ইরান যুদ্ধের ঢেউ কি আছড়ে পড়ছে ভারতে?

বছর ৫৭ বয়সের মোজতবা খামেনেইকে মার্কিন-ইজরায়েল যৌথ বাহিনীর সামরিক অভিযানে নিহত ইরানের প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রধান খামেনেইয়ের উত্তরসূরি হিসেবে ঘোষণা করার মাধ্যমেই ইরান এই বার্তা গোটা বিশ্ববাসীর কাছে রাখতে পারলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো দাবি তারা মানছে না। ইরানের রাশ থাকবে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হাতেই, আর সেই ধর্মীয় নেতা খোদ খামেনেইয়ের পুত্র। সেই খামেনেই, যাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে মেরেছে আমেরিকা এবং ইজরায়েল।অন্যদিকে ট্রাম্প তার স্বভাবসিদ্ধ ঔদ্ধত্য বজায় রেখে বলেছেন যে, একটা সময় আসবে যখন ইরানে আত্মসমর্পণ করার জন্য কেউ বেঁচে থাকবেনা।

দীর্ঘদিনের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, ব্যাপক দুর্নীতি এবং শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ সুবিধাভোগের সংস্কৃতি দেশটিকে দুর্বল করেছে। কিন্তু কেবল নিষেধাজ্ঞা বা দুর্নীতি নয়, শাসনব্যবস্থার অদক্ষতাও ইরানকে এ অবস্থায় নিয়ে এসেছে। তবু ইরান এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি এবং যার সম্ভাবনা বিপুল। প্রায় ৯ কোটি মানুষের দেশ ইরানে উচ্চশিক্ষিত বিশাল জনগোষ্ঠী রয়েছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় বিস্তৃত প্রবাসী সমাজও শক্তিশালী। ইরানের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিশাল, কারণ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্যাসের মজুত এবং চতুর্থ বৃহত্তম তেলের মজুত রয়েছে দেশটিতে। এছাড়া সোনা, তামাসহ নানা প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ ইরান। এই প্রাকৃতিক সম্পদের কর্তৃত্ব কোন গোষ্ঠীর হাতে থাকবে তাকে কেন্দ্র করেই এই লড়াইয়ের সূত্রপাত।

আসলে এই ঘটনা এবং একইসাথে বছরের একেবারে শুরুর দিকের ভেনেজুয়েলার ঘটনা – এই দুই বাহ্যিক সামরিক ঘটনা একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে আমাদের সামনে দাঁড় করিয়েছে এবং তা হলো – রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব। রাষ্ট্রব্যবস্থায় সার্বভৌমত্বের ধারণার সূচনা হয় ১৬৪৮ সালের ‘পিস অব ওয়েস্টফালিয়া’র মাধ্যমে। এর মূলনীতি ছিল সরল—রাষ্ট্রগুলো সমান, তাদের সীমানা অখণ্ড এবং বাইরের হস্তক্ষেপ অগ্রহণযোগ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই সোশ্যালিস্ট ব্লকের চাপে যখন পাশ্চাত্য দেশগুলো তাদের উপনিবেশ থেকে পিছু হঠতে শুরু করছিল তখন থেকেই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায়। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে জন্ম আজকের সময়ের নয়া-উপনিবেশবাদ (neoimperialism) এর। যার মূল ভিত্তি ছিল এই সকল স্বাধীন দেশগুলোর জনগণের মতাদর্শ ও চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করে ধীরে ধীরে সেই রাষ্ট্রব্যবস্থাকে নিজের আয়ত্তে আনা। নয়া উপনিবেশবাদের ফলে আগের উপনিবেশগুলি সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলির উপর আরও বেশি মাত্রায় অর্থনৈতিক দিক থেকে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বিশ্বের ধনী শিল্পোন্নত দেশগুলি বর্তমানে বিভিন্নভাবে ( যেমন-বৈদেশিক সাহায্য, সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত বাণিজ্য ও অস্ত্র বাণিজ্যের মাধ্যমে ) নয়া ঔপনিবেশিক শোষণ চালাচ্ছে। এই ধরনের নয়া ঔপনিবেশিক শোষণের ফলে বিশ্বের ধনী শিল্পোন্নত ও দরিদ্র উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অধিকার বলেই বিগত কিছু বছরে এই ধারণা কিছুটা পাল্টেছে মানবিক হস্তক্ষেপ’ এবং ‘রেসপনসিবিলিটি টু প্রটেক্ট’–এর মতো নীতিগুলো বলছে, সার্বভৌমত্ব কেবল অধিকার নয়, এটি দায়িত্বও। যদি কোনো রাষ্ট্র নিজ নাগরিকদের গণহত্যা, জাতিগত নিধন বা মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় হস্তক্ষেপ করতে পারে।

কিন্তু এখানেই প্রশ্ন থেকে যায়, যে এই ব্যর্থতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করবে কে? সংকট ঠিক কতটা তীব্র হলে বিদেশি কোনো শক্তি সেখানে হস্তক্ষেপ করার অধিকার পাবে এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। কিন্তু বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকলে লক্ষ্য করা যাবে যে এই সকল বিষয়ই শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা , প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থা চলতে থাকলে আত্মনির্ভর হওয়ার ভিত্তি কমতে থাকে এবং নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয় ক্ষমতাশালী দেশগুলোর উপর। তাই সবমিলিয়ে এই কথা বলা রাখতে কোনো দ্বিধার অবকাশ থাকেনা যে ইরানের উপর এই আক্রমণের ঘটনা কোনো নিছক ব্যতিক্রমী কোনো ঘটনা নয়।

এখানেই উপস্থাপিত হয় এই নয়া উপনিবেশবাদী ব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাথে সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্ব। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি থেকে চলমান এই যুদ্ধে দুপক্ষের তরফেই সামরিক ঘাঁটি এবং তেল শোধনাগারগুলোকে কেন্দ্র করে নামিয়ে আনা হয়েছে একাধিক হামলা। ফলে তড়িঘড়ি তেল উৎপাদন এবং সংশোধনের যে চলমান প্রক্রিয়া তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে অনেকটাই।

২০২৬ সালের মার্চ মাসের শুরুতে বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১.৬৭ ডলার বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২.০৫ শতাংশ বেড়েছে । যদিও ভারত সরকার মার্চ মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম খুব বেশি বদলায়নি এবং ফেব্রুয়ারির মতো একই হারে তা বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘসময় হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় রান্নার, যানবাহনের গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে। কালোবাজারি ঠেকাতে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন জারি করেছে কেন্দ্র। কিন্তু কোথাও গ্যাসের কালো বাজারি আটকানো সম্ভব হয়ে উঠছেনা। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে স্মার্টফোন , ইন্ডাকশন, মাইক্রোওয়েভের মত যন্ত্রাদির দাম বাড়বে কয়েকগুণ। কারণ, এইসকল বৈদ্যুতিক যন্ত্র বানানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সালফিউরিক অ্যাসিড, যার অন্যতম প্রধান উপাদান হল সালফার এবং যা খনিজ তেল পরিশোধনের পর অন্যতম উপজাত দ্রব্য। পাশাপাশি বিশ্বের ‘সেমিকন্ডাকটর হাব’ তাইওয়ান উপরোক্ত কারণে জ্বালানি সংকটে পড়ায় এই শিল্পকে চালানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে ওরা। ফলে নতুন অর্থবর্ষ থেকেই ১০-১২% দাম বাড়বে বলেই ধারণা করছে অর্থনীতিবিদরা।

ফলে, এক দীর্ঘস্থায়ী টালমাটাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছি আমরা। সেইক্ষেত্রে ভারত সরকারকে অনেকবেশি সংবেদনশীলতার সাথে জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ানো, নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর কথা ভাবতে হবে। তাই এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ইরান থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়ে আমাদের কাজ কেবল প্রস্তুতি নেওয়া কারণ পৃথিবীতে যুদ্ধ শুধু সীমান্তে হয় না, তার ঢেউ এসে লাগে বাজারে এবং মানুষের প্রত্যেকদিনের জীবনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *