সুচিত্রা মিত্র : এক আপোষহীন মানুষ

রবীন্দ্রনাথের গানের কেবল বাণী নয়। তাঁর গানের প্রতিটি অক্ষর, কোথায় কিভাবে শুদ্ধ স্বর নিক্ষেপে , নিবেদন করে, রবীন্দ্রনাথ কি বলতে চেয়েছেন , ওই গানটির ভেতর দিয়ে — সেটাকে সকলের সামনে তুলে ধরার সাধনার প্রশ্নে — আমৃত্যু সুচিত্রা ছিলেন আপসহীন। একটু উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

সুচিত্রা মিত্র ছিলেন একজন পরিপূর্ণ শিল্পী। নিছক রবীন্দ্র গানের একজন সার্থক পারফর্মার নন। রবীন্দ্রনাথকে, তাঁর সুরের ধারাকে তিনি সমাজ বদলের স্বপ্নের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন ।রবীন্দ্রনাথের গান করা , রবীন্দ্রনাথের গান শেখানো– এই বিষয়গুলি সুচিত্রা মিত্রের কাছে নিছক আর দশটা পেশার মতো ,একটা পেশা ছিল না। গোটা বিষয়টা তাঁর কাছে ছিল; রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নের শোষণহীন সমাজ গঠনের একটা অস্ত্র ।যে অস্ত্রে কখনো রক্তের দাগ লাগেনা ।যে অস্ত্র কখনো মানুষে -মানুষে বিভাজন ঘটায় না। যে অস্ত্র কখনো দেশভাগ করে না ।যে অস্ত্র কখনো মানুষ হত্যা করে না।

রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় বহু মানুষ সার্থকভাবে তাঁর গান গেয়েছেন। তাঁর জীবনাবসানের পরেও বহু মানুষ সার্থকভাবে তাঁর গানকে তুলে ধরেছেন। আগামী দিনেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে ।কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে ,গানের ভিতর দিয়ে আবিষ্কার করবার যে চাবিকাঠি সুচিত্রার হাতে ছিল, যে চাবিকাঠি দিয়ে তিনি রবীন্দ্রভুবনের একটি বিশেষ দিকের তালা খুলতে সক্ষম হয়েছিলেন ।তেমনটা কিন্তু খুব বেশি মানুষের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায় না। পরিশুদ্ধভাবে রবীন্দ্রনাথকে উপস্থাপন করা , তাঁর বাণী এবং সুরের মেলবন্ধনে যন্ত্রনুসঙ্গকে, রবীন্দ্রনাথের মন মানসিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উপস্থাপিত করা। এমন কাজে বহু শিল্পী সফল হয়েছেন। আবার অনেকে রবীন্দ্র গানে ,যন্ত্রকে এমন ভাবে ব্যবহার করেছেন, যা শ্রোতার কাছে যন্ত্রনা হয়ে দেখা দিয়েছে। এখানেই ছিলেন সুচিত্রা একজন সার্থক নামা শিল্পী ।নিছক কোনও পরিবেশক নন।

সুর এবং বাণীর সামঞ্জস্য বিধানের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের যে দৃষ্টিভঙ্গি, যার সার্বিক পরিচয় আমরা, তাঁর ,’সঙ্গীতচিন্তা’ গ্রন্থের মধ্যে পাই। তাকে সার্থক করে তোলবার ক্ষেত্রে, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সুচিত্রার সাধনার বিধান ছিল না। সুচিত্রার রবীন্দ্রমন্ত্র উচ্চারণ ,তাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করলেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত চিন্তা সম্যকভাবে শ্রোতার হৃদয়ে স্থাপিত হয়ে যাবে। চলতি কথায় যাকে বলে , খোদার উপর খোদকারী, অর্থাৎ; স্রষ্টার উপরে নিজস্ব এক্সপেরিমেন্ট, সুচিত্রা, তাঁর দীর্ঘজীবনে রবীন্দ্রনাথ ঘিরে এক মুহূর্তের জন্যেও তা করেন নি। রবীন্দ্রনাথকে মুর্ত করে তোলবার নাম করে, সুরের বিকৃতি, উচ্চারণের বিকৃতি যন্ত্র –এগুলি ছিল সুচিত্রার কাছে অত্যন্ত ঘৃণার বিষয়। তিনি বারবার রবীন্দ্রনাথের গান গাইবার আগে বলতেন ; গানটিকে বার বার পড়ে , সেটিকে আত্মস্থ করার কথা। রবীন্দ্রনাথ ওই গানটির মধ্যে দিয়ে কি বলতে চেয়েছেন , নানা দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সেটাকে বোঝবার চেষ্টা– রবীন্দ্রনাথের গান গাইবার আগে , সেটাকে নিজে যেমন তিনি চিরদিন অভ্যাস করেছেন।ঠিক তেমনি ভাবেই , তাঁর প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীকে , রবীন্দ্রনাথকে ,তাঁর গানের ভেতর দিয়ে বোঝবার, জানবার , চেনবার অনুভূতি তিনি সঞ্চারিত করে গিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের গানের কেবল বাণী নয়। তাঁর গানের প্রতিটি অক্ষর, কোথায় কিভাবে শুদ্ধ স্বর নিক্ষেপে , নিবেদন করে, রবীন্দ্রনাথ কি বলতে চেয়েছেন , ওই গানটির ভেতর দিয়ে — সেটাকে সকলের সামনে তুলে ধরার সাধনার প্রশ্নে — আমৃত্যু সুচিত্রা ছিলেন আপসহীন। একটু উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

রবীন্দ্রনাথের ;’ আমার যাবার বেলাতে তোরা সব জয়ধ্বনি কর’, এই গানের শেষ লগ্নে,’ যাত্রা যখন হবে সারা ,উঠবে জ্বলে সন্ধ্যা তারা’, এই অংশটি উচ্চারণের ক্ষেত্রে সুচিত্রা কিন্তু চিরদিন’ সন্ধ্যা ‘ উচ্চারণ করে গিয়েছেন। ‘সোন্ধ্যা’ বলেননি। একটা অক্ষরের একার ,ওকার- তার ব্যবহার এবং ব্যবহার না করা ,তার মধ্যে দিয়ে রবীন্দ্রনাথের মন্ত্রের সম্পুর্ণ উপলব্ধির কিভাবে অদল বদল ঘটে যেতে পারে –সেই ক্ষেত্রটি একেবারে প্রায় বলতে গেলে, চোখে আঙুল দিয়ে তিনি চিরদিন দেখিয়ে গিয়েছেন।

সুচিত্রা কখনো ,’আকাশ ‘ভওরা’ , এমন উচ্চারণ করেন নি।আকাশকে তিনি ‘ভরিয়ে’ দিয়ে গেছেন ।’ভওরিয়ে ‘ নয়। জনপ্রিয়তা অর্জনের তাগিদে কোনও কোনও জনপ্রিয় গায়ক, রবীন্দ্রনাথের গানের শব্দ উচ্চারণ করার ক্ষেত্রে , এরকম একার -ওকার নিজের খেয়াল খুশির মতন বসাতে সচেষ্ট থেকেছেন। স্ব সুরারোপিত, স্বশব্দ সংযুক্ত রবীন্দ্রনাথকে উপস্থাপিত করতে চেষ্টা করেছেন।সৃষ্টি বনাম স্রষ্টার –এই সংঘাতে হাঁটবার চেষ্টা সুচিত্রা , তাঁর দীর্ঘজীবনে, ভুলেও একটি বারের জন্যও করেননি।

একটি ব্যক্তি অভিজ্ঞতা এই প্রসঙ্গে উপস্থাপিত করছি ।নিবন্ধকারকে, সুচিত্রা ‘তুই ‘ বলেই সব সময় সম্মোধিত করতেন। কিন্তু তিনি যদি নিবন্ধকারের উপরে, রবীন্দ্রনাথকে পরিবেশন ঘিরে , কখনো বিরক্ত হতেন ।রেগে যেতেন। ‘ তুই’ তখন ‘তুমি’ হয়েযেত। তখন যেন সেই সুচিত্রা, নিবন্ধকারের থেকে অনেক দূরের মানুষ।

এমন একটি অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে ।’কর্ণ কুন্তী সংবাদ ‘ এর মহলাতে , তাঁর সঙ্গে , উচ্চারণের ক্ষেত্রে, উচ্চারণ বিধির বিভিন্ন অভিধান প্রসূত ,বিশেষ করে, বাংলাদেশে উচ্চারণের আঙ্গিক অনুযায়ী, নিবন্ধকার উচ্চারণ করেছিলেন ,’ আহ্বান’ শব্দটি ‘আহবান’ বলে। সুচিত্রার বিরক্তি মাখা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল ;

তোমার এত পাকামো মারার দরকার নেই। ওটা তুমি ,আমি যেমন বলছি ; ‘আওবান’ ই উচ্চারণ করো।

তখন কিন্তু তাঁর নিবন্ধকারের উপর কোনওরকম ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টি নয়। তখন তিনি রবীন্দ্র মন্ত্র উচ্চারণের এক চিরপ্রণম্য সাধিকা। চিরপ্রণম্য অগ্নি।
সুচিত্রা এমনই একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যাঁর মধ্যে কখনো কোনও রকম ভনিতা ছিল না। এই ভনিতাহীন স্পষ্টবাদিতার জন্য তাঁকে গোটা জীবন ধরে কম শত্রুর মোকাবিলা করতে হয়নি।

তাঁর জীবনের অন্তিম পর্বে তাঁর স্পষ্টবাদীতার জন্য ব্রাত্য বসুর মত লোক , নিজের লেখা একটা নাটকে , সুচিত্রা চরিত্রের অপ মূল্যায়ন ,অবমূল্যায়ন করেছিলেন। সেই নাটকের লেখকের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটিবারের জন্যও গবেষণার যে চলতি, ধারা , অর্থাৎ; ভেরিফিকেশন এবং ক্রস ভেরিফিকেশন– সেসব কোনটার মধ্যেই সে যায় নি।

সুচিত্রা যেহেতু কমিউনিস্ট, সুচিত্রা যেহেতু অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সময়কাল থেকেই ,পার্টির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং পরবর্তীকালে মতাদর্শগত ক্ষেত্রে সিপিআই(এমে) র যে রাজনৈতিক অবস্থান ,তার সঙ্গে সহমত। তাই প্রত্যক্ষভাবে কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য না হয়েও ব্রাত্য বসুর মতো কমিউনিস্ট বিদ্বেষীদের কাছে, সুচিত্রা হয়ে উঠেছিলেন ,আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। আজীবন কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রতি যিনি ছিলেন ক্লান্তিহীন যোদ্ধা, সেই দেবব্রত বিশ্বাসের জীবন কাহিনী ভিত্তিক নাটক লিখতে গিয়ে, কমিউনিস্টদের আক্রমণ। আর তাই ব্রাত্য বসুর কাছে সুচিত্রা হয়ে উঠেছিলেন আক্রমণের কেন্দ্রস্থল ।সিপিআই(এম ) কে আক্রমণ। সেই দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা ব্রাত্য বসুর নাটকে , সুচিত্রা হয়ে উঠেছিলেন; সমস্ত ধরনের প্রতিক্রিয়াশীলদের আক্রমণের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।

জীবনের প্রায় শেষ অধ্যায় এসে, এই ধরনের রুচিহীনতা দেখতে হয় সুচিত্রাকে। কিন্তু সুচিত্রার রুচি এতটাই উন্নত মানের ছিল যে ,এই রুচিহীনতা ঘিরে কোনওরকম কথা বলতেও তিনি ঘৃণা বোধ করতেন । যে মানুষটি পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু, কেরালায় ই এম এস নাম্বুদ্রিপাদের সরকারকে অবৈধভাবে খারিজ করে , পরের দিন কলকাতায় যখন আসেন , সেদিন সুচিত্রার ছিল রেডিওতে লাইভ ব্রডকাস্টিং। সেখানে তিনি বাল্মিকী প্রতিভা একটি অংশ( কাজের বেলায় উনি কোথা যে ভাগেন, ভাগের বেলায় আসেন আগে আরে দাদা) গেয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাষাতেই , পন্ডিত নেহরুর অগণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিবাদ করেছিলেন। এমন প্রতিবাদের জেরে ভারত সরকার, দীর্ঘদিন সুচিত্রার কোনও গান বা তাঁর রেকর্ডিং, সরকার নিয়ন্ত্রিত তৎকালীন একমাত্র গণমাধ্যম ,আকাশবাণীতে প্রচারিত হতে দেয়নি।

জীবন উপান্তে ব্রাত্য বসুর মত লোকের রুচিহীন আক্রমণকে এতোটুকু উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি সেই সুচিত্রা।সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছিলেন এই রুচিহীনতাকে।দুর্ভাগ্যের বিষয় সেদিন দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের মত যে সমস্ত মানুষরা দীর্ঘদিন ধরে সুচিত্রাকে জেনেছেন। চিনেছেন। তাঁরা রাজনৈতিক শিবির বদলের তাগিদে একটাও শব্দ উচ্চারণ করেননি। সুচিত্রা দুঃখ পেয়েছিলেন। যন্ত্রণা পেয়েছিলেন ।কিন্তু তাঁর মনে হয়েছিল; জীবনের শেষ পর্বে এসে, তাঁর গোটা জীবনের পথ চলাতে কোনও ত্রুটি নেই বলেই , তাঁকে এই অনৈতিহাসিক, অনৈতিক রুচিহীন আক্রমণের সম্মুখীন হতে হয়েছে।,

সুচিত্রা কন্ঠে রবীন্দ্র মন্ত্র উচ্চারণে, অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল গ্রেস নোটের ব্যবহার। খালেদ চৌধুরী সুচিত্রার গায়ন ঘিরে এই গ্রেস নোটের ব্যবহার নিয়ে ছিলেন গুণমুগ্ধ ।বস্তুত সুচিত্রা ,যেভাবে রবীন্দ্রনাথের গানে গ্রেস নোটের ব্যবহার করেছেন, তার সমকালে খুব বেশি শিল্পীর কন্ঠে আমরা তেমনটা শুনতে পাইনি। সুচিত্রার সমকালে রবীন্দ্রনাথের গানের একটা ধারা ছিল, যাকে সুচিত্রারই’ কমরেড ‘, কলিম শরাফি বলতেন; মুখে সুপরি পুড়ে গাওয়া। আবার একটা ধারা ছিল যাকে সানজিদা খাতুন বলতেন; চোখ ঢুলু ঢুলু করে একটা বিশেষ ভঙ্গিমায় গাওয়া। এসব কোনও পথ দিয়ে কিন্তু সুচিত্রা একটি বারের জন্যেও হাঁটেন নি।

একদম প্রথম জীবনের যে শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে নিজের জীবনের একাত্মতা অনুভব করেছিলেন সুচিত্রা, সেই একাত্মতা থেকে তাঁকে কোনওদিন কেউ বিযুক্ত করতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথ যে শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন গোটা জীবন ধরে, যার নির্যাস তিনি খোদাই করে গেছেন ‘রক্তকরবী’র মধ্যে। সেই সমাজের স্বপ্নকে সফল করবার চাবিকাঠি হিসেবে সুচিত্রার কাছে ধরা দিয়েছিল ,কমিউনিস্ট পার্টি এবং তার মতাদর্শ। দলীয় সভ্য পদ ঘিরে কোনওদিনও খুব একটা মাথা ব্যথা ছিল না সুচিত্রার। কারণ; তাঁর কথায় , চেনা বামুনের পইতে লাগেনা ।তাই দলীয় সদস্যপদ তাঁর ছিল, কি ছিল না –এসব ঘিরে কোনও দিনও সুচিত্রা কে মাথা ঘামাতে দেখা যায়নি। কমিউনিস্ট পার্টির মতাদর্শ আর রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ,মানুষকে ধনতান্ত্রিক শোষণের হাত থেকে উন্মুক্ত করা — এই ছিল সুচিত্রার কাছে সব থেকে বড় বিষয়। আর এই বিষয়টিকে পরিস্ফুট করবার ক্ষেত্রে তিনি হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রনাথের গান কে।

তাই তিনি যখন রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণৃর অল্প কয়েকদিন পর প্রথম শান্তিনিকেতনে যান ছাত্রী হিসেবে, তখন তাঁর পিঠে ছিল ব্রিটিশ পুলিশের লাঠির দাগ। সেদিনের শান্তিনিকেতনে, সুচিত্রা, অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘নিউ এজ’ লুকিয়ে বিক্রি করতেন ।খুব গর্ব করে বলতেন; ক্ষিতীশ রায়, তাঁকে দেখলেই লাল সেলাম জানাতেন।

‘৪৬ এর দাঙ্গায় কলকাতা জুড়ে শান্তি ফিরিয়ে আনার যে কার্যক্রম কমিউনিস্ট পার্টি করেছিল, তার সাংস্কৃতিক ধারার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন সুচিত্রা। সঙ্গে ছিলেন কলিম শরাফি, খালেদ চৌধুরী, সুরপতি নন্দী ,ভূপতি নন্দী, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, দেবব্রত বিশ্বাস প্রমুখেরা ।সেই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে শম্ভু মিত্র সেই সময় সংযুক্ত ছিলেন ।মহম্মদ জাকারিয়া যুক্ত ছিলেন ।

এই সময় কালে কলকাতার রাজাবাজার অঞ্চলে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য স্থাপনে ট্রাকের উপর দাঁড়িয়ে সুচিত্রা আর কলিমের সমবেত কন্ঠে গান , সুচিত্রার কন্ঠে; সার্থক জনম আমার। আর কলিমের কন্ঠে প্রেম ধবনের সেই বিখ্যাত গান ; শুনহ্ হিন্দ কে রহনে ওয়ালে, তুম শুনো শুনো’, ইতিহাস রচনা করেছিল ।এই কর্মকান্ডের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন শিবিরে থেকেও মানবিক কারণে সংযুক্ত ছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত সাহিত্যিক ।

এই সময়কার স্মৃতিচারণ করে সুচিত্রা বলতেন; ট্রাকের উপরে দাঁড়িয়ে ,জোড় গলায় গান গাইতে গাইতে গলা যখন ধরে যেত। সব আশেপাশের চা বিক্রেতারা , তাঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন শিখ ধর্মাবলম্বী। তাঁরা এগিয়ে দিতেন মালাই চা। সেই চা খেয়ে আবার গলা খুলে আমরা গাইতাম।

সুচিত্রার প্রথম জীবনের এই প্রতিবাদী সত্ত্বা, তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বজায় ছিল। কোনও দিন তিনি কোনও অবস্থাতেই অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করেননি। আর সেজন্য তাঁকে ব্যক্তি জীবনে , সামাজিক জীবনে সর্ব ক্ষেত্রেই বহু ধরনের অন্যায়, বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছিল ।বাইরে থেকে দেখলে বজ্র কঠিন ব্যক্তিত্বের অধিকারী সুচিত্রার জীবনের এসব দুঃখ যন্ত্রণা , তাঁর একান্ত ঘনিষ্ঠ দু একজন মানুষ ছাড়া প্রায় কেউ ই জানে না। সুচিত্রা দুঃখ বিলাসিনী ছিলেন না ।নিজের দুঃখের কথা , যন্ত্রণার কথা , দশ জনকে বলে , তাদের সহানুভূতি আদায় করে , নিজের কার্যসিদ্ধি– সুচিত্রা এইসবকে মন প্রাণ দিয়ে ঘৃণা করতেন ।শুধু তাঁর জীবনের দুঃখ যন্ত্রণার আগুন থেকে ছোট্ট একটি ফুলকি উল্লেখ করেই এই লেখার পরই সমাপ্তি টানা হচ্ছে।

যে ধ্রুব মিত্র , ব্যক্তি সুচিত্রার জীবনকে ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়েছিল, যাকে ঘিরে সুচিত্রা বলতেন ; ধ্রুবর ধর্মে বিশ্বাস ছিল না। গীতায় আস্থা ছিল ।

এই কথার ব্যাখায় না গিয়েও বলতে হয় ; সেই ধ্রুব মিত্র ক্যান্সার আক্রান্ত ।প্রায় কপর্দপহীন ।চিকিৎসার সমস্ত ধরনের ব্যয়ভার কিন্তু বহন করেছিলেন সুচিত্রাই । সুচিত্রাই কিন্তো প্রথম জীবনে একদিন যন্ত্রণায় রাগে ক্ষোভে অভিমানে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন এই ধ্রুব মিত্রের ই জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *