আজকের গোয়েবলস বনাম ভারতবর্ষ
আরত্রিক চ্যাটার্জী
হলুদ ট্যাক্সি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আগাম নিঃশ্বাস গুলি ত্যাগ করে ভোরের আলো ফোটার পরে সেই ট্যাক্সিচালকেরা যখন রওনা দিচ্ছে, তখনও শহর কলকাতায় গাড়ির হর্নের আওয়াজ শুরু হয়নি। গরিব আর মধ্যবিত্তের ঘুমটা ভেঙেছে কিন্তু বড়লোকের ঘুম ভাঙতে একটু দেরি আছে। দৈনিক পত্রিকা হাতে কাঁচা আর পাকা দাড়ির সংমিশ্রণ যখন চায়ে চুমুক দিচ্ছে ঠিক সেই সময় শহরের গন্ধ ত্যাগ করে ধক ধক ধক ধক আওয়াজে বাইকের সাইলেন্সার পাইপ থেকে কিঞ্চিত কালো ধোয়া বার করে ছুটে চলেছে এক যুবক, ছুটে চলেছে নতুন গন্তব্যে। গন্তব্যের নাম নেই তবে উদ্দেশ্য শহরের ঝাঁ চকচকে দেয়াল থেকে বাস্তবের দেওয়ালে কান পাতলে যে আওয়াজটা শোনা যায় সেই আওয়াজটা শোনার।
রি ফুইলিং করতে চায়ের দোকান। বাইক নয়, নিজেকে। এক কাপ চা সাথে দু ধরনের বিস্কুটের অর্ডার দিতেই চোখ গেল চায়ের দোকানে মুখোমুখি দু ধারের বেঞ্চে বসা, কয়েকজন মানুষের দিকে। চোখ নয় প্রথমে কান গেল, তারপরে চোখ। এক বেঞ্চ থেকে আওয়াজ আসছে “ ওরা কাল আমাদের কয়েকটা ছেলেকে গঙ্গার জলে মুন্ডু কেটে ভাসিয়ে দিয়েছে, আমাদের মন্দিরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে মন্দিরের বাসন চুরি করেছে, এটা ওদের দেশ নয়, এটা আমাদের দেশ” ।
বাক্যের আদান-প্রদান শুনে যা বোঝা গেল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা চলছে। একতরফাই কথা আসছিল, তাই চা শেষ করে আবার বাইক স্টার্ট। এবার একটু অন্য ধাঁচের অভিজ্ঞতা, রাস্তার মোড়ে কয়েকটা লোক তার আলোচনা করছে “মসজিদের সামনে এসে রামরাম করলে মজা বুঝিয়ে দেবো, জ্বালিয়ে দেবো” । বাইক চালক যুবকের হঠাৎ একটা লোকের নাম মাথায় এলো, ‘গোয়েবেলস্ জোসেফ গোয়েবেলস্’ ।
“His intelligence is only equaled by his malice”
(তার বুদ্ধিমত্তার সাথে তার দুষ্টতাই সমান)
এটি গোয়েবলসীয় মিথ্য’ কিংবা ‘এটি গোয়েবলসীয় মিথ্যাকেও হার মানাবে’ এমন কথা আমরা প্রায়ই শুনে থাকি। বিশেষত রাজনীতি বা রাজনৈতিক নেতাদের কথায় ও নানানরকম প্রচারণার ক্ষেত্রে আমরা এসব কথা প্রায়ই বলি ও শুনি। গোয়েবলস কে? যারা রাজনীতি ও দেশকাল সম্পর্কে সচেতন তাদের মধ্যে অনেকেই ‘গোয়েবলসীয় মিথ্যা’ কথাটা শুনেছেন।
জার্মানির ড. পল জোসেফ গোয়েবলস একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন। হিটলারের সময় নাৎসিদের প্রপাগান্ডামন্ত্রী ও প্রচারণা বিশেষজ্ঞ ছিলেন এই গোয়েবলস। ১৯৩৩ হতে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত তিনি মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে সস্ত্রীক আত্মহত্যা করেন। একইসঙ্গে গোয়েবলস ছিলেন এডলফ হিটলারের প্রধান সহযোগী এবং তার একনিষ্ঠ অনুসারী।বিদ্বেষপূর্ণ বক্তৃতা এবং ইহুদি বিরোধী তৎরতার জন্য তিনি কুখ্যাত ছিলেন। বলা হয়ে থাকে, হিটলার জার্মানিতে বিপুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পেছনে যার প্রধান ভূমিকা ছিলো তিনি হলেন এই গোয়েবলস। মিথ্যাকে এমনভাবে প্রচার করে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিয়ে গোয়েবলস নাৎসিবাদ ও হিটলারকে জার্মানিতে তুমুল জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং তার পরবর্তী সময়ে গোয়েবলস ডিক্টেশন দিয়ে একটি ডায়রি লিখিয়েছিলেন। সম্প্রতি ওই ডায়রি যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তা লুইস লচনার উদ্ধার করেন। পরে ডায়রিটি ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে লিওনার্দ ডব্লিউ ডুব। ওই ডায়রিটিতে গোয়েবলস তার প্রপাগান্ডার পলিসি বিস্তারিতভাবে লিখে গেছেন।
যেমন – নানান রকম অনুষ্ঠান, ইভেন্ট, প্রোগ্রাম ও জনমতামতের ব্যাপারে অবশ্যই প্রপাগান্ডাকারীর গোয়েন্দা একসেস থাকতে হবে। বুদ্ধিমত্তা থাকতে হবে।
প্রপাগান্ডা অবশ্যই পরিকল্পিতভাবে হতে হবে। আর তা শুধু এক অথরিটিকেই বাস্তবায়ন করতে হবে।সব ইস্যুরই সার্বিকভাবে প্রপাগান্ডার অর্ডার ও নির্দেশনা থাকতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ ও মূল কর্মকর্তাদের কাছে অবশ্যই প্রপাগান্ডার নির্দেশনাগুলোর ব্যাখ্যা থাকতে হবে। এবং এসব নির্দেশনা ও ব্যাখ্যা অবশ্যই এমন হতে হবে যা তাদের মনোবল ধরে রাখবে।প্রপাগান্ডার নিশ্চয়ই কোনো না কোনো প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল তৈরি হবে সেজন্য অবশ্যই গোয়েন্দা সংস্থাসহ বিভিন্ন পার্টি, সংগঠন ও সংস্থার উপর নিবিড়ভাবে নজর রাখতে হবে।কোনো একটা ইস্যু ও একশনের প্রপাগান্ডা ফলাফল ও প্রতিক্রিয়া কী হবে সেটা আগে থেকেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ভেবে নিতে হবে। এরপরই একশন হবে। প্রপাগান্ডা অবশ্যই এমন হতে হবে যা শত্রু ও বিরোধী পক্ষের নীতি ও কার্যক্রমকে প্রভাবিত করবে। প্রচারণার দিক থেকে যেটা খুবই আকর্ষণীয় মাধ্যম ও উপায় সেটার ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণ করা যা শত্রুপক্ষকে কার্যকর বার্তা দিতে পারে। সরাসরি এবং এমন অবাধ প্রচারণা চালানো যার ভেতরকার অর্থ ও আওয়াজগুলো শত্রুপক্ষকে কাঙ্ক্ষিত পরিণতিতে নিয়ে আসার কারণ হয়ে ওঠে।প্রপাগান্ডার মধ্যে শত্রুপক্ষের প্রতি এমন খোঁচা, প্ররোচনা ও উস্কানি থাকতে হবে যাতে করে শত্রু তার অভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হুট করে বলে দেয় বা ফাঁস করে দেয়। কাঙ্ক্ষিত শত্রুপক্ষের কার্যক্রমের কোনো রেফারেন্স বা সোর্স ব্যবহার না করে এমনভাবে প্রপাগান্ডা চালানো যখন তাতে শত্রুর এসব কার্যক্রমের কোনো ক্রেডিটই থাকবে না। প্রপাগান্ডা ক্যাম্পেইনে অবশ্যই বাস্তবায়ন করা যাবে এমন অপারেশনাল তথ্যই থাকতে হবে এবং এবং ওই তথ্যের কোনো ডকুমেন্ট ও প্রমাণ রাখা যাবে না। খুব সহজেই বোঝা যায় এমন হতে হবে প্রপাগান্ডা। এবং প্রপাগান্ডা অবশ্যই এমন হবে যা শ্রোতা ও দর্শকের ইচ্ছা-আগ্রহকে নাড়া দেয় ও জাগিয়ে তোলে। এধরনের প্রপাগান্ডা অবশ্যই যোগাযোগের সকল মাধ্যমে প্রচারিত হতে হবে। প্রপাগান্ডা সত্য কিবা মিথ্যা হতে হবে এমন কোনো দিব্যি নাই। কিন্তু প্রপাগান্ডার বিশ্বাসযোগ্যতার ব্যাপারে একশ ভাগ নিশ্চিত এবং সংকল্পবদ্ধ থাকতে হবে।
কানে কানে কেউ যেন এসে বলে গেল “কি বাস্তবের সাথে মিলছে”? বাইক আরোহী যুবকের পা থেকে যেন মাটি সরে গেল। গত কয়েক বছর ধরে যা দেশে চলছে, যা রাজনীতিতে ঘটছে, টিভিতে চলছে, যা চায়ের দোকানে শুনছি, যা ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে শুনছি, মোবাইল ফোনে দেখছি সবটাই মিলে যাচ্ছে। গায়ে ধরন দিয়ে উঠছে, এই তথ্যগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের এটা ভেবে। তখন তো নয় নাৎসি পার্টি। আর এখন? এখন RSS, জামাত, এর মতো সাম্প্রদায়িক সংগঠন গুলো। দক্ষতার সাথে এই কাজ যুগ যুগ ধরে করে আসছে। সেই সময় নাৎসি পার্টির উদ্যোগে মূলত জোসেফ গোয়েবেলস এর চাহিদায়, জার্মানি কুতি বাড়িতে রাষ্ট্রের তরফ থেকে একটি ফ্রি ট্রানজিস্টার রেডিও দেয়া হতো, যাতে সারাদিন চলতো নাৎসি জার্মানির বীরত্বের কথা, হিটলারের বীরত্তের কথা। আর এখন? এখন ইউটিউবে একটা ভিডিও দেখতে গেলে তার আগে এক মিনিট আরএসএসের তৈরি করা এডভার্টাইজমেন্ট দেখতে হয়, যাতে ওরা হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তান করতে পারে, প্রত্যেকটা ভিডিওর আগে সেটা মানুষকে জোর করে মনে করিয়ে দেওয়া হয়। আর এই পায়ের পাড়ার চায়ের দোকানের আড্ডা গুলো, যে লোকগুলো দাঙ্গার কথা বলছে, উস্কানি দিচ্ছে, তারাও ওদের পাঠানো লোক। কাউকে অর্থ দিয়ে, এবং কিছুদিন পরে সেই অর্থের জায়গায় তার মাথার মধ্যে সাম্প্রদায়িক হিপনোটিজম দিয়ে। কিন্তু দাঙ্গার পর? শ্রমিক মহল্লায়, কারখানায় শ্রমিকরা যখন কাজ করতে যাবে তখন? হিন্দুদের ভয় দেখানো হচ্ছে যে, হিন্দুরা কারখানায় কাজ করতে গেলে মুসলিমরা মারবে, মুসলিমদের ভয় দেখানো হচ্ছে যে মুসলিমরা যদি কারখানায় কাজ করতে যায় তাহলে হিন্দুরা মারবে। আর ড্রপ আউট? দাঙ্গার পরে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী গুলোর কি হচ্ছে? যাদের গরিব বাবা মাকে ধর্মীয় উস্কানি অথবা অর্থের লোভ দেখিয়ে দাঙ্গা করিয়ে গা ঢাকা অথবা পুলিশ হেফাজতে করতে হয়েছে সেই সন্তানগুলো পড়াশুনা থেকে ড্রপ আউট। আসলে প্ল্যানিংটা অনেক বড়। পড়াশোনা করতে পারলে ওরাই বড় হয়ে জোসেফ গোয়েবেলস্ দের বিরুদ্ধে কথা বলবে। তাই মগজের আক্রমণ। এত গেল গরিবের কথা, আর মধ্যবিত্ত একই জালে জর্জরিত। রাত্রিবেলা অফিস ফেরত বাড়ি এসে খবরের চ্যানেল চালালে চলছে “ তওবা তওবা পাকিস্তান কা ক্যা হালত হ্যা “ , কিন্তু ভারতবর্ষে রোটি কাপড়া মাকানের দাবিতে কথা বলতে গেলে সে হয়ে যাচ্ছে দেশদ্রোহী।
“The king said it’s night
The queen said it’s night
The prince said it’s night
The minister said it’s night
And this just happened after dawn …”
- Gorakh Pandey
The Culture of Godi Media in India.
“If you tell a lie big enough and keep repeating it, people will eventually come to believe it.” – Joseph Goebbels
লক্ষাদিক বেকার যুবককে দাঙ্গার গন্ধ মাখিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ানো হচ্ছে। যারা আওয়াজ তুলছে তাদের জন্য Sedition Law মজুত আছে কিন্তু দেশের ভাঁড়ারে ১৪০ কোটি ভারতবাসীর জন্য রান্নার গ্যাস নেই।
এসবের জবাব কারা দেবে? হিটলারের মন্ত্রিসভার লোকেরা? নাকি শিক্ষা,স্বাস্থ্য,বাসস্থান,কর্ম,খিদের জ্বালায় পেট টনটন করতে থাকা এই দেশের ছাত্র সমাজ? হিটলারের এই GEN-Z র ভয়েই রাতে ঘুম আসতো না। মুসোলিনির ও আসতো না। মোদির ও আসেনা। মুসোলিনি হিটলার এই সবাইকেই ইতিহাসের কাছে নাক্ষত দিতে হয়েছে। RSS বিজেপি সহ বাকি সমস্ত সাম্প্রদায়িক শক্তিকেও নিলডাউন হয়ে বসে ক্ষমা চাইতে হবে দেশবাসীর কাছে, ইতিহাসের কাছে।
ভারত আবার জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে।
খুলে যাক হাজার হাজার বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুল গুলো। স্বপ্নেরা টিফিনে মিঠে রোদ কুড়িয়ে নিক। বন্ধ হোক ধর্মীয় হিংসে গুলো। হাতে হাতে রেখে ঘুরুক বেড়াজাল ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাওয়া প্রেম। পাতে ভাত পড়ুক, ভাতা নয় দাবি আসুক অ্যাকাউন্টে।
জিতে যাক ভালবাসা।
সফল হোক
“ বাবুমশাই জিন্দেগি বড়ি হোনি চাহিয়ে, লম্বি নেহি “ ডায়লগ গুলো।
বাইক আরোহী ছেলেটি, বিশ্রামের বদলে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে শুরু করলো আবার ঐ চায়ের দোকানে বসে, সকাল থেকে দুপুর, দুপুর থেকে সন্ধ্যে, সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত্রি। অভিজ্ঞতাই জবাব দেবে। সমাজকে,সরকারকে, ইতিহাসকে। ও হ্যাঁ বাইক আরোহী ছেলেটির নামটাই বলতে ভুলে গেছি, ছেলেটির নাম ‘ ভারত ‘।
ভারত (বাইক আরোহী) এর ফোন বেজে ওঠায় চায়ের দোকানের সবাই একটু বিস্মিত হলো, রিং টোনটা অদ্ভুত
“ কিসি কি মুস্কুরাহাটো পে হো নিসার
কিসি কা দার্দ মিল সাকে তো লে উধার,
কিসি কে ওয়াস্তে হো তেরে দিল মে প্যায়ার
জিনা ইসিকা নাম হ্যা….”