নতুন বছর নতুন ধারায়

SFI-WB

বাদশা দাস

আর সময় নেই বলেই নতুন উদ্যমে, নতুন বছরে ভারতের ছাত্র ফেডারেশন নিজের স্টিয়ারিংকে ক্যাম্পাসমুখী করতে চাইছে। ডাক দেওয়া হয়েছে “স্কুল বাঁচাও,মূল বাঁচাও” এর। নাছোড়বান্দা লড়াই শুরু করা হয়েছে ড্রপ আউটদের স্কুলে ফেরানোর জন্য। নতুন উদ্যমে নতুন বছরে ক্যাম্পাসে ছাত্র সমাজের স্বার্থে ছাত্র ভোটের দাবিকে মজবুত করতে তৈরি হচ্ছে শক্তিশালী ব্লুপ্রিন্ট, ক্যাম্পাসের গেটে লড়াই আন্দোলন সংগ্রামের শপথ নিতে নিজেদের এই কনকনে শীতে নিজেদের মতাদর্শের স্পর্ধা য় সেঁকে নিচ্ছে আগামীরা। কেন্দ্রের নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি যে শিক্ষানীতি দেশের সংবিধানকে অস্বীকার করে, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্তকে অস্বীকার করে, মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসকে অস্বীকার করে, অস্বীকার করে ডারউনবাদকে, তাদের বিরুদ্ধে বৈচিত্র্যর মধ্যে ঐক্যের ভারতবর্ষকে রক্ষা করতে জোট বেঁধেছে এই দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের, স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রকৃত উত্তরসূরিরা।

        ২০২৫ সালের শেষ দিনে এই লেখাটা লিখতে বসেছি।সময়টা অত্যন্ত কঠিন এই বিষয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই কারুর। অথচ, যুগের পর যুগ ধরেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতেই আগামীর সম্ভাবনাগুলো লুকিয়ে থাকে।  অন্ধকারের পথ পেরিয়ে ভোরের আলোর খোঁজে। চার্লস ডিকেন্স এর “A Tale Of Two Cities” এর ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয় “It was the best of times, it was the worst of times”।জেন-জি এর যুগে বৈপ্লবিক ও প্রগতিশীল চেতনা সম্পন্ন বামপন্থী ছাত্র সংগঠন হিসেবে এসএফআই এর ভাবনার ও যে বদল হবে এটাই স্বাভাবিক।

এ বয়সে তাই নেই কোনো সংশয় 

এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে

 সুকান্ত ভট্টাচার্যের লেখা এই বিখ্যাত লাইন একসময়ে গোটা বাংলার ছাত্র-যুব সমাজের হৃদয়ে এক দোলাচল সৃষ্টি করেছিল সমাজ বদলের সন্ধানে। সামনে আদর্শ ছিল সোভিয়েত। কিন্তু সময়ের নিয়মে আজ দিন বদলেছে। যত সময় এগিয়েছে,গোটা দুনিয়াকে গ্রাস করেছে নয়া উদার অর্থনীতি। বেকারত্বর জ্বালা কিংবা কাজ থাকলেও পুঁজিবাদের দাদাগিরিতে চরম নীপিড়নের স্বীকার হয়েছে আজকের ছাত্র-যুবসমাজ।যে ছাত্র-যুবদের লড়াই ছিল “সকলের জন্য শিক্ষা,শিক্ষা শেষে কাজ”, আজ কর্পোরেট দুনিয়া সেই লড়াইয়ের ধারাবাহিকতাকে ক্রমশ বাধা প্রাপ্ত করেছে। যে আট ঘন্টা কাজ, আট ঘন্টা বিনোদন,আট ঘন্টা বিশ্রামের অধিকারের লড়াই জন্ম দিয়েছিল লাল ঝান্ডার, শ্রমিকরা যে অধিকার ছিনিয়ে আনতে পেরেছিল , আজ সেই কাজ ১২ ঘন্টা ছাড়িয়ে ১৩ র পথে। সরকারি কর্মসংস্থানের জায়গা প্রতিদিন সংকুচিত হচ্ছে। প্রতিদিন রাজ্য ও কেন্দ্রের সরকার হাতে হাত মিলিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, সরকারি স্কুল, কলেজ, অফিস তুলে দেওয়ার নকশা তৈরি করেছে সুকৌশলে। আজ প্রতিদিন ছাত্র-যুব সমাজকে “আমাকে আমার মতো থাকতে দাও, নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছি” এই মন্ত্রে মুগ্ধ করতে চাইছে বর্তমান দুনিয়া। প্রতিদিন সুপরিকল্পিতভাবে  সমাজের লড়াই আন্দোলনকে কাজ হারানোর হুঁশিয়ারিতে ভেঙে চুরমার করছে আজকের কর্পোরেট।আর এই স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে কঠিন আপোসহীন অসম লড়াই চালাচ্ছে আজকের ছাত্রসমাজ,আগামীর ভবিষ্যতেরা। স্কুল আছে শিক্ষক নেই, শিক্ষক নেই তাই ছাত্র ও নেই। কলেজ আছে, ক্লাস রুম আছে, কিন্তু ক্লাসে ছাত্র অর্ধেক। নতুন অধ্যাপক এর দেখা পাওয়া তো “সোনার পাথর বাটি” পাওয়ার সমান। কিন্তু, এই গোটা পরিস্থিতিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর জন্য যে পরিবেশ থাকার দরকার ক্যাম্পাসে , তা নেই । অনেক দিন আগেই কেন্দ্র ও রাজ্য হাতে হাত মিলিয়ে শিক্ষাঙ্গনকে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। ইউনিয়ন রুম আছে, কিন্তু ইউনিয়ন নেই। ছাত্র ভোট বন্ধ করে কার্যত, ছাত্রদের ভোটের অধিকারকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। অনেকটা ঠিক বহু বছর আগে সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত চলচ্চিত্র “হীরক রাজার দেশে” র মতো। শিক্ষামন্ত্রী এভাবেই হীরক রাজার নির্দেশে উদয়ন পন্ডিতের পাঠশালা বন্ধ করে দিয়েছিল। একটি পাঁচালী শুনিয়ে, যেখানে বলা হয়েছিল –

জানার কোনো শেষ নাই 

জানার চেষ্টা বৃথা তাই 

শিক্ষালাভে লোকশান 

নাই অর্থ নাই মান

হীরক রাজার বুদ্ধিমান 

করো সবে তার জয়গান…

    তবে বর্তমানে ফারাক একটাই, ওই ছবিতে শুধু রাজা ছিল, কিন্তু বর্তমানে রাজা এবং রানী উভয় ই আছে। তবে ওই ছবিতেও যেমন শেষ অবধি উদয়ন পন্ডিত সহ তার ছাত্রদের, কৃষক এবং শ্রমিকদের জয় হয়েছিল, বর্তমান সময়েও তার ব্যাতিক্রম হবে না। এই বিষয়ে আমাদের আজকের সময়ের ছাত্র আন্দোলনের কর্মীদের কোনো সন্দেহ নেই, কারণ এটা বিজ্ঞান।শোষক যখন মাথা চাড়া দেয়,তখন তার পাল্টা হিসেবে শোষিতরা দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর ঘুরে দাঁড়াবেই।

      আর সময় নেই বলেই নতুন উদ্যমে, নতুন বছরে ভারতের ছাত্র ফেডারেশন নিজের স্টিয়ারিংকে ক্যাম্পাসমুখী করতে চাইছে। ডাক দেওয়া হয়েছে “স্কুল বাঁচাও,মূল বাঁচাও” এর। নাছোড়বান্দা লড়াই শুরু করা হয়েছে ড্রপ আউটদের স্কুলে ফেরানোর জন্য। নতুন উদ্যমে নতুন বছরে ক্যাম্পাসে ছাত্র সমাজের স্বার্থে ছাত্র ভোটের দাবিকে মজবুত করতে তৈরি হচ্ছে শক্তিশালী ব্লুপ্রিন্ট, ক্যাম্পাসের গেটে লড়াই আন্দোলন সংগ্রামের শপথ নিতে নিজেদের এই কনকনে শীতে নিজেদের মতাদর্শের স্পর্ধা য় সেঁকে নিচ্ছে আগামীরা। কেন্দ্রের নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি যে শিক্ষানীতি দেশের সংবিধানকে অস্বীকার করে, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্তকে অস্বীকার করে, মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসকে অস্বীকার করে, অস্বীকার করে ডারউনবাদকে, তাদের বিরুদ্ধে বৈচিত্র্যর মধ্যে ঐক্যের ভারতবর্ষকে রক্ষা করতে জোট বেঁধেছে এই দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের, স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রকৃত উত্তরসূরিরা। একাকিত্বের এই পঁচা গলা সমাজ ব্যবস্থায় তারাই লিখছে বিকল্পের, মিলে মিশে একসাথে বাচবার জয়গান। বিভিন্ন জেলায় সম্মেলনের মধ্যে দিয়ে তৈরি হচ্ছে আগামী ছাত্র আন্দোলনের রুপরেখা। সময়ের নিয়মে অনেক কিছুই পরিবর্তনশীল, সে সমাজ থেকে সংস্কৃতি। কিন্তু আমাদের মতাদর্শ, যে মতাদর্শ সমাজতন্ত্রের কথা বলে, সকলের সমান অধিকারের কথা বলে, মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার কথা বলে, সেই মতাদর্শ যুগ যুগ ধরে বাস্তববাদী, আধুনিক ও সত্য। তাই তো যারা সোভিয়েতের পতনের পর একসময় বলেছিল “End of History”, তারাই আজকে বলতে বাধ্য হচ্ছে “সমাজতন্ত্রই ভবিষ্যত, ভবিষ্যত আমাদের।”

2 thoughts on “নতুন বছর নতুন ধারায়

  1. খুব সুন্দর হয়েছে লেখাটা এক কথায় সাবাঙ্গীক সুন্দর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *