শতবর্ষে আর এস এস: হিন্দুত্বের বিবর্তন(১)

আরএসএসের কাছে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের মূল উদ্দেশ্য হলো ; তাদের সংগঠনের যে মতাদর্শগতভিত্তি ,অর্থাৎ; রাজনৈতিক হিন্দু রাষ্ট্র স্থাপন ,সেইটাই। এই দিকে লক্ষ্য রেখেই কিন্তু দেশভাগের পরবর্তী সময় থেকে আজ পর্যন্ত আরএসএস তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ কে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পরিচালিত করে আসছে।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের নিজেদের শতবর্ষ উদযাপন ঘিরে ভাবনার প্রথম লক্ষ্যই ছিল যে কোনও উপায়ে , তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ফিরিয়ে আনা।

নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি একক বলিষ্ঠতায় কেন্দ্রে সরকার পরিচালনা করার সুবাদে ,মোদির দ্বিতীয় দফার প্রধানমন্ত্রীত্ব কালে যে ধরনের রাজনৈতিক মাইলেজ আরএসএস পেয়েছে, সেই ধারাকে অব্যাহত রাখাই ছিল সংঘের প্রধান রাজনৈতিক কার্যক্রম ।

এই লক্ষ্যে তারা ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে, সেই সেই রাজ্যের নিজস্ব সামাজিক- সাংস্কৃতিক ধারাকে ,সংঘের রাজনৈতিক হিন্দু ধারায় স্থাপন করে ,রাজনৈতিক হিন্দুত্বের জায়গাটিকে একটা বলগাহীন মাত্রা দিতে সচেষ্ট ছিল। এই কাজে তারা উত্তর ভারত, যাকে রাজনৈতিকভাবে গোবলয় বলা হয়। সেই অঞ্চলটিকে কেবলমাত্র বেছে নেয়নি।

অতীতে সংঘের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি যখন একক গরষ্ঠতায় কেন্দ্রে সরকার গঠন করেনি তখন কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষেত্র বিস্তারের লক্ষ্যে, আরএসএস সবথেকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে গোবলয়কে কারণ, গোবলয়ের বাইরে তখন তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম, সামাজিক আগ্রাসন, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন- এগুলি খুব বেশি মাত্রায় বিকাশ লাভ করতে পারেনি।

                   অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন তিন দফার এনডিএ সরকারে বিজেপি ছিল মূল নেতৃত্বে। তৃণমূল কংগ্রেসের মতো বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি, নিজেদের ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক স্বার্থে এনডিএ নামে পরিচিত নীতিবিহীন, সুবিধাবাদী জোটে ছিল।

তবে এটা মনে করবার কোনো কারণ নেই যে, আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির যে বিভাজনের রাজনীতি, ধর্মান্ধতার রাজনীতি, দাঙ্গার রাজনীতি, তার সঙ্গে এইসব আঞ্চলিক দলগুলির নীতি-আদর্শের দিক থেকে বিশেষ কোনও রকম ফারাক আছে।

গুজরাট গণহত্যা ঘিরে, গণহত্যা সময়কালে বাজপেয়ী মন্ত্রিসভায় অবস্থানরত মমতার অবস্থান । তার পরবর্তী সময়ে মমতার তথাকথিত বিজেপি বিরোধীতা। তার মধ্যেও আরএসএস ঘিরে নীরবতা। গুজরাট গণহত্যাগীরে নীরবতা। এই সমস্ত ঘটনাকম কিন্তু এটাই প্রমাণ করে যে; এনডিএ সরকারের অবস্থান করে, এইসব আঞ্চলিক দলগুলি কিন্তু নীতিগতভাবে আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সঙ্গে আলাদা অবস্থানে থাকত না। এ প্রসঙ্গে বিশেষ করে বলতে হয়; এন ডি এ র যে রাজনৈতিক ইস্তাহার, সেখানে মমতা ও স্বাক্ষর করেছিলেন ।

ওই ইস্তাহারে কিন্তু বলা হয়েছিল; ধ্বংসপ্রাপ্ত ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের ভগ্নস্তুপের উপরেই তারা তথাকথিত রাম মন্দির নির্মাণ করবে। তাই আজ এইকথা জোরের সঙ্গে বলতে হয় যে; নিজেদের শতবর্ষ উদযাপনের প্রাক মুহূর্তে আরএসএস, তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়, দেশের সর্বোচ্চ আদালতকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তূপের উপরে যে বিতর্কিত রাম মন্দির তৈরি করেছে, এই গোটা রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতি এবং অবস্থান অভিন্ন।

২০১৪ সালে আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি প্রথম কেন্দ্রে নিজেদের একক বলিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। বিজেপির এই একক গরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পেছনে ইউ পি এ (দুই ) সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে কংগ্রেস দলের যে ভূমিকা এবং অবস্থান, তা বিশেষ রকম ভাবে কাজ করেছিল।

এক্ষেত্রে মুলায়ম সিং যাদবের দল সমাজবাদী পার্টির ভূমিকা কেও আমরা ভুলে যেতে পারি না ।ইউ পি এ ( দুই) সরকারের শাসনকালের প্রায় শেষ অবস্থায়, দিল্লি -উত্তরপ্রদেশ লাগোয়া, মুজফফরনগরে আরএসএস- বিজেপি এক ভয়ঙ্কর সম্প্রদায়িক দাঙ্গা করে ।

মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের জানমালের উপর রাজনৈতিক হিন্দুরা ভয়াবহ আক্রমণ চালায়। কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে এই দাঙ্গা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবির চালিয়েছিল ।কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, এই দাঙ্গা থামাতে তদানীন্তন কেন্দ্রীয় সরকার সেভাবে কোন ভূমিকাই পালন করে নি। তার পাশাপাশি বলতে হয়; ওই সময়ে উত্তরপ্রদেশে ক্ষমতায় ছিল সমাজবাদী পার্টি।

মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন মূল্যায়ম পুত্র অখিলেশ যাদব। তিনিও কিন্তু মুজফফরনগরের দাঙ্গা থামাতে আদৌ কোনওরকম প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেন নি।

এই প্রেক্ষাপটটি কিন্তু আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে কেন্দ্রে একক গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতা দখল করবার ক্ষেত্রে একটা অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে সাহায্য করেছিল। তার মানে এই নয় যে, দুই দফার ইউপিএ সরকারের ১০ বছরের সময়কালে, নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছিল গোটা হিন্দুত্ববাদী শক্তি।

২০০৪ সালে যখন অটলবিহারী বাজপেয়ির নেতৃত্বে পরাজিত হয় এন ডি এ , তারপর পরবর্তী সময়ে ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের বিভিন্ন পর্যায়ে সাম্প্রদায়িকতাকে প্রতিরোধ করবার ক্ষেত্রে একটা শৈথিল্য কাজ করেছিল।

বাম সমর্থনে প্রথম ইউপিএ সরকার তৈরি হওয়ার গোটা প্রেক্ষাপট রচিত হয়ে যাওয়ার পর, ডঃ মনমোহন সিং যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন , তার অব্যবহিত আগে তিনি একটি সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন। ওই সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে , সরকার গঠন করবার পর, সাম্প্রদায়িকতাকে রখতে এবং সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কানি ,সম্প্রদায়িক সংঘর্ষে অংশ নেওয়া -এই সমস্ত ঘটনাক্রমকে ঘিরে তাঁর সরকার একটা কার্যকরী জোরদার আইন প্রণয়ন করবে।

এই আইন প্রণয়ন করবার লক্ষ্যে বামপন্থীরা মনমোহন সিং বা কংগ্রেস দলের উপর বহুবার চাপ সৃষ্টি করা সত্ত্বেও কংগ্রেস দল কার্যক্ষেত্রে এমন কোনও আইন তৈরি করেনি। এই ঘটনাক্রম কিন্তু গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবির কে নতুন ভাবে পুনঃগঠিত হবার একটা বড় রকমের সুযোগ করে দেয়। অনেকের ধারণা হয়েছিল, রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি না থাকার দরুন আরএসএস বা তার রাজনৈতিক দল বিজেপি কিংবা তাদের বিভিন্ন ধরনের শাখা সংগঠন, তারা তাদের সমস্ত ধরনের হিন্দু সন্ত্রাসী প্রচার ,ফ্যাসিবাদী প্রচার ,প্রতিক্রিয়াশীল ধ্যান ধারণা– এই সমস্ত কাজে খুব একটা ফলপ্রসু হবে না।   

                   কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল ইউপিএ সরকারের প্রথম পাঁচ বছর যখন বামপন্থীরা সেই সরকারের সমর্থক , সেই সময়কালেও বিভিন্ন রাজ্যে সেই রাজ্যগুলির নানা ধরনের আঞ্চলিক সমীকরণ, আর্থ-সামাজিক বৈশিষ্ট্য ,সংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, নানা ধরনের ধর্মীয় বিষয় গুলি –এই সমস্ত কিছুকে পুঁজি করে হিন্দুত্ববাদী শক্তি ,তাদের সামাজিক প্রযুক্তির কাজটাকে অত্যন্ত জোরদার ভাবে করে যেতে শুরু করলো। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারকে তারা এমন একটা জায়গায় নিয়ে এলো যেখানে সাধারণ মানুষের কাছে ধর্ম পালন, ধর্মপ্রাণতাকে বজায় রাখা ,আর ধর্মান্ধতা ,ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার, হিন্দু ধর্মকে অপর ধর্মের বিদ্বেষ হিসেবে ব্যবহার করবার প্রকার ও প্রবনতা –এগুলোই হয়ে উঠল একমাত্র উপজীব্য বিষয়।

২০০৪ সালে অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এন ডি এ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দিন থেকেই আরএসএস কেবলমাত্র যে ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য সচেষ্ট হয়েছিল তা নয়। সেই দিন থেকে তাদের লক্ষ্য ছিল ২০২৫ সালে বিজয়া দশমীর দিন, তাদের সংগঠনের শতবর্ষ পূর্তিকে কেন্দ্র করে কি ধরনের রাজনৈতিক পদক্ষেপ তারা নেবে, সে বিষয়ে ।

আরএসএসের কাছে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের মূল উদ্দেশ্য হলো ; তাদের সংগঠনের যে মতাদর্শগতভিত্তি ,অর্থাৎ; রাজনৈতিক হিন্দু রাষ্ট্র স্থাপন ,সেইটাই। এই দিকে লক্ষ্য রেখেই কিন্তু দেশভাগের পরবর্তী সময় থেকে আজ পর্যন্ত আরএসএস তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ কে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পরিচালিত করে আসছে। দেশভাগের অব্যবহিত পরে, তারা তাদের রাজনৈতিক হিন্দুত্বকে প্রতিষ্ঠিত করবার লক্ষ্যে সবথেকে বড় অন্তরায় হিসেবে অতীতের মতই নির্ধারিত করেছিল মহাত্মা গান্ধীকে।

মহাত্মা গান্ধীর ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল হিন্দুত্ববাদীদের কাছে চক্ষুশূল। সংখ্যালঘু মুসলমান সমাজ সহ সমস্ত ধরনের ধর্মীয় ভাষাবিত্তিক, জাতপাত ভিত্তিক সংখ্যালঘু সমাজের প্রতি সহমর্মিতা, ভালোবাসা, মহাত্মা গান্ধীর এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল হিন্দুত্ববাদীদের রাজনৈতিক অগ্রাসনের ক্ষেত্রে সবথেকে বড় অন্তরায় ।তাই তারা, ব্রিটিশ শাসনকালে যেমন তথাকথিত অস্পৃশ্যদের মন্দিরে প্রবেশাধিকারের দাবিতে মহাত্মা গান্ধীর আন্দোলনের প্রেক্ষিতে তিনের দশকে , তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল ভাটপাড়ার পন্ডিত সমাজের অন্যতম বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব পঞ্চানন তর্করত্নকে দিয়ে , সেই ধারাবাহিকতা তারা চিরদিন বজায় রেখেছে। আর তার পরিণতিতে তারা প্রাক্তন হিন্দু মহাসভার প্রশিক্ষিত কর্মী নাথুরাম গডসের মাধ্যমে গান্ধীজিকে হত্যা করে, তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে পরিচালিত করবার ক্ষেত্রে অগ্রসর হয়েছে।

রাজনৈতিক হিন্দুরাষ্ট্র স্থাপনের যে পরিকল্পনাকে মূলধন করে শতবর্ষের আরএসএসের কর্মসূচি কে হিন্দুত্ববাদীরা পরিচালিত করেছে, সেই উদ্দেশ্য পালনের লক্ষ্যই কিন্তু তারা ভারতের জাতীয় আন্দোলনের সময়কালে ব্রিটিশ তোষণ করে গেছে ।যে সমস্ত সশস্ত্র বিপ্লববাদী মানুষ এবং জাতীয়তাবাদী ধারার মানুষ এবং কমিউনিস্ট মতাদর্শের মানুষ ,ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ময়দানে আত্মনিবেদিত থেকেছে ,তাদের ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিয়ে তথাকথিত দেশপ্রেমের কর্তব্য পালন করেছে , এই আরএসএস তাদের সহযোগী সংগঠনগুলি, হিন্দু মহাসভা বা ভারতীয় হিন্দু সভার মতো চরম ফ্যাসিস্ট সংগঠন গুলি ।

হিন্দুত্ববাদীরা কোনওদিনই ধর্মনিরপেক্ষ ভারত চায়নি।মুসলিম জাতীয়তার উপর ভর করে যখন পাকিস্তান দাবি প্রবল হয়, তখন এই হিন্দুত্ববাদীরা, হিন্দু জাতীয়তার উপর ভিত্তি করে , হিন্দুদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের দাবি জানিয়েছে ।যে দাবি তারা উনিশ শতকের শেষ দিক থেকে জানাতে শুরু করেছিল। বিশ শতকের সূচনা পর্বে, আজকের পাকিস্তানের অন্তর্গত পাঞ্জাবের যে অংশ ,সেখানকার হিন্দু সম্প্রদায় ভুক্ত বণিকদের স্বার্থে তারা হিন্দুদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের দাবি জানিয়েছিল। মুসলিম লীগ, মুসলিম জাতীয়তার উপর ভিত্তি করে পাকিস্তানের দাবি জানানো, আলাদা রাষ্ট্রের দাবি জানানোর অনেক আগেই, হিন্দু সম্প্রদায়িক মতাদর্শের লোকেরা, হিন্দু র স্বার্থে, হিন্দুদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের দাবি জানিয়েছিল ।

পরবর্তীতে যখন ব্রিটিশ, কংগ্রেসের মধ্যে একটা বড় বর্ণবাদী ,ধনী হিন্দু এবং উচ্চ বর্ণের মুসলমানদের সার্বিক শ্রেণী স্বার্থ, যা কংগ্রেসের একটা অংশ আর মুসলিম লীগের একটা অংশ ,হিন্দু মহাসভা– এদের সম্মিলিত উদ্যোগে দেশভাগের বৃত্তটিকে পরিপূর্ণ করে।

তখন কিন্তু হিন্দুত্ববাদী শক্তি কোনও অবস্থাতেই চায়নি, ব্রিটিশ চলে যাওয়ার পর, ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হোক। ভারতকে রাজনৈতিক হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করবার লক্ষ্যে তারা যেমন তাদের নিজেদের পরিমণ্ডলের সচেষ্ট থেকেছে। ঠিক তেমনি ই কংগ্রেসের মধ্যে যারা রাজনৈতিক হিন্দু চিন্তা চেতনা ,মুসলমান বিদ্বেষ- এসবের দ্বারা পরিচালিত তাদের সংগঠিত করেছে। যার প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন; পুরুষোত্তম দাস ট্যান্ডন, বসন্ত শ্রীহরি আনে , সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, গোবিন্দবল্লভ পন্থ প্রমূখ। কংগ্রেসের মধ্যেকার চরম মুসলমান বিদ্বেষী, রাজনৈতিক হিন্দু নেতৃত্ব , তাদেরকে পরিচালিত করবার ক্ষেত্রে আরএসএস, হিন্দু মহাসভার একটা বড় রকমের ভূমিকা ছিল।

স্বাধীন ভারতে হিন্দুত্ববাদীদের কাছে প্রথম দুজন শত্রু ছিলেন মহাত্মা গান্ধী এবং জওহরলাল নেহরু ।সবথেকে বড় শত্রু হিসেবে তারা বেছে নিয়েছিল মহাত্মা গান্ধী কে ।সেজন্যই ক্ষমতা হস্তান্তরের অব্যবাহিত পরেই তারা, তাদের বহু পরিকল্পিত গান্ধী হত্যার বিষয়টি বাস্তবায়ন ঘটায় ।গান্ধীজীর ক্ষেত্রে হিন্দুত্ববাদী এবং মুসলমান জাতীয়তা উভয় সম্প্রদায়িক শিবিরের সবথেকে বড় আপত্তির জায়গা সমস্যার জায়গা ছিল; গান্ধীজি নিজের ভুল প্রকাশ্য স্বীকার করতেন। যেটা সমসাময়িক বিশ্বের রাজনীতিবিদদের মধ্যে প্রায় একটি বিরল বিষয় ছিল।

কেন গান্ধীজি ক্ষমতাবান এবং বিভেদকামী লোকেদের কাছে এতখানি অপছন্দের শত্রুতার মানুষ সেটা বোঝার জন্য হাজার ১৯৩১ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চাচ্চিলের গান্ধীজী সম্পর্কে করা একটি উক্তির দিকে আমরা নজর দিতে পারি ।চার্চিল বলেছিলেন; গান্ধীজিকে দেখে তার বমি আসছে। গান্ধীজীর অর্ধনগ্ন ফকিরের পোশাক দেখে নয়, এই কারণে তার বমি আসছে যে ,ওই রকম পোশাক পড়া একজন লোক ,যে আইন অমান্য আন্দোলন চালাচ্ছে। আবার সেই সঙ্গে সমান মর্যাদায় ভারত সম্রাট ,অর্থাৎ ; ব্রিটিশ রাজের সঙ্গে বা ব্রিটিশ সম্রাটের প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনা করছে এটা দেখে( Mahatma- D G Tendulkar.Vol-3, Bombay.1952.Page- 68)।

ব্রিটিশের কাছে যেভাবে গান্ধীজী ছিলেন চরম অপছন্দের একজন মানুষ ,ঠিক তেমনি ভাবেই আরএসএসের কাছে চিরদিন গান্ধীজী ছিলেন চরম অপছন্দের একজন মানুষ ।ক্ষমতা হস্তান্তরের পর ব্রিটিশের পরিত্যক্ত ভারতকে ধর্মের ভিত্তিতে পরিচালিত করতে চেয়েছিল হিন্দুত্ববাদী শক্তি। তারা যে এটা একেবারে একা চেয়েছিল তা নয়।কংগ্রেসের মধ্যে যারা দক্ষিণপন্থায় বিশ্বাস করে, ধর্ম কেন্দ্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করে, সে যুগে এমন মানুষজন, তারাও চেয়েছিল; ভারতকে হিন্দু ধর্মের রীতিনীতি অনুযায়ী পরিচালিত করতে। ভারতের যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠিত করবার লক্ষ্যে কংগ্রেসের মূল ধারার একটা বড় অংশ, বামপন্থীরা, সশস্ত্র বিপ্লববাদীরা, তাঁদের তাঁদের মত করে সচেষ্ট থেকেছে ,তাঁরা কিন্তু একটা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উপর স্বাধীন ভারত পরিচালিত হোক, সেটাই চেয়েছিলেন।

সেই লক্ষ্যেই তাঁরা স্বাধীন ভারতের সংবিধান প্রণয়ন থেকে শুরু করে যাবতীয় শাসনতান্ত্রিক কার্যক্রমকে পরিচালিত করতে সচেষ্ট ছিলেন। ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় কাল থেকেই ছিল এই কর্মকাণ্ডটি ছিল হিন্দুত্ববাদীদের কাছে সবথেকে অপছন্দের বিষয়।হিন্দুত্ববাদী শক্তি, তাদের প্রতিষ্ঠান লগ্ন থেকেই রাজনৈতিক হিন্দু চিন্তা চেতনা ,যার মূলে রয়েছে সম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এবং সম্প্রদায়িক বিভাজন ,তাকে মূল প্রতিপাদ্য করে স্বাধীন ভারতকে পরিচালিত করতে চেয়েছিল।

হিন্দুত্ববাদী শক্তির গান্ধীজীকে ঘিরে অপছন্দের সব থেকে বড় কারণ ছিল; গান্ধীজীর ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি ।দেশভাগের পর ,বিশেষ করে যখন নোয়াখালী ,বিহার ইত্যাদি জায়গায় ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হচ্ছে একাধারে হিন্দু মহসভা ও মুসলিম লীগের প্ররোচনায় , তখন হিন্দু-মুসলমান উভয়ের কাছে গান্ধীজী ছিলেন পরম আশ্রয়। বিশেষ করে বিভাজিত ভারতে ,যে সমস্ত মুসলমানেরা দেশভাগকে মেনে নিতে পারেননি, ভারতীয় জাতিসত্তার সঙ্গে নিজেদের একাত্ত করে দেখেছিলেন নিজেদের। সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে সুসংবদ্ধ করবার মূল হাতিয়ার হিসেবে তারা মনে করেছিলেন তাঁদের পরম আশ্রয় ই হলেন গান্ধীজি। গান্ধীজীর মধ্যে তাঁরা খুঁজে পেয়েছিলেন সমস্ত ধরনের আশ্রয়। গান্ধীজীর মধ্যে তাঁরা খুঁজে পেয়েছিলেন জান মালের নিরাপত্তার বিষয়টি ।আর ঠিক সেই কারণেই মুসলিম জাতীয়তাবাদকে আশ্রয় করে যারা নিজেদের রাজনৈতিক জীবন জীবিকা কে পরিচালিত করেছিল, সেইরকম লোকেরা, তারা গান্ধীজিকে ভারতীয় জনতার নেতা হিসেবে নিতে পারে নি।গান্ধীজীকে তারা নিয়েছিল হিন্দুদের নেতা হিসেবে। যে শব্দবন্ধ , যে দ্যোতনায় সব থেকে বেশি আপত্তি ছিল স্বয়ং গান্ধীজীর। 

                 হিন্দুত্ববাদীদের হাতে গান্ধীজী নিহত হওয়ার পর ,গোটা বিশ্ব থেকে যে সমস্ত শোকবার্তা এসেছিল, তার মধ্যে জিন্নার শোক বার্তা ছিল সব থেকে বেশি উপহাসমূলক ।মহাত্মা গান্ধীকে তিনি শহিদ হওয়ার পরও হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা, এই বিশেষণে বিশেষিত করতে ছাড়েন নি। অথচ যে হিন্দুত্ববাদীরা, অর্থাৎ; আরএসএস- হিন্দু মহাসভার সম্মিলিত গুন্ডাবাহিনী , যাদের হাতে গান্ধীজি মৃত্যুবরণ করেছিলেন, তারা তাঁকে হত্যা করেছিল হিন্দু স্বার্থ রক্ষা না করবার অভিযোগে। মুসলমানের স্বার্থের প্রতি তিনি বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন- এই অভিযোগেই আরএসএস – হিন্দু মহাসভা গান্ধীজিকে হত্যা করেছিল। জিন্না র রাজনৈতিক চরিত্রের যে দ্বৈততা, যাকে মুসলিম জাতীয়তাবাদের প্রবক্তারাও নিজেদের রাজনৈতিক বিন্যাসের ক্ষেত্রে মূলধন হিসেবে ব্যবহার করেছিল এবং অবশ্যই হিন্দু জাতীয়তাবাদের উপর ভিত্তি করে রাজনীতি করা হিন্দু মহাসভা, আরএসএস, হিন্দুসভা ইত্যাদি হিন্দু সম্প্রদায়িক সংগঠন ,তাদের রাজনৈতিক বিন্যাসের অন্যতম অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করেছিল ।সেই জিন্নাও কিন্তু হিন্দুত্ববাদীদের হাতে গান্ধীজীর শহিদ হওয়া ঘটনাকে কেন্দ্র করে, সেটি মুসলমানদের জন্য একটি বিরাট ক্ষতি এ কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

            ক্ষমতা হস্তান্তরের পর পাকিস্তান সৃষ্টি হয়ে গেলে, পাকিস্তানপন্থী নেতারা পাকিস্তানে নিজেদের গুছিয়ে নেওয়া যখন শুরু করে, তখন কিন্তু ভারতে একটা বড় অংশের মানুষ, যাঁরা জন্মসূত্রে মুসলমান, এঁরা কোনও অবস্থাতেই মুসলিম জাতীয়তার ভিত্তিতে দেশভাগ ,হিন্দু -মুসলমান দুটি আলাদা জাতি- এগুলি মেনে নিতে পারেননি। তাঁরা ভারতে থেকে গেছিলেন। একটা বড় অংশের মানুষ পাকিস্তানে গিয়ে নিজেদের সমস্ত রকমের সুযোগ সুবিধা গুছিয়ে নিলেও, আর একটা বড় অংশের মানুষ, যাঁরা জন্মসূত্রে মুসলমান ,তাঁরা কোনও অবস্থাতেই পাকিস্তানকে তাঁদের স্বদেশ বলে মেনে নেননি। আর সেই মুসলমানদের কাছে পরম আশ্রয়স্থল ছিলেন গান্ধীজি। জিন্না যাঁকে কেবলমাত্র একজন হিন্দু নেতা বলেই অভিহিত করেছিলেন, ইতিহাসের পরিহাস এই যে, জিন্না বর্ণিত সেই হিন্দু নেতাটি, মুসলমানদের জানমালের নিরাপত্তার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন বলেই, হিন্দু সম্প্রদায়িক শক্তির হাতে প্রাণ বিসর্জন দিলেন। চরম মুসলমান বিদ্বেষী এক বর্ণ হিন্দু হাতে প্রাণ দিলেন।

স্বাধীনতার আগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পদলেহনকারী হিসেবে আরএসএসের লক্ষ্য ছিল ; ব্রিটিশ ভারত ত্যাগ করবার পর , ভারত যাতে রাজনৈতিক হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত হয় সেদিকে আত্মনিয়োগ করা। এই কাজটিতে হিন্দুত্ববাদী শক্তি যাতে সফল হয় সেজন্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের চেষ্টা র ত্রুটি ছিল না। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ক্ষমতা হস্তান্তরের নামে ভারত ভূখণ্ডের যে অংশটিকে অবশিষ্ট রাখল ,সেই অংশের দেশিয় রাজাদের স্বাধীন করে দেওয়ার নাম করে তারা চেয়েছিল, হিন্দুত্ববাদী শক্তির, হিন্দু রাষ্ট্র স্থাপনের ধারা-উপধারাকে শক্তিশালী করতে।

ভারতের এই সমস্ত দেশীয় রাজন্যদের বেশিরভাগই ছিল উচ্চ বর্ণের হিন্দু অভিজাত পরিবার ভুক্ত। সামন্ততন্ত্রের চরম সমর্থক হিসেবে এই সমস্ত দেশীয় রাজাদের লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ যাতে কখনো কোনও অবস্থাতেই ব্রিটিশ চলে যাওয়ার পর স্বাধীন ভারতে গড়ে উঠতে না পারে , সেদিকে লক্ষ্য রেখা।সেভাবেই তারা ভারতের বিভিন্ন অংশের হিন্দুত্ববাদী শক্তির সঙ্গে একটা যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছিল। আর ব্রিটিশ শাসনকালে সমস্ত ধরনের হিন্দুত্ববাদী শক্তি গুলি ,তাদের হিন্দু সম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিকে ভারতের বুকে গেঁথে দেওয়ার লক্ষ্যে, দেশিয় রাজন্য বর্গের সঙ্গে একটা ভালো রকমের বোঝাপড়া সম্পর্ক তৈরি করে ফেলেছিল। যে সম্পর্কের রেশ , ব্রিটিশের ভারত ত্যাগের পর বিশেষভাবে স্বাধীন ভারতে পড়েছিল যার মোকাবিলায় ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল । এই জায়গায় পন্ডিত নেহরুর উপর হিন্দু সম্প্রদায়িক চাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে ,তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল নানা ধরনের রাজনৈতিক প্যাঁচ কষেছিলেন।

আজ শতবর্ষ উদযাপন কে কেন্দ্র করে আরএসএস তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির , কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনা করবার সুযোগকে গ্রহণ করে, রাজনৈতিক হিন্দুরাষ্ট্র স্থাপনের পরিকল্পনা করছে স্বাধীন ভারতে। এই পরিকল্পনা তারা প্রথম করে ইংরেজ দেশ ছাড়বার অব্যবহিত পরেই। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে সমস্ত দেশিয় রাজাদের তথাকথিত উৎপত্তি আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তাদেরকে কেন্দ্র করে , হিন্দুরাষ্ট্রের পরিকল্পনা সঙ্ঘ স্বাধীন ভারতে জোরদার ভাবে শুরু করে। এই কাজে যেমন দেশভাগের পরবর্তীকালে পাকিস্তানের অবস্থানরত মুসলিম জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী কিছু কিছু ব্যক্তির বড় ভূমিকা ছিল ।ঠিক তেমনিই তার পাশাপাশি, আরএসএস, হিন্দু মহাসভারও, হিন্দু দেশিয় রাজাদের একত্রিত করে, ভারত রাষ্ট্রকে ,গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর উপরে পরিচালিত হতে না দিয়ে ,ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করবার একটা প্রবণতা খুব বেশি রকম ভাবে কাজ করেছিল।

গুজরাটে জুনাগর, সেটি ছিল জুলফিকার আলী ভুট্টোদের সামন্ত রাজ্য, হায়দ্রাবাদের নিজামের মতোই এই জুনাগর ও পাকিস্তানে যোগ দিতে চেয়েছিল। নিজামের নেতৃত্বাধীন যে তথাকথিত বিদ্রোহ, নিজামের প্রধানমন্ত্রী লায়েক আলির নেতৃত্বে রাজাকার বাহিনী তৈরি করা।এই সমস্ত ঘটনাক্রমের সঙ্গে সঙ্গেই দেশের বিভিন্ন অংশের হিন্দু রাজাদের নেতৃত্বে হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে ভারতকে পরিচালিত করবার প্রচেষ্টা , সেটি ছিল কিন্তু আরএসএসের সদ্য স্বাধীন ভারতে, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের একটি বড় অংশ। এই কাজটি করবার ক্ষেত্রে আরএসএসের কাছে সবথেকে বড় অন্তরায় ছিলো প্রধানমন্ত্রী নেহরু এবং জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী।

ভারতে অবস্থিত দেশিয় রাজ্যগুলি যে হিন্দু সম্প্রদায়িক শক্তি সুরে সুর মিলিয়ে হিন্দু রাষ্ট্রের দিকে নিজেদের চিন্তা-চেতনাকে প্রসারিত করবার চেষ্টা করছিল, ভারত সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করছিল, তাকে প্রতিহত করবার ক্ষেত্রে পন্ডিত নেহরুর ভূমিকাটি বিশেষভাবে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হয়। কংগ্রেসের মধ্যে হিন্দু দক্ষিণপন্থী শক্তি নতুন করে তখন শক্তি অর্জন করছিল স্বাধীন ভারতকে রাহগ্রস্ত করবার লক্ষ্যে। তাদের নেতৃত্ব দেশিয় রাজ্যগুলিকে ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করবার ক্ষেত্রে সমস্ত কৃতিত্ব প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত নেহরুর উপরে না দিয়ে ,তাঁর সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের উপর দিতে সবসময় ব্যস্ত থেকেছে ।

এই প্রবণতা আটের দশক পর্যন্ত কিন্তু শক্তিশালী ছিল ।জাতীয় কংগ্রেসের শতবর্ষ উপলক্ষে ‘দেশ’ পত্রিকা একটি বিশেষ সংখ্যা করেছিল ।সেই পত্রিকাতে কংগ্রেসের সেই সময়ে দক্ষিণপন্থী নেতৃত্বের অন্যতম বড় মুখ অতুল্য ঘোষ ,’ভারত ভাগ : কার্য ও কারণ’ বলে একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেই প্রবন্ধে তিনি স্বাধীন ভারতে দেশিয় রাজ্যগুলির ভারতীয় ইউনিয়নের সংযুক্তির পুরো কৃতিত্ব দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত নেহরুকে নয়। সর্দার প্যাটেল কে ।

নেহরু সরকারের গৃহমন্ত্রী হিসেবে সর্দার প্যাটেলের যে চরম দক্ষিণপন্থী হিন্দু সম্প্রদায়িক অবস্থান ছিল, যা সোমনাথ মন্দিরের পুনর্গঠন ঘিরে প্যাটেলের ভূমিকা এবং প্যাটেল কর্তৃক ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদকে প্ররোচিত করবার ঘটনাক্রম ,যে সমস্ত ঘটনাবলী বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল হিন্দু মহাসভা এবং আরএসএসকে, সেই প্রেক্ষিতগুলো কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার।

শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে ভারতকে রাজনৈতিক হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করবার যে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিয়ে আরএসএস নিজেদের পরিচালিত করছে, ভারতের স্বাধীনতার সময়কাল থেকে সেই কার্যক্রম ই তারা নানান সময়ে , নানান ইঙ্গিতে, নানান পরিপ্রেক্ষিতে লাগু করতে সচেষ্ট থেকেছে। আর এস এস রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে চেয়েছে, তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ, যাকে তারা তাদের সামাজিক মতাদর্শ বলে প্রকাশ্যে বলে থাকে- সেই বিষয়বস্তুকে প্রতিষ্ঠিত করবার লক্ষ্যে। আরএসএসের রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রথম ও প্রধান বিষয় হল; মুসলমান মুক্ত ভারত।

              তারা যে হিন্দুরাষ্ট্রের কথা বলে, এই হিন্দু রাষ্ট্রের তারা আরএসএসের সংজ্ঞা অনুযায়ী যাদেরকে তারা হিন্দু বলে স্বীকৃতি দেবে, তার বাইরে জন্মসূত্রে কোনও হিন্দু থাকতে পারবে না। অর্থাৎ; যে মানুষ জন্মসূত্রে হিন্দু হয়েও মুসলমান বিদ্বেষী নয় , সেই মানুষদেরকে আরএসএস কখনো তাদের সংজ্ঞা অনুযায়ী হিন্দু বলে পরিগণিত করে না। যে মানুষ জন্মসূত্রে হিন্দু হয়েও অপর ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ।অপর ধর্মের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিষয়ে সোচ্চার ।সেই মানুষদের কেও কখনো আরএসএস হিন্দু বলে মনে করে না।

            পরমত বিদ্বেষী ব্যাক্তি আরএসএসের কাছে বড় হিন্দু ।পরধর্ম বিদ্বেষী ব্যক্তি আরএসএসের কাছে বড় হিন্দু। এই রাজনৈতিক হিন্দু ব্যতীত জন্মসূত্রে কোনও হিন্দুকে আরএসএস তাদের রাজনৈতিক হিন্দু রাষ্ট্রের নাগরিক করতে রাজি নয়। আরএসএসের তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাতা এম এস গোলওয়ালকার , যে হিন্দু রাষ্ট্রের প্রস্তাবনা রেখেছিল; সেখানে মুসলমান সহ পর ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল যে কোনও মানুষই দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে পরিগণিত হবে ।

চৈতন্য মহাপ্রভু থেকে শুরু করেছিলাম শ্রীরামকৃষ্ণ, মা সারদা ,স্বামী বিবেকানন্দ- যাঁরা পবিত্র ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। পরমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেছেন।পরধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেছেন। কোনও অবস্থাতেই জাত -পাতের বেড়াজালে নিজেদেরকে আবদ্ধ রাখেন নি। তাঁরা কিন্তু আরএসএসের অন্যতম তাত্ত্বিক ভিত্তির নির্মাতা গোলওয়ালকারের সজ্ঞা অনুযায়ী হিন্দু নন!

ভারতের চিরন্তন সমন্বয়ী সংস্কৃতির প্রতি যাঁরা শ্রদ্ধাশীল ,তাদেরকে আরএসএস কখনো হিন্দু বলতে রাজি নয়। তাই আরএসএস যে হিন্দু রাষ্ট্রের দিকে পাখির চোখ করে তাদের শতবর্ষ পালনের নানান কর্মসূচি কার্যত এক দশক আগের থেকে শুরু করে দিয়েছে, সেই হিন্দুরাষ্ট্র কিন্তু সামগ্রিকভাবে জন্মসূত্রে হিন্দু যাঁরা, তাঁদের জন্য নয়।

আরএসএস, তার রাজনৈতিক হিন্দুর সংজ্ঞায় এই মুহূর্তে খাদ্যাভ্যাসকে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরবার চেষ্টা করছে। আরএসএস তাদের রাজনৈতিক হিন্দুদের খাদ্যাভ্যাস হিসেবে নিরামিষ খাদ্যদ্রব্য কে স্বীকৃতি দিচ্ছে। যে যে রাজ্যে আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বা তার সহযোগী সংগঠনগুলি শাসন ক্ষমতা রয়েছে, সেসব রাজ্যে আমিষ খাবার বিক্রির উপরে সরকারি নিষেধাজ্ঞা তারা জারি করছে। অতি সাম্প্রতিককালে বিহারে সেখানকার রাজ্য সরকার, বিজেপি যার অন্যতম প্রধান অংশ, তারা আমিষ খাবার বিক্রির উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

বিজেপি -আরএসএসের এই আমিষের সংজ্ঞার সঙ্গে কিন্তু আবার বাঙালি সংস্কৃতির আমিষ ,সেটির কোনও মিল নেই। বাঙালি সংস্কৃতিতে নিরামিষ, আমিষ- সেই খাদ্যদ্রব্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে এখানকার ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির একটা বড় ভূমিকা আছে। হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে যারা দায়ভাগ ধারার পর্যায়ক্রম অনুযায়ী চলেন, তার প্রভাব বাঙালি হিন্দু উচ্চ বর্ণের ওপরে রয়েছে। সেখানে মাছ-মাংসের সঙ্গে পিঁয়াজ, রসুন, মুসুরির ডাল ইত্যাদি বস্তুকেও আমিষ হিসেবে ধরা হয়।

কিন্তু উত্তর ভারতে যারা মীতাক্ষরা অনুযায়ী হিন্দু উত্তরাধিকার আইনকে পালন করে, তাদের কাছে কিন্তু উচ্চবর্ণের বাঙালিদের মত ,পিয়াজ- রসুন কিন্তু আমিষ হিসেবে পরিগণিত হয় না ।আবার বিহারে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে এই আমিষ – নিরামিষ ঘিরে উত্তরপ্রদেশ বা উত্তরাখণ্ডের ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির সঙ্গে একটা বিস্তর ফারাক রয়েছে।    

              তাই আরএসএস তাদের শতবর্ষকে পালনের উদ্দেশ্যে যে হিন্দু রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে থাকে, তার সার্বিক(uniform) রূপটি যে কি ,সে সম্পর্কে তাদের নিজেদেরই কোন বাস্তব ধারণা নেই।( চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *