প্রীতিলতার নিশান…

“আঁধার পথে দিলাম পাড়ি,
মরণ স্বপন দেখে…..”

এমনই দুঃসাহস এবং প্রত্যয়ে ভরপুর দুটো লাইন লেখা ছিল কাগজের টুকরোটায়। ব্রিটিশ পুলিশের কাঁচি-কাটা করা , প্রীতিলতার শেষ চিঠির অংশ। সেই শেষ চিঠির টুকরো পৌঁছেছিল প্রীতির মামাতো দাদা পূর্ণেন্দু দস্তিদারের কাছে, দেউলির বন্দি শিবিরে।

সাহসী, কৌতূহলী ও মেধাবী প্রীতিলতা, স্কুলের শিক্ষিকা ঊষাদির দেওয়া “ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ” বইটি প্রথমবার পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন অষ্টম শ্রেণিতে। ছোটবেলায় গোপন বিপ্লবী দলের সদস্য এক দাদার কাছে শুনতেন, সেইসময়ে চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের গল্প। রেলওয়ে ডাকাতির মামলায় মাস্টারদা সূর্য সেন সহ অন্যান্য বিপ্লবীদের জেল হেফাজতের সময়, নিয়মিত খোঁজ খবর নিতেন শুনানির। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল , যারা দেশের ভালোর জন্য লড়াই করে, তারা মুক্তি পাবেই। সেই মেয়েটিই মাত্র একুশ বছর বয়সে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়ে স্বাধীন ভারতবর্ষ গড়ার লড়াইয়ে জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছিলেন মাতৃভূমিকে শিকল মুক্ত করতে। সাম্রাজ্যবাদের জাঁতাকল থেকে খেটে খাওয়া মানুষদের উদ্ধার করার শপথ নিয়ে , প্রীতিলতা নির্দ্বিধায় ঝাপিয়ে পড়েছিলেন সংগ্রামের আগুনে।

গোপন বিপ্লবী দলের সদস্য সেই দাদার দেওয়া চারটি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক বই পড়ে প্রীতিলতা অল্পবয়সেই উপলব্ধি করেন, ব্রিটিশ শাসন দেশকে পরাধীন করে রাখার পাশাপাশি দেশের মানুষের আত্মসম্মানকেও ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। কেড়ে নিয়েছে বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও। পরবর্তীতে, দাদার মারফত প্রীতি “ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি”- র ‘চট্টগ্রাম’ শাখায় গোপন সদস্যা হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। মাস্টারদা সূর্য সেনের
তত্ত্বাবধানে ও “দীপালি সংঘ” – এর অভ্যন্তরে গোপনে নিজেকে এবং সহপাঠীদের লড়াই সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করেন। ১৯৩২ সালে, পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ – এ নেতৃত্ব দিয়ে, শেষপর্যন্ত আত্মবলিদানের মাধ্যমে প্রীতিলতা দেশ ও সংগঠনের প্রতি দৃঢ় নিষ্ঠার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
প্রীতিলতার জীবনদর্শন নারী স্বাধীনতার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে, এমনকি একুশ শতকেও শ্রমজীবী নারী দিবস প্রসঙ্গে যে একাধিক বিতর্ক থেকে গেছে, তা লজ্জাজনক। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে হাজার হাজার মা – বোনেরা , বিপ্লবী ভাই – ছেলেদের জন্য যে অমানুষিক দৈহিক শ্রম দান করেছিলেন, অর্থ সাহায্য স্বরূপ নির্দ্বিধায় বিলিয়ে দিয়েছিলেন শেষ সঞ্চয়টুকু এমনকি অলংকার পর্যন্ত, তা এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে যথেষ্ট নয় কি? গৃহ শ্রমের প্রশ্নে প্রতিনিয়ত অবহেলিত হতে হয় নারীদের। গৃহ শ্রম আজও “শ্রম” এর স্বীকৃতি পায়নি। সন্তান লালন – পালন, গৃহস্থের অগুনতি কাজের পাশাপশি সংসারের প্রতিটি সদস্যের মুখে অন্ন জোগানোর যে নিরন্তর দায়িত্ব পালন করে চলেছেন আমাদের মা – বোনেরা, তা দেশের সমাজ ও অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছে যুগের পর যুগ, শতকের পর শতক। উপলব্ধি করলে আশ্চর্য হতে হয় যে , সমাজব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ হলেও, এই শ্রমের কোনো মজুরি নেই। নেই কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা। গৃহ শ্রমকে অস্বীকার করা কি তবে নারীদের বাস্তব সংগ্রামকে একাংশে অস্বীকার করার সমতুল্য নয়? প্রীতিলতা সশস্ত্র বিপ্লবে নামার আগে বেশ কিছু বছর গোপনে সহপাঠী মেয়েদের রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে এবং বিপ্লবী দলের জন্য সুদক্ষভাবে অর্থের যোগান দেওয়ার কাজে ব্যয় করেছিলেন। তিনি জীবন দিয়ে বুঝেছিলেন এবং বুঝিয়েছিলেন, বন্দুক হাতে শত্রুর মুখোমুখি হওয়া সংগ্রামের একটি দিক। লড়াই সংগ্রামের আরেকটি অদৃশ্য অংশ লুকিয়ে আছে প্রতিটি বাড়ির অন্দরমহলে, সৈনিকদের প্রস্তুতির যোগানে, মা – বোনেদের শ্রমে, শ্রমের মর্যাদা রক্ষায় ও অধিকার প্রতিষ্ঠায়। স্বাধীনতা আন্দোলন তো বটেই, তেভাগা, শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন, নকশালবাড়ি আন্দোলন, খাদ্য আন্দোলন এবং বিভিন্ন জায়গায় জল-জঙ্গল-জমিন রক্ষার লড়াইয়ে অসংখ্য নারী সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আত্মত্যাগ করেছেন। বর্তমান সময়ে নারীদের আত্মমর্যাদা রক্ষার সংগ্রামের একটি অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত , সেই অদৃশ্য শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া। গৃহ শ্রমকে অস্বীকার করার প্রবণতা আসলে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সকে আড়াল করে রাখতে অনেকাংশে সাহায্য করে। অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা ও সামাজিক ক্ষমতার অসম বন্টন দিনের পর দিন অসংখ্য নারীকে মানসিক ও দৈহিক নির্যাতন সহ্য করতে বাধ্য করে এসেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নারীদের উপর সংঘবদ্ধ আক্রমন, গার্হস্থ্য হিংসা, পণপ্রথা এবং ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন এই সময়ের হাজার হাজার প্রীতিলতারা। জারি রেখেছেন লিঙ্গ বৈষম্য ও সামাজিক বৈষম্যের পাঁচিলকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার আপসহীন সংগ্রাম।

মনে রাখবার বিষয় এই যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে বিপ্লবী বলার অন্যতম কারণ হলেও, একমাত্র কারণ নয়। বাংলা তথা সমগ্র ভারতবর্ষের নারীদের আত্মমর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে নামার সাহস জুগিয়েছিলেন তিনি। শিখিয়েছিলেন, ধর্ম মানেই মেয়েদের উপর অপ্রয়োজনীয় আচার-অনুষ্ঠান অথবা কুসংস্কারের বোঝা নয়। দেশ, দেশের মানুষের স্বাধীনতার জন্য অসীম আত্মত্যাগও মানবধর্মের প্রকৃত রূপ হয়ে উঠতে পারে। প্রীতিলতার উদ্যোগে চট্টগ্রামে প্রথমবার অনুষ্ঠিত হয়েছিল “জিলা নারী সম্মেলন”। সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত রাজনৈতিক বই জোগাড় করতেন বিপ্লবীদের থেকে। পড়াতেন সহপাঠী মেয়েদের। সেইসময়ে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারীরাও লড়াইয়ের জন্য গোপনে তৈরি হচ্ছিলেন প্রীতিলতার সান্নিধ্যে। আজকের ভীষণ কঠিন সময়ে, যখন ধর্মের নামে শয়তানদের আস্ফালন, ঘৃণার রাজনীতি, নারী নির্যাতন ও দুর্বলের উপর শাসকের অত্যাচার বেড়েই চলেছে, তখন প্রীতিলতার বেছে নেওয়া পথ আমাদের নতুন করে স্বপ্ন দেখায়। সাহস জোগায় ঘুরে দাঁড়িয়ে, চোখে চোখ রেখে অধিকার ছিনিয়ে আনার লড়াইয়ে নামার জন্য।

প্রীতিলতা বৈষম্যহীন এবং শোষণমুক্ত স্বাধীন ভারতবর্ষ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। ধর্মের নামে বিভেদের রাজনীতি, সুপরিকল্পিতভাবে সৃষ্ট সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, দরিদ্র এবং সংখ্যালঘু মানুষের উপর সীমাহীন অত্যাচার সেই স্বপ্নের ভারতবর্ষ গড়ে তোলার পথে কাঁটা বই আর কিছু নয়। আমাদের, হাজার হাজার প্রীতিলতাদের কর্তব্য সমস্ত বাধা অতিক্রম করে, ধর্ম – জাতি – লিঙ্গের ভেদাভেদ ভুলে মানুষের মনে যুক্তিবাদের এবং ঐক্যবদ্ধ জীবনের বীজ রোপণ করে যাওয়া। শিক্ষিত ও সংগঠিত হওয়ার পদ্ধতিতে ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি শ্রমিক-কৃষক তথা সর্বস্তরের খেটে খাওয়া মানুষকে একত্রিত করার মধ্যে দিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে বুক চিতিয়ে অংশগ্রহণ করা।

বেকারত্ব, বেসরকারিকরণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় শাসকগোষ্ঠীর অবিরাম হস্তক্ষেপ, প্রতিদিন সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও বেশি করে বাজারকেন্দ্রিক করে তুলছে। বেঁচে থাকার জন্য জরুরি কাজগুলি শেষ হওয়ার পর, পড়ে থাকা অবসরটুকুও কর্পোরেট আমাদের অজান্তেই কিনে নিচ্ছে স্বল্প মূল্যে। এক শতক আগেও, ছাত্রাবস্থায় বিপ্লবী দলের সংস্পর্শে এসে মেধাবী প্রীতিলতা বুঝেছিলেন , ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি মানুষকে মুক্ত করতে পারে সংগঠন, যে সংগঠন পুঁজিবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়তে শেখাতে পারে। শেখাতে পারে কিছু মৌলিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। পাঠ্য বইয়ের বিকৃত ইতিহাসের প্রভাবকে ছাপিয়ে মগজে ভরে দিতে পারে, দেশের মানুষের লড়াইয়ের সত্যিকারের গল্প, অধিকার রক্ষার সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস। শিক্ষা ও শিক্ষা শেষে কাজের দাবিতে লড়াই করি আমরা, ছাত্রছাত্রীরা। যে শাসকগোষ্ঠী এই দেশের লড়াই সংগ্রামে বিপ্লবীদের গৌরবময় ইতিহাসের বিরুদ্ধতা করে চলেছে, তারাই ব্রিটিশ শাসকের আধুনিক এবং অধিকতর মন্দ রূপ। দাঁড়িপাল্লার একদিকে যখন শিক্ষা , শ্রম, সময় ও স্বপ্ন আর অন্যদিকে শাসকের যথেচ্ছাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহার, তখন প্রীতিলতার জীবন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, আমাদের বেঁচে থাকার এবং বাঁচিয়ে রাখার সমস্ত শক্তি সুপ্ত থাকে মানবিকতায়, প্রতিবাদে, নিষ্ঠায়, যুক্তিতে এবং ভালোবাসায়।

আসলে, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, সূর্য সেন, অনন্ত সিংহ, অম্বিকা চক্রবর্তী, সরোজিনী পাল, কল্পনা দত্ত প্রমূখ বিপ্লবীদের আদর্শের প্রাসঙ্গিকতা কয়েকশো শব্দ লিখে বোঝানোর প্রয়োজন হয় না। লড়াইয়ের সামনের সারিতে, লাখো লাখো প্রীতিলতা, সরোজিনী, অনন্ত এবং সূর্য সেনদের এগিয়ে আসা দাবি করে বর্তমান সমাজের প্রতিকূল পরিস্থিতি। আমাদের একত্রিত হওয়ার অঙ্গীকার আসলে সমাজ বদলের লক্ষ্যে, শোষণমুক্ত ভারতবর্ষ‌ গড়ার লক্ষ্যে, জল-জঙ্গল-জমিন রক্ষার লক্ষ্যে। সর্বোপরি, জাত-ধর্ম-লিঙ্গ নির্বিশেষে সকল মানুষকে পাশে নিয়ে, হাতে হাত রেখে সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে ব্যারিকেড গড়ে তোলার লক্ষ্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *