ময়দানের রোজনামচা

চূড়ান্তভাবে কর্পোরেটমুখী হচ্ছে দেশের ফুটবলও আম্বানিদের এফএসডিএল কন্ট্রোল করছে গোটা ভারতীয় ফুটবল, আইএসএল হচ্ছে আম্বানি, সঞ্জীব গোয়েন্কাদের মুনাফা তৈরির লিগ। ফলে ৫০-৬০ কোটি খরচা হচ্ছে টিম পিছু ১৫০-২০০ কোটি মুনাফা করছে কর্পোরেট কোম্পানিগুলো। বন্ধ হচ্ছে ডেমপো, সালগাওকর, চার্চিল ব্রাদার্সের মতো দলগুলি।

“এই ধূলো পায়ে পায়ে আদর দেয়”…

বাংলার ফুটবল মানে নবজাগরণের ফুটবল। ২০০ বছরের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উপকথা হলো বাংলার ফুটবল, ছিন্নমূল মানুষের বাঙালির আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন হলো বাংলার ফুটবল। গ্যালারি জুড়ে আশাবাদের চাষ হোক কিংবা গ্যালারি জুড়ে বর্ণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে আওয়াজ কিংবা এনআরসির বিরুদ্ধে রক্তের বিনিময়ে জমি পাওয়ার ইতিহাসকে স্পর্শ হোক, লড়াইয়ের গ্যালারি, নবজাগরণের গ্যালারি, আশাবাদের গ্যালারি।

শুধু গ্যালারি নয় বাংলার ফুটবলের ঐতিহ্য হলো কলকাতা ফুটবল‌‌ লিগ। যার শুরুয়াত ১৯২৫ সাল থেকে। প্রথম বড়ো ম্যাচ ১৯২৫ সালে। ১-০ গোলে জেতে ইস্টবেঙ্গল, তার পরের খেলায়‌ আবার মোহনবাগান। বাংলার ফুটবলের যে বহমান ইতিহাস অবশ্যই একটা বড়ো‌ অংশ‌ জুড়ে থাকবে বড়ো ম্যাচের ইতিহাস, তিন প্রধানের ইতিহাস তেমনি থাকবে ময়দানের তথাকথিত ছোট ক্লাবগুলোর ইতিহাস। রেলওয়ে এফসি, কালিঘাট মিলন সংঘ, ভবানীপুর এফসি, টালিগঞ্জ অগ্রগামী এই সব দলগুলো‌ ছাড়া বাংলার ফুটবল ভাবাই যেত না। এই সমস্ত দল এবং তার অ্যাকাডেমিগুলো‌ ছিল ফুটবলার তৈরির আঁতুড়ঘর। বড়ো ম্যাচের ইতিহাস লিখতে গেলে অবশ্যই জুড়ে যাবে এই ক্লাবগুলোর নাম। ২০১১ পরবর্তী সময়‌ থেকে শুরু হলো বাংলা ফুটবলের কঙ্কালসার দশা।‌ সরকারের মদতে শুরু হলো একের পর এক ক্লাবের দখলদারি, তৃণমূলের মাতব্বরদের নতুন আস্তানা ময়দান।

বছরের পর বছর চলছে ফুটবল নিধন যজ্ঞ। যে‌ বাংলা ফুটবলের নবজাগরণ ঘটিয়েছিল গোটা দেশজুড়ে। নতুন ফুটবলার তৈরির আখড়া ছিল যে অ্যাকাডেমি সেই অ্যাকাডেমি- গুলো কার্যত লাটে তোলার মতো অবস্থা করে ছেড়েছে তৃণমূলের মাতব্বররা। বাংলার ফুটবলকে লাটে তোলার জন্য দখল করা হলো আইএফএ। সুতারকিন স্ট্রীটের অফিস আসলে অরুপ বিশ্বাসের পার্টি অফিস হয়ে দাঁড়িয়েছে। গজিয়ে উঠছে ডায়মন্ড হারবারের মতো ফুটবল ক্লাব যে দলের কাজ কয়লা মাফিয়ার কালো টাকা সাদা করা। কোন নিয়ম না মেনেই হঠাৎ করে প্রথম সারির টুর্নামেন্ট খেলতে শুরু করলো আইএফএ- এর বদান্যতায়। ফলে ফুটবলের রাজনীতিকরণ আরও দৃঢ় ভাবে শুরু করা হলো।

তার ওপর চুড়ান্ত বেসরকারিকরণ ফলে বড়ো‌ ক্লাবগুলো‌ ছাড়া ছোট ক্লাবগুলোর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না দল গঠন করা। ফলে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অনেক ক্লাব। এবং কলকাতা ফুটবল‌‌ লিগ, আইএফএ শিল্ড কার্যত কর্পোরেট খেলায় পিছিয়ে পড়ছে ফলে গুরুত্ব কমছে লিগ গুলোর।

চূড়ান্তভাবে কর্পোরেটমুখী হচ্ছে দেশের ফুটবলও আম্বানিদের এফএসডিএল কন্ট্রোল করছে গোটা ভারতীয় ফুটবল, আইএসএল হচ্ছে আম্বানি, সঞ্জীব গোয়েন্কাদের মুনাফা তৈরির লিগ। ফলে ৫০-৬০ কোটি খরচা হচ্ছে টিম পিছু ১৫০-২০০ কোটি মুনাফা করছে কর্পোরেট কোম্পানিগুলো। বন্ধ হচ্ছে ডেমপো, সালগাওকর, চার্চিল ব্রাদার্সের মতো দলগুলি। চূড়ান্ত কর্পোরেটমূখী হয়ে আসলে ক্ষতি হচ্ছে বাংলা তথা ভারতীয় ফুটবলের। ফুটবলার তৈরির কারখানাগুলো অর্থাৎ ময়দানের বুনিয়াদি ক্লাবগুলো ধ্বংসের মুখে অনেক ক্লাব উঠেই গেছে। দেশের সরকারের মতো উদাসীন রাজ্যের সরকার। পূজো করার জন্য ক্লাবকে ১ লক্ষ টাকা দেওয়া হচ্ছে কিন্তু ফুটবলের স্বার্থে কোন স্পেশাল প্যাকেজ তৈরি করে ক্রীড়া মন্ত্রক। খুব শোচনীয় অবস্থা ময়দানের রেফারিদের, তাদের রোজকার আজকের দিনে নেই বললেই চলে, একের পর এক লিগ যদি বন্ধ হতে থাকে তাহলে পেশাদার রেফারি‌ বা ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন কেউ দেখবেই না, “শিল্ড গ্রামের বাইরে যেতে দেব না” ধন্যি মেয়ের‌ এই সংলাপ বাস্তবায়িত করতে শিল্ড কে বাঁচাতেই হবে, ফুটবলকে বাঁচাতেই হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *