বাজেট ও বাস্তবতা : বিপন্ন প্রজন্মের খতিয়ান

রাজ্যের ৬,৪৮২টি স্কুলের ২ লক্ষ ৩৫ হাজার ছাত্রছাত্রী আজ স্রেফ একজন শিক্ষকের মুখাপেক্ষী। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির দায়ে ২৫,৭৫১ জনের চাকরি বাতিল হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে, অথচ স্থায়ী নিয়োগের কোনো সদিচ্ছা নেই। অন্যদিকে ৩,৮১২টি স্কুলে পড়ুয়াহীন অবস্থায় শিক্ষক পড়ে আছেন—যা চূড়ান্ত প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার ফল। আসলে এই ‘সিঙ্গল টিচার’ বা পড়ুয়াহীন স্কুলগুলো হলো সুপরিকল্পিত ‘একীভূতকরণ’ বা স্কুল বন্ধের প্রথম ধাপ। গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে একচেটিয়া বাজারের নিয়ন্ত্রণে আনার এই গভীর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ছাত্র সমাজকে আজ সজাগ হতে হবে।

শহরের বিলাসবহুল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অডিটোরিয়ামে বসে যখন ‘বিকশিত ভারত’ কিংবা ‘অভূতপূর্ব উন্নয়ন’-এর ঝকঝকে পরিসংখ্যান পেশ করা হয়, তখন তার প্রতিটি পৃষ্ঠায় লুকিয়ে থাকে দেশের অগণিত ছাত্র ও যুব সমাজের দীর্ঘশ্বাস। রাজপথে যখন কেন্দ্রের ‘অমৃত কাল’-এর রঙিন হোর্ডিং ঝোলে কিংবা বিধানসভার দলিলে রাজ্যের ‘এগিয়ে বাংলা’-র জয়গান গাওয়া হয়, তখন সেই উৎসবের আলো কি পৌঁছাতে পারে গ্রাম বাংলার সেই জরাজীর্ণ স্কুল বাড়িটার অন্ধকার বারান্দায়? যেখানে পর্যাপ্ত পরিকাঠামোর অভাবে বর্ষায় ছাদ ফুটো হয়ে জল পরে, যেখানে একটি মাত্র শিক্ষক আর শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী—ধুঁকতে ধুঁকতে কোনো রকমে চলে পঠন-পাঠন।

আসলে ঝকঝকে পরিসংখ্যান আর গাণিতিক চাতুর্যের আড়ালে আজ নিঃশব্দে তলিয়ে যাচ্ছে সাধারণ ঘরের অগণিত ছাত্রের শিক্ষা আর ভবিষ্যৎ। যে ছাত্রটি বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে সরকারি স্কুলের চৌকাঠে পা রেখেছিল, আজ সে দেখছে তার স্কুলে ঝুলছে সরকারি ‘একীভূতকরণ’-এর তালা। আসলে এই দুই সরকারের প্রচার সর্বস্ব রাজনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের স্বপ্নগুলো আজকে কেবল বাজেটের শুষ্ক পাতায় বন্দি হচ্ছে। পড়াশোনা যখন অধিকারের গন্ডি থেকে বঞ্চিত হয়ে স্রেফ দামি পণ্যে পরিণত হয়, মূল্যবৃদ্ধির বাজারে সাধারণ বাবা-মা যখন সন্তানদের খাতা-কলম-বই সহ লেখাপড়ার সরঞ্জাম কিনে দিতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন, ঠিক তখনই বোঝা যায়—এই বাজেট ছাত্রদের সুবিধার্থে নয়, বরং ছাত্রদের বর্তমান শ্রমের বাজারে সস্তায় শ্রমিক বানানোর সুপরিকল্পিত নীল নকশা। সরকারের এই তথাকথিত ‘অভূতপূর্ব’ সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজার হাজার স্কুল বন্ধ হওয়ার হাহাকার, লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বেকারের পরিযায়ী শ্রমিক হওয়ার যন্ত্রণা, আর এক অনিশ্চিত অন্ধকারের পথে ঠেলে দেওয়া এক তরুণ প্রজন্মের করুণ আর্তনাদ—গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে একচেটিয়া বাজারের নিয়ন্ত্রণে আনার এক গভীর ষড়যন্ত্র।

কেন্দ্রীয় বাজেট : ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’র আড়ালে অ্যানালগ বঞ্চনা- কেন্দ্রীয় সরকার দাবি করেছে, গত অর্থবর্ষের ১,২৫,৬৩৮ কোটি টাকার তুলনায় এবার বরাদ্দ ১০.৮ শতাংশ বাড়িয়ে ১,৩৯,২৮৯ কোটি টাকা করা হয়েছে। কিন্তু গভীরে তাকালে দেখা যাবে, এই বরাদ্দ মোট বাজেটের মাত্র ৩.৩ শতাংশ এবং জিডিপির মাত্র ০.৪৪ শতাংশ। আমাদের সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে—শিক্ষা খাতে বরাদ্দ হতে হবে মোট বাজেটের ১০ শতাংশ অথবা জিডিপির ৬ শতাংশ। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেট সেই ন্যায়সঙ্গত দাবি থেকে যোজন যোজন দূরে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমান বাজারে ৫ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি বাদ দিলে শিক্ষার প্রকৃত বৃদ্ধি ৫ শতাংশেরও নীচে। কেন্দ্রীয় বাজেট দলিলের ১১ নম্বর পৃষ্ঠায় ১৫,০০০ স্কুলে ‘ই-কনটেন্ট ল্যাব’ তৈরির জাঁকজমকপূর্ণ ঘোষণা আছে। অথচ সরকারি তথ্য (UDISE+ ২০২৪-২৫) বলছে, গত ১০ বছরে পরিকাঠামো ও শিক্ষকের অভাবে সারা দেশে ৯৩,০০০ সরকারি স্কুলে তালা ঝুলেছে। বর্তমানে ১,০৪,১২৫টি স্কুল চলছে মাত্র একজন শিক্ষক দিয়ে—অর্থাৎ প্রায় ৩০ লক্ষ শিশুর ভবিষ্যৎ আজ অনিশ্চিত। প্রশ্ন জাগে, শিক্ষক নিয়োগের ৯ লক্ষ শূন্যপদ না ভরে এডু-টেক কোম্পানিগুলোর গেজেট বিক্রির বাজার তৈরি করাই কি এই বাজেটের আসল লক্ষ্য? ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’র এই মরীচিকার আড়ালে শিক্ষকহীন শ্রেণীকক্ষগুলো আসলে এক চরম অ্যানালগ বঞ্চনার সাক্ষী।
রাজ্য বাজেট: ঋণের পাহাড় আর শূন্য ক্লাসরুম- অপরদিকে, রাজ্য সরকার শিক্ষা খাতের তিনটি প্রধান বিভাগের (স্কুল, উচ্চ ও কারিগরি শিক্ষা) জন্য প্রায় ৪৯,৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। একে মোট বাজেটের ১৬ শতাংশ বলে দাবি করা হলেও তার বাস্তব সুফল ক্লাসরুমে পৌঁছাচ্ছে না। কারণ, বরাদ্দের সিংহভাগই চলে যায় বেতন ও প্রশাসনিক ব্যয়ে। উপরন্তু, বাজেটের ৮ নম্বর পয়েন্ট অনুযায়ী, ৫৪,৬০৬ কোটি টাকা (বাজেটের ১৭.৬৪%) ব্যয় হচ্ছে কেবল পুরনো ঋণের বোঝা বইতে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার চেয়ে দেনা মেটানোই যখন সরকারের অগ্রাধিকার, তখন উন্নয়নের চাকা থমকে যেতে বাধ্য। গত বছরের তুলনায় এই ঋণের বোঝার খরচ ২৪.৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া যেকোনো শিক্ষা-উন্নয়নের টুঁটি টিপে ধরার জন্য যথেষ্ট। রাজ্য বাজেট দলিলের ১০ নম্বর পৃষ্ঠায় ৫৩ লক্ষ স্মার্টফোন ও ১ কোটি ৪৪ লক্ষ সাইকেল বিলির খতিয়ান দেওয়া হয়েছে। অথচ অর্ধেকের বেশি স্কুলে ইন্টারনেট বা কম্পিউটার ল্যাব নেই। কেন্দ্র-রাজ্য দড়ি টানাটানিতে পশ্চিমবঙ্গের ৬৪,০০০ স্কুল ‘কম্পোজিট গ্র্যান্ট’-এর অভাবে ধুঁকছে। গত অর্থবর্ষের শুরুতেও সরকার মাত্র ২৫ শতাংশ টাকা ছাড়তে পেরেছে, বাকি ৭৫ শতাংশ বরাদ্দ আজও পৌঁছায়নি। ফলে চক-ডাস্টার কেনা বা বিদ্যুৎ বিল মেটানোও আজ দুঃসাধ্য।

রাজ্যের ৬,৪৮২টি স্কুলের ২ লক্ষ ৩৫ হাজার ছাত্রছাত্রী আজ স্রেফ একজন শিক্ষকের মুখাপেক্ষী। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির দায়ে ২৫,৭৫১ জনের চাকরি বাতিল হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে, অথচ স্থায়ী নিয়োগের কোনো সদিচ্ছা নেই। অন্যদিকে ৩,৮১২টি স্কুলে পড়ুয়াহীন অবস্থায় শিক্ষক পড়ে আছেন—যা চূড়ান্ত প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার ফল। আসলে এই ‘সিঙ্গল টিচার’ বা পড়ুয়াহীন স্কুলগুলো হলো সুপরিকল্পিত ‘একীভূতকরণ’ বা স্কুল বন্ধের প্রথম ধাপ। গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে একচেটিয়া বাজারের নিয়ন্ত্রণে আনার এই গভীর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ছাত্র সমাজকে আজ সজাগ হতে হবে।

সস্তা শ্রমিকের কারখানা: দক্ষতার অপমৃত্যু ও ঋণের ফাঁস-বর্তমান শ্রমের বাজারে একজন শিক্ষার্থী প্রধানত দুটি বিষয় মাথায় রেখে পড়াশোনা করে—এক, কত কম খরচে সে সর্বাধিক দক্ষতা অর্জন করতে পারবে; এবং দুই, শিক্ষা শেষে সেই দক্ষতা অনুযায়ী সে কতটা সম্মানজনক কাজের সুযোগ পাবে। কিন্তু বর্তমান ভারতের রূঢ় বাস্তব হলো, বেকারত্বের ভারে যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাওয়া আজ এক অলীক কল্পনা। উল্টোদিকে, ইকোনমিক সার্ভে (২০২৫-২৬) অনুযায়ী গত এক বছরে পরিবারের নিজস্ব শিক্ষা খরচ ১৫ শতাংশ বেড়েছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্কুল ও কলেজের হাজিরা খাতায়। বঞ্চনার এই মানচিত্র আজ কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত বিস্তৃত। UDISE+ (২০২৪-২৫) রিপোর্ট অনুযায়ী, সারা দেশে মাধ্যমিক স্তরে প্রতি বছর প্রায় ১২.৬ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৪৬ লক্ষ পড়ুয়া স্কুলছুট হচ্ছে। আবার AISHE-র সর্বশেষ জাতীয় রিপোর্ট বলছে, উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা তরুণদের মধ্যে মাত্র ২৮.৪ শতাংশ কলেজের চৌকাঠ পেরোতে পারে; বাকি ৭১ শতাংশের বেশি তরুণ সমাজ আজ উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত। পশ্চিমবঙ্গের চিত্রটি আরও ভয়াবহ। এখানে মাধ্যমিক স্তরে স্কুলছুটের হার ১৮.২ শতাংশ, যা জাতীয় গড়কেও ছাপিয়ে গেছে। স্কুল শেষ করা প্রতি ১০০ জনের মধ্যে মাত্র ২০-২২ জন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় পৌঁছাতে পারছে, আর তাদের মধ্যেও ১৫-১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী ডিগ্রি পূর্ণ করার আগেই অভাবের তাড়নায় বা কর্মসংস্থানের অভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।

এই অকাল-বিদায় নেওয়া মেধাগুলোই শেষ পর্যন্ত শিশু শ্রমিক কিংবা পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে অসংগঠিত শ্রমের বাজারে নাম লেখাচ্ছে। নীতি আয়োগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে দ্রুত বাড়ছে সামাজিক সুরক্ষাহীন ‘গিগ শ্রমিকের’ সংখ্যা। ডেলিভারি বয় বা অস্থায়ী শ্রমিকের এই ‘গিগ ইকোনমি’ আসলে কোনো টেকসই কর্মসংস্থান নয়, বরং এক আধুনিক গোলামখানা।

রাজ্য বাজেট দলিলের ১০ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, সরকার ‘স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড’-এর মাধ্যমে ৩,৮০০ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে। ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্কলারশিপ বা বৃত্তির পরিমাণ বাড়ানোর বদলে তাদের ঋণের জালে জড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ৪ শতাংশ সুদের এই ঋণ আসলে ডিগ্রি পাওয়ার আগেই শিক্ষার্থী ও তার পরিবারের গলায় এক মরণফাঁস। যে শিক্ষা কর্মসংস্থানের গ্যারান্টি দেয় না, সেই শিক্ষার জন্য পাহাড়প্রমাণ ঋণের বোঝা আসলে ছাত্রসমাজকে আজীবন দাসে পরিণত করার এক সুপরিকল্পিত কৌশল।

শেষ কথা : বাজেটের এই গাণিতিক কারসাজি আসলে এক গভীর ষড়যন্ত্র—যার একদিকে আছে স্কুলছুট শ্রমিকের সস্তা বাজার, আর অন্যদিকে ঋণের জালে বন্দী বিপন্ন প্রজন্ম। ৯৩ হাজার স্কুল বন্ধের এই ‘অকাল অমৃত কালে’ আমাদের স্বপ্নগুলো পণ্য হওয়ার আগেই রুখে দাঁড়াতে হবে। শিক্ষার অধিকার বাঁচাতে আজ মাঠের লড়াই-ই একমাত্র বিকল্প।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *