শতবর্ষে বাংলার দ্বিতীয় জাগরণ
গৌতম রায়
আজ থেকে ঠিক ১০০ বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কে কেন্দ্র করে বাংলায় যে উনিশ শতকের জাগরণের দ্বিতীয় পর্যায়ের সূচনা হয়েছিল, যা জাতি- ধর্ম -বর্ণের বিভাজন রেখা কে অস্বীকার করে ,বুদ্ধির মুক্তির ক্ষেত্রে ,ফরাসি বিপ্লবের সাম্য -মৈত্রী- স্বাধীনতার বাণী, যার মধ্যে দিয়ে গোটা বিশ্ব, অন্ধকার থেকে আলোক প্রাপ্তির দিকে যাত্রা করেছিল, তারই এক অভিস্রুতি — এ সম্পর্কে সেই ঐতিহাসিক ঘটনার ১০০ বছর পর ,আজ পর্যন্ত এপার বাংলায় অন্নদাশঙ্কর রায় ,শিবনারায়ণ রায়– এমন হাতে গোনা মানুষজন ছাড়া কেউ খুব বেশি সোচ্চার হননি।
বা ংলায় মুসলমান সমাজের আলোকিত অধ্যায় ঘিরে আলোচনার ক্ষেত্রটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে বাঙালি মুসলমানের মধ্যে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটা স্বীকার করতে হয় যে, বাংলার সমাজ- সংস্কৃতিতে মুসলমানের ভূমিকা ,অবদান– এগুলি সম্পর্কে সারস্বত সমাজে চর্চার ক্ষেত্রে কোথায় যেন একটা অলিখিত বিভাজন রেখা কার্যকর ই থাকে। এই রেখাটিকে মুছে ফেলবার ক্ষেত্রে খুব একটা উদ্যোগও আমরা দেখতে পাই না।
আজ থেকে ঠিক ১০০ বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কে কেন্দ্র করে বাংলায় যে উনিশ শতকের জাগরণের দ্বিতীয় পর্যায়ের সূচনা হয়েছিল, যা জাতি- ধর্ম -বর্ণের বিভাজন রেখা কে অস্বীকার করে ,বুদ্ধির মুক্তির ক্ষেত্রে ,ফরাসি বিপ্লবের সাম্য -মৈত্রী- স্বাধীনতার বাণী, যার মধ্যে দিয়ে গোটা বিশ্ব, অন্ধকার থেকে আলোক প্রাপ্তির দিকে যাত্রা করেছিল, তারই এক অভিস্রুতি — এ সম্পর্কে সেই ঐতিহাসিক ঘটনার ১০০ বছর পর ,আজ পর্যন্ত এপার বাংলায় অন্নদাশঙ্কর রায় ,শিবনারায়ণ রায়– এমন হাতে গোনা মানুষজন ছাড়া কেউ খুব বেশি সোচ্চার হননি। আজ বাংলার দ্বিতীয় জাগরণের এই শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে ১০০ বছর পর ,এপার বাংলায় আমরা এই কর্মকাণ্ডের শতবর্ষ ঘিরে আজ পর্যন্ত কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।
১৯২৬ সালের ১৯শে জানুয়ারি ,ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম সাহিত্য সমাজ। প্রতিষ্ঠা সভাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হল ইউনিয়ন কক্ষে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর মোঃ শহিদুল্লাহ, মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রথম সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন ।সংগঠনটি পরিচালনার উদ্দেশ্যে দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিভাগের অধ্যাপক আবুল হোসেন ,মুসলিম হলের ছাত্র এ এফ এম আবদুল হক, ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের ছাত্র আবদুল কাদির ও আনোয়ার হোসেন এবং ঢাকা ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজের ছাত্র আবুয্ যোহা নূর হোসেনের উপর। তাঁরাই ছিলেন প্রথম বছরের কর্মী সংসদের সদস্য। এই প্রতিষ্ঠানে প্রথম থেকেই কোনও সভাপতি ছিলেন না। ছিলেন সম্পাদক। প্রথম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন আবুল হোসেন ।
তবে এই সংগঠনটি গড়ে তোলবার ক্ষেত্রে একদম সূচনাকাল থেকে ঢাকার ইন্টারমিডিয়েট কলেজের অধ্যাপক কাজী আব্দুল ওদুদ, কাজী আনোয়ারুল কাদির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক শ্রেণীর ছাত্র আবুল ফজল বিশেষ রকমের ভূমিকা পালন করেছিলেন। মুসলিম সমাজের যে বার্ষিক অধিবেশন গুলি হত, তাতে কুমিল্লা থেকে এসে যোগ দিতেন মোতাহার হোসেন চৌধুরী ।তাছাড়াও বিভিন্ন সময়ে তাঁদের অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ,আহমদ ফজলুর রহমান ,চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, খান বাহাদুর তসাদ্দুক আহমদ, মমতাজ উদ্দিন আহমদ, মোঃ আবদুর রশিদ, আব্দুস সালাম খাঁ, হেমন্ত কুমার সরকার, রমেশ চন্দ্র মজুমদার, সুশীল কুমার দে ,কামালউদ্দিন খান, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী ,মোহিতলাল মজুমদার খান, বাহাদুর আবদুর রহমান খান প্রমুখ সেই সময়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রধান দুই স্তম্ভ ছিলেন কাজী আব্দুল ওদুদ এবং আবুল হোসেন। কাজী আব্দুল ওদুদ লিখছেন; “১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের সূচনায়– ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিমণ্ডলে মুসলিম সাহিত্য সমাজ নামে এক সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয় তার মূল মন্ত্র ছিল বুদ্ধির মুক্তি ।বুদ্ধির মুক্তি অর্থাৎ বিচার বুদ্ধিকে অন্ধ সংস্কার শাস্ত্রানুগত্য থেকে মুক্তি দান বাংলার মুসলমান সমাজে হয়তো বা ভারতের মুসলমান সমাজে এসেছিল এক অভূতপূর্ব ব্যাপার হয়েছিল বাংলার শিক্ষিত মুসলিম তরুণদের উপরে এর প্রভাব একটি জিজ্ঞাসু ও সহৃদয় গোষ্ঠী সৃষ্টি সম্ভবপর হয়েছিল এর দ্বারা দৃশ্য তো এর প্রেরণা এসেছিল মুস্তাফা কামালের উদ্দোম থেকে কিন্তু তার চাইতে গুরুতরক যোগ এর ছিল বাংলার বা ভারতের একালের জাগরণের সঙ্গে আর সেই সূত্রে মানুষের প্রায় সর্বকালের উদার জাগরণ প্রয়াসের সঙ্গে।” ( শাশ্বত বঙ্গ- কাজী আবদুল ওদুদ)।
মুসলিম সাহিত্য সমাজ- নামের সঙ্গে’ মুসলিম ‘ শব্দটি যুক্ত থাকলেও সংগঠনটির কার্যক্রমের সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার কোনও রকম সম্পর্ক ছিল না ।সংকীর্ণতার কোনও রকম সম্পর্ক ছিল না। এই সাহিত্য প্রতিষ্ঠানের মানুষজন , এঁরা কোনওদিন কোনও রকম ভাবে ধর্ম ,গোষ্ঠী ইত্যাদির সংকীর্ণতার মধ্যে আবদ্ধ করেননি নিজের বা এই সংগঠন টিকে।যুগের প্রয়োজনই তাঁরা ‘মুসলিম ‘শব্দটিকে ব্যবহার করেছিলেন।
বিশ শতকের প্রায় মধ্যভাগে বাংলার মুসলমান সমাজের কাছে মুক্ত বুদ্ধি এবং উদার চিন্তাধারার আদর্শ তুলে ধরার যে প্রয়োজনীয়তা, সেখান থেকেই এই শব্দটির ব্যবহার। এ সম্পর্কে সংগঠনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে;” শরীরের যে অঙ্গে ব্যাধি সেই অঙ্গেই চিকিৎসার প্রয়োগ করা দরকার। বঙ্গভাষা সেবক হিন্দুও বটে মুসলমানও বটে অস্বারোহীর দল আগে ছুটি আছে রসধিন শক্তিহীন পদাতিক দল পিছনে পড়িয়ে আছে এদের কথা একটু স্বতন্ত্র ভাবে চিন্তা না করিলে এরা যে কোনদিনই অগ্রগামী দলের কোন সাহায্যেই লাগিতে পারিবে না এবং বঙ্গভাষাও সাহিত্যের বিজয় গৌরব কিঞ্চিত অসম্পূর্ণ থাকিয়া যাইবে( মুসলিম সাহিত্য সমাজের অষ্টম বার্ষিক প্রতিবেদন, [ চৈত্র, ১৩৪০] সভাপতি মহম্মদ বরকতুল্লাহের বক্তৃতা)।”
সংকীর্ণ ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা পরিচালিত হয়ে ,একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে ,অখন্ড বাংলায় , বাঙালি মুসলমানের জীবন- জীবিকা, যাপন– সবকিছুকেই একটা বিশেষ রকমের ধারায় প্রবাহিত করবার প্রচেষ্টা বিশ শতকের প্রায় সূচনা পর্ব থেকেই কিছু সংখ্যক মুসলমানের মধ্যে দেখা গিয়েছিল। এটা কিন্তু সামগ্রিকভাবে বাংলার মুসলমান সমাজের চিত্র নয়। বাঙালি মুসলমানের যে অবিকৃত রূপ ,যে অখন্ড রূপ, যে নিরাভরণ রূপ -সুস্পষ্ট ভাবে মুসলমান সমাজ, সার্বিকভাবে বাঙালি সমাজের কাছে তুলে ধরবার যে প্রয়োজনীয়তা , একটা যুগের প্রয়োজনীয়তা হিসেবে তখন ধীরে ধীরে উঠে আসতে শুরু করে , মুসলিম সাহিত্য সমাজ সেই চাহিদাটাই পূরণ করেছিল।
মোস্তফা কামাল থেকে ডিরোজিও –এঁরা ছিলেন মুসলিম সাহিত্য সমাজের চিন্তা চেতনার অন্যতম প্রধান প্রেরণা। রবীন্দ্রনাথ(১৮৬১- ১৯৪১) , নজরুল(১৮৯৯- ১৯৭৬) থেকে প্রমথ চৌধুরীও (১৮৬৮- ১৯৪৬) ছিলেন এদের প্রেরণার অন্যতম বিশেষ রকমের কেন্দ্র বিন্দু হিসেবে। তাছাড়াও তাঁরা রামমোহন ( ১৭৭২- ১৮৩৩) হযরত মুহাম্মদ( ৫৭০- ৬৩২) , শেখ সাদী (১১৭৫- ১২৯২), গ্যেটে( ১৭৪৯- ১৮৩২) রোমাঁ রোলাঁ( ১৮৬৬- ১৯৪৪) প্রমূখ মনীষীদের চিন্তা চেতনাকে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারনের বিশেষ রকমের গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।
কাজী আবদুল ওদুদের এই লেখাটির থেকে খুব পরিষ্কার হয়ে ওঠে ,মুসলিম সাহিত্য সমাজ এবং তাঁদের মুখপাত্র ‘শিখা’ র মূল আদর্শের দিকটি।ওদুদ লিখছেন;” মুস্তাফা কামালের সত্যকার অনুরাগী ভারতীয় মুসলমানদের ভিতরে তেমন বেশি হয়তো নেই অন্তত ‘আলেম ‘- সম্প্রদায়ের নেতা ও সম্পাদক সম্প্রদায়ের কথাবার্তা শুনে তাই মনে হয় তবে তরুণ মুসলিম কামালের কর্ম প্রচেষ্টার অর্থ পুরোপুরি না বুঝেও মোটের উপর হয়তো শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে তার পানে চেয়ে আছেন বাংলাদেশে এই দল নিজেদের আদর্শের নাম দিয়েছেন বুদ্ধির মুক্তি”( পথ ও পাথেয়- সমাজ ও সাহিত্য নামক ওদুদের মূল গ্রন্থে সঙ্কলিত[ মোসলেম পাবলিশিং হাউজ, ১৩৪১] পৃ-৩৮)।
এই প্রবন্ধে ওদুদ বলছেন ; “বুদ্ধির মুক্তির আদর্শ নিশ্চয়ই খুব সহজসাধ্য আদর্শ নয়। তবে মানুষের সাধনা দিন দিন কঠিনতর হচ্ছে। আর এতেই তার আনন্দ ।তাই ভয় পাবার কিছু নেই। আজ হয়তো মুসলমানদের পক্ষে প্রয়োজন একান্ত করে ভাবা কোনটির কি ফল ।তারই সঙ্গে ইনফিউরিটি কমপ্লেক্সের স্থানে জীবনে আনন্দ ও শ্রদ্ধা এবং মানুষের অসীম সম্ভাবনায় বিশ্বাস , তার পক্ষে যদি সত্য হয়, তবে সেটি হবে তার পক্ষে , জগত বা বৃহত্তর দেশের পক্ষে যে এক দৈব অনুকম্পা। তাহলে আজকের এই পতিত ভারতীয় বা বাঙালি মুসলমানই হবে অন্তত তার নিজের দেশের জন্য কল্যাণের সিংহদ্বার।”( ঐ) ।
অবাক লাগে আজ থেকে ১০০ বছর আগে জাতীয় আন্দোলনের বিভিন্ন ধারা যখন ক্রমশ সাম্রাজ্যবাদের বুকে কাঁপন জাগাচ্ছে, তখন ব্রিটিশ একদিকে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে বিভাজনের অক্ষরেখাটিকে স্পষ্ট করে তুলছে।এভাবেই তাদের শাসন যন্ত্র কে চিরস্থায়ী করবার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আর অপরদিকে বাঙালি মুসলমানের মধ্যেকার একটা অংশ, যাঁরা ফরাসি বিপ্লবের চিন্তা চেতনা, মুস্তাফা কামালের চিন্তা চেতনা, রবীন্দ্রনাথ -নজরুলের দৃষ্টিভঙ্গিকে পাথেয় করে ,মুসলমান সমাজের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে , বুদ্ধির মুক্তি কে প্রসারিত করবার জন্য আত্মনিয়োগ করছেন। পাশ্চাত্যের শিক্ষা অনেক পরে মুসলমান সমাজের ভেতরে প্রবেশ করতে থাকলেও, এই শিক্ষা কেবলমাত্র অর্থ উপার্জন আর চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ফলপ্রসু হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার যে মহৎ ভূমিকা ,তা কতখানি বাঙালি সমাজের মধ্যে ,বিশেষ করে মুসলমান সমাজের মধ্যে প্রসারিত হচ্ছে– এই প্রশ্ন কিন্তু বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অগ্রগতির পথিকেরা তুলেছিলেন। সেই সময় দাঁড়িয়ে শিক্ষার মহৎ ভূমিকা বাঙালি মুসলমানের মধ্যে সেভাবে প্রসারিত হচ্ছে না- এ কথা জোর গলায় বলবার সাহস দেখিয়েছিলেন বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের প্রধান ঋত্বিকেরা ।ইংরেজি শিক্ষা যে বাঙালি মুসলমানের মধ্যে কেবলমাত্র চাকরি পাওয়ার ,অর্থ উপার্জনের একটা হাতিয়ার হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে, জ্ঞানার্জনের মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেনি, আজ থেকে ১০০ বছর আগে, এই কথা জোড়ের সঙ্গে এই বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিত্বরা বলেছিলেন ।
কাজী মোতাহার হোসেন চৌধুরী লিখছেন ;” শিক্ষার দুটি আদর্শ আছে….. একটি প্রয়োজনের ।আরেকটি অপ্রয়োজনের।প্রথমটির ক্ষুদ্র আদর্শ , কেননা অর্থ সমৃদ্ধির দ্বারা সুখ-স্বাচ্ছন্দ বৃদ্ধি উন্মুক্ত করে দেওয়াই তার কার্য। আমার মনে হয় প্রথম আদর্শটি সামনে রেখেই আমরা শিক্ষা ক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছিলাম তাই বৃহৎ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন চিন্তাশীল মানুষ আজ আমাদের সমাজে দেখতেই পাওয়া যায় না।( মুসলিম সাহিত্য সমাজের পঞ্চম বর্ষে, পঞ্চম সাধারণ অধিবেশনে পঠিত হয় ১৯৩১ সালের ১৮ ই জানুয়ারি। মৌলবী আলি নূর এটি পড়েছিলেন)।
মুসলিম সাহিত্য সমাজ বা তার মুখপাত্র শিখা খুব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সমসাময়িক কালের নানা রাজনৈতিক আবর্তন ,সামাজিক পরিপ্রশ্ন ,তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, সেই সময়ে এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রতিবন্ধকতা ছিল। যতদিন পর্যন্ত খাতায়-কলমে এই আন্দোলন বিদ্যমান ছিল ,ততদিন পর্যন্ত সমাজের রক্ষণশীল অংশ ,সম্প্রদায়িক অংশ, মৌলবাদী অংশ, ধর্মনিরপেক্ষ -সম্প্রীতির চেতনায় বিশ্বাসী, আধুনিকতার পরিপন্থীরা ,মুক্তবুদ্ধির উপাসকদের এই আন্দোলনকে বিধ্বস্ত করতে চেষ্টা কসুর করেনি।
মুসলমান সমাজের ভেতরেও ধর্মের রাজনৈতিক ব্যাখ্যাকারীরা এই আন্দোলনকে কমজোরী করবার চেষ্টা করে। এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত মানুষজনেরাই যে নাস্তিক ছিলেন , তা নয় ।কাজী আব্দুল ওদুদ একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন। পবিত্র কোরআন গ্রন্থের অসাধারণ বঙ্গানুবাদ তিনি করেছিলেন। কিন্তু তিনি কোনও অবস্থাতেই ধর্মান্ধ ছিলেন না ।ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের পক্ষপাতি ছিলেন না। সম্প্রীতিতে বিশ্বাস করতেন ।একই কথা প্রযোজ্য কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল হোসেন আবুল ফজল প্রমুখ ব্যক্তিত্বদের সম্পর্কেও।
মুক্ত বুদ্ধির মানুষদের হেনস্থা করতে ,সেই সময়ের হিন্দু- মুসলমান উভয় সমাজেরই সাম্প্রদায়িক শিবির ,মৌলবাদী শিবির কম চেষ্টা করেনি। নানা রকম ভাবে তাদের সমস্যার মধ্যে ফেলা হয়েছে ।তাদের বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহীতার অভিযোগ আনা হয়েছে। এমনকি কারো কারো প্রাণহানির পর্যন্ত আশঙ্কা দেখা দিয়েছে ।ধর্মশ্রিত সামাজিক বিচারের মধ্যে দিয়ে , তাঁদেরকে হেনস্থা করবার বহু রকমের চেষ্টা করা হয়েছে ।
তবু এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিত্বেরা কখনো কোনও অবস্থাতেই কোনওরকম চাপের কাছে মাথা নত করেননি। উন্নত মেরুদন্ড নিয়ে, বুদ্ধির মুক্তির পক্ষে, তাঁরা নিজেদের চিন্তা চেতনাকে প্রসারিত করে গেছেন। সামাজিক ভ্রুকুটির তোয়াক্কা না করা এই মানুষজনেরা সেদিন কি ধরনের সামাজিক বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন তা আজ হয়তো আমরা একুশ শতকের এই প্রেক্ষিতে সঠিকভাবে উপলব্ধি করে উঠতে পারব না। বিশ শতকের বাংলার, বিশেষ করে তদানীন্তন পূর্ব বাংলার সামাজিক প্রেক্ষিতের দিকে যদি আমরা লক্ষ্য রাখি , বেগম রোকেয়ার মত মানুষ, স্ত্রী শিক্ষা বিস্তারে যে ভূমিকা পালন করতে গিয়ে প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে গিয়েছেন , তাঁর পূর্বসূরী ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী যে লড়াই করে গেছেন ,তার প্রেক্ষিতে আমাদের সার্বিকভাবে মুসলিম সাহিত্য সমাজের গোটা কার্যক্রমকে বিচার করা দরকার।
মুসলিম সাহিত্য সমাজ খুব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। শিখা পত্রিকায় খুব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কিন্তু সামান্য সময়ের মধ্যে দিয়ে বাংলার সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন তাঁরা পালন করে গিয়েছন, তার প্রেক্ষিতে মুসলিম সাহিত্য সমাজের গোটা কার্যক্রমকে অন্নদাশঙ্কর রায়,’ বাংলার দ্বিতীয় জাগরণ ‘ বলে অভিহিত করেছেন।
বস্তুত উনিশ শতকের নবজাগরণের যে বুদ্ধিদীপ্ত বিভাসা , তাকে বাঙালি সমাজে, বিশেষ করে বাঙালি মুসলমান সমাজে, সময়ের প্রেক্ষিতে গ্রন্থিত করবার কাজে, মুসলিম সাহিত্য সমাজ যে ভূমিকা পালন করেছিল , তার রেশ ই কিন্তু ‘ ৪৭ উত্তর, তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে, মুসলিম জাতীয়তার নাম করে যে ধর্মান্ধ এবং ধর্মাশ্রিত রাজনীতি ,তার বিরুদ্ধে মাতৃভাষার দাবিকে কেন্দ্র করে ভাষা আন্দোলনের সূচনা করেছিল ১৯৫২ সালে। মুসলিম জাতীয়তার নাম করে, বাঙালিকে হিন্দু মুসলমান কে বিভাজিত করবার যে ইসলামী য় , মৌলবাদী চক্রান্ত ,তাকে প্রতিহত করতে এই সময় যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সূচনা হয়, তার মূল কিন্তু নিহিত আছে এই মুসলিম সাহিত্য সমাজ ,শিখা গোষ্ঠীর ঐতিহাসিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ।
আর সেই চিন্তা চেতনা ই পরবর্তীকালে হানাদার পাক বাহিনীকে বহু রক্তের বিনিময়ে বিতাড়িত করে ,বহু নারীর সম্ভ্রমের বিনিময় বিতাড়িত করে, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিল।
এপার বাংলার ক্ষেত্রে আজ যখন নতুন করে ধর্মাশ্রিত রাজনীতি মানুষের সঙ্গে মানুষের মধ্যে একটা বড় রকমের বিভাজনের প্রাচীর নির্মাণ করছে ।মানুষকে খেপিয়ে দিচ্ছে মানুষের বিরুদ্ধে ।ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে মানুষকে আলাদা করছে।তখন বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের যে মর্মকথা ,তা এই অন্ধকারের ঘূর্ণাবর্তে, আমাদের নতুন করে আলোর দিশা দেখাবে। হিন্দু মুসলমানের সম্প্রীতি ই কেবল নয়। পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে আরো বেঁধে বেঁধে থাকার , আরও নিবিড়ভাবে আত্মার আত্মীয় হয়ে থাকবার যে ধ্বনি সেদিন উচ্চারিত হয়েছিল আজ থেকে ১০০ বছর আগে এই বাংলার বুকে , তার সম্যক চর্চার ভেতর দিয়ে।এই চর্চায় একদিকে যেমন আমরা নিজেদের বুদ্ধিকে মুক্ত করতে পারব। চেতনাকে সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে তুলতে পারব। তেমনি ই অপরদিকে সার্বিকভাবে হিন্দু- মুসলমান নির্বিশেষে ,আমরা, আমাদের ঐতিহ্যের মূল থেকে শতফুল ফোটাবার অঙ্গীকার করতে পারব।