এল ও সি এফ : পেছনের দিকে হাঁটছে ভারতবর্ষ

ইউজিসি জারি করলো এদেশের শিক্ষার কারিকুলাম সংক্রান্ত তার নবীনতম ফ্রেমওয়ার্ক। প্রাথমিকভাবে ৯ টি বিষয়ের পাঠ্যসূচীর চূড়ান্ত রদবদল করে তা খসড়া আকারে আনা হলো এবং তা নিয়ে ‘ ফিডব্যাক ’ দেওয়ার জন্য সময় দেওয়া হলো একমাস৷ তার নাম এল ও সি এফ বা লার্নিং আউটকামস্ বেসড্ কারিকুলাম ফ্রেমওয়ার্ক। এই দলিলটি শুধু আর গৈরিকীকরণের প্রচেষ্টায় সীমাবদ্ধ রইলো না, বরং পা থেকে মাথা পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে নিয়ে গেলো একটা রক্ষণশীল, কদর্য, পশ্চাদপদ অন্ধকার যুগে – যেখানে এই সভ্যতার আধুনিকতম প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবন সহাবস্থান করবে সভ্যতার প্রাচীনতম অবৈজ্ঞানিক যুক্তিহীন সামন্ততান্ত্রিক বিশ্বাসগুলোর সাথে। ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেমের নামে রাষ্ট্রবিজ্ঞান থেকে রসায়ন সর্বত্র জুড়ে দেওয়া হয়েছে প্রাচীন ভারতের গৌরবগাথার নামে কিছু ভ্রান্ত অনৈতিহাসিক কাল্পনিক ধারণা, যা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শনের মর্মবস্তু৷ এতদিন হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটির মারফত যা কিছু পড়ানো হতো , তা এবারে সরাসরি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর নীলনকশা নিয়ে এসেছে সরকার।

গণিতশাস্ত্রের কারিকুলাম ফ্রেমওয়ার্কটি বিস্মিত হয়ে যাওয়ার মতো। উচ্চশিক্ষায় যেখানে উন্নততর গাণিতিক সূত্রায়ন বা প্রয়োগ শেখার কথা, সেখানে বেদের যুগের গণিতের খুঁটিনাটি পড়ানো হবে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রাচীন ভারতে কালের নিরিখে গণিত বিজ্ঞানের যে সুসমৃদ্ধ ভান্ডার, তা অতি অবশ্যই প্রশংসনীয় – কিন্তু তা বর্তমান সময়ের গণিতের থেকেও উন্নত ছিল বা বর্তমানের উদ্ভাবনগুলি বেদের যুগেই হয়ে গেছিল; এমন ধারণা পোষণ করা হাস্যকর। সেই ধারণাকে কার্যত প্রতিষ্ঠা দেওয়ার লক্ষ্যেই গণিতের কারিকুলামে ঢুকে গেছে নারদপুরাণ, জৈষ্ঠ্যা দেবী আর শূল্ব্য সূত্র। সূর্য-চন্দ্রের অবস্থান দেখে কালজ্ঞাপনের প্রাচীন তত্ত্ব পড়িয়ে মোহবিস্তার করা হবে এমন একটি যুগ এবং সমাজ সম্পর্কে – যে সমাজ বর্ণাশ্রমের প্রতিনিধিত্ব করে, যে সমাজ প্রতিনিধিত্ব করে ভারতবর্ষের অন্ধকারতম হিংস্র আস্ফালনের যুগের।চলে যাই রসায়নে, দেখবো রসায়নশাস্ত্র সংক্রান্ত যে খসড়া কারিকুলাম, তার সূত্রপাত হচ্ছে সরস্বতীবন্দনা দিয়ে। শুরুতেই দেবী সরস্বতীর চিত্রসহ তার নীচে মোটা মোটা অক্ষরে লেখা রয়েছে – “ Salutations to Devi Saraswati, the giver of boons and fulfiller of wishes. O Devi, When I begin my studies, please bestow on me the capacity of right understanding always.” নির্দিষ্ট একটি ধর্মের দেবতাকে দেশের শিক্ষা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিলে সগর্বে স্থান দেওয়া দেশের ধর্মনিরপেক্ষ এবং যুক্তিবাদী প্রাণস্পন্দনের ঘোরতর পরিপন্থী। CHY – DSE – 404 নং কোর্স কোডে রয়েছে ভারতীয় ঔষধবিদ্যার ইতিহাস (আয়ুর্বেদ ও সিদ্ধ) সংক্রান্ত আলোচনা৷ এইজাতীয় বিষয় রসায়নের মূল বিদ্যার সাথে সম্পৃক্ত নয়, বরং তা খানিক রসায়নের ইতিহাস। যা স্কুলপাঠ্য সিলেবাসে খানিক আলোচিত হতেই পারে, কিন্তু উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এই বিষয় অপ্রাসঙ্গিক। CHY – DSE – 406 নং কোর্স কোডে রয়েছে ভারতীয় রসায়নের ইতিহাস। এই অংশটি ভীষণভাবেই আপত্তিকর এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদী মননের পরিপন্থী। পারমানবিক বর্ণালী এবং কুন্ডলিনীর ধারণার তুলনা কোনোভাবেই সমান্তরালভাবে তুল্য নয়, একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বনির্ভর – অন্যটি একটি আধ্যাত্মিক ধারণা। ইলেকট্রনের এক এনার্জি লেভেল থেকে উচ্চতর এনার্জি লেভেলে উত্তরণের ধারণার সাথে কুন্ডলিনীর ধাপে ধাপে চক্রে উত্তরণের ধারণার তুলনা হাস্যকর। Maxwell – Boltzman এর Distribution of velocities & energies – এর ধারণার সাথে ‘Samata – Vishamata ’ র ধারণাও তুল্যমূল্যের দাবী রাখে না। গ্যাসের মধ্যে অনুগুলির মধ্যে গতি এবং শক্তির বিষমতার সাথে দর্শনশাস্ত্রের একটি বিষয়ের তুলনা পড়ানো হচ্ছে রসায়নের স্নাতক স্তরে – এর চেয়ে অবৈজ্ঞানিক কিছু হতে পারে না। প্রলয় ধনঞ্জয়ের ধারণাগুলো সম্পূর্ণভাবে আধ্যাত্মিক এবং আধুনিক বিজ্ঞানের পরিপন্থী, Radioactivity ’র সাথে একে যুক্ত করে মৃত্যু পরবর্তী অস্তিত্বের ধারণাকে পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার অর্থ একটি রক্ষণশীল এবং অবৈজ্ঞানিক চেতনাকে নবীন প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারিত করা৷ প্রাচীন ভারতে ধাতুবিদ্যার ইতিহাস সংক্রান্ত চর্চাও মৌলিক বিজ্ঞানের চর্চার মধ্যে ভীষণভাবেই অপ্রাসঙ্গিক!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *