কর্পোরেট বিনিয়োগ ও ভারতীয় ক্রীড়া

একসময় পেশাদার ফুটবল ক্লাবগুলি ছিল স্থানীয় মানুষের সমর্থন পুষ্ট। সেখানে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রনা ছিল। তখন ফুটবলারদের আয় ছিল কম। বিগত কয়েক দশক ধরে ফুটবল চলে বিশ্বব্যাপী কর্পোরেট পুঁজির মাধ্যমে। বড় খেলোয়াড়দের আয় অস্বাভাবিক বেশি। আগে টেলিভিশন শুরু থাকলেও কভারেজ কম ছিল।

ভারতীয় ক্রীড়াজগৎ আজ এক গভীর দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে অভূতপূর্ব কর্পোরেট বিনিয়োগ, বিপুল অর্থপ্রবাহ, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযুক্তি ও ‘গ্লোবাল ব্র্যান্ডিং’; অন্যদিকে সাধারণ জনগণ, শ্রমজীবী শ্রেণি ও প্রান্তিক সামাজিক গোষ্ঠীর ক্রীড়া থেকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া। এই বিচ্ছেদ কেবল আবেগের নয়, এটি শ্রেণিগত, কাঠামোগত ও রাজনৈতিক। কমিউনিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, ক্রীড়া আর নিছক খেলাধুলা নয়—এটি একটি সামাজিক উৎপাদন ব্যবস্থা, যার ভেতরে পুঁজির আধিপত্য ধীরে ধীরে ক্রীড়াকে জনগণের সাংস্কৃতিক অধিকার থেকে কর্পোরেট পণ্যে রূপান্তরিত করেছে।

ঔপনিবেশিক যুগে ভারতীয় ক্রীড়া ছিল একদিকে শাসকের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের হাতিয়ার, অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধের ক্ষেত্র। ফুটবল, হকি বা ক্রিকেট—সব ক্ষেত্রেই স্থানীয় ক্লাব, শ্রমিক সংগঠন, পাড়া-মহল্লার দল ও স্বেচ্ছাসেবী ক্রীড়া সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল জনগণের নিজস্ব উদ্যোগে। স্বাধীনতার পরেও দীর্ঘ সময় ধরে ক্রীড়া রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সামাজিক অংশগ্রহণের যৌথ পরিসরে বিকশিত হয়। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের পর উদারীকরণ, বেসরকারিকরণ ও বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে ক্রীড়াও পুঁজিবাদী বাজারের নিয়মে বাঁধা পড়ে। কর্পোরেট পুঁজি ক্রীড়াক্ষেত্রে প্রবেশ করে ‘স্পনসরশিপ’, ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি’, ‘মিডিয়া রাইটস’ ও ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’–র নামে, যা বাস্তবে ক্রীড়াকে এক ধরনের বিনোদন-শিল্পে পরিণত করে।
এই রূপান্তরের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ ক্রিকেট। আজকের ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড—Board of Control for Cricket in India—বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রীড়া সংস্থাগুলির একটি। অথচ এই বিপুল সম্পদের উৎস জনগণের আবেগ, শ্রম ও দীর্ঘদিনের ক্রীড়া সংস্কৃতি। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে একটি সীমিত এলিট গোষ্ঠীর হাতে। মাঠে দর্শকরা এখনও ভিড় করেন, কিন্তু তাদের ভূমিকা ক্রমে ‘ভোক্তা’তে সীমাবদ্ধ। টিকিটের দাম, স্টেডিয়ামের বাণিজ্যিকীকরণ, টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের জায়গা সংকুচিত হয়েছে। ক্রিকেট আর পাড়ার মাঠের খেলাধুলা নয়, এটি এখন কর্পোরেট বিনিয়োগের নিরাপদ ক্ষেত্র।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো উদ্বৃত্ত মূল্য আহরণ। ক্রীড়াক্ষেত্রেও তাই ঘটছে। খেলোয়াড়ের শ্রম—তার শারীরিক সক্ষমতা, অনুশীলন, আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা—সবই পণ্যে রূপান্তরিত হচ্ছে। কিছু তারকা বিপুল অর্থ উপার্জন করলেও, অধিকাংশ খেলোয়াড় অনিশ্চিত জীবনের মধ্যে পড়ে থাকেন। বিশেষত নারী ক্রীড়া, আদিবাসী ক্রীড়া বা গ্রামীণ খেলাধুলা কর্পোরেট নজরের বাইরে থেকে যায়, কারণ সেখানে তাৎক্ষণিক মুনাফার সম্ভাবনা কম। ফলে পুঁজির বিনিয়োগ ক্রীড়ার সামগ্রিক বিকাশ ঘটায় না, বরং নির্দিষ্ট কিছু ইভেন্ট ও মুখকে কেন্দ্র করে অসম উন্নয়ন তৈরি করে।

ফুটবল ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা লক্ষণীয়। একসময় কলকাতা, গোয়া বা কেরালার ফুটবল ছিল শ্রমিক শ্রেণি ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি। আজ লিগ কাঠামো, ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকানা ও স্পনসরশিপের দাপটে স্থানীয় ক্লাব সংস্কৃতি দুর্বল। টেলিভিশন স্বত্ব ও বিজ্ঞাপনের চাপে খেলার সময়সূচি, খেলোয়াড়দের বিশ্রাম এমনকি দর্শকের অভিজ্ঞতাও বাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। জনগণ এখানে আর সহ-নির্মাতা নয়, তারা কেবল দর্শক ও ক্রেতা।

ক্রীড়া মানুষের সার্বিক বিকাশের একটি সামাজিক অধিকার। অবসর ও সংস্কৃতি শ্রমজীবী মানুষের মানবিক বিকাশের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু পুঁজিবাদ অবসরকেও পণ্যে রূপান্তরিত করে। আজকের ক্রীড়াজগতে সেই রূপান্তর স্পষ্ট। স্টেডিয়াম, একাডেমি, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র—সবকিছুই ধীরে ধীরে ব্যক্তিমালিকানায় চলে যাচ্ছে। রাষ্ট্র ক্রীড়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে, অথচ কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষায় নীতিগত সহায়তা দিচ্ছে। এর ফল হলো সামাজিক বৈষম্যের পুনরুৎপাদন: ধনী পরিবারের সন্তান উন্নত প্রশিক্ষণ ও সুযোগ পায়, দরিদ্র প্রতিভা হারিয়ে যায় অযত্নে।
গণমাধ্যম এই বিচ্ছেদকে আরও তীব্র করেছে। কর্পোরেট মালিকানাধীন মিডিয়া ক্রীড়াকে ‘ইভেন্ট’ ও ‘স্টার সিস্টেম’-এ পরিণত করেছে। কোন খেলাটি দেখানো হবে, কোন খেলোয়াড় প্রচার পাবে—সবই নির্ধারিত হয় বিজ্ঞাপনমূল্য দিয়ে। এতে ক্রীড়ার বহুত্ব ও গণতান্ত্রিক চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জনগণের সক্রিয়তা সীমিত থাকে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিক্রিয়ায় বা ভোক্তা আচরণে; সংগঠিত অংশগ্রহণ, স্থানীয় উদ্যোগ ও সমবায় কাঠামো ক্রমে বিলুপ্ত হয়।

এখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা বিশেষভাবে সমালোচনার যোগ্য। পুঁজিবাদী রাষ্ট্র নিজেকে ‘নিরপেক্ষ’ বলে দাবি করলেও বাস্তবে সে পুঁজির স্বার্থ রক্ষা করে। কর্পোরেট বিনিয়োগকে ‘উন্নয়ন’ হিসেবে তুলে ধরা হয়, অথচ সরকারি স্কুল-কলেজের মাঠ, জেলা ক্রীড়া পরিকাঠামো ও কোচিং ব্যবস্থায় বিনিয়োগ কমে যায়। এর ফলে ক্রীড়া গণমুখী না হয়ে এলিটমুখী হয়ে ওঠে। ক্রীড়া নীতি জনগণের স্বাস্থ্যের বদলে আন্তর্জাতিক পদক বা বাণিজ্যিক সাফল্যের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের দুই অধ্যাপক জন এফ গ্যালিহার ও রিচার্ড এম হেসলার প্রায় ৪৫ বছর আগে এক প্রবন্ধে দেখিয়েছিলেন যেকোন রকম খেলাধুলায় চরম প্রতিযোগিতা একটা বড় অংশের মানুষকে খেলাধুলায় সক্রিয় হওয়ায় বাধা দেয়। অত্যাধিক প্রতিযোগিতামূলক খেলাগুলি বেশিরভাগ সময় খেলোয়াড়রা উপভোগ করতে পারেন না। আগে সাধারণ মানুষ খেলা দেখে খেলোয়াড়দের দেখে তাঁর মত খেলার চেষ্টা করত, এখন ফ্যান্টাসি গেম খেলে আর সমাজ মাধ্যমে অন্য কোনও খেলোয়াড়কে ব্যঙ্গ করে।

একসময় পেশাদার ফুটবল ক্লাবগুলি ছিল স্থানীয় মানুষের সমর্থন পুষ্ট। সেখানে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রনা ছিল। তখন ফুটবলারদের আয় ছিল কম। বিগত কয়েক দশক ধরে ফুটবল চলে বিশ্বব্যাপী কর্পোরেট পুঁজির মাধ্যমে। বড় খেলোয়াড়দের আয় অস্বাভাবিক বেশি। আগে টেলিভিশন শুরু থাকলেও কভারেজ কম ছিল।

এখন বড় চ্যানেল গুলি বিশাল বিনিয়োগ করে ক্রীড়াক্ষেত্রে। প্রিমিয়ার লিগের টিভি স্বত্ব বিলিয়ন বিলিয়নে
বিক্রি হয়। স্পনসরশিপ এবং বিজ্ঞাপন টিভি কভারেজের মত আরও বেশি অর্থ আনে। ফলস্বরূপ, বড়
খেলোয়াড়রা এখন সেলিব্রিটি। স্থানীয় মানুষ ক্লাব থেকে ক্রমশঃ বিচ্ছিন্ন। আগে খেলোয়াড়রা আশেপাশের
জনসম্প্রদায় থেকেই আসত কিন্তু এখন বহুক্ষেত্রে স্থানীয় জনসম্প্রদায়ের প্রতিনিধি থাকেই না।

বর্তমানে ফ্র্যাঞ্চাইজির যুগে টিকিটের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, খেলাটি শ্রমিক-শ্রেণির নাগালের বাইরে চলে
গেছে ও যাচ্ছে। সম্প্রতি পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে এই ফ্র্যাঞ্চাইজির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে ওঠার অবস্থা তৈরী
হলেও বহু ক্ষেত্রে আন্দোলন গুটিয়ে যাচ্ছে। এক শ্রেণির সমর্থকরা তবুও এই কর্পোরেট সংস্কৃতির
বিরোধিতা করেন। যদিও বিকল্প রাস্তা দেখাতে তাঁরা অক্ষম।

আসলে সাম্প্রতিক সময়ের আন্তর্জাতিক পুঁজি যে কোনও খেলাধুলায় প্রতিযোগিতা ও শ্রেষ্ঠত্ব, দুটি
বিষয়কেই পণ্য বলে মনে করে, এমনকি এর সঙ্গে যুক্ত থাকা ‘নৈতিক’ ধারণাকেও পণ্য বলে ধরে। যেহেতু
আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদ এবং ক্রীড়া জগতের বিশাল বাজার মোটামুটি একই কর্পোরেটদের নিয়ন্ত্রণে তাই
যেকোনো বড় খেলার (ফুটবল, ক্রিকেট, অলিম্পিক) আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের স্বার্থকে খুব ভালভাবে রক্ষা করে।

তবে এই অন্ধকার চিত্রের মধ্যেও প্রতিরোধের সম্ভাবনা রয়েছে। শ্রমিক ক্রীড়া আন্দোলন, স্থানীয় ক্লাব সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবন, বিদ্যালয় ও পঞ্চায়েত স্তরে গণক্রীড়া উদ্যোগ—এসবই পুঁজির আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিকল্প পথ দেখাতে পারে। সমবায় মালিকানা, গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্রীয় সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা বলে। ক্রীড়া যদি আবার জনগণের হাতে ফিরে আসে, তবে তা কেবল বিনোদন নয়—স্বাস্থ্য, সংহতি ও শ্রেণি-চেতনার ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

অতএব, ভারতীয় ক্রীড়ায় কর্পোরেট বিনিয়োগ ও জনগণের সক্রিয়তা থেকে বিচ্ছেদ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের স্বাভাবিক ফল। এই বিচ্ছেদ ভাঙতে হলে ক্রীড়াকে আবার সামাজিক অধিকারের পরিসরে ফিরিয়ে আনতে হবে। খেলাধুলা তখনই মুক্ত হতে পারে, যখন তা মুনাফার নয়, মানুষের মুক্ত বিকাশের জন্য সংগঠিত হবে। ক্রীড়াকে পণ্যের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে জনগণের যৌথ আনন্দ ও সংগ্রামের অংশ করে তুলতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *