যে ভাষাতে স্বপ্ন দেখি
ব্যাপ্তি রায়
আমার বাড়ির পূবে,
যেখানে আমার কৃষ্ণচূড়া গাছটা আকাশ দেখে…
আজ থেকে কয়েক বছর আগেও দুই বাংলার মানুষ পরস্পরকে এভাবেই দেখত। একই বাড়ির দুই অংশ, মাঝখানে বেড়া, হোক না তা কাঁটাতারের। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর যখন পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের ওপর, তারা মেনে নিতে পারেনি। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিল লক্ষ লক্ষ মানুষ, নেতৃত্ব দিয়েছিল ছাত্রযুবরা। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি চালিয়েছিল পাকিস্তান সরকারের পুলিশ। ভাষার জন্য শহীদ হন অন্তত আটজন। এই আন্দোলনের তীব্রতা ও যন্ত্রণা, বাঙালি জনমানসে যে প্রভাব রেখে গেছিল তা ফুটে উঠেছে দুই বাংলার শিল্পে সাহিত্যে গানে কবিতায়। এই আন্দোলন যে আগুন জ্বালিয়েছিল, সেই স্ফুলিঙ্গ দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। আত্মপ্রকাশ করে এক নতুন দেশ— বাংলাদেশ। সেসময় প্রতিবেশী ভারতও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। তারপর বহুদিন পর্যন্ত দুই বাংলার মধ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প- সাহিত্য -সংস্কৃতির আদানপ্রদান হয়েছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। তারপর, গত কয়েক বছর থেকে বাংলাদেশে বাড়তে থাকল ধর্মীয় মৌলবাদ। ধর্মের পরিচয় আড়াল করে দাঁড়াল ভাষার পরিচয়কে । আজকের বাংলাদেশে সংখ্যালঘু বাঙালি খুন হয়, সংখ্যালঘু শিল্পী দেশ ছাড়তে বাধ্য হন, মুক্তচিন্তা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র ছায়ানট আক্রান্ত হয়। আজকের বাংলাদেশে লাঞ্ছিত ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। তবুও একুশে ফেব্রুয়ারি মনে করিয়ে দেয়, বাংলাই একমাত্র ভাষা, যার জন্য রক্ত ঝরেছিল।
তবে শুধু বাংলাদেশ নয়, বাংলা ভাষার জন্য আমাদের ভারতেই আরও একাধিক আন্দোলন হয়েছিল। প্রথমটি পুরুলিয়ার বঙ্গভুক্তি আন্দোলন। দেশভাগের সময় যে মানভূম অঞ্চল বিহারের অন্তর্ভুক্ত হয় তার অধিকাংশ মানুষই ছিলেন বাংলাভাষী তাদের ভাষা ছিল বাংলার ঝাড়খন্ডি উপভাষা বা মানভূম ভাষা, তারা হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়াকে মেনে নিতে পারেননি। পূর্ববঙ্গের ভাষা আন্দোলনের প্রায় সাথে সাথেই ১৯৪৮ সাল নাগাদ পুরুলিয়ার বঙ্গভুক্তি আন্দোলনের শুরু। অহিংস সত্যাগ্রহে সামিল হয়েছিল মানভূমের বাঙালি। টুসু গানে লেখা হয়েছিল,
“বাংলা ভাষা প্রাণের ভাষা রে, তোরা রুখবি আজি কি তারে।”
এই আন্দোলনের ফলে ১৯৫৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয় পুরুলিয়া জেলা।
আর দ্বিতীয়টি ১৯৬০ সালে আসামের বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন। যেখানে অসমীয়াকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করার প্রতিবাদে আন্দোলনে নামেন আসামের বাঙালিরা। পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ১১ জন। কিন্তু এখানেও শেষ পর্যন্ত প্রাণের বিনিময়ে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি ছিনিয়ে আনতে পেরেছিল বাংলাভাষী মানুষ।
এই উপমহাদেশে বহু ভাষার সহাবস্থান, বহু ভাষা আন্দোলনের ঐতিহ্যে গৌরবময় এর ইতিহাস। কিন্তু এখন, ভাষা হয়ে উঠেছে বৈষম্যের হাতিয়ার। ভাষার ভিত্তিতে মানুষকে ভাগ করা হচ্ছে, ঠিক যেভাবে করা হয়েছে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা জাতির ভিত্তিতে। যে ভাষা বারবার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছে, তাকে ব্যবহার করেই মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে ইন্ধন জোগাচ্ছে বর্তমান কেন্দ্রীয় শাসকদলের এক দেশ- এক ভাষা তত্ত্ব। হিন্দি ভাষাকে ভারতের একমাত্র ভাষা প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগেছে এক শ্রেণির মানুষ। তারা ভুলে যাচ্ছে, বহু ভাষা ভারতবর্ষের অন্যতম পরিচয়। এর ফলে সৃষ্টি হচ্ছে এক বিপরীত প্রতিক্রিয়ার। প্রতিটি রাজ্যের মানুষ নিজের ভাষাকে নিয়ে অতি সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। নিজের ভাষা ছাড়া কোনো ভাষাকেই তারা স্থান দিতে রাজি নয়। ফলে প্রতিটি রাজ্যেই ভাষার ভিত্তিতে আক্রমণ, সেখানকার আঞ্চলিক ভাষা না জানায় নিগ্রহের ঘটনা উঠে আসছে বারবার। আর পশ্চিমবঙ্গে, যেখানে মানুষ সাধারণভাবে সমস্ত ভাষার প্রতি সহনশীল বলে পরিচিত, সেখানে বাংলা ভাষার ওপরেই নেমে আসছে আক্রমণ। এই বাংলাতেই বাংলা বলার জন্য বা হিন্দি না জানার জন্য ‘বাংলাদেশী’ তকমা দেওয়া হয়েছে বাঙালিকে। আর বাংলার বাইরে অবস্থা আরও শোচনীয়। বাংলাদেশী সন্দেহে নিগৃহীত , এমনকি খুন পর্যন্ত হয়েছেন এ রাজ্যের মানুষ, যার শিকার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শ্রমিকেরা। একেবারে সাম্প্রতিক সময়ে দেরাদুনে ত্রিপুরার ছাত্র এঞ্জেল চাকমার হত্যার ঘটনা এই বৈষম্য ও হিংসার ছবিটাকে আরও স্পষ্ট করে দেয়। তার অপরাধ ছিল, সে উত্তর পূর্ব ভারতের বাসিন্দা, তাকে নাকি ঠিক ‘ভারতীয়দের মতো দেখতে নয়’, অতএব সে ‘চাইনিজ’। ভারতীয় হওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট চেহারা, নির্দিষ্ট ভাষা বা ধর্ম থাকা প্রয়োজন, একথা সংবিধানে কোথাও লেখা আছে কি? এরকম অজস্র ঘটনা বারবার সাধারণ ভাষার অধিকার, দেশের যে কোনো স্থানে ভ্রমণ করার সাংবিধানিক অধিকারকে প্রশ্ন চিহ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। আমার দেশেই আমি নিরাপদ নই? আমার দেশেই আমায় নিজের ভাষা বলতে ভয় পেতে হবে? এ অবস্থায় খুব স্বাভাবিকভাবেই বলতে ইচ্ছে হয়, ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’। কিন্তু না, এ আমারই দেশ। এই ভাষা আন্দোলনের ঐতিহ্যবাহী উপমহাদেশ আমার জন্মভূমি। এই ঐতিহ্যের ওপর যারা আক্রমণ নামিয়ে আনছে, তাদের প্রতিরোধ করা আমাদের দায়িত্ব। আমাদের জানতে হবে নিজেদের সাংবিধানিক অধিকার,ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে হবে ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে। এর জন্য আমাদের সবার আগে নিজেদের ভাষা নিয়ে ছোট ছোট হীনমন্যতাকে কাটিয়ে উঠতে হবে। “বাংলাটা ঠিক আসে না” নিয়ে গর্ব করলে চলবে না। ঐতিহাসিকভাবে, ভাষা বেঁচে থাকে সময়ের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে, অন্য ভাষার শব্দকে আপন করে নিয়ে। যে ভাষা সময়ের সাথে বদলায় না, সে একদিন বিলুপ্ত হয়ে যায়। তাই ভাষাকে নিয়মের শেকলে বেঁধে রাখার চেষ্টা বৃথা। কিন্তু তা বলে ভাষার নিজস্বতা হারিয়ে ফেললে চলবে না। নিজের ভাষার প্রতি দায়বদ্ধতা আর অন্য ভাষার প্রতি সহিষ্ণুতা থাকলেই আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবে ভাষা আন্দোলনের চেতনা।