উন্নয়নের নীচে পিষে যাওয়া বাংলার পরিযায়ী শ্রমিক
সমাদৃতা বিশ্বাস
ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সেই অনেক শ্রমিক শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েন যে বয়সে কাজের জীবন সবচেয়ে উৎপাদনশীল হওয়ার কথা।এই শ্রমের সময়সীমাও মানবিক সীমা ছাড়িয়ে যায়। দিনে ১১ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ অস্বাভাবিক নয়। দৈনিক মজুরি ৬০০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করলেও কাজ থাকে অনিয়মিত। মাস শেষে গড় আয় দাঁড়ায় ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকার আশেপাশে।
ভারতের তথাকথিত উন্নয়ন যাত্রার ভিত যে শ্রমের উপর দাঁড়িয়ে আছে, সেই শ্রমের বড় অংশই আসে অভ্যন্তরীণ পরিযায়ী শ্রমিকদের হাত ধরে। সরকারি হিসেবেই দেখা যায়, এই পরিযায়ী শ্রমিকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পশ্চিমবঙ্গ থেকে যান। বেসরকারি গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের সমীক্ষা বলছে বাস্তব সংখ্যা সরকারি নথির চেয়েও অনেক বেশি। মালদহ, মুর্শিদাবাদ, কোচবিহার, বীরভূম, নদিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা এই জেলাগুলি থেকে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ কাজের খোঁজে রাজ্যের বাইরে পাড়ি দেন।
নির্মাণ শিল্প, খনি, পাথর খাদান, ইটভাটা, কারখানা দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও শারীরিকভাবে ধ্বংসাত্মক শ্রমক্ষেত্রগুলিতেই তাদের বড় অংশ কাজ করেন। এই বাস্তবতা শুধু কর্মসংস্থানের সংকটের গল্প নয়। এটি রাষ্ট্র, পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা এবং শ্রমিকের দেহের মধ্যকার এক গভীর অসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের ছবি। এখানে শ্রমিকের শরীর একটি ব্যবহারযোগ্য সম্পদ যার ক্ষয়, অসুস্থতা কিংবা মৃত্যু রাষ্ট্রের উন্নয়নের হিসেবের বাইরে পড়ে। বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের সিংহভাগই অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক। গোটা দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৯০ শতাংশই এই অসংগঠিত ক্ষেত্রের মধ্যে পড়ে কিন্তু পরিযায়ী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এই নিরাপত্তাহীনতা আরও তীব্র। স্থায়ী কাজ নেই, লিখিত চুক্তি নেই, সামাজিক সুরক্ষা নেই, স্বাস্থ্যবিমা নেই, দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের কোন নিশ্চয়তা নেই। কাজ আছে কিন্তু অধিকার নেই। শ্রমের চাহিদা আছে, কিন্তু শ্রমিকের জীবন রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের তালিকায় নেই। এই অনিরাপত্তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় তাদের নিজের জীবন দিয়ে।
পশ্চিমবঙ্গের বহু পরিযায়ী শ্রমিক কাজ করেন পাথর খাদান, ক্রাশার ইউনিট, খনি ও নির্মাণ শিল্পে। এই কাজগুলির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি প্রাণঘাতী পেশাগত রোগ সিলিকোসিস। গবেষণায় দেখা গেছে, পাথর ভাঙা ও খনিশিল্পে যুক্ত শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ শ্রমিকদের শরীরে সিলিকোসিসের লক্ষণ পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন সিলিকা ধুলোর সংস্পর্শে থাকার ফলে ফুসফুস ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে যায়, শ্বাস নেওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে। এই রোগের কোনও সম্পূর্ণ চিকিৎসা নেই। কিন্তু নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না হওয়ায় এই রোগ ধরা পড়ে যখন তখন দেহ কার্যত ভেঙে পড়ে। সিলিকোসিসের পরের ধাপ আরও ভয়াবহ। চিকিৎসা পরিসংখ্যান বলছে সিলিকোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তির টিবিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। এছাড়াও বহু পরিযায়ী শ্রমিক রাজ্যের বাইরে কাজ করতে গিয়ে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন কিন্তু কাজ হারানোর ভয়ে চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রেখে আবার কাজে ফেরেন। ফলে রোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়, সংক্রমণ ছড়ায়, মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় COPD, অ্যাজমা, ফুসফুসে ফাইব্রোসিস, দীর্ঘস্থায়ী কাশি ও শ্বাসকষ্ট। নির্মাণ শ্রমিকদের মধ্যে হাঁটু, কোমর ও মেরুদণ্ডের স্থায়ী ক্ষয় প্রায় নিয়মিত ঘটনা। ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সেই অনেক শ্রমিক শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েন যে বয়সে কাজের জীবন সবচেয়ে উৎপাদনশীল হওয়ার কথা।
এই শ্রমের সময়সীমাও মানবিক সীমা ছাড়িয়ে যায়। দিনে ১১ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ অস্বাভাবিক নয়। দৈনিক মজুরি ৬০০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করলেও কাজ থাকে অনিয়মিত। মাস শেষে গড় আয় দাঁড়ায় ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকার আশেপাশে। এই আয়ের মধ্যেই ভাড়া, খাবার, ওষুধ, পরিবারে টাকা পাঠানোর দায়িত্ব সামলাতে হয় তাদের। অসুস্থ হলে আয় শূন্য। শরীর ভেঙে পড়লে জীবনের সমস্ত ভরকেন্দ্র ভেঙে পড়ে।
সিলিকোসিসে আক্রান্ত অকাল কর্মক্ষমতা হারানো পরিযায়ী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ক্ষয় শুধু একটি দেহে সীমাবদ্ধ থাকে না তা সরাসরি সন্তানের জীবনে নেমে আসে। শ্রমিকের অসুস্থতা বা মৃত্যু মানেই পরিবারের আয়ের ভরকেন্দ্র ভেঙে পড়া। এই অবস্থায় স্কুলে যাওয়া সন্তানের জন্য অসম্ভব হয়ে ওঠে। পেটের দায় শিক্ষার অধিকারের উপর জয়ী হয়। ফলে অল্প বয়সেই এই শিশুরা স্কুলছুট হয়ে নির্মাণক্ষেত্র, ইটভাটা, কারখানার কাজে যুক্ত হয় আরও কম মজুরিতে, আরও বেশি ঝুঁকিতে। এভাবে পেশাগত রোগ এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে শোষণের চক্র তৈরি করে।
স্বাস্থ্যসুরক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবতা আরও নির্মম। ই-শ্রম পোর্টাল, শ্রমিক কল্যাণ বোর্ড এইসব প্রকল্প কাগজে থাকলেও পরিযায়ী শ্রমিকদের বড় অংশ এখনও নথিভুক্ত নন। নথিভুক্ত না থাকার দরুন দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলেও পরিবার ক্ষতিপূরণ পায় না। বহু শ্রমিক জানেনই না যে এমন কোনও অধিকার তাঁদের আছে। এই অজ্ঞতা কোনও ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয় এটি রাষ্ট্রের পরিকল্পিত উদাসীনতার ফল।
বর্তমানে এই শারীরিক ও সামাজিক বিপন্নতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক ভয়ংকর রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিচয়ের হিংসা। সাম্প্রতিক বছরে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর হেনস্থার ঘটনা ক্রমশ বেড়েছে। ভাষা, চেহারা বা নামের ভিত্তিতে তাঁদের ‘বাংলাদেশি’ বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বৈধ নাগরিকত্ব প্রমাণের সুযোগ না দিয়েই আটক, মারধর, এমনকি সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার মতো বেআইনি ঘটনাও ঘটছে। দরিদ্র শ্রমিককে শত্রু বানিয়ে রাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক ব্যর্থতা ঢেকে রাখছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো আইন থাকা সত্ত্বেও সরকার নিজেই তা প্রয়োগ করছে না। ১৯৭৯ সালের আন্তঃরাজ্য পরিযায়ী শ্রমিক আইন স্পষ্টভাবে নিয়োগকারী ও ঠিকাদারের দায় নির্ধারণ করেছে -আবাসন, চিকিৎসা, যাতায়াতের সবই তাদের দায়িত্ব। কিন্তু এই আইন কার্যকর হলে কর্পোরেট সংস্থা ও ঠিকাদারদের জবাবদিহি করতে হবে তাই আইন কার্যত অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। ফলত ক্রমাগত বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকরা আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছেন—অর্থনৈতিক শোষণ, শারীরিক ক্ষয় এবং রাজনৈতিক নিগ্রহ থেকে। এই অবস্থায় ভাতা দিয়ে সমস্যার বিশেষ সমাধান হয় না। কয়েক হাজার টাকার ভাতা সেই শ্রমিকের তেমন কাজে আসে না, যার শরীর সিলিকোসিসে ভেঙে পড়েছে, যার চিকিৎসা নেই, যার কাজ নেই। পরিযায়ী শ্রমিকেরা আসলে চাইছেন আইনের বাস্তব প্রয়োগ, পেশাগত স্বাস্থ্যসুরক্ষা, নিয়মিত চিকিৎসা, স্থায়ী কাজের সুযোগ এবং নাগরিক হিসেবে প্রশ্নাতীত মর্যাদা।
আজ বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে যা ঘটছে, তা কেবল একটি রাজ্যের সমস্যা নয়। এটি ভবিষ্যত ভারতের শ্রম বাস্তবতার পূর্বাভাস। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারগুলি সচেতনভাবেই পরিযায়ী শ্রমিকদের সুরক্ষার প্রশ্নকে উপেক্ষা করে চলেছে। কেন্দ্রের স্তরে আইন আছে, নীতির ঘোষণা আছে, পরিসংখ্যানের ভাষণ আছে কিন্তু আন্তঃরাজ্য পরিযায়ী শ্রমিক আইনের বাস্তব প্রয়োগ নেই, পেশাগত রোগের জাতীয় স্বীকৃতি নেই, সিলিকোসিস ও সিলিকো টিউবারকিউলোসিসে আক্রান্ত শ্রমিকদের জন্য কার্যকর চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নেই। অন্যদিকে রাজ্য সরকারগুলি শ্রমিকের স্বাস্থ্য, নথিভুক্তি ও সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নে কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকা নেয়। এই সকল ব্যর্থতার মধ্যেই পরিযায়ী শ্রমিকের দেহ ভেঙে পড়ে। এদিকে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য দু’স্তরের প্রশাসনই ভাষা ও পরিচয়ের প্রশ্নে শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীন করে তুলছে।
ভিনরাজ্যে বাংলাভাষী শ্রমিকদের উপর নিগ্রহ , নাগরিকত্ব যাচাইয়ের নামে বেআইনি আটক ও হেনস্থা এবং এই ঘটনার বিরুদ্ধে সরকারের নীরবতা স্পষ্ট করে দেয় এই অবহেলা দুর্ঘটনা নয়, এটি রাজনৈতিক পছন্দ। যে উন্নয়ন লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের ফুসফুসে ধুলো জমিয়ে, চিকিৎসাহীন রোগকে স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে মেনে নিয়ে, পরিচয়ের রাজনীতিকে শাসনের অস্ত্র বানায় তা উন্নয়ন নয়। তা কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের যৌথ ব্যর্থতা এবং যৌথ দায়।প্রশ্ন তাই বিমূর্ত রাষ্ট্রের দিকে নয়, সরাসরি ক্ষমতায় থাকা সরকারের দিকে। এই কেন্দ্রীয় সরকার ও এই রাজ্য সরকারগুলি কি পরিযায়ী শ্রমিককে নাগরিক হিসেবে স্বীকার করতে প্রস্তুত, না কি উন্নয়নের নামে তাদের শরীর ক্ষয় হওয়াকেই শাসনের গ্রহণযোগ্য মূল্য বলে ধরে নিয়েছে?