শ্রীরামপুর কলেজ: ইতিহাসের পথ ধরে…

আঠারো শতকের মাঝের দিকে ডেনিস দের হাত ধরে শ্রীরামপুর হয়ে উঠেছিল বাণিজ্য নগরী। ডেনিশরা এই জনপদের নাম দিয়েছিল ‘ফ্রেডেরিক্সনাগর’। দেশ তথা বিশ্বের ইতিহাসে একটি প্রাচীন শহরের নাম শ্রীরামপুর। শ্রীরামপুরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একাধিক ইতিহাস ।তখন ১৮০০ সাল , খ্রিস্ট ধর্মপ্রচারক উইলিয়াম কেরি বসবাস করতে শুরু করেন শ্রীরামপুরের গঙ্গা তীরবর্তী একটি বাড়িতে যা আজ অলডিন হাউস নামে পরিচিত। জানা যায় ওই হাউস টি এক সময় ছিল ব্রাউন সাহেবের কুটির। এরপর ১৮১৮ সালের জুলাই মাসে গঙ্গার ধারে ওই ছোট্ট কুঠিরে উইলিয়াম কেরি , জোশুয়া মার্ক্সম্যান ও উইলিয়াম ওয়ার্ড (শ্রীরামপুর ত্রয়ী) -এর হাত ধরেই অলডিন হাউসে মাত্র ৩৭ জন ছাত্র নিয়ে শুরু হয় শ্রীরামপুর কলেজে পথ চলা। তৈরি হয় নতুন ইতিহাস। এখান থেকেই শুরু হয় শ্রীরামপুর মিশনের কাজ। শ্রীরামপুর কলেজ শুধু খ্রিস্টান মিশনারি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বাংলা নবজাগরণের বীজতলা। যার ফলে এটি হয়ে ওঠে শ্রীরামপুর ছাপাখানার জন্মস্থল। উইলিয়াম কেরির প্রচেষ্টায় বাইবেলের বাংলা অনুবাদ হয়ে ছিল, যা বাংলার ভাষা-গবেষণার পথপ্রদর্শক।সেই সময় ভারতীয় খ্রিস্টানদের প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে এই কলেজ নির্মাণ হলেও এর আরো এক অন্য লক্ষ্যও ছিল। তৎকালীন হিন্দু কলেজে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা প্রচলিত থাকলেও তা সীমাবদ্ধ ছিল কেবল উচ্চ বৃত্তের মুষ্টিমেয় ছাত্রদের মধ্যে। সর্বসাধারণের সেখানে পড়বার সুযোগ ছিল না বললেই চলে। তখন “শ্রীরামপুর ত্রয়ী” সর্বসাধারণের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন ও প্রতিষ্ঠান টি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এটিই হচ্ছে সর্বপ্রথম এবং ভারতের একমাত্র প্রতিষ্ঠান যেখানে ধর্ম , মানবিকবিদ্যা এবং ধর্মনিরপেক্ষ বিষয় একইসঙ্গে পড়ানো হয়। এখান থেকেই শুরু হয় ভারতীয় পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রদানের কাজ। দেশীয় ভাষার পাশাপাশি হিব্রু ,ল্যাটিন সহ বহু ভাষার শিক্ষা প্রদান চলতে থাকে। ডেনিস স্থপতি মেজর উইকেডি নতুন ভবনের নকশা প্রস্তর করেন এবং পরে লর্ড হেস্টিংস অনুমোদন দিলে ডেনমার্কের সম্রাট উপহার স্বরূপ পাঠায় কলেজের জন্য সুন্দর একটা লোহার গেট ও দোতলায় ওঠার জন্য নকশা করা একজোড়া সিঁড়ি। ১৮২১ সালে হুগলি নদীর পশ্চিম তীরে ডেনিস সরকার প্রদত্ত সাত একর জমির উপর তৈরি হলো দ্বিতল কলেজ ভবন । এরপর অলডিন হাউস থেকে সম্পূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা স্থানান্তরিত হয়ে যায় প্রধান ক্যাম্পাসে অর্থাৎ দুই তলা বিশিষ্ট ভবনে । ১৮২৭ সালে ডেনমার্কের রাজা ষষ্ঠ ফ্রেডরিক কলেজটিকে একটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে স্বীকৃতি দেন এবং ডিগ্রী প্রদান করার ক্ষমতা দেন। তার ফলে ইউরোপের যেকোনো কলেজের সমতুল্য হয়ে ওঠে ও ডেনিস বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি লাভ করে। ভারতবর্ষ পেলো দেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়-মর্যাদা প্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।১৮৩৩ সালে কলেজের সংবিধান রচিত হয়। কলেজ কাউন্সিলের প্রথম মাষ্টারমশাই হন কেরি স্বয়ং। তখন অধ্যক্ষ পদে বসেন মার্শম্যান।
১৮৪৫ সালে ডেনিশ সরকারের পতনের পর কলেজের অর্থাভাব দেখা যায়। এরপর ১৮৫৭ সাল অধ্যক্ষ ডেনহেমের সময়কাল, তখন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে কলা, বিজ্ঞান ,বাণিজ্য বিভাগ এর সাথে যুক্ত হয় শ্রীরামপুর কলেজ। তবে ধর্মতত্ত্বের ক্ষেত্রে নিজস্ব ডিগ্রী প্রদানের ক্ষমতা আজও বজায় রেখেছে ঐতিহ্যবাহী এই কলেজ। ধর্ম- বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে সকলের জন্য উন্মুক্ত এই কলেজ বিজ্ঞান ও পাশ্চাত্য শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। শোনা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শ্রীরামপুর কলেজের ওই ভবনকে মিলিটারি হাসপাতালের কাজের জন‌্য তৎকালীন সরকার দখল নেয়। কলকাতার থেকে বয়সে বেশ বড়ো আমাদের এই শ্রীরামপুর। কলকাতার সঙ্গে তুলনা করলে আজ যা জেগে আছে তা এক করুণ শহরের ফসিল। কিন্তু সেই ফসিল ছুঁয়েও বোঝা যায় ইতিহাসের কত শুভ-অশুভ মহরতের সাক্ষী থেকেছে এই ছোট্ট জনপদটি। এরপর গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে অনেক জল দুশো বছর অতিক্রান্ত শ্রীরামপুর কলেজ ‘হেরিটেজ’ স্বীকৃতি পেলেও বছরের পর বছর অব্যবহার ও অবহেলার ফলে ভগ্নাবশেষে পরিণত হয়েছে শ্রীরামপুর কলেজের আঁতুর ঘর। সময় সাথে পাল্লা দিতে না পেরে উইলিয়াম কেরির অলডিন হাউজ আজ পরিতক্ত।সকলের চোখের আড়ালে শ্রীরামপুর জলকলের ভিতর ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে ব্রাউন সাহেবের সেই ছোট্ট কুটির। তবে ভারতীয় শিক্ষা প্রসারে ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে কেরি সেই অলডিন হাউস এর কথা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *