন ঘিরে , তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি , ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কি ধরনের পথে হাঁটতে পারে , তার একটা আভাস দিয়ে ভারতীয় জনগণের যে অংশ , হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে বিশ্বাস করে সেই অংশকে একটা ইতিবাচক বার্তা দিতে, সঙ্ঘের পক্ষেই এই ৩৭ ধারার অবলুপ্তির মধ্যে দিয়ে একটা বার্তা দিতে চেয়েছে হিন্দুত্ববাদীরা। যারা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির তীব্র বিরোধী, কিন্তু নরম হিন্দুত্বের পথে চলে, তাদের কাছেও একটা বার্তা দিতে চেয়েছিল ।
এভাবেই আরএসএস- বিজেপি; গোটা অবিজেপি কিন্তু বামপন্থী নয় , এমন রাজনৈতিক দলগুলি যাতে বামপন্থী শিবির , ধর্মনিরপেক্ষ শিবির দ্বারা প্রভাবিত না হয়, সেই কৌশল ও নিয়েছিল।সব অবস্থাতেই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা যাতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সঙ্গে নিজেদের সংযুক্ত রাখে , তাইই তাদের কাছে আর এস এর শতবর্ষের প্রাক্কালে , সংবিধানের ৩৭০ ধারা এবং ৩৫ এর ক ধারার অবলুপ্তি ঘটিয়ে হিন্দুত্ববাদীরা বোঝাতে চেয়েছিল , সংঘের শতবর্ষ পালনকে ঘিরে তারা কি ধরনের উগ্রতার পথে হাঁটবে। কি ধরনের বিদ্বেষ এবং প্রতিহিংসার পথে একাধারে প্রশাসন অন্যদিকে সামগ্রিক রাজনীতিকে পরিচালিত করবে।
এই গোটা প্রেক্ষিতকে বোঝবার জন্যে ,’৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা ক্ষমতা হস্তান্তরের পর , আর তার অব্যবহিত আগে জম্মু-কাশ্মীরের রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে দিকে আমরা সংক্ষেপে একটু দৃষ্টিনিক্ষেপ করছি-
পাহাড়, বিশেষ করে কাশ্মীরের পাহাড় ঘিরে পন্ডিত নেহরুর বিশেষ রকমের আকর্ষণ ছিল।তিনি তাঁর বিভিন্ন লেখাতে বহুবার কাশ্মীরের ভৌগলিক আকর্ষণের কথা লিখেছেন।’৪৬ সালে পন্ডিত নেহরু লিখছেন;
পাহাড়ের প্রতি ভালোবাসা আর কাশ্মীরের প্রতি আমার রক্তের টান ই আমাকে বার বার সেখানকার মানুষদের কাছে, প্রকৃতির কাছে টেনে নিয়ে গেছে। কাশ্মীরে যে আমি কেবলমাত্র সমকালীন সময়ের জীবন, যাপন, শৌর্য আর সৌন্দর্যেই নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছি, তা কিন্তু নয়।সুদূর অতীত থেকে সেখানকার যে কমনীয় রূপ প্রবাহিত হয়ে আসছে, তাকেও আমি অন্তরে উপলব্ধি করেছি। আমাদের দেশ ভারতের কথা ভাবলেই, এইসব কিছুই আমার মন কে আন্দোলিত করে। তবে ভারতের কথা ভাবলে , সব কিছুর আগে যেটা আমার মন কে সবথেকে বেশি নাড়া দেয়, সেটা হলো; তুষারশুভ্র হিমালয়। বসন্তে রঙিন নতুন ফোটা ফুলে কাশ্মীরের কোনও গিরি উপত্যকার কথা আমার মনকে বেশি টেনে নিয়ে যায়।কুলুকুলু স্রোতধারার ভিতর দিয়ে বয়ে চলা নদী, তার পাশের মানুষেরা– আমার মনকে ভরিয়ে রাখে।
কাশ্মীর ঘিরে হিন্দুত্ববাদী শক্তির কর্মপদ্ধতির প্রথম বিষয়টি ছিল পন্ডিত জওহরলাল নেহরুর জীবন সংগ্রামকে ,কাশ্মীরের ঘটনাক্রমের সঙ্গে বিকৃতভাবে উপস্থাপিত করে, গোটা ভারত জুড়ে পন্ডিত নেহরুকে অসম্মানিত করা ।বিকৃতভাবে উপস্থাপিত করা ।আর পন্ডিত নেহরুকে বিকৃতভাবে উপস্থাপনার মধ্যে দিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের কেবলমাত্র কংগ্রেস বিরোধী রাজনীতির দিকটিই উঠে আসেনি ।সামগ্রিকভাবে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি, হিন্দু – মুসলমানের সম্প্রীতির পরিমণ্ডলে বিশ্বাসী শক্তির বিষয়ে একটি বিকৃত ইতিহাসবোধ ভারতবাসীর মনে উপস্থাপিত করা– এটিই ছিল কাশ্মীর প্রশ্নে সার্বিকভাবে পণ্ডিত নেহরুকে ভারতবাসীর চোখে অসম্মানিত করবার লক্ষ্যে আরএসএস সহ তাদের গোটা পরিমণ্ডলের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক কর্মসূচি ।
ব্রিটিশ ১৯৪৭ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের কালে পাঁচশোরও অধিক দেশীয় রাজ্যগুলিকে তাদের মত করে, তাদের ছোট ছোট রাজ্যগুলিকে পরিচালনার অধিকার দিয়ে গিয়েছিল ।এই ৫০০র বেশি দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতীয় রাষ্ট্রের অধীনে আনার প্রধান কৃতিত্ব পণ্ডিত জওওহরলাল নেহরুর। যদিও কংগ্রেসের ভেতরকার দক্ষিণ পন্থী শক্তি, যারা হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে কংগ্রেসের রাজনীতিকে ,হিন্দু সাম্প্রদায়িক ধারায় পরিচালিত করবার চেষ্টা করত ,তারা এই দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতীয় ইউনিয়নের যোগদানের যাবতীয় কৃতিত্ব দেয় নেহরুর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের উপর ।
কংগ্রেসের মধ্যে নেহরুর ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতির প্রতি গভীর অনুরাগ এবং ভারতীয় সংস্কৃতি , সম্প্রীতির ধারাবাহিকতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা –এই বিষয়টিকে তাঁদের দলের( কংগ্রেস) অনেকেই সমর্থন করত না। এই নেহরু বিরোধিতার ধারা আমাদের বাংলায় ,এখানকার প্রাদেশিক কংগ্রেসের মধ্যেও যথেষ্ট জোরদার ছিল ।
১৯৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেসের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে’ দেশ ‘ পত্রিকার পক্ষ থেকে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করা হয়েছিল ।সেই পত্রিকায় এককালের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কংগ্রেস নেতা অতুল্য ঘোষ ,’ভারত ভাগ: কার্য ও কারণ ‘নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেই প্রবন্ধে অতুল্য ঘোষ ,দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতীয় ইউনিয়নে যোগদানের সার্বিক কৃতিত্ব অর্পণ করেছিলেন সর্দার প্যাটেলের উপর ।দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করার প্রসঙ্গে নেহরুর নামও প্রায় এ প্রসঙ্গে অতুল্য ঘোষের লেখাটিতে অত্যন্ত গুরুত্বহীনভাবে উল্লিখিত হয়েছিল।
এই প্রবণতা থেকেই বুঝতে পারা যায় , ব্রিটিশের ক্ষমতা হস্তান্তরের কালে যে ৫০০র ও বেশি দেশিয় রাজ্য কার্যত স্বাধীন হয়েছিল , যার মধ্যে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পৈত্রিক সম্পত্তি জুনাগর বা হায়দ্রাবাদ ,নিজামের অধিকারভুক্ত- এরা সরাসরি পাকিস্তানি যোগ দেওয়ার কথা ঘোষণা পর্যন্ত ঘোষণা করেছিল। এই রকম একটি পরিস্থিতিতে এই ৫০০রও বেশি দেশিয় রাজ্যের মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, জম্মু ও কাশ্মীর।
কাশ্মীরের ভারত ভুক্তি, দেশিয় রাজাদের ভারতীয় ইউনিয়নে যুক্ত হওয়ার ঘটনার মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। সেই সময় জম্মু ও কাশ্মীরের আয়তন হায়দ্রাবাদের থেকেও বেশি ছিল। সেটি ছিল ৮৪,৪৭১ বর্গ মাইল। কাশ্মীরের ভারতভুক্তির সময়ে সেই রাজ্যের জনসংখ্যা ছিল ৪০ লক্ষের থেকেও বেশি ।ভৌগলিক কারণে , হায়দ্রাবাদের জনসংখ্যা ঘনত্ব ছিল বেশি ।আর কাশ্মীরের মানুষ যেহেতু গোটা উপত্যকা টি জুড়ে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করতেন, সেই কারণে সেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব ছিল কম।
যে ৫০০টির ও বেশি দেশিয় রাজ্য, ব্রিটিশের ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়কালে ছিল , তাদের মধ্যে একমাত্র জম্মু-কাশ্মীর , সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যতার দিক থেকে ছিল সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। হায়দ্রাবাদ, জুনাগর, জয়পুর , কোচবিহার সহ অন্যান্য দেশিয় রাজ্যগুলিতে, জম্মু-কাশ্মীরের মতো সাংস্কৃতিক বৈচিত্র এবং বৈশিষ্ট্য আর অন্য কোনও রাজ্যের ছিল না। গোটা কাশ্মীর জুড়ে ছোট বড় পাহাড় আর বিশাল চাষযোগ্য জমি , রাজ্যটিকে একটি বিশেষ রকমের ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের উপস্থাপিত করেছিল ।কাশ্মীরে, পাহাড়ি উপত্যকার মধ্যে যে সমস্ত ছোট ছোট চাষ যোগ্য জমি ছিল ,সেগুলির উর্বরতার সঙ্গে তুলনা করা চলে, পাঞ্জাব অঞ্চলের কৃষি জমিগুলি।
ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে জম্মু-কাশ্মীরে সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক ছিলেন মুসলমানেরা। সেখানকার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৩ শতাংশ তখন ছিলেন মুসলমান ।কিন্তু দেশভাগজনিত সময়কালের যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ,দাঙ্গা, পারস্পরিক অবিশ্বাস- এইসবের ফলে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরবর্তী সময়েই সেখানে মুসলমান জনসংখ্যা হ্রাস পায়। তবে , এটি ঘটে মূলত জম্মুতে।
একটা বড় অংশের কাশ্মীরের মুসলমান নাগরিক ,তারা দাঙ্গা সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ হিন্দুত্ববাদীদের নানা ধরনের কলাকৌশল এই সমস্ত কিছুর ফলে আতঙ্কিত হয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের চলে যান।
পাশাপাশি দাঙ্গা ইত্যাদির কারণে পাকিস্তানের হিন্দু নাগরিকদের একটা বড় অংশ কাশ্মীরের জম্মু অংশে চলে আসে ।জম্মুতে এইসময়ে সামান্য কিছু মুসলমানেরা ছিলেন ।এই দেশভাগের কালে তাঁরা চলে আসেন কাশ্মীর উপত্যাকাতে ।আর তার পাশাপাশি পাকিস্তানের হিন্দু নাগরিকদের একটা অংশ বা পাঞ্জাবের হিন্দু নাগরিকদের একটা অংশ তারাও চলে আসেন জম্মুতে ।
এই ঘটনাক্রমের ফলে ধীরে ধীরে সেই সময়ের অবিভক্ত জম্মু-কাশ্মীরে মুসলমানেরা আর সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকে না। বাইরের জনস্রোতের ফলে হিন্দুরাই হয়ে ওঠে সংখ্যাগরিষ্ঠ।
অবিভক্ত জম্মু-কাশ্মীরে , দেশভাগের সময়কালের বিভিন্ন ঘটনাক্রমের ফলশ্রুতি হিসেবে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে, হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে ওঠার ফলে, কাশ্মীরের হিন্দু রাজা হরি সিং, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান যেটা চিরদিনই হিন্দু সম্প্রদায়িক শক্তির পক্ষে ছিল ।সেই হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার পক্ষে অবস্থান, তা খুব জোরদার হয়ে ওঠে অবিভক্ত ভারতের শেষ পর্বে।
উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে শুরু করে বিশ শতকের প্রথম ভাগের সময়কাল পর্যন্ত অবিভক্ত পাঞ্জাবে হিন্দু মহাসভা এবং তার বিভিন্ন ধরনের শাখা সংগঠন( বিশেষ করে আর্য সমাজ) ভয়ঙ্কর মুসলমান বিদ্বেষ এবং হিন্দু সম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি প্রসার ঘটাতে শুরু করেছিল । এই ঘটনাক্রম , বিশেষ করে সামগ্রিকভাবে ওই এলাকার অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে শুরু করে । হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার দ্বারা অর্থনীতিকে প্রভাবিত করবার একটা রেশ এবং প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই জম্মু অংশে পড়েছিল ।আর সেই প্রভাবকে কেন্দ্র করে হিন্দু মহাসভা, ( আর্য সমাজ ইত্যাদিরাও ) যেটি জন্ম লগ্ন থেকেই আরএসএসের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রথম এবং প্রধান প্রচারক ছিল। সেই হিন্দু মহাসভা, জম্মু অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে শক্তিশালী করবার লক্ষ্যে নানাভাবে ডালপালা বিস্তার করতে থাকে।
আরএসএস প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৫ সালে। প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে তারা প্রথম কিছুটা সময়, তাদের তাত্ত্বিক অবস্থান ঘিরে কিছুটা ব্যস্ত থাকে ।এই সময়কালে সাংগঠনিক বিস্তারের কাজে তারা খুব বেশি মনোযোগ দেয় নি। তবে তাদের সেই তাত্ত্বিক অবস্থানের প্রয়োগ, আর এস এসের ও প্রতিষ্ঠার আগে, তাদের মতাদর্শের যে হিন্দু মহাসভা কর্মরত ছিল, আর্য সমাজ কর্মরত ছিল, তারাই কিন্তু সেটি বিস্তারের কাজ বেশি রকম ভাবে শুরু করে দিয়েছিল ।বস্তুত হিন্দু মহাসভাই কিন্তু আরএসএসের জন্ম লগ্ন থেকে, তাদের রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে কর্মরত ছিল। তার পাশাপাশি বলতে হয়, হিন্দু মহাসভার সমান্তরাল যদিও আদর্শগতভাবে এবং অবস্থানগতভাবে তাদের মধ্যে কোনও বিরোধ বা সংঘাত ছিল না।তবে ,’ হিন্দু সভা’ নামক আরও একটি প্রতিষ্ঠান , এই সময়ে উত্তর ভারত জুড়ে কার্যকরী ছিল। তারাও ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়কাল ধরে জম্মুতে জনসংখ্যার বিন্যাসের পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে, মুসলমান বিদ্বেষ এবং হিন্দু সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি , জম্মু – কাশ্মীরের হিন্দু রাজা যাতে ভারত ইউনিয়নে যোগ না দিয়ে , সেই রাজ্যটিকে একটি স্বাধীন হিন্দু রাজ্য হিসেবে রাখে, এই ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম তারা গোটা কাশ্মীর ভূখণ্ডে কার্যকর করেছিল।
কাশ্মীর উপত্যকায়, অবিভক্ত ভারতের সময়কাল থেকেই নাগরিক সমাজের মধ্যে মুসলমানদের যে সংখ্যাধিক্য ছিল, সেটি দেশভাগ জনিত কারণে কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পেয়েছিল ।তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থানরত উচ্চ শিক্ষিত, অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী মুসলমান সমাজের একটা অংশ , জন্ম লগ্ন থেকেই পাকিস্তানের প্রতি আস্থাশীল ছিলেন না ।মুসলিম জাতীয়তার উপর ভিত্তি করে, কেবলমাত্র ধর্মকে কেন্দ্র করে একটা নতুন রাষ্ট্র তৈরি হওয়া এবং সেই রাষ্ট্র আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলবে– এই ধ্যান ধারণায় , পশ্চিম পাকিস্তানে ছোট হলেও একটা অংশের আধুনিক মানসিকতা সম্পন্ন মুসলমানেরা বিশ্বাসী ছিলেন না ।
তাঁরা সেই সময়ই ভারতে চলে আসেন ।কাশ্মীর উপত্যকায় তারা বসবাস করতে শুরু করেন। এই কার্যক্রম ক্ষমতা হস্তান্তরের কিছুকাল আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। ফলে জম্মুতে যেমন হিন্দু জনসংখ্যার আধিক্য দেখা দিল। যার ফলে জম্মু -কাশ্মীর মিলিয়ে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হল। ঠিক তেমনি ই কাশ্মীর উপত্যকাতে মুসলমানের সংখ্যা কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পেল ক্ষমতা হস্তান্তরের ফলে।
এই ঘটনাটি কে ই জম্মু-কাশ্মীরের হিন্দু রাজা এবং তার সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে তাল মিলিয়ে চলা হিন্দু সম্প্রদায়িক শক্তি, আরএসএস, হিন্দু মহাসভা , হিন্দু সভা সহ আর্য সমাজ প্রমুখেরা, হিন্দু – মুসলমানের বিভাজনের অক্ষরেখাটিকে আরো শক্তিশালী করে। সেই বিভাজনের প্রভাব ভারতের অন্যান্য অংশে প্রবাহিত করবার লক্ষ্যে বিশেষ রকম ভাবে কার্যকরী হয়ে ওঠে। কিন্তু কাশ্মীর উপত্যকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য , যেটি কেবলমাত্র আপামর ভারতবাসীর কাছেই অত্যন্ত ভালোবাসার একটি জায়গা, আকর্ষণের একটি জায়গা তা নয়, পাকিস্তানের কাছেও বিশেষ রকমের লোভাতুর একটি দৃষ্টি রয়েছে কাশ্মীরের প্রতি। অপরপক্ষে গোটা বিশ্বের কাছে কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য খুবই আকর্ষণীয় একটি বিষয় ।
এই জায়গা থেকে জম্মুর উত্তরের কাশ্মীর উপত্যকা, তার প্রতিও হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি আর জম্মু-কাশ্মীরের রাজা, তার লোভ টাকে প্রশমিত করতে পারল না। ব্রিটিশ শাসনকালে ই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পর্যটন শিল্পের ক্ষেত্রে কাশ্মীর, ভারতে বিশেষ একটা জায়গা করে নিয়েছিল।তবে সেই সময়ে কেবলমাত্র গোটা ভারতের ধনী মানুষজনেরাই গ্রীষ্মকালে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসতেন তা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকেও ধনী মানুষজনেরা কাশ্মীরে আসতেন পর্যটনের উদ্দেশ্যে। দীর্ঘদিন থাকতেন এবং এই পর্যটন শিল্পকে কেন্দ্র করে ,জম্মু-কাশ্মীরের হিন্দু রাজার একটা বড় রকমের উপার্জন হত।
এই অর্থনৈতিক লোভটাও কাশ্মীরের হিন্দু রাজা এবং হিন্দু সম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়কাল থেকেই বিশেষভাবে দেখেছিল। কাশ্মীর ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলে, সেখানকার হিন্দু রাজার অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে। তাই হিন্দু রাজা কে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী রেখে , সেই রাজার কাছ থেকে একটা বড় অংশের অর্থ আদায় করে, হিন্দু সম্প্রদায়িকতাকে গোটা ভারতব্যাপী প্রসারিত করা– এটাও ছিল কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের কালে জম্মু-কাশ্মীরকে ঘিরে গোটা হিন্দু সম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শিবিরের অন্যতম বড় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য।
তাছাড়াও রেশম, পশম, কারুশিল্প, কাঠ, পেতল ইত্যাদির উপর নানা ধরনের শৈল্পিক সুষমা ফুটিয়ে তোলবার ক্ষেত্রে কাশ্মীর উপত্যকার খ্যাতি গোটা ভারত জুড়ে ছিল। এই সমস্ত বিষয়গুলি বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত সফল ছিল। গোটা ভারতেই , কাশ্মীরের হস্তশিল্প , নানা ধরনের কুটির শিল্প, বিশেষ করে শাল ,পশমিনা, জামিয়ার বিশেষ রকমের খ্যাতি ছিল ।
এগুলি যে কেবল ভারতের মধ্যেই বাণিজ্যিক ভাবে সমাদ্রিত হতো তা নয়। আন্তর্জাতিক বাজারেও কাশ্মীরের এই সমস্ত শিল্প-সামগ্রীগুলির বিশেষ রকমের কদর ছিল। বিদেশি মুদ্রা উপার্জনের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলি ছিল কাশ্মীর রাজার অন্যতম আকর্ষণীয় এবং লোভনীয় বিষয়। হিন্দু স্বার্থ নয়, এইসব অর্থনৈতিক স্বার্থই ছিল কাশ্মীর রাজার , নিজের রাজ্য টিকে স্বাধীন হিন্দু রাজ্য রাখার পক্ষে সবথেকে বড় কারণ। এই উদ্দেশ্য টিকেই তিনি চরিতার্থ করবার লক্ষ্যে, হিন্দু মহাসভা সহ সামগ্রিক হিন্দু সম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তি , আজকের বিজেপির পূর্বসূরীরা , তাদের সঙ্গে একটা পারস্পরিক বোঝাপড়ার উপর দিয়ে’ ৪৭ এর দেশভাগের সময়কালে, নিজেদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করবার লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছিল।
কাশ্মীরে কেবল যে মুসলমান ছিলেন তা নয়। কাশ্মীর উপত্যকা এবং জম্মু দুই জায়গাতেই কিন্তু কিছু সংখ্যক শিখও ছিলেন। তাঁদের স্বার্থের বিষয়টি কিন্তু দেশভাগের সময়কালে ব্রিটিশ রাও কোনও গুরুত্ব দেয়নি। আর কাশ্মীরের হিন্দু রাজা বা তাকে সহযোগিতা করা আরএসএসের সমস্ত সঙ্গীসাথী রাও এতটুকু গুরুত্ব দেয়নি ।
পরবর্তীকালে আরএসএস যেভাবে কাশ্মীরকে ঘিরে তাদের হিন্দু সম্প্রদায়িক আগ্রাসী রাজনীতিকে ,ফ্যাসিস্ট দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিচালিত করেছে, তার কোনও ক্ষেত্রেই কাশ্মীরে অবস্থানরত সংখ্যালঘুদের স্বার্থকে তারা বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দেয়নি।
আর এস এসের কাছে সব থেকে অপছন্দের বিষয় হলো , সংস্কৃতির বৈচিত্র্য।বৈচিত্রময় সংস্কৃতিতে তারা বিশ্বাস করে না। সমন্বয়ী চিন্তাধারাতে বিশ্বাস করে না। সংস্কৃতির বহুত্বে তারা বিশ্বাস করে না। এই কারণেই আরএসএস , প্রবাহমান হিন্দু সংস্কৃতির ধারা-উপধারায়ও বিশ্বাসী নয়। প্রবাহমান হিন্দু সংস্কৃতি হিসেবে সাধারণত যেটিকে বলা হয়; সেটি যুগ যুগ ধরে ভারতে একটা সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের মধ্যে দিয়ে , সাংস্কৃতিক বৈচিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় যাকে বলতে হয় ; শক হুন দল পাঠান মোগল এক দেহে হলো লীন।
ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ধারা এবং ৩৫ এর ক ধারা এগুলির অবলুপ্তি ঘিরে আরএসএসের যে অবস্থান, তার উদ্দেশ্য কেবলমাত্র জম্মু – কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার অবসান ঘটানোই ছিল না। হিন্দুত্ববাদীদের উদ্দেশ্য ; কাশ্মীরকে একটি মিনি ভারতবর্ষ বললেও খুব ভুল বলা হয় না, সেই দ্যোতনাকে ধ্বংস করা।
কাশ্মীরের মধ্যে কেবল ধর্মীয় বিন্যাস এবং নৃতাত্ত্বিক গঠনের ক্ষেত্রে যে বৈচিত্র আছে, সেটি ভারতীয় সভ্যতার ধারাবাহিকতা আলোচনা ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ।এই বৈচিত্রময়তাকে ধ্বংস করা — এটাও ছিল কিন্তু আরএসএসের কাশ্মীর ঘিরে, ভারতীয় সংবিধান প্রদত্ত বিশেষ মর্যাদা কে অবলুপ্তির অন্যতম প্রধান একটি কারণ।
আমরা এই আলোচনায় জম্মু অংশের হিন্দু, সেখানকার আর্থ- সামাজিক বিন্যাস, কাশ্মীর উপত্যকা অংশের মুসলমান আধিক্য , সেখানকার আর্থ- সামাজিক বিন্যাস এবং জম্মু ও কাশ্মীর দুই অংশেই কিছু শিখেদের অবস্থান, তা আলোচনা করেছি ।
কাশ্মীর উপত্যকার পূব দিক , সেখানে কিন্তু লাদাখের উচ্চ পর্বতমালার অবস্থান। লাদাখের এই উচ্চ পর্বতমালা গিয়ে মিশেছে তিব্বতের সীমান্তে ।কাশ্মীরে যেমন মুসলমান সংখ্যাধিক্যের কথা আমরা জেনেছি। ঠিক তেমনিই এই লাদাখ অঞ্চলটির নাগরিক সমাজের মূল প্রতিনিধি হল বৌদ্ধেরা ।
বৌদ্ধ সংস্কৃতি সেখানকার সামাজিক বিন্যাসের সঙ্গে, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে যুগের পর যুগ ধরে ।লাদাখ থেকে যদি আমরা একটু পশ্চিম দিকে চলে যাই , সেখানে আমরা বাল্টিস্তান পাব। সেই সঙ্গে পাব, গিলগিট অঞ্চল ।এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ মূলত মুসলমান ।যদিও এখানে জনসংখ্যা অত্যন্ত কম ।
গিলগিট এবং বালটিস্তানের মুসলমানদের মধ্যেও আবার শিয়া এবং ইসমাইলি এই দুই তরিকার বিন্যাস রয়েছে। শিয়া এবং ইসমাইলি এই দুই ধারার মুসলমান থাকলেও তাঁদের মধ্যে কিন্তু কোনও রকম পারস্পরিক সংঘাতের পরিবেশ নেই। আবার কাশ্মীর উপত্যকার মুসলমানদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেন সুন্নি ধারার মুসলমান। সুন্নি ধরার মুসলমানেরা কাশ্মীর উপত্যকায় অত্যন্ত প্রভাবশালী।
এই যে মুসলমানেরা এবং তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন ধারা, হিন্দু- শিখ- বৌদ্ধ — এতগুলি ধর্ম মতাবলম্বী মানুষদের যে বিন্যাস ।সেই বিন্যাসটিকে কেন্দ্র করে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়কাল থেকে শুরু করে গোটা কাশ্মীর উপত্যকা জুড়ে, জম্মু এলাকায় নানা ধরনের সামাজিক সমস্যা তৈরি করবার চেষ্টা ধারাবাহিকভাবে হিন্দুত্ববাদীরা করেছে। পরবর্তীকালে পাক অধিকৃত কাশ্মীরকে অবলম্বন করে স্থানীয় ইসলামীয় এবং হিন্দু উভয় মৌলবাদীরাও করেছে। পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ চেয়িছে, আজ ও চায় ; গোটা উপত্যকার মধ্যে হিন্দু- মুসলমান – শিখ – বৌদ্ধদের মধ্যে কোনও অবস্থাতেই যাতে পারস্পরিক সৌভাতৃত্বের পরিবেশ না থাকে। সেজন্য পাকিস্তানের মৌলবাদী শক্তি যেমন সচেষ্ট থেকেছে এবং থাকে গোটা কাশ্মীর উপত্যকায় ।ঠিক তেমনিই ভারতের হিন্দু মৌলবাদী , সাম্প্রদায়িক শক্তিও সক্রিয় ওই এলাকায়। সচেষ্ট থেকেছে এবং আজ ও তাদের সচেষ্ট থাকার শেষ নেই।
গত শতকের চারের দশকের অন্তিম পর্ব, যখন পাকিস্তান বিষয়টি প্রায় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠল, সেই সময় কাল থেকেই গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবির জম্মু-কাশ্মীরের হিন্দু রাজার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে আরো জোরদার ভাবে। তাদের এই তৎপরতার পিছনে ছিল দেশিয় , রাজন্যবর্গের সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার প্রতি হিন্দুত্ববাদীদের সীমাহীন সমর্থনের বিষয়টি। জম্মু-কাশ্মীরের যে বৈচিত্র্যময় সামাজিক, সাংস্কৃতিক ,অর্থনৈতিক পর্যায়ের বিষয়টি আলোচিত হলো , সেই পর্বটি নির্মাণের ক্ষেত্রে সেখানকার হিন্দু রাজাদের আগ্রাসী মানসিকতার একটা বড় ভূমিকা ছিল ।
গোটা কাশ্মীর উপত্যকা জুড়ে এই যে নানাভাবে বিস্তৃত ছোট ছোট অঞ্চল গুলি ছিল, তাকে জম্মু-কাশ্মীরের হিন্দু রাজাদের অধীনে নিয়ে আসার এই প্রক্রিয়াটা চলেছিল কিন্তু সেখানকার হিন্দু রাজাদের অন্য রাষ্ট্র দখল করবার মানসিকতার মধ্যে দিয়ে। হিন্দু রাজাদের এই আগ্রাসী মানসিকতা উনিশ শতক থেকে বিশ শতকের প্রথম দিক পর্যন্ত কার্যকরী ছিল। এটা ছিল জম্মু-কাশ্মীরের হিন্দু রাজাদের , ব্রিটিশের সহযোগিতা নিয়ে। তাদের দাসত্ব করে।ব্রিটিশের দাসত্বের বিনিময়ে বিভিন্ন অঞ্চলকে নিজেদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করবার এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যে সেখানকার হিন্দুরাজারা করেছিল ,তা আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে আছে।
জম্মুর ডোগরা রাজপুতদের যে ধারা, তার একটি অংশ, যাদের সঙ্গে জম্মুর রাজাদের প্রত্যক্ষ সংযোগ ছিল ।তারাই কিন্তু লাদাখ ,গিলগিট ,বাল্টিস্থান প্রমুখ অংশ গুলিকে জম্মুর রাজবংশের অধীনে আনে। জম্মু-কাশ্মীরের হিন্দু রাজারা উনিশ শতকে তিনের দশকে লাদাখ দখল করেছিল। গোটা কাশ্মীর উপত্যকাটি জম্মুর হিন্দুরাজাদের উনিশ শতকে চারের দশকে ব্রিটিশের কাছ থেকে দয়ার দান হিসেবে পাওয়া ।জম্মুর হিন্দু রাজারা , উনিশ শতকের অন্তিম পর্বে গিলগিট অঞ্চলে ঢুকে পড়ে এবং গিলগিটকে তাদের রাজত্বের অংশ করে। কাশ্মীরের হিন্দু রাজাদের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন একটা সময় প্রায় সোভিয়েট ইউনিয়নের কাছাকাছি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। আফগানিস্তান থেকে চীনের সিনকিয়াং, এমনকি তিব্বতের সীমান্তের সঙ্গেও জম্মু-কাশ্মীরের হিন্দু রাজা রাজত্বের সীমা বিশ শতকের প্রথমদিকে বিস্তৃত হয়েছিল। আফগানিস্তানের একটা ছোট্ট অংশ জম্মু-কাশ্মীরের হিন্দু রাজার সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের সীমারেখা কে সোভিয়েট ইউনিয়নের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল( জম্মু কাশ্মীরের হিন্দু রাজাদের এই সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যের জন্য দেখুন; Kashmir: A Disputed Legacy 1886- 1990. By– Alastair Lamb[ Karachi.Oxford University Press, 1992]।
পাক অধিকৃত কাশ্মীর ঘিরে পাকিস্তানের যে ধারাবাহিক আস্ফালন, সেটিও কিন্তু সম্ভবপর হয়েছে জম্মু-কাশ্মীরের হিন্দু রাজাদের উনিশ- বিশ শতকের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের জন্যই। পাক অধিকৃত কাশ্মীর ঘিরে পাকিস্তানের বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে কিছুটা হলেও গুরুত্ব পেয়েছে জম্মু-কাশ্মীরের হিন্দু রাজাদের এই সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের ফলে , সেখানকার জনবিন্যাস ইত্যাদির ক্ষেত্রে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তার জন্যই।
জম্মুর হিন্দুর রাজাদের যে আগ্রাসী মানসিকতা সেটি কিন্তু ভারতের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ব্রিটিশ আমলেই একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিয়ে নিয়েছিল। আফগানিস্তান, চিন ,সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ইত্যাদি দেশগুলির সঙ্গে সীমান্তের প্রশ্নে , কাশ্মীর একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠল। আর সেই জায়গা থেকেই হিন্দু সম্প্রদায়িক রাজনীতিকেরা, এই কাশ্মীর কে ঘিরে তাদের আগ্রাসী নীতিকে প্রয়োগ করতে শুরু করল।জম্মু-কাশ্মীরের যে ভৌগলিক সীমারেখা ব্রিটিশ আমলে ছিল, সেই তুলনায় সেখানকার জনসংখ্যা বেশ কম থাকলেও, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে সীমান্ত জনিত নৈকট্যের কারণে এই এলাকার যে গুরুত্ব, সেটি ব্রিটিশরা অনুভব করতে পেরেছিল। অনুভব করতে পেরেছিল বলেই , তারা ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়কালে এই রাজ্যটিকে ঘিরে টাল বাহনার বিষয়টি এমনভাবে করে, যার দরুন , ভারতের জাতীয় আন্দোলনের গোটা পর্বে, তাদের সব থেকে বেশি সহায়তাকারী যারা ছিল, সেই হিন্দু সম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি, আরএসএস- হিন্দু মহাসভা ইত্যাদি রা , কাশ্মীরের হিন্দু রাজা যাতে লাভবান হয়, সেদিকে সবথেকে বেশি নজর দিয়েছে। ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন থেকেই জম্মু-কাশ্মীরের সঙ্গে পাকিস্তানের সীমারেখা- এই অঞ্চলটিকে বিশেষ রকম ভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলল।
ভারত ও পাকিস্তানের সীমারেখা হিসেবে কাশ্মীরের অবস্থান হিন্দুত্ববাদীদের কাছে পাকিস্তান বিরোধী তথা মুসলমানবিরোধী যে রাজনৈতিক কার্যক্রমকে পুঁজি করে তাদের সমস্ত কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় , তাকে আরো উগ্র করে তোলবার ক্ষেত্রে , এটা একটা বড় হাতিয়ার হয়ে উঠল। কাশ্মীর উপত্যকার জনবসতিতে যে মুসলমান আধিক্য, সেই এলাকাটির শাসন ক্ষমতা যাতে হিন্দু রাজার উপর চিরস্থায়ীভাবে থেকে যায় , এজন্য যেমন ব্রিটিশ যথেষ্ট করিতকর্মা ভূমিকা পালন করেছে। ঠিক সেই রকম ভূমিকাই পালন করেছে , ব্রিটিশের সহযোগী আরএসএস- হিন্দু মহাসভা সহ সমস্ত রকম হিন্দুত্ববাদী শক্তি ।
জামাত ই ইসলাম সহ, মুসলিম লীগ, সহ সমস্ত ধরনের ইসলামীয় মৌলবাদী সংগঠনও হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী সংগঠনগুলির সঙ্গে তাদের অভিন্ন শ্রেণি অবস্থানের দরুন কাশ্মীর প্রশ্নে, ক্ষমতা হস্তান্তরের কাল, দেশভাগের কালে , বিশেষ রকমের পক্ষপাতিত্বপূর্ণ ছিল সেখানকার হিন্দু রাজার প্রতি। যদিও তারা প্রকাশ্যে সেই পক্ষপাতিত্ব দেখাত না ।কিন্তু তারা চাইতো কাশ্মীরের উপর পাকিস্তানের আগ্রাসনকে সফল করতে ।
গোটা কাশ্মীর ভূখণ্ডের শাসনভার থাকুক হিন্দু রাজাদের উপর। বিশেষ করে কাশ্মীর যাতে কোনও অবস্থাতেই ভারতের অন্তর্ভুক্ত না হয়- সেই জন্য ভারতের হিন্দু – মুসলিম উভয় সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি এবং সদ্য সৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের মুসলিম মৌলবাদী শক্তি, সেখানকার শাসকেরা পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে হাতে হাত ধরে ,কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে গিয়েছিল এই সময়।
২০১৯ সালে একক গরিষ্ঠতা নিয়ে আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি, কেন্দ্রে দ্বিতীয়বার সরকার গঠনের পর , লোকসভার প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনই , কাশ্মীরের জন্য সংবিধানের বিশেষ ধারা গুলি বাতিল করেছিল। এই যে পর্যায়ক্রম, সেটি তারা , গত শতকের চারের দশকের মধ্যবর্তী কাল থেকে শুরু করেছিল। সেই পর্যায়ক্রমটিকেই ২০১৯ সালে তারা কার্যকরী করতে সক্ষম হয়।
এই গোটা প্রক্রিয়া টা চালানোর পেছনে তাদের উদ্দেশ্য এক , এক সময়ে, এক ,এক রকম ভাবে পরিচালিত হয়েছে। ব্রিটিশ শাসনে , দেশিয় রাজন্যবর্গের ক্ষমতা ঘিরে হিন্দুত্ববাদীরা নেতিবাচক কিছু ভাবতেই পারত না ।আর স্বাধীন ভারতে রাজন্যপ্রথা বিলোপ হয়ে যাবে — এটাও হিন্দুত্ববাদীদের কাছে অকল্পীয় ব্যাপার ছিল। কারণ ; দেশিয় রাজন্যদের একটা বড় অংশের সমর্থন নিয়ে কিন্তু জাতীয় আন্দোলনের সময়কালে হিন্দুত্ববাদীরা, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সহায়তা করে এসেছে ।পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশের ভারত থেকে চলে যাওয়ার পরে, আরএসএস এবং তাদের সেই সময়ের যে রাজনৈতিক সংগঠন গুলি — হিন্দু মহাসভা, ভারতীয় জনসংঘ ইত্যাদিরা , তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত করতে পেরেছিল দেশীয় রাজন্যবর্গদের অর্থে। এইক্ষেত্রে গোয়ালিয়রের রাজ পরিবারের সঙ্গে আরএসএস-এর সম্পর্কের কথা আমরা জানি।
রাজন্য প্রথা অবলুপ্তির আগে হিন্দুত্ববাদীদের কাছে কাশ্মীরের হিন্দু রাজাকে টিকিয়ে রাখার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ; পাকিস্তান বিরোধিতার নাম করে, গোটা পরিবেশ – পরিস্থিতিকে ভারতীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত করা। এ কাজটা তারা জুলফিকার আলী ভুট্টোর পৈত্রিক দেশিয় রাজ্যে জুনাগড় বা নিজামের অন্তর্গত হায়দ্রাবাদ , কোনও জায়গাতেই সফলভাবে করতে পারত না। কারণ; জুনাগড় বা গোয়ালিয়ার বা হায়দ্রাবাদ– কোনও অঞ্চলের সঙ্গেই আন্তর্জাতিক সীমান্ত, অর্থাৎ; কাশ্মীরের সঙ্গে যে নতুন করে পাকিস্তানের সীমান্তের জায়গাটি সৃষ্টি হল , তেমন কোনও পরিবেশ ছিল।
এই আন্তর্জাতিক সীমান্তকে কাজে লাগিয়ে গোটা ভারত জুড়ে দেশপ্রেমের নামে উগ্রতা এবং ভয়াবহ মুসলমান বিদ্বেষ, এই দুটিকে কার্যকর করবার স্বার্থেই, গত শতকের চারের দশক থেকে দেশভাগের সময়কাল পর্যন্ত বা দেশভাগের অব্যবহিত পরে কাশ্মীর ঘিরে আরএসএসের গেম প্ল্যান এত তীব্র , এত ক্ষীপ্র, এত তীক্ষ্ণ।
ক্ষমতা হস্তান্তরের কালে জম্মু-কাশ্মীরের রাজা ছিলেন হরি সিং। ১৯২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হরি সিং সিংহাসনে আরোহন করেছিলেন। অর্থাৎ; আরএসএসের প্রতিষ্ঠা আর হরি সিং এর জম্মু-কাশ্মীরের রাজা হিসেবে অভিষেক প্রায় একই সময়ে ঘটেছিল।
হিন্দুত্ববাদীদের অত্যন্ত পছন্দের লোক ছিলেন এই হরি সিং। হরি সিংয়ের জীবনের বেশিরভাগ সময় টাই কেটেছিল বোম্বাইয়ের, অর্থাৎ ; আজকের মুম্বাইয়ের রেসের মাঠে । রেস খেলা ছিল আরএসএস , হিন্দু মহাসভার অত্যন্ত প্রিয় পাত্র, কাশ্মীরের রাজা হরি সিংয়ের বিশেষ পছন্দের বিষয়। তাছাড়াও শিকার করা ছিল তার একটি বিশেষ পছন্দের বিনোদন। হরি সিং খুব দক্ষ শিকারী ছিলেন ।নিজের শিকার করা জন্তুর তিনি একটি সংগ্রহশালা ও করেছিলেন।
রাজ্যের শাসক হিসেবে রাজ্যের প্রজাদের প্রতি তার বিন্দুমাত্র কোনও নজর ছিল না। জম্মু-কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের সঙ্গে হরি সিংয়ের বিন্দুমাত্র কোনও সংযোগ ছিল না ।যে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের কথা বলে হরি সিং কে ঘিরে একটা আবেগ তৈরি করার চেষ্টা করে আরএসএস , সেই সাধারণ গরিব কাশ্মীরি পণ্ডিতদের সঙ্গেও বিন্দুমাত্র সম্পর্ক হারি সিং এর ছিল না ।হরি সিং এর ছোট রানী নিজেই তার স্মৃতিকথায় হরি সিংয়ের চরিত্রের এই বৈশিষ্ট্য গুলির কথা লিখে গিয়েছেন। হরি সিং যে সবসময় তাঁবেদার পরিবৃত হয়ে থাকতেন , সে কথাও তার ছোট রানী লিখেছেন। যারা তাকে তৈলমর্দন করত- এইরকম কিছু অল্প লোকেদের দ্বারা তিনি সবসময় মেতে থাকতেন। তার বাইরে, তার নিজের রাজ্যে বা গোটা ভারতে বা বিশ্বে কি ঘটছে না ঘটছে, সে সম্পর্কে কাশ্মীরের হিন্দু রাজা হরি সিং এর যে বিন্দুমাত্র কোনও উৎসাহ ছিল না– একথা তার রানীর লেখা স্মৃতিকথাতেই আমরা দেখতে পাই( Autibiography– Karan Singh.revised edition.Delhi.Oxford University Press.1994,Page- 18-19)।
হরি সিংয়ের দীর্ঘ শাসনকালে, তার সব থেকে বড় অপছন্দের মানুষটি ছিলেন কাশ্মীরের এক গরিব ঘরের সন্তান। যাঁর পিতা পেশায় ছিলেন একজন শাল বিক্রেতা। বঙ্গভঙ্গের বছর , অর্থাৎ ; ১৯০৫ সালে হরি সিং এর সব থেকে অপছন্দের ব্যক্তি , শেখ আবদুল্লাহর জন্ম ।পরবর্তীকালে যিনি শের ই কাশ্মীর নামে মানুষের হৃদয়ে বিশেষ ভাবে জায়গা করে নিয়েছিলেন ।শেখ আব্দুল্লাহ ছিলেন আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কৃতি ছাত্র। সেখান থেকেই তিনি বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। উচ্চ ডিগ্রী ধারী হয়েও জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যে, শেখ আবদুল্লাহ কোনও সরকারি চাকরি পাননি। তার কারণ, সেখানকার হিন্দুদের ই তখন রাজা হরি সিংয়ের অধীনে সমস্ত সরকারি পদগুলিতেই নিয়োগ করা হতো। রাজার নির্দেশে বেছে বেছে হিন্দুদের এইভাবে নিয়োগ করার কারণে অত্যন্ত কৃতি ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও জন্মসূত্রে যেহেতু তিনি মুসলমান, তাই তিনি হরি সিং এর রাজত্বে কোনও সরকারি চাকরি পাননি।
এইরকম অবস্থায় সদ্য যুবক শেখ আবদুল্লাহ ভাবলেন; কেন কেবলমাত্র মুসলমানদেরই এই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে ।আমরা এই রাজ্যের সংখ্যাগুরু হওয়া সত্বেও, কেন আমরা সরকারি চাকরি পাব না ? এই রাজ্যে প্রজাদের কাছ থেকে রাজা যে রাজস্ব আদায় করেন, তার সিংহভাগ আমরাই দিই ।কিন্তু আমরা অর্থনৈতিকভাবে , সামাজিকভাবে, সাংস্কৃতিকভাবে বিশেষভাবে উৎপীড়িত হয়ে চলেছি। শেখ আবদুল্লাহর মনে প্রশ্ন জাগলো; আমাদের এই যে সার্বিক পরিস্থিতি , তার কি একমাত্র কারণ এই রাজ্যের সরকারি চাকুরেদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই মুসলমান নন ? তাই ই আমাদের এই পরিণতি?
অকুতোভয় শেখ আবদুল্লাহ এরপর সিদ্ধান্ত এলেন , মুসলমানদের প্রতি এই দুর্ব্যবহার , এই অর্থনৈতিক শোষণ, সামাজিক অত্যাচার –সমস্ত কিছুর মূলে রয়েছে ধর্মীয় পক্ষপাত পূর্ণ আচরণ( Kashmir : The Woounded Vally– Ajit Bhattacharjya. UBS,NewDelhi.1994, Page -18,19. কাশ্মীরের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহের সৌজন্যে তাঁর পিতা ডাঃ ফারুক আবদুল্লাহের সঙ্গে এই নিবন্ধকারের সাক্ষাৎতের সুযোগ ঘটে।সেই সময়ে ফারুকজীও তাঁর পিতার স্মৃতিচারণে অনুরূপ কথা বলেছিলেন)।
কাশ্মীর ঘিরে হিন্দুত্ববাদীদের যে সাম্প্রদায়িক অবস্থান , বিভাজনমূলক অবস্থান, তাকে গোটা ভারতব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে, দেশভাগের অব্যহিত আগের সময় থেকেই তারা টার্গেট হিসেবে ধরে নেয় শেখ আবদুল্লাহকে। শেখ আবদুল্লাহর ইমেজকে কলঙ্কিত করে , তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে অসত্য তথ্যের অবতারণা করে, কেবল তাঁকেই তারা নেতিবাচক একটা জায়গায় দাঁড় করাতে চায়নি ।সেইসঙ্গে গোটা মুসলমান সম্প্রদায়কে, কাশ্মীর ঘিরে একটা সন্দেহভাজন অবস্থানে দাঁড় করানো– এটাই ছিল হিন্দুত্ববাদীদের প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য। লক্ষ্যে স্থিত থেকেই তারা কাশ্মীরের রাজা হরি সিং এর সঙ্গে সুর মিলিয়ে শেখ আবদুল্লাহ সম্পর্কে নানা ধরনের নেতিবাচক বক্তব্য রাখতে শুরু করে ।এই কাজ যে কেবলমাত্র হিন্দুত্ববাদীরা করেছিল তাই নয়। জাতীয় কংগ্রেসের ভেতরে যারা রাজনৈতিক হিন্দুত্বে বিশ্বাসী ছিলেন , পন্ডিত নেহরুর ধর্মনিরপেক্ষতাকে কোনও অবস্থাতেই মেনে নিতে পারতেন না, সেই অংশের লোকজনও ‘৪৭ সাল বা তার পরবর্তী সময় থেকে, শেখ আবদুল্লাহ সম্পর্কে নানা ধরনের নেতিবাচক কথাবার্তা বলতেন। এমনকি জাতীয় কংগ্রেসের দক্ষিণপন্থী নেতা , যিনি পরবর্তী সময়ে ভারতের প্রথম অ কংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, সেই মোরারজি দেশাই পর্যন্ত তাঁর জীবন সায়হ্নে , একটা ইংরেজি সাপ্তাহিকে( ইন্ডিয়া টু ডে) , শের ই কাশ্মীর শেখ আব্দুল্লাহ সম্পর্কে অত্যন্ত ব্যক্তি আক্রমণাত্মক কুৎসা ছড়িয়ে ছিলেন।
আর এস এস তার রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি কে দিয়ে ভারতীয় সংবিধানে জম্মু-কাশ্মীরের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার অবলুপ্তির যে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে ধারাবাহিকভাবে চালিয়েছে এবং নিজেদের শতবর্ষ পালনকে সামনে রেখে , সেই প্রক্রিয়ার প্রয়োগ তারা ঘটিয়েছে– এই গোটা বিষয়টির ক্ষেত্রে তারা যে ধরনের কুৎসা, ব্যক্তি আক্রমণ , অরাজনৈতিক আক্রমণ, শেখ আবদুল্লাহ বা তাঁর পরিবারকে ঘিরে ঘটিয়েছে , তার মূল কারণ কিন্তু লুকিয়ে রয়েছে কাশ্মীর ঘিরে সেখানকার হিন্দু রাজা হরি সিং এর যে ব্যক্তিগত লালসা, সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা — এই সমস্ত কিছুকে সফল করবার লক্ষ্য।
পরবর্তীতে রাজন্যপ্রথা বিলোপের পর সেখানকার হিন্দু রাজা হরি সিং এর সম্পত্তি সুরক্ষিত রাখবার লক্ষ্যে আরএসএস সব সময় সক্রিয় ছিল। রাজন্যপ্রথা বিলোপের পর হিন্দু রাজাদের সম্পত্তি সুরক্ষিত রাখবার লক্ষ্যে আরএসএসের এই কর্মসূচি যে কেবলমাত্র জম্মু-কাশ্মীর ঘিরেই ছিল, তা নয় ।
গোয়ালিয়ার থেকে শুরু করে , কোচবিহার থেকে শুরু করে, জয়পুর ইত্যাদি বড় বড় দেশিয় রাজ্যগুলি , যেখানকার রাজারা ছিলেন হিন্দু ।আর তাদের সঙ্গে আরএসএস সহ গোটা হিন্দুত্ববাদী পরিমণ্ডলের একটা গভীর সংযোগ ছিল। আর এস এসীয় রাজনীতিকে, হিন্দু সম্প্রদায়িক রাজনীতিকে তুলে ধরবার লক্ষ্যে , এই সব রাজা রাজরারা বিপুল অর্থ, হিন্দুত্ববাদীদের দিতেন। এই সমস্ত দেশিয় রাজ্যগুলির রাজাদের স্বার্থ সুরক্ষিত করবার লক্ষ্যে আরএসএস বা তাদের বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন রকম নামে যেসব রাজনৈতিক সংগঠন কার্যকরী ছিল, তারা অত্যন্ত যত্নমান থেকেছে।
শেখ আবদুল্লাহকে হিন্দুত্ববাদীদের পছন্দ না করার প্রথম প্রধান কারণ ছিল ; তিনি মনেপ্রাণে ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন। অসাম্প্রদায়িক ছিলেন ।হিন্দু – মুসলমানের সম্প্রীতিতে গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন।আর রাজন্যপ্রথার বিরোধী ছিলেন ।কাশ্মীর থেকে রাজাকে উচ্ছেদ করে, কাশ্মীরকে ভারতের আর দশটি টি জায়গার মতো , গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে প্রতিষ্ঠিত করা- এটাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। কাশ্মীরের মানুষের স্বার্থেই এ ব্যাপারে প্রথম থেকে আত্ম নিবেদিত ছিলেন শেখ আবদুল্লাহ ।ঠিক সেই কারণেই হিন্দুত্ববাদী শিবির, তাদের শ্রেণী স্বার্থ বিঘ্নিত হচ্ছে– সেদিকে লক্ষ্য রেখেই তারা প্রথম থেকে শেখ আবদুল্লাহর বিরোধিতা করে এসেছে।
কাশ্মীরের রাজা হরি সিং এর হিন্দু সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি, মুসলমান বিদ্বেষ– এসবের কারণে উচ্চশিক্ষিত হয়েও শেখ আবদুল্লাহ সরকারি চাকরি পেলেন না প্রথম জীবনে। তাই পেশাগত ভাবে তিনি বেছে নিলেন একটি ইস্কুলে শিক্ষকতার কাজ। পেশাজীবন শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই নানা ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত করলেন শেখ আবদুল্লাহ ।ছাত্রদের নিয়ে তিনি তৈরি করলেন একটি ছোট্ট সংগঠন। যেখানে কেবলমাত্র প্রথাগতভাবে যাঁরা শিক্ষাঙ্গনে আসছে , তাঁরাই নয় ।নানা ধরনের অর্থনৈতিক কারণে , সামাজিক কারণে যাঁরা প্রথাগত শিক্ষার মধ্যে আসতে পারছে না– তাঁদেরকেও বইপত্র পড়া, সাধারণ জ্ঞান, বিজ্ঞান বিষয়ক নানা ধরনের ধারণা, ইংরেজি শিক্ষা ইত্যাদির পরিমন্ডলে নিয়ে আসার জন্য নিজের এই সংগঠনকে পরিচালিত করতে থাকলেন তিনি ।
এই সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হলেন শেখ আবদুল্লাহ। কিন্তু সে সমস্ত প্রতিবন্ধকতার পরোয়া না করে , খুব সামান্য সংখ্যায় হলেও কিছু মহিলাকে তিনি এই কর্মকাণ্ডের অংশ করতে পেরেছিলেন। যাঁরা বাড়ির অভ্যন্তরের পরিমণ্ডলের মধ্যেও মেয়েদের আধুনিক শিক্ষার বিষয় উৎসাহিত করতেন।অন্দরমহলে থাকা মেয়েরা যাতে অপ্রথাগতভাবেই প্রথাগত শিক্ষার সংস্পর্শে আসতে পারে তার জন্য সচেষ্ট থাকতেন শেখ আবদুল্লাহের কিছু মহিলারা।
সামগ্রিক ভাবে গোটা কাজটি পরিচালনা করবার সঙ্গে সঙ্গেই কাশ্মীরের সাধারণ প্রজাদের অর্থনৈতিক দুর্দশা, সামাজিক দুর্দশা, সাংস্কৃতিক সংকট, বিশেষ করে সেখানকার হিন্দু রাজাদের নানা ধরনের ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির প্রবণতা — এই বিষয়গুলি নিয়ে সক্রিয় হলেন শেখ আবদুল্লাহ। তাঁর ব্যক্তিত্ব সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষ ভাবে ধরা দিল। শেখ আবদুল্লাহর ব্যক্তিত্বের কাছে সাধারণ গরিব গুর্বো কাশ্মীরের মানুষ নিজেদেরকে প্রায় সঁপে দিলেন।অসাধারণ বক্তৃতা করবার ক্ষমতা ছিল শের ই কাশ্মীরের ।সহজ সরল মেঠো কথায় সেখানকার সাধারণ গরিব মানুষদের তিনি বোঝাতে থাকলেন তাঁদের সামাজিক অবস্থানের কথা। কেন তাঁদের এই অর্থনৈতিক দুর্দশা। কেন তাঁদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য গুলো ক্রমশ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে, সেসব কথা।
শেখ আবদুল্লাহর এই কার্যক্রমের মধ্যে কাশ্মীরের মুসলমান প্রজাদের আত্মসংকটের কথা বারবার উঠে এলো। কিন্তু একটি বারের জন্যেও সামগ্রিকভাবে হিন্দু প্রজাদের প্রতি কোনও বিদ্বেষ ফুটে উঠলো শেখের বক্তৃতা গুলিতে।রাজা হরি সিং এর সাম্প্রদায়িক প্রবণতা , মুসলমান বিদ্বেষ- এগুলোকে তিনি সাধারণ প্রজাদের সামনে তুলে ধরলেন। কিন্তু একটিবারের জন্য হরি সিং এর ধর্মীয় অবস্থানকে কেন্দ্র করে সামগ্রিকভাবে হিন্দু বিদ্বেষী একটি শব্দও তিনি উচ্চারণ করলেন না ।জীবনের শুরু থেকে শেষ দিন পর্যন্ত এই ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ধারাকে শের ই কাশ্মীর বজায় রেখেছিলেন। তাঁর দৈহিক গঠন ছ ফুট, চার ইঞ্চি লম্বা। ছিপছিপে ।চেহারার বৈশিষ্ট্যটি কাশ্মীর উপত্যকা জুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশেষ রকমের সাড়া ফেলে দিল। তাঁর ব্যক্তি জীবনের কিছু বৈশিষ্ট্য কাশ্মীরের গরীব প্রজাদের বিশেষভাবে প্রভাবিত করল। কোনদিনও মদ স্পর্শ করেননি শের ই কাশ্মীর ।কখনো – সখনো দু একটা সিগারেট খেলেও ,সিগারেটের প্রতি ও তাঁর কোনওদিন কোনও রকম বিশেষ আসক্তি ছিল না।
জীবনের শুরু থেকে শেষ দিন পর্যন্ত যেখানেই তিনি থাকুন না কেন, যতখানি ব্যস্ততার মধ্যেই থাকুন না কেন, পবিত্র জুম্মাবারে, পবিত্র মসজিদে যাওয়া। নামাজ আদায় করা ।এগুলি তাঁর জীবনের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য ছিল ।পবিত্র কোরআন সম্পর্কে তাঁর অসাধারণ বুৎপত্তি ছিল(Sheikh Muhammad Abdullah, Swatantra— V K Chinnammalu Amma.22/05/1948 .
Sher- i Kashmir Sheikh Abdullah, Swatantra. — Trilok Nath Moza.05/06/1948)।
বিংশ শতাব্দীর তিনের দশকের সূচনা পর্ব থেকে সামাজিক অঙ্গনের পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনে ধীরে ধীরে শেখ আবদুল্লাহর প্রবেশ ঘটল। ১৯৩১ সালে তিনি একটি মুসলমান প্রতিনিধি দলের সদস্য নির্বাচিত হলেন ।এই প্রতিনিধি দলটির প্রত্যাশা ছিল, তাঁরা কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন । মহারাজের কাছে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের দুর্দশা, বিশেষ করে অর্থনৈতিক সংকট এবং তার দরুন কি ধরনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংকটের মধ্যে তাঁরা পড়েছেন, সেই বিষয়গুলি তুলে ধরবেন( বিস্তারিত তথ্যের জন্যে উৎসাহী পাঠক দেখুন, অ্যালেস্টার ল্যাম্বের গ্রন্থ[পৃষ্ঠা-89 থেকে 95] এবং অজিত ভট্টাচার্যের গ্রন্থ[ পৃষ্ঠা – 65-76])।
কাশ্মীর উপত্যকার একটি গরীব পরিবার থেকে উঠে আসা, উচ্চশিক্ষিত একটি মানুষের , এভাবে সেখানকার প্রজাদের জীবন জীবিকা নিয়ে সোচ্চার হয়ে ওঠা — এই বিষয়টিতে একই সঙ্গে অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে পড়ে ব্রিটিশ প্রশাসন এবং কাশ্মীরের সম্প্রদায়িক হিন্দু রাজা হরি সিং ।শেখ আবদুল্লাহর এই রাজনৈতিক উত্থানকে রুখে দেওয়ার লক্ষ্যে , প্রথম থেকেই আরএসএস, হিন্দু মহাসভা, আর্য সমাজ সহ সমস্ত রকম হিন্দু সম্প্রদায়িক সংগঠন গুলি জম্মুতে বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
কাশ্মীর উপত্যকার সাধারণ মানুষের জীবন জীবিকার নানা সমস্যার কথা তুলে ধরতে শুরু করলেন শেখ আবদুল্লাহ ।আর এই বিষয়টি যে কিভাবে কাশ্মীরের হিন্দু রাজা হরি সিং কে আতঙ্কিত করে তুলল তা বুঝতে পারা যায় , শেখ আবদুল্লাহর নেতৃত্বে একটি ছোট প্রতিনিধি দল, মহারাজা হরি সিং এর সাক্ষাৎপ্রার্থী হওয়ার আগেই, শেখ আবদুল্লাহ র ঘনিষ্ঠ সহকর্মী আবদুল কাদির কে গ্রেপ্তার করলেন হরি সিং এর প্রশাসন, এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে।আবদুল কাদির কে গ্রেপ্তার করেই ক্ষান্ত হলেন না রাজা হরি সিং। শুরু হল আবদুল কাদিরের বিচারের নামে প্রহসন।
রাজার এই ভূমিকা, কাশ্মীর উপত্যকার মানুষকে প্রতিবাদী করে তুলল। প্রতিরোধে সংকল্পিত করল ।তাঁদের প্রতিবাদকে প্রতিহত করবার জন্য অত্যাচারের স্টিমরোলার চালাল রাজার পুলিশ ।রাজার পুলিশের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ তৈরি হলো এই প্রতিবাদকারীদের। রাজার পুলিশের বীভৎস অত্যাচারে মারা গেলেন ২১ জন প্রতিবাদী কাশ্মীর উপত্যকার গরিব মানুষ , যাঁরা জন্মসূত্রে মুসলমান ।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজা হরি সিং এর প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় গোটা কাশ্মীর উপত্যকায় শুরু করা হলো এক ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ।স্বভাবসুলভ ভাবেই এই দাঙ্গার দায় তুলে দেওয়া হলো মুসলমান সম্প্রদায়ের উপর ।অভিযুক্ত করা শুরু হলো শেখ আবদুল্লাহকে ।রাজার পুলিশের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় বেশ কিছু হিন্দুদের দোকান লুট করা হলো ।পুড়িয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু সমস্ত দায় চাপিয়ে দেওয়া হল কাশ্মীর উপত্যকার গরিব মুসলমানদের উপর।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের উপর যেভাবে অত্যাচারী হয়ে উঠল সেখানকার হিন্দু রাজা হরি সিংয়ের পুলিশ, সেই অত্যাচার, কাশ্মীরের সাধারণ গরিব খেটে খাওয়া মানুষকে , রাজা সম্পর্কে, তার সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে , কর্মসূচি সম্পর্কে আরো বেশি রকম সচেতন করে তুলল ।রাজা যতই সচেষ্ট হল শেখ আবদুল্লার নামে নানা ধরনের অপবাদ রটাতে, ততই কাশ্মীর উপত্যকার সাধারণ মানুষ, তাঁদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠলেন।তাঁদের হয়ে শেখ আব্দুল্লাহের লড়াই , তাঁর সহকর্মীদের লড়াই — সে সম্পর্কে তাঁরা আবেগপ্রবণ হয়ে উঠলেন। তাঁরা বুঝতে শিখলেন, কি ধরনের সম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য নিয়ে এই দাঙ্গা মহারাজা হরি সিং এবং তার সহযোগীরা ঘটিয়েছে।
আর বাইরে থেকে এই দাঙ্গার আগুন গোটা ভারতে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে কাশ্মীরের পার্শ্ববর্তী রাজ্য , সেই সময়ের অবিভক্ত পাঞ্জাবে, ধনী হিন্দুদের নেতৃত্বাধীন বণিক সম্প্রদায় , যারা সার্বিকভাবে হিন্দু সম্প্রদায়িক শক্তির অংশ ছিল। তারা সচেষ্ট হয়ে উঠল ।গোটা ভারতে এই দাঙ্গার আগুন ছড়িয়ে দিয়ে মুসলমান সমাজকে অভিযুক্ত করে , তারা হিন্দু – মুসলমানের দাঙ্গা কে, গোটা ভারত জুড়ে প্রসারিত করবার লক্ষ্যে আত্মনিয়োগ করল।
আরএসএস , তাদের শতবর্ষ পালনের প্রাক মুহূর্ত কেন কাশ্মীরের ভারত ভুক্তির সময়কাল থেকেই ভারতীয় সংবিধান প্রদত্ত বিশেষ অধিকার কেড়ে নিতে সচেষ্ট হয়েছে, কেন এই লক্ষ্যে তারা দীর্ঘদিন ধরে, কখনো প্রকাশ্যে , কখনো গোপনে, নিজের কর্মসূচিকে প্রসারিত করেছে , সেটা বোঝবার জন্য আমাদের সামগ্রিকভাবে জাতীয় আন্দোলনের সময়কালের কাশ্মীর এবং জাতীয় আন্দোলন উত্তর কালে কাশ্মীরের ভারত ভুক্তির পর , কাশ্মীরের আর্থ- সামাজিক -রাজনৈতিক সংস্কৃতিক এবং অবশ্য ই ধর্মীয় বিষয়গুলির দিকে একটু বিস্তারিত ভাবে নজর দেওয়া দরকার।
রাজনৈতিক হিন্দুদের স্বার্থ রক্ষায় কাশ্মীরকে ,সেখানকার মানুষদেরকে, হিন্দুত্ববাদীদের বলির পাঠা করবার এই উপক্রম, পন্ডিত জওহরলাল নেহরু কে কলঙ্কিত করবার এই উপক্রম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কাছে সঠিক তথ্য না থাকার দরুন, যে সমস্ত বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, সেগুলির অবসান কল্পে শতবর্ষ পালনকে কেন্দ্র করে , কাশ্মীর ঘিরে আরএসএস , সঙ্ঘ পরিবার এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির গেম প্লান্ট টা আমাদের ভালো করে বুঝে নেওয়া একান্তভাবে প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।( চলবে)